চর্মগোলকের মহাযজ্ঞ দেখা শুরু ম্যারাডোনাকে দিয়েই

চর্মগোলকের মহাযজ্ঞ দেখা শুরু ম্যারাডোনাকে দিয়েই

রুমেল খান : এই ক্রীড়াভূবনের ক্রীড়ামঞ্চে অসংখ্য ক্রীড়ার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়া হচ্ছে ফুটবল। জাতিসংঘের অধীনে যত দেশ আছে, তার চেয়ে বেশি দেশ আছে ফিফার অধীনে। ফুটবল খেলা নিয়ে যেমন কুরুক্ষেত্র বেঁধে যায়, তেমনি থেমে যায় যুদ্ধও। নব্বই মিনিটের এ খেলাটিতে কি এমন আছে, যা মন্ত্রমুগ্ধের মতো আচ্ছন্ন করে রাখে সবাইকে? এর উত্তর দেয়া মুশকিল। যুগে যুগে বিভিন্ন ফুটবলারদের অনন্য ফুটবলশৈলী ও দলীয় সাফল্যই ফুটবলপ্রেমীদের আকৃষ্ট করে এসেছে, সেটা অস্বীকার করা যাবে না।

ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর হচ্ছে ফিফা বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই বিশ্বজুড়ে উন্মাদনা। বিশ্বকাপ মানেই আবেগ, উচ্ছ্বাস, হাসি-কান্না। এমন অনুভূতির সঙ্গে পরিচয় আছে বাংলাদেশের সবারই। আমিও এর ব্যতিক্রম নই।

`The World Cup final's here/The crowd assembled cheer/The anthems play/ On this fine day/Supporters filled with fear./The whistle starts the game/The team so full of fame/Sven's fingers are crossed/He thinks we've lost/Each player much the same./The final minutes run/The pitch alight with sun/It's still nil-nil/But score we will/Before the end has come

কোন্টি আমার প্রথম বিশ্বকাপ ফুটবল দেখার (টিভিতে) অভিজ্ঞতা? সেটা ১৯৮৬ সালের কথা। তখন আমি পড়ি ক্লাস ফোরে। থাকি নরসিংদীর ঘোড়াশালের পলাশে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ওয়াপদা কলোনীতে। বাবা সেখানে চাকরি করেন হিসাবরক্ষক পদে। জায়গাটা অনেক বড় আর সুন্দর (আমার মতে এই অঞ্চলটা হচ্ছে ‘বাংলার কাশ্মীর’। এখানে আমরা বাস করেছি ১৯৮১ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত)। খেলার মাঠ আছে প্রচুর। মনের খায়েশ মিটিয়ে নানা ধরনের খেলা খেলেছি। যেমন হাডুডু, দাড়িয়াবান্ধা, কানামাছি, বউচি, সাতচারা, বরফ-পানি, চোর-পুলিশ, এক্কা-দোক্কা, এমনকি কুতকুত-ও! ক্লাস থ্রিতে উঠে পরিচিত হলাম ফুটবল ও ক্রিকেটের সঙ্গে। খেলাদুটি আমার শিশুচিত্ত দখল করে নিল। তখন ক্রিকেট খেলতাম শুধু শীতকালে। আর ফুটবল প্রায় সারাবছরই। ভালই খেলতাম খেলাটি। খেলতাম উইঙ্গার ও ফরোয়ার্ড পজিশনে। পরবর্তীতে বিভিন্ন জায়গায় ‘খ্যাপ’ খেলেছি, স্থানীয়

‘জুনিয়র টাইগার্স ক্লাব’ গঠন করে তাতে খেলেছি। খেলেছি আন্তঃস্কুল ও জেলা পর্যায়েও।

বিশ্বকাপ প্রসঙ্গে ফিরে আসি। যে সময়টার কথা বলছি, তখন বিটিভি এবং বাংলাদেশ বেতার ছাড়া অন্য কোন চ্যানেল ছিল না। ছিল না এখনকার মতো এতো পত্রিকা, অনলাইন পত্রিকা এবং বেসরকারী বেতার স্টেশন। তারপরও বিদেশী খেলাধুলা সম্পর্কে জানার জন্য আমার আগ্রহের কোন কমতি ছিল না। বিটিভি, বাংলাদেশ বেতার এবং দৈনিক ইত্তেফাক এবং কিছু সাপ্তাহিক বা পাক্ষিক ম্যাগাজিন থেকে চেষ্টা করতাম খেলাধুলার খবরাখবর নেয়ার।

মনে পড়ে, সেই সময় বিটিভিতে ‘রোড টু ওয়েম্বলি’ নামে একটি সাপ্তাহিক খেলার অনুষ্ঠান প্রচারিত হতো, যাতে দেখানো হতো ইংলিশ প্রিমিয়ার ফুটবল লীগের খেলাগুলো। গোগ্রাসে গিলতাম তা। আমার মন কেড়ে নেয় লিভারপুলের দৃষ্টিনন্দন খেলা। সে দলের ওয়েলস্ স্ট্রাইকার ইয়ান রাশ ছিলেন আমার প্রিয় খেলোয়াড়।

কদিন পরেই পেপার পড়ে জানতে পারলাম অচিরেই মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর। ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি নিয়ে কিছু তথ্য জানলাম, যা ডায়েরিতে লিখে রাখি।

এছাড়াও জানলাম বিশ্বকাপের ইতিহাস ও রোল অব অনার। সেই সঙ্গে বেশ কিছু তারকা ফুটবলারদের নাম। যেমন লিওনিদাস, পুসকাস, পেলে, গ্যারিঞ্চা, ববি মুর, বেকেনবাওয়ার, ক্রুইফ, কেম্পেস, জিকো, সক্রোটিস, প্লাতিনি, রুমেনিগো, শিফো, আলতোবেলি …।

সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট হলাম ইতালির পাওলো রোসি আর জার্মানির হ্যারল্ড শুমাখারের গল্প পড়ে। ১৯৮২ বিশ্বকাপের আগে ঘরোয়া লীগে পাতানো ম্যাচ খেলার দায়ে রোসিকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাঁর জেলও হয়। কিন্তু বিশ্বকাপের সময় ঘনিয়ে এলে দেশের স্বার্থে তাঁকে মুক্তি দেয়া হয় এই শর্তেÑ দেশকে বিশ্বকাপ জেতাতে পারলে মুক্তি পাবেন, নয়তো টানতে হবে জেলের ঘানি! সেমিতে হ্যাটট্রিক, ফাইনালে দুই গোলসহ টুর্নামেন্টে ছয় গোল করলেন রোসি। ইতালি হলো চ্যাম্পিয়ন। গোল্ডেন বুট জিতলেন রোসি। সেই রোসি এবারও খেলবেন! খেলবেন জার্মানির গোলরক্ষক শুমাখারও, যিনি ’৮২ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের প্যাট্রিক বাটিস্টনকে ভয়ংকর এক লাথি মেরে তার কয়েকটি দাঁত ফেলে দিয়েছিলেন! মাঠে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন বাটিস্টন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে রেফারি শুমাখারকে লাল কার্ড দূরের কথা, হলুদ কার্ডও দেখাননি! দুঃখ পেলাম ওয়েলস্ মূলপর্বে যেতে না পারায় খেলতে পারবে না আমার প্রিয় ইয়ান রাশ।

কিন্তু আমার সেই দুঃখ ভুলিয়ে দিল আরেকজন। তাঁর নাম ডিয়েগো ম্যারাডোনা। স্কুলের দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা শেষ। আম-জাম-কাঠাল খাওয়ার ধুম পড়েছে। ছুটি চলছে গ্রীষ্মকালীন। শুরু হয়েছে বিশ্বকাপও। বাসার সবাই রাত জেগে, উৎসবমুখর পরিবেশে টিভিতে খেলা দেখি। প্রতিবেশীরাও শামিল হয় তাতে। মা সবার জন্য চা-নাস্তা বানিয়ে দেন। পরদিন স্কুলে খেলা নিয়ে তুমুল আলোচনা-তর্ক করি বন্ধুদের সঙ্গে। সেই সঙ্গে ধরি বাজি।

কখনও জিতি, কখনও হারি। বিকেলে মাঠে ফুটবল খেলি বিশ্বকাপের তারকা খেলোয়াড়দের মতো। দলগঠন করি ইতালি, জার্মানি, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা … ইত্যাদি। আমাদের টিভিটি হচ্ছে ‘ফিলিপস্’ মডেলের, ২০ ইঞ্চি, সাদা-কালো। তবে তাতে আনন্দ খুঁজতে কোন সমস্যা হয় না আমাদের। সেবার বিশ্বকাপ চলেছিল মাসখানেক ধরে। শেষ হবার দশদিন আগে বাবা জানালেন, আমরা মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ার পুরান বাউশিয়া গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যাব। মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। সেখানে যেতে প্রবল আপত্তি জানালাম। কারণ গ্রামে বিদ্যুৎ-ব্যবস্থা নেই। টিভি আছে মাত্র দু-তিনজনের বাড়িতে। সেই টিভি চলে ব্যাটারির সংযোগ দিয়ে। খেলা দেখতে হলে তিনমাইল হেঁটে যেতে হয়! কিন্তু বাবা সুখবর দিলেন, আর তিন মাইল হাঁটতে হবে না। মাত্র দশ মিনিট হাঁটলেই টিভি দেখা যাবে। খুব কাজেই একজন নতুন টিভি কিনেছেন। তারপরও পুরোপুরি আশ্বস্ত হলাম না। বাড়ী গেলাম। খেলা যেন ভালমতো দেখতে পারি, এজন্য বিকেল থেকেই বাবা ও চাচাকে জোর তাগাদা দিতাম। তারা বিরক্ত হয়ে সন্ধ্যাবেলাতেই আমাকে খেলা দেখাতে নিয়ে গেলেন। বাড়ির উঠোনে টিভি রাখা। খেলা দেখতে এসেছে কমপক্ষে শ’ পাঁচেক মানুষ। আমি যেন নির্বিঘ্নে ও আরামে খেলা দেখতে পারি, এজন্য সবার সামনে পাটি পেতে বসিয়ে দেয়া হয়েছে আমাকে। সম্ভবত রাত আটটার পর খেলা শুরু হলো, আর্জেন্টিনার খেলা। কোয়ার্টারে তাদের প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড। দুটি গোল করে আর্জেন্টিনাকে জেতালেন ম্যারাডোনা। একটি গোল হেডে (পরে শুনেছি গোলটি ছিল হাত দিয়ে করা), আরেকটি গোল ছয়জনকে কাটিয়ে। অবিশ্বাস্য দৃষ্টিনন্দন গোল। রাজপুত্রের মতো চেহারা। সুগঠিত দেহসৌষ্ঠ্যব, জাদুকরি নৈপুণ্যÑ সবমিলিয়ে ম্যারাডোনা আমার হৃদয়ের মণিকোঠায় ঠাঁই করে নিলেন। আড়াল হয়ে গেলেন ইয়ান রাশ! সেমিতেও বেলজিয়ামের বিপক্ষে দারুণ দুটো গোল করলেন এই ফুটবল জাদুকর। ফাইনালে জার্মানির বিরুদ্ধে গোল করতে না পারলেও জয়সূচক গোলটি তিনিই করালেন। দেশকে শিরোপা জেতালেন অবিস্মরণীয়ভাবে। স্পষ্ট মনে আছে, ৩-২ গোলে এগিয়ে ছিল আর্জেন্টিনা। খেলা শেষ হতে আর মাত্র কয়েক মিনিট বাকি। সে সময়টায় মহা টেনশন নিয়ে শুধু সৃষ্টিকর্তার নাম জপেছিলাম আর্জেন্টিনার সাফল্যের জন্য! ফাইনাল শেষে গ্রামের সবাই মিলে টর্চ আর হারিকেন জ্বালিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে আনন্দ-মিছিল করেছিলাম! এত রাত পর্যন্ত বাইরে থাকায় মা-বাবা ব্যাপক প্যাঁদানি ও বকা দিলেও সেটাকে থোড়াই কেয়ার করেছিলাম!

সেই বিশ্বকাপে আমার দেখা সেরা ম্যাচ ছিল কোয়ার্টারে ব্রাজিল-ফ্রান্সের ম্যাচ। দু’দলই উপভোগ্য ফুটবল খেলে। শেষে টাইব্রেকারে জিতে যায় ফ্রান্স। বেশ আগ্রহ নিয়ে দেখেছিলাম এশিয়ান দেশ দক্ষিণ কোরিয়ার খেলা। ভাল খেলেছিল মরক্কো, ইতালি, ব্রাজিলের খেলাও। বেশ কিছু ফুটবলারের নাম জানলাম।

এরপর দেখেছি আরও আটটি বিশ্বকাপ আসর। ‘প্রথম প্রেম’-এর স্মৃতি মানুষ যেমন ভুলতে পারে না, তেমনি আমি কখনও ভুলতে পারব না প্রথম

বিশ্বকাপ ফুটবল আসর দেখার মধুময় চিরজাগরুক স্মৃতি। সেই স্মৃতির নায়ক ম্যারাডোনা আমাদের ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছেন না-ফেরার দেশে।

যতদিন ফুটবল থাকবে, ম্যারাডোনাও থাকবেন ইতিহাস হয়ে। তাঁর মতো কালজয়ী ফুটবলার আগামীতে আসবে কি না সন্দেহ। ম্যারাডোনার মত এমন আবেগী, প্রবল জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ক্রীড়াবিশ্বে বিরল। মাঠের বাইরেও ছিলেন দারুণ বিনোদনদাতা। ব্যক্তিজীবনে যত বিতর্কই থাকুক, ম্যারাডোনা আজীবন বেঁচে রইবেন তাঁর অসাধারণ, অবিস্মরণীয়, জাদুমাখা, অনন্য ফুটবলশৈলীর জন্যই। ম্যারাডোনা এক চিরজাগ্রত আবেগের নাম।

* অতিথি লেখক : স্পোর্টস রিপোর্টার, দৈনিক জনকণ্ঠ 

[email protected]

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




bangladesherkhela.com 2019
Developed by RKR BD