সাফ ফুটবল: ব্যর্থতার এক অমোঘ প্রপঞ্চ

সাফ ফুটবল: ব্যর্থতার এক অমোঘ প্রপঞ্চ

দরোজায় কড়া নাড়ছে আরো একটি সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ। ফিফা র‌্যাংকিংয়ে বারবার বাংলাদেশের অবস্থান পিছিয়ে গেলেও দেশের ফুটবল নতুন জোয়ার আনার স্বপ্নে বিভোর কোচ ও কর্মকর্তারা। সবশেষ প্রকাশিত ফিফা র‌্যাংকিংয়ে চারধাপ পিছিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৮৮ তে। যে ভুটানকে বলে-কয়ে হারাতো ফুটবলে তাদের পরেই এখন আছে বাংলাদেশ। অবশ্য খেলার মান বোঝানোর জন্য র‌্যাংকিং সবসময় সঠিক চিত্র প্রকাশ করেনা। কিন্তু র‌্যাংকিংই তো একটি দেশের খেলার মানকে অন্য দেশের খেলার মানের চেয়ে পার্থক্য গড়ে দেয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তো অন্য দেশের কাছ থেকে সমীহ আদায় করার জন্যও র‌্যাংকিংয়ে ভালো অবস্থানে থাকতে পারাটা জরুরী। আর এমনটা না হলে, খেলার আগেই প্রতিপক্ষ দেশগুলোর কাছ থেকে অবজ্ঞা আর অবহেলা পাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। ফুটবল ফেডারেশনের কর্মকর্তা কিংবা কোচ যতই গলা চেচান না কেনো এদেশের ফুটবলের মান উন্নত করা না গেলে সাফল্য আনা সম্ভব নয়। স্বপ্ন দেখানো যাবে, আর সেই স্বপ্নে ভেসে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া গেলেও সাফল্যরা থাকবে দূরেই। 

আরও একটি সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ দোরগোড়ায়। ইতোমধ্যেই সূচি প্রকাশ করেছে সাফ ফুটবল ফেডারেশন। আগামী ১ থেকে ১৩ অক্টোবর এবারের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের আসর বসবে মালদ্বীপের রাজধানী মালেতে। করোনাভাইরাস মহামারীর এই সময়ে মালদ্বীপেই কোভিড-১৯ সংক্রমণের হার সবচেয়ে কম সেখানে। তাই দক্ষিণ এশিয়ান ফুটবল কর্মকর্তারা ভেন্যু হিসেবে তাই মালদ্বীপকে বেছে নিয়েছে। অবশ্য এরআগে দুইবার পিছিয়ে যায় সাফ ফুটবল আসর। করোনা সঠিক সময়ে আয়োজন করতে দেয়নি আসরকে। অবশ্য তাতেও করোনার থাবা পিছু ছাড়ছেনা এবার সাফ চ্যাম্পিয়নশীপকে। করোনার কারণে ভুটানকে বিদেশ সফরে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি সেদেশের সরকার। তাই খেলা হচ্ছেনা তাদের। আর প্রথম সাফ ফুটবলের স্বাগতিক পাকিস্তান খেলতে পারছেনা, ফিফা নিষেধাজ্ঞার কারণে। এদিকে, ২০১৫ সালের পর থেকে সাফ ফুটবলে আর অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে রেখেছে, ২০০৩ সাল থেকে সাফে অংশ নেওয়া আফগানিস্তান। সুতরাং এবারকার সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ হচ্ছে পাঁচ দলের প্রতিযোগিতা। রাউন্ড রবিন লিগ পদ্ধতিতে হবে খেলা। পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষ দুই দল লড়বে শিরোপা দ্বৈরথে। 

আগের ১২ আসরে বাংলাদেশের জন্য সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ ছিলো হতাশার। সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতাই সঙ্গী হয়েছে বারবার। পিছনে ফিরে তাকালে গাইতে হবে হতাশার শোকগাথাই। তারপরও নতুন স্বপ্ন সঙ্গী করে ছক কষছে বাংলাদেশ। প্রত্যাশা দেশের ফুটবলে নতুন সূর্যোদয়। ১৯৯৩ সালে পাকিস্তানের লাহোরে বসে প্রথম সাফ চ্যাম্পিয়শিপের আসর। সেবার অংশ নেয়নি বাংলাদেশ। দ্বি-বার্ষিক এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ অংশ নেয় ১৯৯৫ সালে শ্রীলঙ্কায়। প্রথমবারের মতো দ্বিতীয়বারও ভুটান অংশ নেয়নি। ছয় দলের এই প্রতিযোগিতা থেকে শেষ মুহূর্তে না প্রত্যাহার করে নেয় মালদ্বীপ। গ্রুপ ম্যাচে পাকিস্তান ও নেপালকে পরাজিত করা বাংলাদেশ, সেমিফাইনালে ভারতের সঙ্গে আর পেরে ওঠেনি। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ম্যাচে নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ে কোনো দল গোলের দেখা না পেলে খেলা গড়ায় টাইব্রেকারে। 


পেনাল্টি শ্যূট আউটে ৪-২ গোলে ভারতের কাছে হেরে ঘরে ফেরে বাংলাদেশ। ১৯৯৭ সালে নেপালে, মালদ্বীপের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্রয়ের পর ভারতের কাছে ৩-০ গোলের পরাজয়ে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায়। ১৯৯৯ সালে ভারতের গোয়ায়, গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর সেমিতে নেপালকে হারিয়ে প্রথমবার সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে জায়গা করে নেয় বাংলাদেশ। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। বাংলাদেশকে হারিয়ে চারবারের মধ্যে তিনবারই সাফ শিরোপা জিতে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমান দেয় ভারত। 

২০০৩ সাল। বাংলাদেশে বসে প্রথম সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের আসর। আফগানিস্তান প্রথমবার এই অঞ্চলের সঙ্গে যোগ দেয়। ভুটানও প্রথম খেলতে আসে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপো। আট দলের প্রতিযোগিতা। গ্রুপ পর্বে মালদ্বীপ, নেপাল ও ভুটানকে হারিয়ে শীর্ষ দল হিসেবে সেমিফাইনালে জায়গা করে নেয় স্বাগতিকরা। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ের খেলা ১-১ গোলে ড্র হওয়ার পর, সাডেনডেথে ২-১ ব্যবধানে ভারতকে পরাজিত করে ফাইনালে উঠে যায় বাংলাদেশ। এবার শিরোপা লড়াই। প্রতিপক্ষ মালদ্বীপ। প্রথম এগিয়ে গেলেও নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ে ১-১ গোলে খেলা ড্র। পেনাল্টি শ্যূট আউটে ৫-৩ গোলে জিতে প্রথমবার সাফ অঞ্চলের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে লাল-সবুজের দল। অধিনায়ক আমিনুল হকের দৃঢ়তায় চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ। সেই শুরু, সেই শেষ। ১৮ বছর শেষের দিকে আর জিতেনি কখনো। এর মধ্যে অবশ্য হয়েছে আরো সাতটি সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। প্রতিবারই আশায় বুক বাঁধে মানুষ। কিন্তু প্রাপ্তিতে হতাশার চেয়ে বেশি কিছু জোটেনি। 

২০০৫ সালে আবারও পাকিস্তানে বসে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের আসর। এবার খেলা হয় করাচি ও ইসলামাবাদে, দুই শহরে। করাচিতে ভুটান আর নেপালের সঙ্গে জয়ের পর ভারতের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে গ্রুপ সেরা হয়েই শেষ চারের টিকিটি পায় বাংলাদেশ। ইসলামাবাদে সেমিফাইনাল ম্যাচে স্বাগতিক পাকিস্তানকে একমাত্র গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে পৌঁছে যায় বাংলাদেশ। ভারত বাঁধা আর টপকাতে পারেনি লাল-সবুজের দল। গ্রুপের ম্যাচে শুরুতে পিছিয়ে থাকলেও সমতায় ফেরায় জাহিদ হাসান এমিলির গোল। কিন্তু ফাইনালে সেই ধারা রক্ষা করা যায়নি। মেহরাজুদ্দিনের পর বাইচু ভুটিয়ার গোল আর ম্যাচে ফিরতে দেয়নি আরিফ খান জয়ের দলকে। বাংলাদেশকে হতাশ করে চতুর্থবার সাফ ফুটবলের শিরোপা জিতে নেয় ভারত। ২০০৮ শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ সাফের যৌথ আয়োজক। কলম্বোর সুগাথাদাসা স্টেডিয়ামে নিজেদের প্রথম ম্যাচে ভুটানের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে শুরুতেই ব্যাকফুটে বাংলাদেশ। কোচ আর ম্যানেজারের মনোমালিন্য। আর ফিরতেই দেয়নি বাংলাদেশকে। আফগানিস্তানের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র, স্বাগতিক শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ১-০ গোলের পরাজয়; গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়।  সেই ব্যর্থতার কথন এখনও এদেশীয় ফুটবলে সমানতালে চলমান। ২০০৯ সালে সেমিফাইনালে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে আবারও ভারত ফোবিয়া। গ্রুপ পর্বে শীর্ষ দল হলেও সেমিতেই থামে শিরোপা মিশন। ২০১১ সাল, ২০১৩, ২০১৫ এবং ২০১৮ সালেও গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিতে হয় বাংলাদেশকে।

তবে এতো ব্যর্থতাও দমাতে পারেনি এদেশের ফুটবলপ্রেমিদের। বারবার আশায় বুক বাঁধেন তারা। এবারও বেঁধেছেন। আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন আস্থা রেখেছে ইংলিশ কোচ জেমি ডে’র উপর। জাতীয় দলের পাইপলাইনে নতুন খেলোয়াড় তেমন না থাকায় জেমি ডে’ ভরসা করছেন আগের খেলোয়াড়দের উপরই। সাফে অতীতের ব্যর্থতা আর হতাশার বৃত্ত থেকে দলকে টেনে নিয়ে আসতে কিছু বিকল্প চিন্তাও আছে জেমি ডে’র। তবে নতুন প্রতিভাবান খেলোয়াড় সন্ধান করে দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণ দিয়ে জাতীয় দলের পাইপলাইনে যোগান দেয়া না গেলে ব্যর্থতার অচলায়তন বরাবরই সঙ্গী হবে। ফুটবল কর্তা আর কোচকে সবার আগে সেদিকেই নজর দেয়া উচিত।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




bangladesherkhela.com 2019
Developed by RKR BD