কাল তৃতীয় ‌‌ও শেষ ওয়ানডে

কাল তৃতীয় ‌‌ও শেষ ওয়ানডে

সম্প্রতি শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট দল অনেক সংগ্রাম করছে। বিশ্বকাপেও তারা ছিল আলোচনার বাইরে। তবু দশ দলের টুর্ণামেন্টে তাদের অবস্থান ষষ্ঠ। অপরদিকে শ্রীলঙ্কার চেয়ে অনেক আলোচিত বাংলাদেশ। সেমিফাইনালে খেলার লক্ষ্যে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে যায় তারা। শেষ পর্যন্ত আট নম্বরে থেকে শেষ করে। তবে র‌্যাঙ্কিংয়েও বর্তমানে শ্রীলঙ্কার চেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ। তাই দু’দলের ওয়ানডে সিরিজে যেন নিজেদের শক্তিমত্তা প্রমাণের লড়াই ছিল। সিরিজ শুরুর আগেই স্বাগতিক লঙ্কানরা হুঙ্কার দিয়েছিল সফরকারী বাংলাদেশকে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে হোয়াইট ওয়াশ করার।

নিয়মিত অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা, বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান, নিয়মিত সদস্য লিটন দাস ও মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন না থাকা এবং ঘরের মাটিতে সিরিজ বলেই এমন দৃঢ়তাপূর্ণ ঘোষণা দিতে পেরেছে তারা। সেই পথে এগিয়েও গেছে তারা টানা দুই ম্যাচে অনায়াস জয় তুলে। ৪৪ মাস পর ঘরের মাটিতে সিরিজ জয়ের পর এখন ঘোষণার সত্যতা প্রমাণের সুযোগ তাদের। আরেকবার হোয়াইট ওয়াশের লজ্জার মুখে দাঁড়িয়ে এখন বাংলাদেশ। আগামীকাল বুধবার সিরিজের তৃতীয় ওয়ানডেতে হারলেই তামিম ইকবালের দল হোয়াইট ‌ওয়াশের লজ্জায় পড়বে। ১২ বছর পর শ্রীলঙ্কার মাটিতে হোয়াইটওয়াশ হবে বাংলাদেশ।

একটা সময় দ্বিপাক্ষিক সিরিজগুলো হলেই শুধু ভাল ক্রিকেট খেলা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা করাটাই মুখ্য ছিল বাংলাদেশ দলের জন্য। টানা হোয়াইটওয়াশের লজ্জা বরণ করতে হয়েছে। তখন বাংলাদেশ দলের অন্যতম প্রতিপক্ষ ছিল কেনিয়া, আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড। এ তিন দলকে হোয়াইটওয়াশের মাধ্যমে বিষয়টি শিখতে শুরু করে টাইগাররা। এরপর একে একে একে জিম্বাবুইয়ে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নিউজিল্যান্ড ও পাকিস্তানের মতো দলগুলোকেও হোয়াইটওয়াশ করেছে বাংলাদেশ। সবমিলিয়ে ১২ বার প্রতিপক্ষকে হোয়াইটওয়াশের গৌরব অর্জিত হয়েছে। কিন্তু পরিবর্তে এখন পর্যন্ত ৩০ বার প্রতিপক্ষ দলগুলোর কাছে হোয়াইটওয়াশ হয়েছে বাংলাদেশ দল। তবে দ্বিপাক্ষিক সিরিজগুলোয় এখন আর এই লজ্জাজনক হারগুলো নিয়মিত দেখা যায় না। দেশের মাটিতে যে কোন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে দুরন্ত ‘টাইগারের’ মতো খেলে উল্টো সফরকারীদেরই হোয়াইটওয়াশের ভয়ে ভীত-কম্পিত করে তোলে বাংলাদেশ দল। ওয়ানডে ক্রিকেটে ক্রমোন্নতির মাধ্যমে পরাশক্তি হয়ে ওঠার ইঙ্গিত হয়তো সেখানেই। তবে এখনও ক্রিকেট দুনিয়ার কুলীন দেশগুলো বাংলাদেশকে পরাশক্তি ভাবতে নারাজ। সে কারণেই এবার বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলকে ক্রিকেটের সব বিভাগেই ভাল খেলে পরাস্ত করার পরও অনেকে সেটিকে ‘অঘটন’ বলে আখ্যা দেয়। বাংলাদেশকে ‘ভয়ঙ্কর’ দল হিসেবে বিবেচনা করতে আপত্তি নেই কারও, তবে তারা নিয়মিতই অস্ট্রেলিয়া, ভারত, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা ও পাকিস্তানের বিপক্ষে জিতবে তা স্বাভাবিকভাবে দেখতে নারাজ ক্রিকেট বিশ্ব।

সত্যিকার অর্থে এই দলগুলোর বিপক্ষে এখন পর্যন্ত নিয়মিত জেতার অভ্যাসটা হয়ে ওঠেনি বাংলাদেশের। তাই আসলে ‘মর্যাদাপূর্ণ’ দল এখনও হয়ে উঠতে পারেনি। র‌্যাঙ্কিংয়ে উন্নতির কারণে অবশ্য এখন জিম্বাবুইয়ে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, আফগানিস্তান, আয়ারল্যান্ড, হল্যান্ড, স্কটল্যান্ডের মতো দলগুলোর চেয়ে অনেক এগিয়ে রাখা হয় বাংলাদেশকে। কারণ এই দলগুলোর বিপক্ষে এখন জয়টা নিয়মিতই হয়ে গেছে। তবে মূল লড়াইটা এখন শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে। সর্বশেষ দেশটিতে আয়োজিত ত্রিদেশীয় নিদাহাস টি২০ ট্রফিতে দু’দলের লড়াই ছিল উত্তেজনায় ঠাসা এবং দারুণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। বাড়তি উন্মাদনা এবং জয় তুলে নিয়ে একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জটা মাঠ ছাপিয়ে এমনকি দর্শকদের মধ্যেও সংক্রমিত হয়েছে। যদিও র‌্যাঙ্কিংয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ, তবে দু’দলের অবস্থান যে পাশাপাশিই তা সাম্প্রতিক সময়ের লড়াইগুলোতে স্পষ্ট। চলতি ৩ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে জমজমাট দর্শক উপস্থিতি প্রমাণ করছে লঙ্কান ক্রিকেটপ্রেমীরা এখন বাংলাদেশের বিপক্ষে জয় তুলে নিতে কতটা মরিয়া। তাদের চাওয়াটা পূর্ণ হয়েছে। টানা দুই ম্যাচে ভাঙ্গাচোরা বাংলাদেশ দল কোন পাত্তাই পায়নি। এক ম্যাচ হাতে রেখেই সিরিজ জয় নিশ্চিত করেছে লঙ্কানরা। নিজেদের মাঠে অন্তত বাংলাদেশের চেয়ে নিজেদেরই সেরা হিসেবে প্রমাণ করে ফেলেছে। ৪৪ মাস পর নিজেদের মাটিতে আবার কোন সিরিজ জিতেছে লঙ্কানরা। ২০১৫ সালের নবেম্বরে সফরকারী ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সর্বশেষ ঘরের মাটিতে সিরিজ জিতেছিল তারা। ৩-০ ব্যবধানে হারিয়েছিল যেটি নিজেদের মাঠে প্রতিপক্ষকে সর্বশেষ হোয়াইটওয়াশ করারও ঘটনা। মাঝের সময়ে ১৫টি ওয়ানডে সিরিজ খেলে মাত্র দুটি সিরিজ জিততে পেরেছে শ্রীলঙ্কা। ১২টি সিরিজ হাতছাড়া হয়েছে, একটি ড্র করেছে বাংলাদেশের বিপক্ষে। এর মধ্যে ঘরের মাঠে ৬ সিরিজ খেলে ৫ টিতেই হেরেছে যার মধ্যে এমনকি দুর্বল জিম্বাবুইয়ের কাছে হারের বাজে রেকর্ডও আছে। তবে ২০১৬ সালে আয়ারল্যান্ড সফরে স্বাগতিকদের ২-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ করেছে তারা। এখন আবার কোন প্রতিপক্ষকে হোয়াইটওয়াশ করার মোক্ষম সুযোগ তাদের সামনে।

এর আগে পর্যন্তু বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কার মধ্যে ৭টি দ্বিপাক্ষিক সিরিজ হয়েছে। সেখানেও শ্রেষ্ঠত্ব শ্রীলঙ্কার। হোয়াইটওয়াশ করাতো দূরের কথা, কোন সিরিজই লঙ্কানদের বিপক্ষে জিততে পারেনি বাংলাদেশ দল। সেরা সাফল্য বলতে দুইবার ১-১ সমতায় সিরিজ শেষ করতে পেরেছে। ৪ বার লঙ্কানরা বাংলাদেশকে হোয়াইটওয়াশ করে আর এক সিরিজ জিতে নেয় ২-১ ব্যবধানে। অর্থাৎ এবার নিয়ে ষষ্ঠবারের মতো বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজ জিতল লঙ্কা শিবির। এখন পঞ্চমবারের মতো বাংলাদেশকে হোয়াইটওয়াশ করার মোক্ষম সুযোগ। বিশ্বকাপ ব্যর্থতা থেকে ফিরেই অপরিহার্য ৪ ক্রিকেটারকে ছাড়া খেলতে এসে এখন টানা দুই হারে একেবারেই বিপর্যস্ত বাংলাদেশ দল। সর্বশেষ দুই সফরে শ্রীলঙ্কার মাটিতে ১-১ সমতায় সিরিজ শেষ করে দেশে ফিরে তারা। কিন্তু মাঝে ঘরের মাটিতে শ্রীলঙ্কার কাছে ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে ৩-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ হয় বাংলাদেশ। কিন্তু শ্রীলঙ্কার মাটিতে সর্বশেষ হোয়াইটওয়াশ হয়েছিল ২০০৭ সালে। ১২ বছর পর আবার সেই লজ্জা বরণের সামনে দাঁড়িয়ে তামিমের দল। প্রথম দুই ম্যাচে স্বাগতিকরা যেভাবে খেলেছে তাতে করে ঘটনাটি বাস্তব হয়ে ওঠাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশ দলকে পুরোপুরি ছত্রভঙ্গ, অপরিকল্পিত আর বিপর্যস্তই মনে হয়েছে। ঘুরে দাঁড়ানোটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জের হবে তামিমদের জন্য।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




bangladesherkhela.com 2019
Developed by RKR BD