কোভিড-১৯ ও শারীরিক অনুশীলন

কোভিড-১৯ ও শারীরিক অনুশীলন

বিগত প্রায় ৭ মাস যাবৎ সারা পৃথিবী করোনাভাইরাসের মহামারীতে বিপর্যস্ত হয়ে আছে। লাখ লাখ লোক আক্রান্ত হচ্ছে এবং দুঃখজনকভাবে লাখো লোকের প্রাণহানি ঘটেছে। অল্প বয়সীদের বেশিরভাগই রোগে আক্রান্ত হলেও বিশেষ খারাপ অবস্থায় না পড়ে সুস্থ হয়ে উঠছেন। কেউ কেউ আক্রান্ত হচ্ছেন কোনোরকম উপসর্গ ছাড়াই।

ডাঃ আবদুল্লাহ আল সাফী মজুমদার

রোগটা আমাদের শরীরের জীবকোষকে কীভাবে আক্রমণ করে? ভাইরাসটি শরীরে প্রবেশ করার পরে (প্রবেশ-পথ-নাক, মুখ এবং চোখ) শরীরের বিভিন্ন জীবকোষে প্রবেশ করে-এনজিওটেন্সিন কনভার্টিং এনজাইম-২ রিসেপ্টর'এর মারফত। এই রিসেপ্টরগুলো ফুস্ফুসে প্রচুর পরিমাণে থাকায় ভাইরাসটি ফুস্ফুসের কোষকে ব্যাপক আক্রমণ করতে সক্ষম হয়। ফুস্ফুস ছাড়াও হৃদযন্ত্রের জীবকোষে ও রক্তনালীর দেয়ালে দায়ী রিসেপ্টরগুলো প্রচুর পরিমাণে রয়েছে। অতএব, ভাইরাসটি হৃদযন্ত্র ও রক্তনালির কোষগুলোতে ঢুকে পড়তে ও ক্ষতি সাধন করতে সক্ষম।

আক্রান্ত হৃদযন্ত্র ও পরবর্তী ঝুঁকি

এর ফলে হৃদযন্ত্রের কোষগুলো জখম হয় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে হৃদযন্ত্রে প্রদাহের সৃষ্টি হয়। কারো ক্ষেত্রে হৃদযন্ত্রের মাংশপেশীর অংশবিশেষ অকেজো হয়ে যেতে দেখা যায়। কাজেই, কোভিড-১৯ মূলত ফুস্ফুসের রোগ হলেও করোনা রোগীর হৃদযন্ত্র আক্রান্ত হয়ে রোগের জটিলতা বাড়ায়। সে কারণে করোনা রোগীদের চিকিৎসায় হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে।/ রোগী তাৎক্ষণিক সুস্থ হয়ে গেলেও সবক্ষেত্রে রোগী সম্পূর্ণ নিরাময় লাভ করেছেন-এটা বলা যাবে না। হৃদযন্ত্রে যে প্রদাহ হয় অথবা মাংশপেশি যে অকেজো হয়- এই দুই ঘটনা পরবর্তীকালে দু'রকমের জটিলতা সৃষ্টী করতে পারে-

১) হৃদযন্ত্রের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে,

২) হৃদযন্ত্রের নষ্ট মাংশপেশীর বদলে অন্য ধরনের মাংশপেশির উপস্থিতি ঘটে যা হৃদস্পন্দনের মারাত্মক পরিবর্তন ঘটায়।

এই পরিবর্তন জীবন সংশয় ও করতে পারে। মূলত: তাৎক্ষণিক হৃদযন্ত্র বন্ধ হওয়া (Sudden Cardiac Arrest) এভাবে হয়ে থাকে।

এই দুই ধরণের পরিবর্তন আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক সক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং মৃতুর ঝুঁকি বাড়ায়। যারা পেশাগতভাবে শারীরিক অনুশীলন/শরীর চর্চা করেন, তাদের ক্ষেত্রে হৃদযন্ত্রের পরিবর্তনগুলো অধিকতর ঝুঁকি সৃষ্টি করার সম্ভবনা রয়েছে।

মূল্যায়ন ও পর্যবেক্ষণ: ইতিমধ্যে সুস্থ হয়ে যাওয়া করোনা রোগীদের ৩ মাস পরে হৃদযন্ত্রের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা গেছে যে কারো কারো ক্ষেত্রে শারীরিক অনুশীলন করাটা বিপদজনক। এই সংক্রান্ত তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হচ্ছে করোনায় আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে যাওয়ার ২ সপ্তাহ পড়ে প্রত্যেক ক্রীড়াবিদের হৃদযন্ত্রের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা। পরীক্ষার ফলাফলের উপর নির্ভর করে শারীরিক অনুশীলনের মাত্রা এবং সময়কাল নির্ধারণ করে দিতে হবে। একটি বিষয় উল্লেখ করতে হয় যে এই মহামারীতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক উপসর্গহীন রোগী ও রয়েছে।

অতএব শুধু জানা রোগী নয়, প্রতিজনকেই- বিশেষ করে যারা প্রতিযোগিতামূলক অনুশীলনে অংশগ্রহণ করবেন, তাদের প্রত্যেককে অংশগ্রহণের পূর্বে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে হৃদযন্ত্রের সার্বিক মূল্যায়ন করে নিতে হবে। অনুশীলন চলাকালীন সময় এবং প্রতিযোগিতামূলক খেলায় অংশগ্রহণের পূর্বে পর্যবেক্ষণ অব্যহত রাখতে হবে। এছাড়াও প্রতিযোগিতা চলাকালে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ রাখতে হবে। এ পর্যবেক্ষণ-প্রক্রিয়া ক্ষেত্রবিশেষে, রোগের অন্তত ১ বছর পর্যন্ত অব্যাহত রাখা প্রয়োজন হতে পারে।

লেখক পরিচিতি : অধ্যাপক কার্ডিওলজি, প্রাক্তন পরিচালক, জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিউট, মহাসচিব, বাংলাদেশ কার্ডিয়াক সোসাইটি

সূত্রঃ

১। বৃটিশ জার্নাল অফ স্পোর্টস মেডিসিন, সম্পাদকীয়, জুন ১৯,২০২০; ২। বৃটিশ মেডিকাল জার্নাল ওপেন স্পোর্টস এন্ড এক্সার্সাইজ মেডিসিন, জুলাই ১৩,২০২০; ৩। ইউরোপিয়ান হার্ট জার্নাল, মে ২০,২০২০; ৪। জার্নাল অফ আমেরিকান মেডিসিন এ্যাসোসিয়েশন, মে ১৩,২০২০; ৫। সার্কুল্যাশন, জুন,২০২০; ৬। জার্মান জার্নাল অফ স্পোর্টস মেডিসিন অনলাইন, মে,২০২০।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




bangladesherkhela.com 2019
Developed by RKR BD