করোনা মহামারীর বছরে বাংলাদেশের ক্রিকেট

করোনা মহামারীর বছরে বাংলাদেশের ক্রিকেট

২০২০ সালটা ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য অনেক কিছু পাওয়ার। পুরো বছরটিতে টাইগারদের জন্য ঠাসা সুচি। করোনা কারণে সব কিছুই ভেস্তে গেছে। তাই বছরটি ছিল টাইগারদের জন্য হতাশারই। ব্যস্ত সুচির জন্য অধীর আগ্রহে ছিল টাইগাররা। কিন্তু বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারীর ভয়াবহতায় এ বছর মাত্র দু’টি টেস্ট খেলতে পারে বাংলাদেশ। তারপরও তাদের উথান-পতনের মধ্যে দিয়ে  বছরটি পার করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। করোনা মহামারীর মধ্যেও বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের বিশ্বকাপ জয় ছিলো, দেশের জন্য এ যাবতকালের সেরা অর্জন। 

সুযোগ মিস করার বছর : বাংলাদেশের জন্য এ বছরটি ব্যস্ততম বছর হবার কথা ছিলো। কমপক্ষে দশটি টেস্ট ম্যাচ এবং বেশ কিছু ওয়ানডে ও টি-টুয়েন্টি সিরিজ খেলার কথা ছিল। তাই টাইগাররা হতাশ, কারন সাধারণত বেশি টেস্ট ম্যাচ খেলার যথেষ্ট সুযোগ পায় না তারা। কেননা বিশ্ব ক্রিকেটে বড়-বড় দল বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্ট খেলতে আগ্রহী থাকে না।

করোনার কারনে বাংলাদেশের আটটি টেস্ট স্থগিত হয়। তিনটি করে শ্রীলংকা ও নিউজিল্যান্ডের মাটিতে এবং দেশের মাটিতে দু’টি করে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এবং সাথে বেশক’টি ওয়ানডে ও টি-টুয়েন্টিও। এ বছর বাংলাদেশ দু’টি টেস্ট, তিনটি ওয়ানডে ও পাঁচটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছে। এরমধ্যে একটি টি-টুয়েন্টি পরিত্যক্ত হয়।

শুধুমাত্র জাতীয় দলই নয়, ২০২২ সালের বিশ্বকাপকে সামনে রেখে অনূর্ধ্ব-১৯ দলের প্রস্তুতির জন্য বেশ কয়েকটি দেশে সফর এবং বেশ কয়েকটি দেশকে দেশের মাটিতে আমন্ত্রন জানানোর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত না হওয়াতে তাদের অনেক ক্ষতি হয়েছে। মহামারীর কারনে তাদের বেশিরভাগ প্রশিক্ষণের পরিকল্পনাবাদ দিতে বাধ্য করে। তবে বেশ কিছুদিন পর প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছিল এবং বিসিবি স্থগিত সিরিজগুলো পুনরায় আয়োজন করতে অন্যান্য বোর্ডের সাথে যোগাযোগ রাখে।

মহামারীর কারণে বাংলাদেশ ‘এ’ দল ও নারী দলেরও বেশ কিছু সিরিজ স্থগিত হয়েছে। দেশের জনপ্রিয় ঘরোয়া আসর ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ (ডিপিএল) প্রথম রাউন্ডের পর পরিত্যক্ত হয়ে যায়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে এশিয়া একাদশ ও বিশ্ব একাদশের মধ্যকার টি-টুয়েন্টি আয়োজনের পরিকল্পনা করেছিলো বিসিবি। কিন্তু সেটিও করোনার কারণে পরিত্যক্ত হয়ে যায়। 

সাফল্য-ব্যর্থতার মিশেল :

এ বছর তিন ফরম্যাটে ১০টি ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ। দু’টি টেস্ট, তিনটি ওয়ানডে ও দু’টি টি-টুয়েন্টি। এরমধ্যে একটি টেস্টে পাকিস্তানের কাছে ইনিংস ও ৪৪ রানে হেরেছে তারা। টানা চার ম্যাচে ইনিংস ব্যবধানে হারের লজ্জা পায় টাইগাররা। তবে ঘুড়ে দাঁড়াতে সময় নেয়নি বাংলাদেশ। মুশফিকুর রহিমের তৃতীয় ডাবল-সেঞ্চুরিতে সিলেটের মাটিতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ইনিংস ও ১০৬ রানে সিরিজের একমাত্র ম্যাচ জিতে বাংলাদেশ। সেটি ছিলো দ্বিতীয়বারের মত বাংলাদেশের ইনিংস ব্যবধানে জয়। আর ১১৯ ম্যাচে ১৪তম টেস্ট জয়।

এরপর তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে জিম্বাবুয়েকে হোয়াইটওয়াশ করে বাংলাদেশ। দ্বিপক্ষীয় সিরিজের টানা চতুর্থবারের মত জিম্বাবুয়েকে হোয়াইটওয়াশ করে টাইগাররা। তিন ম্যাচের ঐ সিরিজে বাংলাদেশের জয়ের চিত্র ছিলো যথাক্রমে  ১৬৯, ৪  ও ১২৩ রানে। প্রথম ওয়ানডেতে ১৬৯ রানের জয় বাংলাদেশের ওয়ানডে ইতিহাসে রান  ব্যবধানে বড় জয় ছিলো।

ওয়ানডের পর টি-টুয়েন্টি সিরিজেও জিম্বাবুয়েকে হোয়াইটওয়াশ করে বাংলাদেশ। দু’টি ম্যাচ যথাক্রমে ৪৮ রান ও ৯ উইকেটে জিতে তারা। তার আগে পাকিস্তানের মাটিতে তিন ম্যাচের টি-টুয়েন্টি সিরিজ ২-০ ব্যবধানে হারে বাংলাদেশ। তৃতীয় ও শেষ ম্যাচটি বৃষ্টির কারনে পরিত্যক্ত হয়, ফলে হোয়াইটওয়াশের লজ্জা থেকে রক্ষা পায় টাইগাররা। 

পাকিস্তান সফরের সম্মতি :

অনেক চিন্তা-ভাবনার পর এ বছরের শুরুতে পাকিস্তান সফরে যায় বাংলাদেশ। ১২ বছর পর পাকিস্তান সফরের আগে সেখানকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করে বাংলাদেশের নিরাপত্তা দল। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে যে ধরনের নিরাপত্তা দেয়া হয়, তা কেবল পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রী পেয়ে থাকেন। সিরিজের জন্য সফরটি তিন ধাপে ভাগ  হয়েছিলো। প্রথম ধাপে তিন ম্যাচের টি-টুয়েন্টি সিরিজ। যেটিতে বাংলাদেশ ২-০ ব্যবধানে হারে। জানুয়ারিতে টি-টুয়েন্টি সিরিজ শেষে ফেব্রুয়ারিতে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজের প্রথম ম্যাচের জন্য সফর করে বাংলাদেশ। লংগার ভার্সনের  সিরিজটি  বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশীপের অংশ।

প্রথম টেস্টটি ইনিংস ও ৪৪ রানে হারে বাংলাদেশ। পাকিস্তান সফরের তৃতীয় ও শেষ ধাপে বাকী একটি করে টেস্ট ও ওয়ানডে খেলতে যাবার কথা ছিলো টাইগারদের। কিন্তু করোনা কারনে থমকে যায় বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গন। 

প্রথমবারের মত আইসিসির কোন ট্রফি জয় :

এ বছরের ৯ ফেব্রুয়ারিে  নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অর্জনের স্বাদ নেয় বাংলাদেশ। অনূর্ধ্ব-১৯ দলের খেলোয়াড়রা আইসিসি বিশ্বকাপ জয় করে। দক্ষিণ আফ্রিকার পচেফস্ট্রুমে অনুষ্ঠিত টুর্নামেন্টের ফাইনালে বৃষ্টি আইনে বাংলাদেশ ৩ উইকেটে হারায় ভারতকে। ফলে প্রথমবারের মত আইসিসির কোন ট্রফি জিততে সক্ষম হয় বাংলাদেশ।  

ফাইনালে প্রথমে ব্যাট করে ৪৭ দশমিক ২ ওভারে ১৭৭ রানে অলআউট হয় ভারত। এরপর বৃষ্টির কারনে জয়ের জন্য ৪৬ ওভারে ১৭০ রানের টার্গেট পায় বাংলাদেশের যুবারা। জবাব দিতে নেমে ১০২ রানে ৬ উইকেট হারায় তারা। তবে অধিনায়ক আকবর আলির অধিনায়কোচিত ইনিংসের সুবাদে ৩ উইকেটের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে বাংলাদেশ। অপরাজিত ৪৩ রান করেন আকবর। ৭৭ বলে ৪টি চার ও ১টি ছক্কা মারেন আকবর।

প্রথমবার বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলে বাংলাদেশের যুবারা। চার বারের চ্যাম্পিয়ন ভারতকে হারিয়ে অবিস্মরনীয় জয় তুলে নেয় আকবরের দল। এই দলটিই এর আগে, ইংল্যান্ড ও এশিয়া কাপে দু’টি ত্রিদেশীয় ফাইনালে তাদেরকে হারিয়েছিলো।

তবে যেদিন, শিরোপা জয়টি গুরুত্বপূর্ণ ছিলো, সেদিনই নিজেদের সেরাটা দিয়ে ট্রফি জিতে নেয় বাংলাদেশ। ট্রফি নিয়ে দেশে ফেরার পর আকবর-হৃদয়দের বীরের মত সংবর্ধনা দেয়া হয়। অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেটারদের বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যত হিসেবে অভিহিত করে বিসিবি। ইতোমধ্যে আকবরসহ বেশ কিছু ক্রিকেটার ঘরোয়া আসরে সাকিব-তামিম-মুশফিকদের জায়গা পূরণ করার মত পারফরমেন্স করেন।

প্রথম ট্রিপল সেঞ্চুরি তামিমের :

বাংলাদেশের প্রথম শ্রেনির ক্রিকেটে দ্বিতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে ট্রিপল সেঞ্চুরি করেন জাতীয় দলের ওপেনার তামিম ইকবাল। এ বছরের ২ ফেব্রুয়ারি মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগের (বিসিএল) ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক টুর্নামেন্টের প্রথম রাউন্ডে ইসলামি ব্যাংক ইস্ট জোনের হয়ে খেলতে নামেন তামিম। ওয়ালটন সেন্ট্রাল জোনের বিপক্ষে অপরাজিত ৩৩৪ রান করেন তামিম। দেশে  প্রথম শ্রেনির ক্রিকেটে এটিই কোন ব্যাটসম্যানের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রান। এর আগে রকিবুল হাসান ৩১৩ রান করেছিলেন।  

২০০৭ সালে জাতীয় ক্রিকেট লিগে (এনসিএল) সিলেট বিভাগের বিপক্ষে বরিশাল বিভাগের হয়ে ঐ স্কোর করেছিলেন রকিবুল।

৪২৬ বলে ৩৩৪ রান করেছিলেন তামিম। তার ম্যারাথন ইনিংসে ৪২টি চার ও তিনটি ছক্কা ছিলো। তামিমের ৩৩৪ রানে পৌঁছানোর পর ইনিংস ঘোষনা করে ইস্ট জোন। এটি, ক্রিকেটের সেরা ব্যাটসম্যান স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের টেস্টে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোর। তামিমের এই ট্রিপল সেঞ্চুরিতে, ১৩ বছর এমন কীর্তি দেখলো বাংলাদেশ। অবশ্য ২০১৮ সালে ট্রিপল সেঞ্চুরির কাছে গিয়েও তা করতে ব্যর্থ হন নাসির হোসেন। ট্রিপল সেঞ্চুরি থেকে ৫ রান দূরে থাকতে আউট হন তিনি।

বিসিএলের শ্রেষ্ঠত্বে মুকুট সাউথ জোনের :

করোনার সংক্রমন বাড়ার আগে শেষ হয়েছিলো দেশের প্রধান প্রথম শ্রেনির টুর্নামেন্ট বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগ (বিসিএল)। ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক এই টুর্নামেন্টের অষ্টম আসর ছিলো সেটি। দেশের সেরা খেলোয়াড়দের নিয়ে চারটি জোনে বিভক্ত করে বিসিবি। পাঁচ দিনের ফাইনাল ম্যাচে ইসলামি ব্যাংক ইস্ট জোনকে ১০৫ রানে হারিয়ে শিরোপার স্বাদ নেয় সাউথ জোন। তবে অন্যান্য ম্যাচগুলো চারদিনের ছিলো। অষ্টম আসরের মধ্যে সাউথ জোনের এটি পঞ্চম শিরোপা। তারাই সবচেয়ে বেশি শিরোপা জয় করেছে।

অধিনায়কত্ব থেকে অব্যাহতি মাশরাফির :

ওয়ানডে অধিনায়ক হিসেবে মাশরাফি বিন মর্তুজার সড়ে দাড়ানোয় এ বছরটি মনে রাখতে হবে। তবে ক্রিকেট থেকে অবসর নেননি তিনি। মাশরাফি বলেছিলেন, টিম ম্যানেজমেন্ট যদি তাকে জাতীয় দলের জন্য বিবেচনা করে তবে সাধারন খেলোয়াড় হিসেবে খেলে যাবেন।  

লাখ-লাখ ভক্তের কাছ থেকে অনুপ্রেরনা পাওয়া মাশরাফি  ৫ মার্চ এক সংবাদ সম্মেলনে নিজের সিদ্বান্তের কথা জানান । অধিনায়ক হিসেবে তার শেষ এবং জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডে ম্যাচের পর নিজের অভিমত ব্যক্ত করে তিনি। মাশরাফির শেষ অধিনায়কত্বের ম্যাচে ১২৩ রানের জয় পায় বাংলাদেশ। যা ছিলো অধিনায়ক হিসেবে ওয়ানডেতে মাশরাফির ৫০তম জয়।

তার আগে, মাশরাফি বলেছিলেন, অবসর নেয়ার সিদ্ধান্তটি তার উপরই ছেড়ে দেয়া উচিত এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) যদি তাকে অধিনায়ত্বও ছাড়তে বলে তবে তিনি সেটিও করবেন।

তবে, নিজ থেকেই অধিনায়কত্ব ছেড়ে দেন মাশরাফি। কিন্তু বিসিবির সাথে কয়েক মাস  মাশরাফির চলে  শীতল সম্পর্ক।

তবে দেশের সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণামূলক অধিনায়ক হিসেবে বিবেচিত মাশরাফি বলেন, ২০২৩ বিশ্বকাপের জন্য দল গঠনের জন্য নতুন অধিনায়ককে সময় দেয়া উচিত বলেই এমন সিদ্বান্ত তিনি  নিয়ছেন।

লিটন দাসের ম্যাজিক :

এ বছর  ওয়ানডেতে বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ১৭৬ রানের ইনিংস খেলেন ওপেনার লিটন দাস।

গত মার্চে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তিন ম্যাচ সিরিজের দ্বিতীয়টিতে ১৪৩ বলে ১৬টি চার ও ৮টি ছক্কায় ১৭৬ রান করেন লিটন। ওপেনিংএ তারই সতীর্থ তামিম ইকবাল আগের ম্যাচে ১৫৮ রান করেছিলেন। তার কাছ থেকে পরের ম্যাচে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের রেকর্ডটি দখলে নেন লিটন।

ঐ ম্যাচে তামিমও সেঞ্চুরি তুলে ১২৮ রান করেন। লিটনের সাথে ওপেনিং জুটিতে ২৯২ রান যোগ করেন লিটন। যা যেকোন উইকেটে বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ রানের জুটি ছিলো। ফলে ভেঙ্গে যায় সাকিব আল হাসান ও মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের  সর্বোচ্চ রানের জুটি। ২০১৭ সালে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে কার্ডিফে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে পঞ্চম উইকেটে ২২৪ রানের জুটি গড়ে বাংলাদেশকে অবিস্মরনীয় এক জয়ের স্বাদ দেন সাকিব-মাহমুদুল্লাহ।

জুটিতে রেকর্ড গড়া ৪৩ ওভারের ম্যাচে ৩ উইকেটে ৩২২ রান করেছিলো বাংলাদেশ। বৃষ্টির কারনে ২ ঘন্টা ৩৮ মিনিট খেলা বন্ধ ছিলো।

এই জুটিতে ২১ বছরের পুরনো রেকর্ডও ভাঙ্গেন তামিম-লিটন। ১৯৯৯ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২২৪ রান করেছিলেন শাহরিয়ার হোসেন বিদ্যুৎ ও মেহরাব হোসেন অপি।

রাজশাহীর বিপিএল চ্যাম্পিয়ন :

বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের সপ্তম আসরটি (২০১৯) বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ‘বঙ্গবন্ধু বিপিএল’ নামে নামকরন করা হয়। বিপিএলের বিশেষ আসরটিতে পুরনো কোন ফ্র্যাঞ্চাইজি ছিলো না। বিসিবির সাতজন ডিরেক্টর সাতটি দলের দায়িত্বে ছিলেন। আসরটি এ বছরের ১৭ জানুয়ারি শেষ হয়। ক্রিস গেইল, হাশিম আমলা, ডেভিড মালান, কেসরিক উইলিয়ামস ও শেন ওয়াটসনের মত তারকারা  আসরে অংশ নিয়েছিলেন। বিপিএলের বিশেষ আসরে চ্যাম্পিয়ন হয় রাজশাহী রয়্যালস। মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালে রাজশাহী ২১ রানে হারায় খুলনা টাইগার্সকে।

করোনায় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ ক্রিকেটাররা : করোনা শুধুমাত্র দেশের অর্থনীতিকেই ক্ষতিগ্রস্থ করেনি, ক্রিকেটারদেরও সমস্যায় ফেলেছে। ঘরোয়া ক্রিকেটাররা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তবে জাতীয় দলের বর্তমান ক্রিকেটারদের ক্ষতির পরিমানটা ছিলো বেশি। কিন্তু বিভিন্ন দেশের বোর্ডের মত নিজ দেশের ক্রিকেটারদের কোন বেতন কাটেনি বিসিবি। তবে বোর্ডে আর্থিক ক্ষতিটা অনেক বেশিই। 

এ বছর বাংলাদেশের ১০টি টেস্ট খেলার সূচি ছিলো। কিন্তু জাতীয় দল মাত্র দু’টি টেস্ট খেলতে সক্ষম হয়। বছরের শুরুতে পাকিস্তান ও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দু’টি টেস্ট খেলে বাংলাদেশ। বর্তমানে টেস্টে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের ম্যাচ ফি ৬ লাখ টাকা। ফলে আটটি টেস্ট পরিত্যক্ত হওয়াতে নিয়মিত ম্যাচ খেলা মোমিনুল হক, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম ও অন্যান্যরা একেকজন ৪৮ লাখ টাকা পাননি। 

ওয়ানডে ফরম্যাটের দিকে তাকালে দেখা যায়, আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের তিনটি ওয়ানডে ম্যাচ ছিলো। ওয়ানডে ম্যাচের ফি ৪ লাখ করে এবং প্রত্যক ক্রিকেটার ১২ লাখ টাকা করে পাননি।

আয়ারল্যান্ড সফরে বাংলাদেশের চারটি টি-টুয়েন্টি ম্যাচ পরিত্যক্ত হয়েছে। সেখানে যদি ধরা হয় প্রত্যক খেলোয়াড়ের প্রত্যক ম্যাচের ফি ২ লাখ করে হয়, তবে ৮ লাখ পাননি তারা।

করোনার মধ্যেও সজাগ ছিলেন ক্রিকেটাররা :

করোনা বিশ্বকে থমকে দিলেও ঘরে বসে থাকেননি ক্রিকেটাররা। বিসিবির দেয়া গাইডলাইনে অনুশীলন করে গেছেন তারা। পাশাপাশি অসহায়-দুস্থদের সহায়তায়ও এগিয়ে এসেছিলেন ক্রিকেটাররা। জাতীয় ক্রিকেটার, প্রথম শ্রেনির ক্রিকেটার, নারী ক্রিকেটার ও অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ক্রিকেটাররা তাদের বেতন থেকে অর্থ প্রদান করে তহবিল গঠন করেন। কিছু ক্রিকেটার, যেমন মাশরাফি বিন মর্তুজা, এমপি, নাজমুল ইসলাম অপু করোনায় আক্রান্ত হন। তারা অসহায়-দুস্থদের সহায়তায় সোচ্চার ছিলেন। 

শিরোনামে ছিলেন সাকিব :

ক্রিকেটের জনপ্রিয় ওয়েবসাইট  ক্রিকভিজের সাথে  উইজডেন ম্যাগাজিন যৌথভাবে  ওয়ানডেতে সবচেয়ে মূল্যবান ক্রিকেটার ও টেস্টের ষষ্ঠ সেরা খেলোয়াড় হিসেবে সাকিবকে বেছে নেন। আইসিসির এক দশকে সেরা ওয়ানডে একাদশেও নাম আছে সাকিবের।

তবে এ বছরের অধিকাংশ সময়ই  আইসিসির কর্তৃক নিষিদ্ধ ছিলেন সাকিব। জুয়াড়ির তথ্য গোপন করায় আইসিসি তাকে নিষিদ্ধ করে। তাই বছরজুড়েই শিরোনামে ছিলেন সাকিব। তবে করোনা তার জন্য আশীর্বাদ হয়েই এসেছিলো। এজন্য অনেকগুলো ম্যাচ মিস করতে হয়নি সাকিবকে। গত ২৮ অক্টোবর সাকিবের নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়। ফলে ক্রিকেটে ফিরতে আর কোন বাঁধা থাকেনি তার। এতে বঙ্গবন্ধু টি-টুয়েন্টি কাপে জেমকন খুলনার হয়ে মাঠে নামেন সাকিব।

ভবিষ্যতের তারকা আকবর :

আগামী দশকে আধিপত্য বিস্তার করা ২০জন ক্রিকেটারের মধ্যে জায়গা করে নেন বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক আকবর আলী। ইএসক্রিকইনফোর মাসিক ম্যাগাজিন বিশ্বব্যাপী ১৫ জন কোচ, স্কাউটস, বিশ্লেষক, খেলোয়াড় এবং পর্যবেক্ষককে জিজ্ঞাসা করে এই তালিকা তৈরি করে। উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান আকবর আলি বিশ্বকাপের ফাইনালে বাংলাদেশের শিরোপা জয়ে বড় অবদান রাখেন। অনবদ্য ৪৩ রান করেন তিনি। ফাইনালে ভারতকে ৩ উইকেটে হারিয়ে শিরোপা জিতে নেয় বাংলাদেশ।

টম মুডি, মাইক হেসন, দিপ দাশগুপ্ত, এইচডি অ্যাকারম্যান, ইয়ান বিশপ, এআর শ্রীকান্ত, টিম উইগমোর, রাসেল আরনল্ড, পরস মহামব্রে, হাসান চিমা, শ্রীনাথ বশিয়াম, তামিম ইকবাল, অ্যান্ডি মোলস, জারোড কিম্বার এবং রবিন পিটারসনরা ভবিষ্যতের সেরা ২০জন খেলোয়াড়কে বাছাই করেন।

নারী ক্রিকেটারদের জন্য হতাশার বছর :

করোনার কারনে দেশের ক্রিকেট থমকে যাবার আগে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সাফল্য পেয়েছিলো পুরুষ দল। তবে নারীদের দলের জন্য বছরটি হতাশার ছিলো। এ বছর তারা কেবল মাত্র চারটি টি-টুয়েন্টি ম্যাচ খেলতে পারে। নারীদের আইসিসি টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে নিজেদের ঐ চার ম্যাচে কোন জয়ের স্বাদ পায়নি বাংলাদেশ। 

ভারতের কাছে ১৮ রানে, অস্ট্রেলিয়ার কাছে ৮৬ রানে ও নিউজিল্যান্ডের কাছে ১৭ রানে ম্যাচ হারে বাংলাদেশ। শেষ ম্যাচে শ্রীলংকার কাছে ৯ উইকেটে হারে নারী দল। পুরো আসরে ব্যাট হাতে বাজে পারফরমেন্স ছিলো নারী দলের ক্রিকেটারদের। কোন ব্যাটসম্যানই হাফ-সেঞ্চুরি করতে পারেননি।

বিসিবি প্রেসিডেন্টস কাপ ও বঙ্গবন্ধু টি-টুয়েন্টি কাপ :

করোনার মধ্যে সাহসিকতার সাথে দু’টি টুর্নামেন্টের আয়োজন করে বিসিবি। ক্রিকেটকে মাঠে ফেরাতে টুর্নামেন্ট দু’টি বিসিবির বড় উদ্যোগের অংশ।

এই দু’টি টুর্নামেন্ট জুড়ে খেলোয়াড়, কর্মকর্তা এবং অন্যান্য স্টোকহোল্ডারদের জৈব-সুরক্ষা পরিবেশে রাখা হয়েছিলো। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে পুনরায় চালু করার পরিকল্পনা হিসেবে জৈব-সুরক্ষা পরিবেশ কীভাবে কাজ করে সেটি দেখাই প্রধান লক্ষ্য ছিলো বিসিবির।

কোন সমস্যা ছাড়াই পরিকল্পনা অনুযায়ী দু’টি টুর্নামেন্ট সফলভাবে আয়োজন করে বিসিবি। বিসিবি প্রেসিডেন্টস কাপে ৫০ ওভারের টুর্নামেন্টে তিনটি দল মাহমুদুল্লাহ একাদশ, তামিম একাদশ ও নাজমুল একাদশ অংশ নেয়। তিনটি দলের নেতৃত্বে ছিলেন মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ, তামিম ইকবাল ও নাজমুল হোসেন শান্ত। মাহমুদুল্লাহ একাদশকে নেতৃত্ব দেন মাহমুদুল্লাহ। তার অধীনে চ্যাম্পিয়ন হয় মাহমুদুল্লাহ একাদশ। ফাইনালে নাজমুল একাদশকে ৭ উইকেটে হারায় তারা।

বঙ্গবন্ধু টি-টুয়েন্টি কাপ টি-টুয়েন্টি ফরম্যাটে অনুষ্ঠিত হয়। পাঁচটি জেলার নামে পাঁচটি দল স্পন্সর করে দেশের নামীদামি কোম্পানী। জেমকন খুলনাকে নেতৃত্ব দেন মাহমুদুল্লাহ। তার নেতৃত্বে এই ফরম্যাটেও শিরোপা জিতে খুলনা। ফাইনালে গাজী গ্রুপ চট্টগ্রামকে ৫ রানে হারিয়ে শিরোপার স্বাদ নেয় খুলনা। দু’টি টুর্নামেন্টেই বড় অংকের প্রাইজমানি দেয়া হয়েছিলো।  

ডাবল শিরোপা মাহমুদুল্লাহর :

ঘরোয়া আসরে অধিনায়ক হিসেবে টানা দু’টি শিরোপার স্বাদ পান মাহমুদুল্লাহ। বিসিবি প্রেসিডেন্টস কাপ ও বঙ্গবন্ধু টি-টুয়েন্টি কাপে চ্যাম্পিয়ন হয় তার দল।

বঙ্গবন্ধু টি-টুয়েন্টি কাপের উত্তেজনাপূর্ণ ফাইনালে মাহমুদুল্লাহর দল জেমকন খুলনা ৫ রানে হারায় গাজী গ্রুপ চট্টগ্রামকে। সামনে থেকে দলকে নেতৃত্ব দেন মাহমুদুল্লাহ। ৪৮ বলে অপরাজিত ৭০ রান করেন তিনি।

গত অক্টোবরে তিনটি দলকে নিয়ে অনুষ্ঠিত বিসিবি প্রেসিডেন্টস কাপের মাহমুদুল্লাহ নেতৃত্বে দল চ্যাম্পিয়ন হয়। তাই তার অধীনে ওয়ানডে ও টি-টুয়েন্টির শিরোপা জিতে দল। এতে তার অধিনায়কত্ব প্রশংসিত হয় ক্রিকেট মহলে। 

করোনার কারনে দীর্ঘ বিরতির পর দেশে ক্রিকেট ফিরিয়ে আনতে দু’টি টুর্নামেন্টই বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিকল্পনার বড় অংশ ছিল।

বর্ষসেরা খেলোয়াড় :

এ বছর যেক’টি ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ, তাতে বর্ষসেরা খেলোয়াড় নির্বাচন করা কিছুটা কঠিনই। যাইহোক, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দুর্দান্ত একটি ইনিংস খেলেন লিটন। বর্ষসেরা খেলোয়াড় হবার জন্য ভালো রানও করেছেন তিনি। তিন ম্যাচের সিরিজে ১৫৫ দশমিক ৫০ গড়ে ৩১১ রান করেন লিটন। যা এ বছর বাংলাদেশের পক্ষে ব্যক্তিগত কোন খেলোয়াড়ের  সর্বোচ্চ রান।

জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তিন ম্যাচের সিরিজে ১৫৫ গড়ে ৩১০ রান করেন তামিম ইকবাল। তাই রানের দিক দিয়ে লিটনের খুব কাছেই ছিলেন তিনি। তবে তামিমকে পেছনে ফেলে সর্বোচ্চ রান লিটনের। সেই সাথে এ বছর বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানও করেন লিটন।    

টেস্টে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২০৩ রানের ইনিংস খেলেছেন মুশফিকুর রহিম। টেস্ট ক্যারিয়ারে তৃতীয় ডাবল-সেঞ্চুরি ছিলো মুশফিকের। কিন্তু লিটনের ইনিংসটিও প্রশংসা কুড়িয়েছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




bangladesherkhela.com 2019
Developed by RKR BD