ক্রীড়াঙ্গনে নারীদের সাফল্য ‌ও অগ্রযাত্রা

ক্রীড়াঙ্গনে নারীদের সাফল্য ‌ও অগ্রযাত্রা

সমাজ ও সভ্যতার অগ্রযাত্রায় বরাবরই পুরুষদের পাশাপাশি হেঁটেছে নারীরা। চিরকালই তারা পুরুষের সমান্তরাল। কিন্তু শুধুমাত্র খেলাধুলাই নারীরা পিছিয়ে ছিলেন পুরুষের চেয়ে। তবে আশার কথা হলো, এদেশের নারীরা আসতে শুরু করেছেন- সাফল্যের রঙে বর্ণিল করতে শুরু করেছেন এদেশের ক্রীড়াঙ্গন। তবে এটা একদিনে হয়নি। এই অর্জন কিংবা স্বীকৃতি পেতে নারীকে বহু বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। নারীরা প্রথমে পরিবারেই খেলাধুলা বিষয়ে বাধা পান। সেই বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে একটু এগিয়ে গেলে আসে আবার সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাধা। সাথে উপরি পাওনা সুযোগ-সুবিধা এবং বেতন বৈষম্য। জাতীয় পর্যায়ে আসার পর নারীদের মুখোমুখি হতে হয় পৃষ্ঠপোষক সমস্যার। এইসব নানা আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয় নারীদের। যারা এই বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে-এড়িয়ে এগিয়ে যেতে পেরেছেন সাফল্য এসে ধরা দিয়েছে তাদের কাছেই। কিংবা এভাবে বলা যেতে পারে, ক্রীড়াঙ্গনে সাফল্য পাওয়ার পাশাপাশি নারীদের পথচলা সহজ ও সুগম হয়েছে।

এখন আর ঘরে বসে কাঁথা সেলাই কিংবা উনুন জ্বালানোর কাজ নয়, আরো বহু কাজ আছে এদেশের নারীদের। গত এক দশকে তো নারী ক্রীড়াঙ্গনের চেহারাই পাল্টে দিয়েছেন। ঘরোয়া আর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য দিয়ে আলোচনায় এসেছেন বারবার। পুরুষ ক্রীড়াবিদদের সাথে তুল্যমূল্যে বিচারও হয়েছেন এদেশের নারী ক্রীড়াবিদরা। অথচ ১৫ বছর আগেও এমনটি কল্পনা করা যেত না। তবে এক দশকে এই ধারণা পাল্টে দিয়েছেন নারী খেলোয়াড়েরা। নারীদের ফুটবলের ইতিহাসটাই পাল্টে দেয় ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার কলসিন্দুর স্কুলের মেয়েরা। চরম সুবিধা বঞ্চিত এই সকল মেয়েরা শুধুমাত্র ফুটবল নৈপুন্য দিয়েই পেরিয়ে যায় হাজারও বাধা। গাঁও-গেরামের হতদরিদ্র পরিবারের এইসব মেয়েরা শুরুতে উন্নত প্রশিক্ষণ না পেলেও অদম্য মনোবল আর প্রাচীর ভাঙা উদ্দীপনায় একের পর এক সাফল্য পেয়েছে। শেষে দেশের হয়ে খেলেও তারা পায় সাফল্যের দেখা। সব বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে এখন তাদের সামনে বিশ্বকাপে খেলার হাতছানি।

গত এপ্রিল-মে মাসে বঙ্গমাতা অনূর্ধ্ব-১৯ আন্তর্জাতিক গোল্ডকাপ ফুটবলের গ্রুপের ম্যাচে আরব আমিরাত ও কিরগিজস্তানকে পরাজিত করে সেমিফাইনালের টিকিট পায় স্বপ্ন-কৃষ্ণারা। সেমিতে মঙ্গোলিয়াকে বিধ্বস্ত করে ফাইনালে উঠে আসে তারা। কিন্তু শিরোপা লড়াইয়ের ঘন্টাখানেক আগে ঘূর্ণিঝড় ফণী এসে ভন্ডুল করে দেয় ফাইনালের মঞ্চ। তাতে লাওসের সঙ্গে যৌথভাবে চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হয় বাংলাদেশকে। বঙ্গমাতা অনূর্ধ্ব-১৯ নারী আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে মঙ্গোলিয়ার বিপক্ষে চোখ ধাঁধানো এক গোল করে ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ফিফার তালিকায় ঠাঁই করে নেন বাংলাদেশের কিশোরী ফুটবলার মনিকা চাকমা। এছাড়া সাতক্ষীরার ফুটবলার সাবিনা খাতুন বিদেশি কোটায় ভারতে ও মালদ্বীপের ক্লাবে সুনামের সঙ্গে খেলেছেন।

পিছিয়ে নেই এদেশের নারী ক্রিকেটাররা। ছেলেদের আগেই দেশকে আন্তর্জাতিক ট্রফি জয়ের স্বাদ পাইয়ে দেয় নারী ক্রিকেটাররা। গত বছরের জুনে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে ছয় জাতির এশিয়া কাপ ক্রিকেটে শক্তিশালী ভারতকে আরো ৩ উইকেটে পরাজিত করে বাংলাদেশকে শিরোপা জেতান জাহানারা-সালমারা। এদিকে, ভারতে মেয়েদের আইপিএলে বাংলাদেশের প্রথম নারী ক্রিকেটার হিসেবে খেলেন জাহানারা আলম।

এদেশের এই অনগ্রসর সমাজে প্রায় যেকোনো ক্ষেত্রে ছেলেদের চেয়ে নারীদের অনেক বেশি সংগ্রাম করতে হয়। তাদের পথে বাধা ও চ্যালেঞ্জ বেশি। ক্রীড়াঙ্গনের কথা আলাদা করে বললে, গত কয়েক বছরে সফলতার বিচারে ক্রিকেট-ফুটবল মিলে আমাদের মেয়েরা, ছেলেদের তুলনায় এগিয়ে। মাত্র দু’মাসের ব্যবধানে এশিয়া কাপ জয়সহ তিনটি টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে এদেশের ক্রিকেটার। অন্যদিকে, অদম্য গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে এদেশের বয়সভিত্তিক নারী ফুটবল দল। সাঁতার এবং ভারোত্তোলনে নারীদের সাফল্য জাতীয় পর্যায় থেকে বিস্তৃত হয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও। আর এদেশের ক্রীড়া সংগঠকরা যে দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে, এশিয়া পেরিয়ে বিশ্বমঞ্চে স্থান করে নিয়েছেন সে তো বলাই বাহুল্য। বাংলাদেশের প্রথম কোনো সংগঠক হিসেবে ফিফার সদস্য নির্বাচিত হন বাংলাদেশ মহিলা ফুটবল উইংয়ের চেয়ারম্যান মাহফুজা আক্তার কিরণ।

ক্রিকেটকে এগিয়ে নিতে সরকার এবং বিসিবি যেমন সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে, তেমনি দাবা, হকি, অ্যাথলেটিক্স, ভলিবল, বাস্কেটবল, কাবাডি, ব্যাডমিন্টন কিংবা কুস্তিতেও যদি দেয়া যায়, তবে এদেশের নারী ক্রীড়াবিদদের সাফল্যে পরিসরটা আরো বাড়বে।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নারী খেলোয়াড়রা বাংলাদেশের জন্য নানা সাফল্য নিয়ে আসলেও যথাযথ মূল্যায়ন হয় না। উল্টো বৈষম্যের শিকার হন ক্রীড়াবিদরা। প্রায়ই সরকার, পৃষ্ঠপোষক, পরিবার কিংবা সমাজ থেকে আর্থিক, সামাজিক কিংবা উন্নয়নগত সহযোগিতা পান না তারা। সেজন্য ক্রীড়াক্ষেত্রে আসতে উৎসাহিত হন না নারীরা। ক্রীড়াঙ্গনে নারীদের না আসার আরো একটি কারণ হলো- মূলত: গ্রামীন জনপদের মানুষই তো এখনও বাঁচিয়ে রেখেছেন এদেশের খেলাধুলা- সেইসব প্রান্তিক জনগোষ্ঠির মেয়েদের খেলাধুলায় অংশ নিতে বরাবরই অনুৎসাহিত করেছে সমাজ-পরিবেশ এবং প্রতিবেশ। আর বিত্তবানরা তো খেলাতেই খুবএকটা আসেন না। নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে, কখনো কখনো আবার উপেক্ষা করে এদেশের মেয়েরা ফুটবল-ক্রিকেট-কাবাডিসহ বিভিন্ন খেলায় পারদর্শিতা দেখিয়ে সম্মান বয়ে আনেন। অপরাজেয় নৈপুন্য দেখিয়ে বিশ্বকে অবাক করে দিয়ে দেশের জন্য গৌরবোজ্জ্বল সাফল্য বয়ে আনছেন। সামাজিক প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়াক্ষেত্রে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছেন এদেশের অদম্য নারী ক্রীড়াবিদরা। তাদের এগিয়ে চলার সাহস এদেশের যুব সমাজকেও প্রবলভাবে অনুপ্রাণীত করছে। এই বলিষ্ঠ ও অনুকরণীয় ভূমিকা নারীর এগিয়ে চলার পথকে আরো সুগম করতে সহায়তা করেছে। নিশ্চয়ই এই প্রেরণা নিয়ে আরো সামনে এগিয়ে যাবে এদেশের নারী ও কিশোরীরা। আর তাদের চলার পথকে মসৃণ করতে সহায়ক হবে এদেশের বিত্তবান ও পৃষ্ঠপোষকরা।

তবে সরকারিভাবে নারী-পুরুষ ভেদে একই কাজের জন্য কোনো বেতন-বৈষম্য থাকার কথা নয়। কিন্তু এক্ষেত্রে বৈষম্যের অভাব নেই। পুরুষ ক্রিকেটে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড-বিসিবির আয় বেশি, স্পন্সর-টিভিস্বত্ত্ব, টিকিট বিক্রি এবং আইসিসি থেকে তুলনামূলক অর্থ প্রাপ্তিও অনেক বেশি; তাই বেতন-কাঠামোতে পার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু এদেশে নারী-পুরুষ ক্রিকেটারদের মধ্যে বেতন বৈষম্য লাখের বিপরীতে হাজার টাকা।

তবু ক্রীড়াক্ষেত্রে তেমনভাবে উঠে আসছে না নারী খেলোয়াড়। ১৬ বার জাতীয় টেবিল টেনিসে চ্যাম্পিয়ন হয়ে বহু আগেই গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লিখিয়েছেন জোবেরা রহমান লিনু। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশকে ভালোভাবেই তুলে ধরছেন সালমা খাতুনেরা। ১২তম এসএ গেমসে ভারোত্তোলনে মাবিয়া আক্তার সীমান্ত এবং সাঁতাওে শারমিন আক্তার শীলা স্বর্ণ জিতে ইতিহাস রচনা করেন। নারী ক্রীড়াবিদদের হাত ধরে বাংলাদেশ কম সাফল্য পায়নি। তুলনায় ক্রীড়াঙ্গনে নারীদের অংশগ্রহণ তেমন বাড়েনি। তবে যতটুকু অংশগ্রহণ বলা যায় তার প্রায় পুরোটাই গ্রামীণ এবং দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা ক্রীড়াবিদদের মাধ্যমে। শিক্ষিত এবং অবস্থাস¤পন্ন পরিবারের নারী সেভাবে ক্রীড়াক্ষেত্রে আসেন না।

জাতীয় পর্যায়ের খেলায় অংশ নেয়া নারীদের শতকরা ৮০ ভাগই আসেন মধ্য ও নি¤œবিত্ত থেকে। তাঁদের স্বপ্নই থাকে, খেলায় দক্ষতা দিয়ে চাকরি পেয়ে পরিবারকে আর্থিকভাবে সহায়তা করা। বেশির ভাগ নারী খেলোয়াড়র লক্ষ্য থাকে, আনসার ভিডিপি, পুলিশ, বিজেএমসির মতো সার্ভিসেস দলে খেলা। যাতে পরবর্তীতে তারা এসব প্রতিষ্ঠানে চাকুরি পেতে পারেন এবং ভালো প্রশিক্ষণ পেয়ে নিজেদেরকে আরও দক্ষ করে তুলতে পারেন। তবে এক্ষেত্রে চাকুরি পাওয়ার হার খুব কম। মূলত: আর্থিক এই অনিশ্চয়তাই খেলাধুলায় নারীদের আগ্রহী হয়ে উঠার পথে অন্তরায়। এছাড়া মৌলিক চাহিদা পুরনের জন্য অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা, নিয়মিত টুর্নামেন্ট না হওয়া এবং অনুশীলনের জায়গার অভাবও নারীদেরকে খেলা বিমুখ করে ফেলে।

নারীরা খেলাধুলার সঙ্গে জড়িত থাকলে বাল্যবিবাহ রোধ করা সম্ভব। শিক্ষার হার ও নেতৃত্বগুণ বাড়ানো এবং ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটানো সম্ভব। ফলে নারীর ক্ষমতায়ন হতে পারে। ক্রীড়াঙ্গনে মেয়েদের এই সাফল্যের তালিকাটা বেশ দীর্ঘ। আশার কথা, ক্রীড়াবান্ধব এই সরকার নারী খেলোয়াড়দের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে ইতিমধ্যে অনেক উদ্যোগ নিয়েছে। এদেশের নারী ক্রীড়াবিদদের আপন মর্যাদায় মহিমান্বিত করতে হলে প্রথাগত ভ্রান্ত ধারণা ভেঙে বেতন-বৈষম্য ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর বিকল্প কোনো পথ নেই।

লেখক: ক্রীড়া সম্পাদক, এটিএন বাংলা

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




bangladesherkhela.com 2019
Developed by RKR BD