কাল রাতে শুরু ইউরোর জমজমাট আসর

কাল রাতে শুরু ইউরোর জমজমাট আসর

২০২০ সালে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনা মহামারির জন্য সেই পরিকল্পনা বাতিল হয়ে যায়। এক বছর পর আবার সেটা হচ্ছে। ইউরোপের ২৪টি দেশকে নিয়ে ইউরো ২০২০। এই প্রথম ইউরো কাপ কোনও একটি বা দুটি দেশে না হয়ে হতে চলেছে এগারোটি দেশের এগারোটি শহরে। 

এটা ফিফার বর্তমান প্রেসিডেন্ট জিয়ানি ইনফান্তিনোর মস্তিষ্কপ্রসূত। ২০১২ সালে যখন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তখন ইনফান্তিনো ছিলেন উয়েফার প্রেসিডেন্ট। তাঁর মনোভাব ছিল ১৯৬০ সালে শুরু ইউরো কাপের হীরক জয়ন্তী হচ্ছে ২০২০ সালে। এই উপলক্ষে গোটা ইউরোপ জুড়ে উৎসবটাকে ছড়িয়ে দিতে হবে। তাই যেসব দেশে খেলা হচ্ছে তারা, যে সবাই কোয়ালিফাই করেছে তা নয়। কিন্তু সে দেশের মানুষকে আনন্দ দিতে ইউরোর আয়োজন করতে তো বাধা নেই। যেমন আজারবাইজানের বাকুতে খেলা হচ্ছে। কিন্তু সে দেশ তো কোয়ালিফাই করেনি। 

তবে ইংল্যান্ডের গ্রূপ লিগের ম্যাচগুলো এবং দুটি সেমিফাইনাল ও ফাইনাল হবে লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে। আর যেহেতু এটা ২০২০ সালের টুর্নামেন্ট, তাই এক বছর পরে হলেও টুর্নামেন্টের নাম ইউরো ২০২০ থাকছে। আগামী শনিবার বাংলাদেশ সময় রাত একটায় রোমে ইতালি ও তুরস্কের মধ্যকার খেলা দিয়ে শুরু হবে ইউরো কাপ। ফাইনাল লন্ডনে ১১ জুলাই।

২৪টি দেশকে ছয়টি গ্রুপে ভাগ করা হয়েছে। গ্রুপ এ-তে আছে ইটালি, সুইজারল্যান্ড, তুরস্ক এবং ওয়েলস। বি গ্রুপে আছে বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, রাশিয়া এবং ফিনল্যান্ড। গ্রু সি-তে আছে অস্ট্রিয়া, নেদারল্যান্ডস, মেসিডোনিয়া এবং ইউক্রেন। ডি গ্রুপে আছে ক্রোয়াশিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র, ইংল্যান্ড এবং স্কটল্যান্ড। গ্রুপ ই-তে আছে পোল্যান্ড, স্লোভাকিয়া, স্পেন এবং সুইডেন। আর গ্রুপ এফ-এ আছে ফ্রান্স, জার্মানী, পর্তুগাল এবং হাঙ্গেরী। ছয়টি গ্রূপের প্রথম দুটি দলের সঙ্গে প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে যোগ দেবে ছয়টি গ্রুপের সেরা চারটি তৃতীয় দল। এবং সেই সুযোগে গ্রুপ অব ডেথ থেকে ফ্রান্স, জার্মানি এবং পর্তুগাল–তিনটি দেশই নক আউটে পৌছে যেতে পারে।

আগেরবারের চ্যাম্পিয়ন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পর্তুগালকে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ব্যাপারে ফেভারিট ধরা যাচ্ছে না। কিন্তু বর্তমান বিশ্ব কাপ চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স অবশ্যই ফেভারিট। তিনবারের ইউরো চ্যাম্পিয়ন জার্মানীর সময়টা মোটেই ভাল যাচ্ছে না। তাই তারা কত দূর যাবে তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। কিন্তু যারা কখনও ইউরো যেতেনি সেই ইংল্যান্ড এবং বেলজিয়ামের ভবিষ্যৎ ভাল বলেই মনে করছেন ফুটবলবোদ্ধারা।

ইংল্যান্ড এবং বেলজিয়াম দুটো দেশই ২০১৮-র বিশ্ব কাপে সেমিফাইনালিস্ট। তার পর থেকে তিন বছরে দুটো টিমেরই শক্তি বেড়েছে। ইংল্যান্ডের কথা যদি ধরা যায়, তাহলে তাদের ফরোয়ার্ড লাইনকে বলা যেতে পারে দুর্দান্ত। অধিনায়ক হ্যারি কেন এই মুহূর্তে ইউরোপের তো বটেই বিশ্বের সেরা স্ট্রাইকারদের অন্যতম। এবারেও তিনি প্রিমিয়ার লিগের সেরা স্কোরার। তাঁর পাশে রাহিম স্টার্লিং, ফিল ফোডেন, মার্কাস র‍্যাশফোর্ড, জর্ডন স্যাঞ্চোকে নিয়ে ইংল্যান্ড স্ট্রাইকিং ফোর্স জমজমাট। 

সাধারণত কোচেরা মাঝমাঠে বেশি প্লেয়ার রেখে ফরোয়ার্ডে রাখেন খুব বেশি হলে পাঁচজনকে। কিন্তু ইংল্যান্ড কোচ গ্যারেথ সাউথগেট দলে রেখেছেন আটজন স্ট্রাইকারকে। তুলনায় তাঁর মাঝমাঠে প্লেয়ারের সংখ্যা পাঁচ। এদের মধ্যে জর্ডন হ্যান্ডারসন এবং মেসন মাউন্ট খুবই ভাল ফর্মে আছেন। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে চেলসির কাই হার্ভারেজের গোলের পাসটা এসেছিল মাউন্টের পা থেকেই। ডিফেন্সে হ্যারি ম্যাগুয়ের, জন স্টোনস, কাইল ওয়াকার, কাইরন ট্রিপলিয়ার ইংল্যান্ডের বড় শক্তি। গোলে জর্ডন পিকফোর্ডকে সেরাদের মধ্যেই রাখা যায়। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালের দুটি দল ম্যাঞ্চেস্টার সিটি এবং চেলসির সেরা প্লেয়ারদের পাচ্ছেন সাউথগেট। তাঁর টিমের তাই ভাল খেলার কথা। গ্রুপে ইংল্যান্ডের সঙ্গে আছে ক্রোয়াশিয়া, চেক এবং স্কটল্যান্ড। এই গ্রুপ থেকে হাসতে হাসতেই কোয়ালিফাই করার কথা ইংল্যান্ডের। গত বিশ্বকাপের রানার্স ক্রোয়াশিয়ার সেই সুদিন আর নেই। লুকা মদ্রিচ, ইভান রাকিটিচরা একটু বয়সী হয়ে গেছেন। তাদের বেশি দূর যাওয়া মুশকিল।

গত বিশ্ব কাপের সেমিফাইনালিস্ট বেলজিয়ামের কিন্তু এখনও সোনার সময় চলছে। রবের্তো মার্টিনেজের ছেলেরা বি গ্রুপে আছে ডেনমার্ক, রাশিয়া এবং ফিনল্যান্ডের সঙ্গে। এই গ্রুপ থেকে নক আউটে যাওয়ার ব্যাপারে বেলজিয়াম এক নম্বরেই থাকবে। গোলে থিওবা কুর্তোয়া এখন বিশ্বের এক নম্বর হতেই পারেন। এ ব্যাপারে তাঁর লড়াই জার্মানির ম্যানুয়েল ন্যয়ারের। মাঝমাঠে কেভিন ডি ব্রুইন, উইংয়ে এডেন হ্যাজার্ড এবং ফরোয়ার্ডে রোমেলু লুকাকু বেলজিয়ামের বড় ভরসা। 

ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে বিশ্বের এক নম্বর টিমের দুর্বলতা তাদের ডিফেন্স লাইন। ডিফেন্ডারদের অভিজ্ঞতা যদি তাদের বড় ভরসা হয়, মাইনাস পয়েন্ট হল তাদের বয়স। আর ডিফেন্সে ভিনসেন্ট কোম্পানির মতো তো কেউ নেই। বেলজিয়াম অবশ্যই বড় শক্তি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যেতে হলে তাদের ডিফেন্সকে ভাল খেলতে হবে।

ইটালির মতো স্পেন‌ও তিনবারের ইউরো চ্যাম্পিয়ন। বিশেষ করে ২০০৮ থেকে ২০১২–বিশ্ব ফুটবলকে নিয়ন্ত্রণ করেছিল স্পেন। এই সময়ে তারা দুবার ইউরো এবং একবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়। কিন্তু ২০১৪ থেকে তাদের গ্রাফ নামতে শুরু করে। সেবারের বিশ্বকাপ থেকে তারা প্রথম রাউন্ডেই বিদায় নেয়। ২০১৬-র বিশ্বকাপ থেকে বিদায় দ্বিতীয় রাউন্ডে। ২০১৮-র বিশ্বকাপ থেকেও তাই। এবার তারা যে গ্রুপে আছে সেই ই গ্রুপে তাদের সঙ্গী পোল্যান্ড, স্লোভাকিয়া এবং সুইডেন। গ্রুপের গণ্ডি পেরনো খুব কঠিন হবে না। 

কিন্তু লুই এনরিকের দলকে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মতো বলে মনেহয় না। গোলকিপার ডেভিড দা ভিয়ার উপরে এখন খুব একটা ভরসা করা যায় না। সম্ভবত তাঁর জায়গাটা নিয়ে নেবেন আ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের গোলকিপার উনাই সিমোন। ডিফেন্সে সের্জিও র‍্যামস নেই। রিয়াল মাদ্রিদের কোনও প্লেয়ার নেই স্পেন টিমে। বাদ পড়তে পারেন হঠাৎ করোনা আক্রান্ত অধিনায়ক মিডফিল্ডার সের্জিও বুস্কয়েটস‌ও। স্পেনের ফরোয়ার্ড লাইনে সেই শক্তি নেই, যা বিপক্ষের ত্রাসের কারণ হতে পারে। তবে মাঝ মাঠে থিয়েগো আলাকান্তারা এবং পেদ্রি, ডিফেন্সে আজপিলিকুয়েতা এবং ফরোয়ার্ডে ফেরান টোরেস এবং আলভারো মোরাতা স্পেনকে কতদূর টানতে পারেন তাই এখন দেখার।

ইটালি এবং নেদারল্যান্ডস খুবই বড় টিম। কিন্তু ইদানিং তাদের খুব একটা সাফল্য নেই। ইটালি তো গত বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করেনি। এবার কতদূর যাবে তা নিয়ে সন্দেহ আছে। তবে রবের্তো মানচিনির টিম ইউরোর কোয়ালিফাইং রাউন্ডে খুবই ভাল খেলেছে। দশটি ম্যাচের দশটিতেই জিতেছে। কিন্তু ইউরো চ্যাম্পিয়ন হওয়ার টিম ইতালি নয়। নেদারল্যান্ডস তাদের টিমটাকে গোছাবার চেষ্টা করছে। কিন্তু টিম এখনও চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জায়গায় যায়নি।

বাকী রইল এফ গ্রুপের তিনটি টিম। ফ্রান্স, পর্তুগাল এবং জার্মানী। ফের্নান্দো স্যান্টোসের পর্তুগাল গতবারের চ্যাম্পিয়ন। ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ের গোলে তারা হারিয়েছিল আয়োজক ফ্রান্সকে। কিন্তু ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর দেশকে এবারও চ্যাম্পিয়ন ভাবা যাচ্ছে না। কারণ রোনালদো সহ সেরা প্লেয়ারদের বয়স চার বছর বেড়ে গেছে। নতুন তেমন কোনও তারকা উঠে আসেনি। পর্তুগাল প্রথম রাউন্ডের বাধা হয়তো পেরিয়ে যাবে। কিন্তু তারপর কতদূর এগোতে পারবে বলা যাচ্ছে না। 

আর জোয়াকিম লো-র জার্মানী আবার ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে ডিফেন্ডার ম্যাটস হামেলস এবং ফরোয়ার্ড টমাস মুলারকে। সঙ্গে ডিফেন্ডার আন্তোনিও রুডিগার, ম্যাথিয়েস জিন্টার, মিডফিল্ডার জসুয়া কিমিচ, টনি ক্রূস, এমরে ক্যান, লিওন গোরেৎকা, ইকের গুন্ডোগান, কাই হাভের্ৎজ এবং ফরোয়ার্ডে সার্জ নাব্রি, টিমো ওয়ার্নার, লেরয় সানেকে নিয়ে জার্মানি অবশ্যই বড় শক্তি। গোলে ম্যানুয়েল ন্যয়ার একশোটি ম্যাচ খেলার কৃতিত্ব অর্জন করলেন লাটভিয়ার বিরুদ্ধে। সে ম্যাচে জার্মানি জিতল ৭-১ গোলে। তবুও জার্মানীকে কিন্তু চ্যাম্পিয়ন হতে গেলে অনেক যদি এবং কিন্ত পেরোতে হবে।

ফ্রান্সের এই সমস্যা নেই। তাদের সেট টিম। বিশেষ করে সামনের দিকটা। মাঝমাঠে পল পগবা. কোরেনটিন টোলিসো এবং এনগোলো কন্তে, ফরোয়ার্ডে কিলিয়ান এমবাপে, আঁতোয়া গ্রিজম্যান, অলিভার জিরুর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন করিম বেঞ্জামা। গোলে অধিনায়ক হুগো লরিস এখনও বড় ভরসা। ডিফেন্সে রাফায়েল ভারানে, বেঞ্জামিন পাভার্ড, লুকাস হার্নান্ডেজের উপর ভরসা রাখা যায়। দিদিয়র দেশঁর যে টিমটা তিন বছর আগে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল তাদের প্রায় সবাই আছেন এবারের টিমে। শুধু ডিফেন্ডার স্যামুয়েল উমতিতি এবং মিডফিল্ডার ব্লাইসে মাতুইদি ছাড়া। 

১৯৯৮ সালে বিশ্ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ২০০০ সালে ফ্রান্স ইউরো চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। ২০১৮-তে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ফ্রান্স যদি ২০২০-র ইউরো চ্যাম্পিয়ন হয় অবাক হওয়ার কিছু নেই। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ব্যাপারে তারাই এক নম্বর ফেভারিট।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




bangladesherkhela.com 2019
Developed by RKR BD