বিসিবি নির্বাচনে সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং ক্ষমতার অপপ্রয়োগের প্রমাণ পেয়ে আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়েছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। যেসব অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি।
ক্যাটাগরি ১ থেকে অভিযোগ (জেলা/বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থা): কাউন্সিলর নাম জমা দেওয়ার সময়সীমা বৃদ্ধি: কাউন্সিলর মনোনয়ন ফরম জমা দেওয়ার শেষ তারিখ প্রথমে ১৭ সেপ্টেম্বর নির্ধারণ করা হলেও পরবর্তীতে সেই সময়সীমা বাড়ানো হয় ৫ দিন। কমিটির মতে, এই সময়সীমা যথাযথ কারণ ছাড়াই এবং গোপন উদ্দেশ্যে বাড়ানো হয়েছিল যাতে পছন্দসই ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা যায়।
অ্যাডহক কমিটি থেকে কাউন্সিলর নাম পুনঃপ্রেরণের নির্দেশ: বিসিবি জেলা ও বিভাগীয় সংস্থাগুলোকে অ্যাডহক কমিটি থেকে পুনরায় নাম পাঠানোর নির্দেশ দেয় । তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টার একান্ত সচিব মি. সাইফুল ইসলাম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রভাবিত করেন, যা বগুড়া ও চট্টগ্রামের তৎকালীন জেলা প্রশাসকদের সাক্ষ্যে নিশ্চিত হয়।
নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে মনোনয়নের জন্য চাপ: সরকারি কর্তৃপক্ষ এবং এনএসসি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের কাউন্সিলর হিসেবে মনোনীত করার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয় অ্যাডহক কমিটির বৈধতা: অধিকাংশ অ্যাড হক কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল, এরপরেও তাদের মাধ্যমে নাম পাঠানো হয়।
চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ: নির্ধারিত সময়ে তালিকা প্রকাশ করা হয়নি এবং তালিকার একাধিক সংস্করণ প্রকাশ করা হয়। ২৬ সেপ্টেম্বরের সংশোধিত তালিকায় পাঁচটি জেলার ভোটারের নাম নতুন করে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
অ্যাডহক কমিটিতে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তি: ৮ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম জেলা ও বিভাগীয় অ্যাড হক কমিটির সদস্য সংখ্যা বাড়িয়ে যথাক্রমে ৯ ও ১১ জন করা হয় । সংবিধান অনুযায়ী সদস্য সংখ্যা ৭ জন হওয়ার কথা । এটি নির্বাচন প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে করা হয়েছে।
সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা মি. আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার হস্তক্ষেপ: সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা ব্যক্তিগতভাবে এবং তার পিএস-এর মাধ্যমে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অযৌক্তিকভাবে হস্তক্ষেপ করেছেন। ই-ভোটে কারচুপি: বিসিবি সভাপতি, সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা ও তার পিএস সমন্বিতভাবে ই-ভোটিং প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ ও কারচুপির সঙ্গে জড়িত ছিলেন ।
গোপনীয়তা ব্যতীত ই-ভোট প্রদান: নির্দিষ্ট স্থান থেকে ই-ভোট প্রদান করা হয়েছে এবং ভোটের গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়নি। ঢাকার হোটেল শেরাটনে ৫ তারিখ রাতে এক জায়গায় জড়ো হয়ে আলোচনাকে কমিটি ভোট কারসাজি মনে করেছে।
আমিনুল ইসলাম বুলবুল ও নাজমুল আবেদীন ফাহিমকে অন্তর্ভুক্তি: তাদের কাউন্সিলরশিপ নিশ্চিত করতে ০৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিভাগ ও জেলা অ্যাডহক কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয় । এটি গুরুতর ক্ষমতার অপব্যবহার।
নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ: ২০২৫ সালের নির্বাচনটি স্বাধীন, ন্যায়সংগত বা স্বচ্ছ ছিল না এবং এটি বিসিবি সভাপতি ও সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টার সহায়তায় নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।
ক্যাটেগরি ২ (মেট্রোপলিটন ক্লাব) থেকে অভিযোগ: নির্বাচনে কারচুপি: আমিনুল ইসলাম বুলবুল এবং সরকারি কর্মকর্তাদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় নির্বাচনে কারচুপি করা হয়েছে। ক্লাব কাউন্সিলরদের হুমকি ও বেআইনিভাবে জবরদস্তি করা হয়েছিল।
ই-ভোটিং সিস্টেমের অপব্যবহার: কাউন্সিলরদের হোটেল শেরাটনে এসে ভোট দিতে উৎসাহিত করা হয়েছিল, যার একজন স্টেকহোল্ডার বিসিবির বর্তমান সহ-সভাপতি মো. শাখাওয়াত ।
সময়সীমার পরে মনোনয়ন গ্রহণ (ফারুক আহমেদ): নির্বাচন কমিশন সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত তালিকা পায়, যদিও সময়সীমা ছিল ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। কমিটি মনে করে ফারুক আহমেদ একটি বেআইনি সুবিধা পেয়েছেন।
পছন্দের প্রার্থীদের অনৈতিক সুবিধা: সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টার পছন্দের প্রার্থীদের ভোটার তালিকার আগাম প্রবেশাধিকার ও বেআইনি প্রচারণা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। সামগ্রিক ভোটদান পরিবেশ স্বাধীন ছিল না, ভোটাররা হুমকির মুখে ছিল এবং বিসিবি সংবিধানের একাধিক ধারা লঙ্ঘন করা হয়েছে।
ধারা ৩ থেকে অভিযোগ (প্রাক্তন ক্রিকেটার ও অন্যান্য): বোর্ড সভা: ১০ জন প্রাক্তন ক্রিকেটারকে কাউন্সিলর মনোনয়নের জন্য আমিনুল ইসলাম বুলবুলকে অনুমতি দেওয়ার দাবিটি অন্যান্য পরিচালকরা অস্বীকার করেছেন। বিসিবি সিইও বোর্ড সভার অডিও/ভিডিও রেকর্ড সরবরাহ করতে অস্বীকৃতি জানান।
ক্ষমতার বাইরে কাজ করা: সংবিধান অনুযায়ী সভাপতি এককভাবে ১০ জন প্রাক্তন ক্রিকেটারকে মনোনয়ন দিতে পারেন না। আমিনুল ইসলাম বুলবুল একপক্ষীয়ভাবে এই মনোনয়ন দিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার ও সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন।
তদন্ত কমিটি বিসিবির ভবিষ্যৎ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বেশ কিছু সুপারিশ প্রস্তাব করেছে-
সংবিধান সংস্কার: নির্বাহী ও নির্বাচনি কাজগুলোকে আলাদা করা এবং একটি স্বাধীন ‘গভর্ন্যান্স ও এথিক্স কমিটি’ গঠন করা।
স্বতন্ত্র নির্বাচন কমিশন: একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে একটি স্থায়ী ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন করা।
নিরাপত্তা অডিট: ই-ভোটিং ব্যবহারের আগে কোনো স্বাধীন তৃতীয় পক্ষ দ্বারা নিরাপত্তা অডিট বাধ্যতামূলক করা।
স্বচ্ছতা: নির্বাচনের অন্তত ৬০ দিন আগে ভোটার তালিকা প্রকাশ এবং ৩০ দিনের মধ্যে আপত্তি নিষ্পত্তির সুযোগ রাখা ।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, Bangladesherkhela.com এর দায়ভার নেবে না।
