সরগরম হয়ে উঠছে দেশের ক্রীড়াঙ্গন

সরগরম হয়ে উঠছে দেশের ক্রীড়াঙ্গন

আবার‌ও সরগরম হয়ে উঠেছে এদেশের ক্রীড়াঙ্গন। করোনাভাইরাস মহামারির ভয় কাটিয়ে ধীরে ধীরে মাঠে নামতে শুরু করেছে ছোট-বড় সব ধরনের খেলা। বঙ্গবন্ধুর নামে আয়োজিত টুর্নামেন্টগুলোর খেলা দিয়েই সচল হতে শুরু করেছে ক্রীড়াঙ্গন। ইতোমধ্যে কিছু কিছু টুর্নামেন্ট শেষও হয়েছে। আবার কিছু কিছু খেলা এখনও চলছে। সবই অবশ্য বঙ্গবন্ধুর নামে আয়োজিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকী উপলক্ষ্যে এই ২০২০ সালকে আগেই ‘মুজিব বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলো সরকার। আর মুজিব বর্ষকে স্বাগত জানাতে কিংবা পালন করতে দেশের বিভিন্ন ফেডারেশন বিভিন্ন টুর্নামেন্ট আয়োজন করার ঘোষণা দিয়েছিলো। আয়োজনের দিন-ক্ষণ কাছেও এসেছিলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়ে ওঠেনি। গত মার্চ মাস থেকে করোনাভাইরাস বিশ্বব্যাপি মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ায় অধিকাংশ খেলা মাঠে গড়ানোর আগেই স্থগিত হয়ে যায়। 


তবে মাঠে না থাকলেও অনলাইনে সচল ছিলো ক্রীড়াঙ্গন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭৪তম জন্মদিন পালন উপলক্ষ্যে শুরু হয় ‘জয়তু শেখ হাসিনা’ আন্তর্জাতিক অনলাইন দাবা প্রতিযোগিতা। টুর্নামেন্টের মোট প্রাইজমানি ছিল ৬ হাজার মার্কিন ডলার। তারমধ্যে চ্যাম্পিয়ন ১২০০ ডলার, দ্বিতীয় স্থান অধিকারী, ৮০০ ডলার, তৃতীয় স্থান অধিকারী ৫০০ ডলার, চতুর্থ স্থানধারী ৩০০ ডলার এবং ৫ম থেকে ৯ম স্থানধারী প্রত্যেককে ২০০ ডলার করে। আর ১০ম থেকে ১৬ তম স্থানধারীর প্রত্যেককে ১০০ মার্কিন ডলার অর্থ পুরস্কার দেয়া হয়। তিনদিনের এই টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হন ইন্দোনেশিয়ার গ্রান্ড মাস্টার মেগোরাটো সুশান্ত। ভারতীয় গ্র্যান্ড মাস্টার এসএল নারায়ানান রানারআপ এবং ইরানের গ্র্যান্ডমাস্টার এম আমিন তাবতাবেই তৃতীয় হন। গ্র্যান্ড মাস্টার মেগোরাটো, গ্র্যান্ড মাস্টার নারায়ানান ও গ্র্যান্ডমাস্টার তাবতাবেই সমান সাত পয়েন্ট অর্জন করলেও টাইব্রেকিং পদ্ধতিতে তাদের অবস্থান নির্ধারণ করা হয়। ১৭ জন গ্র্যান্ড মাস্টার সহ টুর্নামেন্টে দেশ-বিদেশের মোট ৭৪ জন দাবাড়ু অংশ নেন। 


এরপর অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহেই শুরু হয় আরো একটি অনলাইন টুর্নামেন্ট ‘প্রথম বাংলাদেশ তায়কোয়ানডো আন্তর্জাতিক পুমসে চ্যাম্পিয়নশিপ’। দুই দিনের এই অনলাইন প্রতিযোগিতায় আমেরিকা, গ্রেট ব্রিটেন, রাশিয়া, স্পেন, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও মালয়েশিয়া সহ বিশে^র ৩০টি দেশের ১০০টি তায়কোয়ানডো ক্লাবের ৩৫০ জন  খেলোয়াড় অনলাইনে পুমসে ইভেন্টে অংশ নেন। আয়োজক বাংলাদেশ থেকে ৭১ জন  খেলোয়াড় এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহন করেন। প্রতিযোগিতার জুনিয়র বিভাগে বাংলাদেশ ভালো করলেও সিনিয়র বিভাগে খুব একটা ভালো ফল করতে পারেনি। 


সব ভয়-ডর দূরে সরিয়ে ১১ থেকে ২৩ অক্টোবর ক্রিকেটাঙ্গনকে সচল করার কাজ শুরু হয়। করোনার কারনে গেল মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে বন্ধ হয়ে যায় দেশের ক্রিকেট। বর্তমান পরিস্থিতিতে শীর্ষস্থানীয় এবং নতুন ক্রিকেটারদের প্রতিযোগিতামূলক পর্যায়ে খেলার সুযোগ করে দিতেই আয়োজন করা হয় এই টুর্নামেন্টটি। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) আয়োজন করে তামিম ইকবাল একাদাশ, মাহমুদুল্লাহ একাদশ আর নাজমুল হাসান শান্ত একাদশ নামের তিন দলের প্রেসিডেন্টস কাপ ৫০ ওভারের ক্রিকেট টুর্নামেন্টের। করোনাভাইরাসের কারণে সাত মাস বিরতির পর আবার মাঠে ফেরে ক্রিকেট। লম্বা বিরতির কারণে প্রথমে ছন্নছাড়া ক্রিকেটই খেলেন সবাই। কারণ দীর্ঘদিন খেলার বাইরে থাকায় অনেকের ফর্মে ফিরতে রীতিমতো লড়াই করতে হয় তামিম, সৌম্য ও মোসাদ্দেকদের। ব্যর্থতার ষোলকলা পূর্ণ করে ফাইনালেই উঠতে পারেনি বাংলাদেশ ওয়ানডে দলের নতুন অধিনায়ক তামিম ইকবালের দল। ফাইনালে শান্ত একাদশকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় মাহমুদুল্লাহ একাদশ। প্রেসিডেন্টস কাপ আসরের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জেতেন মুশফিকুর রহিম। ৫ ম্যাচে সবচেয়ে বেশি ২১৯ রান করেন তিনি।


এরপর ২৪ নভেম্বর থেকে ৫টি দল নিয়ে শুরু হয় বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি ফ্রাঞ্চাইজি ক্রিকেট। এই টুর্নামেন্ট দিয়েই এক বছরের নিষেধাজ্ঞা শেষে ক্রিকেটে ফেরেন বিশে^র অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। এই টুর্নামেন্টে জাতীয় দল, এইপি দল এবং অনূর্ধ-১৯ দলের ৮০ জন ক্রিকেটার অংশ নেয়। খেলোয়াড়দের ফর্ম ধরে রাখা এবং খেলার মধ্যে রাখার জন্য বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টের গুরুত্ব অপরিসীম।     


দর্শকহীন মাঠে ক্রিকেট খেলা আয়োজনে বোধহয় একটু সাহসী হয়ে ওঠে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকী উপলক্ষ্যে নেপাল জাতীয় দলের সাথে দুই ম্যাচের একটি সিরিজ আয়োজন করে বাংলাদেশ, ১৩ ও ১৭ অক্টোবর। অল্প কিছু দর্শক প্রবেশের অনুমতিও দেয় বাফুফে। অবশেষে করোনাভাইরাসের ‘নিউ নরমাল’ পরিস্থিতিতে দেশে আন্তর্জাতিক ফুটবল ফেরানোর প্রাণান্ত চেষ্টা সফল হয়। আর এতে দীর্ঘ ১০ মাস পর মাঠে খেলা দেখার আক্ষেপ ঘোচে দর্শকদের। সেই সঙ্গে অনেকদিন পর মাঠে ফিরে জয়ের দেখাও পায় বাংলাদেশ। দুই ম্যাচের সিরিজের প্রথমটিতে জয় পায় বাংলাদেশ ২-০ গোলে। সাফ ফুটবল ও এসএ গেমস ফুটবলে টানা হারের পর হিমালয়ের দেশটির বিপক্ষে জয় পায় জামাল ভূঁইয়ার দল। খেলার প্রথমার্ধে নাবীব নেওয়াজ জীবন এবং দ্বিতীয়ার্ধে মাহবুবুর রহমান সুফিল গোল করেন। দারুণ এই গোলের পর আনন্দে উদ্বেল হয়ে পড়ে স্টেডিয়ামে উপস্থিত সমর্থকেরা। সিরিজের শেষ ম্যাচে গোল শূন্য ড্র হয়। দ্বিতীয় ম্যাচের সময় আগের ম্যাচের ছন্দ ফিরিয়ে আনতে পারেনি বাংলাদেশ। নাবীব নেওয়াজ জীবন কিংবা মাহবুবুর রহমান সুফিলদের আক্রমণে ধারও ছিলো না। অন্যদিকে নেপালও পারেনি আগের হারের পাল্টা জবাব দিতে। তাতে গোল শূন্য ড্র হয় দ্বিতীয় প্রীতি ম্যাচটি। 


এছাড়া বঙ্গবন্ধু জন্মশত বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষ্যে আয়োজন করা হয় প্রেসিডেন্ট কাপ হকি প্রতিযোগিতা। বঙ্গবন্ধুর জন্ম স্থান গোপালগঞ্জ জেলার মধুমতি নদীতে গত ২৮ নভেম্বর আয়োজন করা হয় ১৭তম জাতীয় দূরপাল্লা সাঁতার প্রতিযোগিতা। পুরুষ বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হন সেনাবাহিনীর ফয়সাল আহমেদ এবং নারী বিভাগের শিরোপা জেতেন সেনাবাহিনীর নাঈমা আক্তার। ৩১ অক্টোবর থেকে হ্যান্ডবল মাঠ সরগরম হয়ে ওঠে বঙ্গবন্ধু ফেডারেশন কাপের মাধ্যমে। প্রতিযোগিতায় চারটি দল অংশ নেয়। আয়োজন করা হয় বঙ্গবন্ধু প্রথম বিভাগ বাস্কেটবল লিগ, ৬টি দল নিয়ে আয়োজন করা হয় বঙ্গবন্ধু প্রিমিয়ার বিভাগ বাস্কেটবল। প্রতিযোগিতায় অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয় ধুমকেতু ক্লাব। আর রানার্সআপ হয়েছে হরনেট এসসি। আয়োজন করা হয় মুজিববর্ষ ২য় মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক বিজয় দিবস স্কোয়াশ প্রতিযোগিতা। ডিসেম্বরের শুরুতে আয়োজন করা হয় বঙ্গবন্ধু জাতীয় টার্গেটবল প্রতিযোগিতা। পুরুষ ও নারী উভয় বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয় আনসার ও ভিডিপি।  


এরআগে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে জাতীয় পুরুষ বেসবল, খো খো লিগ এবং পেসাপালো সহ বেশ কয়েকটি খেলা মাঠে গড়ায়। তারপরই ক্রীড়াঙ্গনে শুরু হয় মুজিব বর্ষ পালনের জন্য খেলা। বাংলাদেশ তায়কোয়ানডো ফেডারেশন ১৮ থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর অনলাইনে আয়োজন করে মুজিব বর্ষ প্রথম বাংলাদেশ তায়কোয়ানডো অনলাইন ক্লাব পুমসে চ্যাম্পিয়নশীপ। প্রতিযোগিতায় দেশের ৩০টি কøাবের প্রায় ১৫০ জন তায়কোয়ানডো খেলোয়াড় অনলাইনে পুমসে অংশ নেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকী পালন উপলক্ষ্যে গত ১০ অক্টোবর থেকে শুরু হয় বঙ্গবন্ধু ফেডারেশন কাপ বাস্কেটবল। আটটি দল দুটি গ্রুপে ভাগ হয়ে অংশ নেয় এই প্রতিযোগিতায়। টুর্নামেন্টের ফাইনালে বাংলাদেশ নৌ বাহিনী  ৯০-৪৪ পয়েন্টে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হয়। প্রতিযোগিতা শেষে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল বিজয়ী ও বিজিতদের পুরস্কৃত করেন। 


তাছাড়া মুজিববর্ষ উদযাপনের অংশ হিসেবে ও বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসকে স্মরণ করতে আগামী ১০ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ঢাকা ম্যারাথন’। আর্মি স্টেডিয়াম থেকে শুরু হয়ে হাতিরঝিল এলাকায় ম্যারাথন শেষ হবে। এই ম্যারাথন তিনটি ক্যাটাগোরিতে অনুষ্ঠিত হবে। প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিকমানের এই ম্যারাথনে দেশি-বিদেশি খ্যাতনামা ক্রীড়াবিদরা অংশ নেবেন। নারী ও পুরুষ দুই বিভাগেই এই ম্যারথন অনুষ্ঠিত হবে। ফুল ম্যারাথন ৪২.১৯৫ কিলোমিটার এবং হাফ ম্যারাথন ২১.০৯৭ কিলোমিটার।


মুজিব জন্মশত বর্ষে এবং বঙ্গবন্ধুর নামে আয়োজিত এইসব খেলাধুলা করোনার ভয় কাটিয়ে স্বাস্থবিধি মেনে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনকে স্বাভাবিকের পথে নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিতও দিচ্ছে। সেই সঙ্গে খেলোয়াড়দের চর্চা ও দক্ষতা বাড়াতেও সাহায্য করছে।   
 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




bangladesherkhela.com 2019
Developed by RKR BD