কেভিতোভার সফল প্রত্যাবর্তন

কেভিতোভার সফল প্রত্যাবর্তন

দু’বারের উইম্বলডন চ্যাম্পিয়ন পেত্রা কেভিতোভাকে ছুরিকাঘাত করায় ৩৩ বছরের এক ব্যক্তির বিপক্ষে সাক্ষ্য দিযেছেন তিনি। ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাসে কেভিতোভার বাড়িতে চুরি করার উদ্দেশ্য প্রবেশ করেন ঐ ব্যাক্তি। পরে কাছে পেয়ে নারী টেনিসের এই গ্রেট প্লেয়ারকে ছুরিবাঘাতে আহত করেন। ছিরকাহত হ‌ওয়ার পর টেনিস সার্কিট থেকে বিদায়ের সম্ভাবনা জাগলে‌ও ঠিকই তিনি ফিরেছেন। বর্তমানে বিশ্বের দুই নম্বর টেনিস তারকা এখন পেত্রা কেভিতোভা।

ছুরিকাহত হয়ে ক্যারিয়ারটাই শেষ হতে পারত চেক টেনিস তারকা পেত্রা কেভিতোভার। কিন্তু সেটা তিনি হতে দেন নি। অদম্য ইচ্ছে আর প্রচন্ড অধ্যাবসায়ে ফিরে আসেন টেনিস দুনিয়ায়। সদ্য সমাপ্ত বছরের প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যাম অস্ট্রেলিয়ান ‌ওপেনে ফাইনালে‌ও ‌ওঠেন। ৬-৭, ৭-৫ ‌ও ৪-৬ গেমে পরাজিত হন জাপানের না‌ওমি ‌ওসাকার কাছে। রানার্সআপ হন তিনি।

অবশ্য তারকাদের সেরা সময়ে এমন হামলা কিংবা আহত করার বিষয় এটাই প্রথম নয়। ১৯৯৩ সালে মনিকা সেলেসের পিঠে ৯ ইঞ্চির ছুরি গেঁথে দিয়েছিল জনৈক ব্যক্তি। হামবুর্গে কোর্টের মধ্যেই। সেরা ফর্মের মনিকা সেলেস দু’‌বছর কোর্টেই ফিরতে পারেননি। ফেরার পর আরও একটা গ্র্যান্ডস্ল্যাম জিতেছিলেন ঠিকই। কিন্তু নিজের সেই বিধ্বংসী ফর্মে আর ফিরতে পারেন নি মনিকা সেলেস।

আর ২০১৬ সালে, ক্রিসমাসের আগে চেক প্রজাতন্ত্রের প্রোসতেজভে নিজের বাড়িতে আক্রান্ত হন পেত্রা কেভিতোভা। ডাকাতির জন্য তাঁর বাড়িতে হানা দিয়েছিল এক দুষ্কৃতিকারী। ছুরি–হাতে। প্রতিরোধের চেষ্টা করেন কেভিতোভা। দুষ্কৃতিকারীর ধারালো ছুরিতে রক্তাক্ত হয় তার বাঁ–হাতের চার আঙুল। বাঁ–হাতের মুঠোয় ধরা র‌্যাকেট থেকেই তাঁর বৈচিত্র্যময় গ্রাউন্ডস্ট্রোক আছড়ে পড়ত বিপক্ষের কোর্টে। এরপর কি আর সেই বাঁ–হাত আবার র‌্যাকেট ধরতে পারবেন তিনি? গোটা টেনিসবিশ্ব জুড়ে প্রশ্নটা উঠেছিল সেই সময়।

এতটাই গভীর ছিল ছুরিকাঘাত, যে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয় কেভিতোভার টেন্ডন আর স্নায়ু। প্রায় চার ঘণ্টা ধরে অস্ত্রোপচার হয়েছিল তার বাঁ–হাতে। মনে হয়েছিল, তাঁর কোর্টে ফিরতে অনেক সময় লাগবে। যদি আদৌ ফিরতে পারেন। কিন্তু পেত্রা কেভিতোভা অন্যরকম ভেবেছিলেন। অস্ত্রোপচারের পর টানা ছ’মাসের রিহ্যাব। ২০১৭ সালের ফ্রেঞ্চ ওপেনেই কামব্যাক। এবার অন্য প্রশ্ন। ফিরলেন তো কোর্টে। কিন্তু থিতু হতে পারবেন কি ২০১১ এবং ২০১৪ সালের উইম্বলডন চ্যাম্পিয়ন?‌

সময় গড়িয়েছে। পেশাদার সার্কিটে একটু একটু করে পায়ের তলার জমি শক্ত করেছেন কেভিতোভা। লড়াইয়ের রসদ সঞ্চয় করে রেখেছেন। অবশেষে আবার তাঁর প্রতিভার বারুদে আঁচ লাগল। জ্বলে উঠলেন সদ্যসমাপ্ত অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে। তাঁর ওপর হামলাকারী এখনও ধরা পড়েনি। কিন্তু বছরের প্রথম গ্র্যান্ড স্লামের ফাইনাল পর্যন্ত অব্যাহত থেকেছে তাঁর অগ্রগতি। শেষরক্ষা হয় নি। দাপটের সঙ্গে ফাইনালে পৌঁছেও প্রায় আড়াই ঘণ্টার ফাইনালে হেরেছেন জাপানের নাওমি ওসাকার কাছে। তবু এই প্রত্যাবর্তন টেনিস ইতিহাসের স্মরণীয় অধ্যায়ে অনায়াসে জায়গা পেয়ে গেছে।

দুষ্কৃতিকারীর হামলার পর বেঁচে যাওয়াটাই আশ্চর্যের ছিল কেভিতোভার কাছে। তখন বিশ্ব ক্রমপর্যায়ে তাঁর র‌্যাঙ্কিং ১১। লড়াইয়ের সোপান বেয়ে এখন কিতোভা ২ নম্বরে। অবশ্য ২০১১–র অক্টোবরেও মহিলা সিঙ্গল্‌স র‌্যাঙ্কিংয়ে ২ নম্বরে পৌঁছেছিলেন তিনি।

এখনও সেই বাঁ–হাতেই র‌্যাকেটটা শক্ত করে ধরেন। কোর্টে নিজেকে উজাড় করে দেন। তবু কেভিতোভার উপলব্ধি, হাতটা ১০০ শতাংশ স্বাভাবিক হয়নি। হবেও না। অবশ্য তাতে আক্ষেপ নেই মার্টিনা নাভ্রাতিলোভাকে আদর্শ করে বেড়ে ওঠা আঠাশের টেনিস কন্যার। সেমিফাইনালে উঠে প্রাক্তন টেনিস তারকা, অধুনা কমেন্টেটর জিম কুরিয়রের সেই হামলা পরবর্তী লড়াইয়ের প্রশ্ন শুনে কান্নায় গলা বুজে এসেছিল তাঁর। সেই তিনিই অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের ফাইনালে হেরে বলেন, ‘‌এখানেই সব শেষ হয়ে গেল, তা নয়। আবার ফিরে আসব।’

স্কুলশিক্ষক বাবাই ছোট্ট কেভিতোভাকে টেনিসে উৎসাহিত করেন। পেশাদার টেনিসে আগমন ২০০৬ সালে। এখনও পর্যন্ত সিঙ্গলসে ফাইনালে উঠেছেন ৩৩ বার। ২৬টিতেই চ্যাম্পিয়ন। ২০১৬ সালটা কেভিতোভার জীবনে ঘটনাবহুল। রিও অলিম্পিকে ব্রোঞ্জ জয়। চেক সতীর্থদের নিয়ে জয় ফেডারেশন কাপে (‌মোট জয়ের সংখ্যা ৬)‌। বছর শেষের আগে ছুরিকাহত। তার আগে, কেভিতোভাকে কাঁদিয়েছিল মানসিক যন্ত্রণাও। ২০১৬ সালেই ভেঙে গিয়েছিল জাতীয় আইস হকি দলের তারকা রাদেক মেডলের সঙ্গে সম্পর্ক। ২০১৪ সালে ডেটিং শুরু। পরের বছর ডিসেম্বরে চেক মিডিয়া জানিয়ে দেয়, এনগেজমেন্ট সেরে ফেলেছেন তাঁরা। যার সত্যতাও স্বীকার করে নেন এই যুগল। কিন্তু বেশিদিন টেকেনি সম্পর্কটা। সেই ধাক্কাই কি তাঁকে মানসিকভাবে আরও শক্তিশালী করে দিয়েছিল? নইলে ‌সারা দুনিয়ার সন্দেহাকুল মন যখন বলছিল এক কথা, তখন ছিপছিপে টেনিস–কন্যার হৃদয় কেন অবাধ্য হল?

গতবছর চারটে গ্র্যান্ড স্ল্যামেই তৃতীয় রাউন্ডের বেশি এগোতে পারেন নি। গতবছরই তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন মনিকা সেলেস। সাক্ষাতের পর কেভিতোভা বলেছিলেন, তিনি সম্মানিত।
কামব্যাকের প্রেরণা কি মনিকা সেলেসই দিয়েছিলেন পেত্রা কিতোভাকে,হতে‌ও পারে। সবসময় গ্রেটরাই তো অন্যদের গ্রেট হতে শিক্ষা দেন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




bangladesherkhela.com 2019
Developed by RKR BD