লক্ষ্য এবার জাতীয় দল: আনিসুর রহমান জিকো

লক্ষ্য এবার জাতীয় দল: আনিসুর রহমান জিকো

নবাগত বসুন্ধরা কিংসকে স্বাধীনতা কাপ ফুটবলের ফাইনালে তুলে গোলকিপার আনিসুর রহমান জিকো এখন ‘হিরো’তে পরিণত হয়েছেন। টানা দুটি ম্যাচ দলকে তিনি টাইব্রেকারে জেতান। দলের তিন নম্বর গোলরক্ষক থেকে এখন নিজেকে তুলে এনেছেন এক নম্বরে। তাঁকে ছাড়া এখন একাদশই চিন্তা করতে পারেন না দলের স্প্যানিশ কোচ। অবিশ্বাস্য কীর্তির পর ২১ বছর বয়সী এই গোলরক্ষক জানান তার সাফল্য কথা।

প্রশ্ন : অভিনন্দন। আপনার কাঁধে চেপেই বসুন্ধরা কিংস এখন ফাইনালে।

আনিসুর রহমান : আমাদের দল কিন্তু মাঠে খারাপ খেলেনি। ইনজুরি ও নিষেধাজ্ঞার কারণে আমাদের ছয়-সাতজন ফুটবলার খেলতে পারেনি। রক্ষণের অবস্থা তো খারাপ ছিল। এর পরও আমরা আগে গোল করেছি, ভালো খেলেছি। টাইব্রেকার একটা জুয়া। কোনো দিন হবে, কোনো দিন হবে না।

প্রশ্ন : টানা দুই ম্যাচ কোয়ার্টার ও সেমিফাইনালে শ্যূট-আউট জেতানোর নায়ক আপনি!

আনিসুর : আমরা স্বাধীনতা কাপের ফাইনালে উঠেছি, খুব ভালো লাগছে। তবে এখনো কষ্ট লাগে আবাহনীর কাছে ফেডারেশন কাপ ফাইনাল হারের জন্য। এ দুই ম্যাচের সাফল্যের বিনিময়ে ওই শিরোপাটা জিততে পারলে আমি বেশি খুশি হতাম। কারণ এএফসি কাপে খেলার সুযোগটা খুব করে চেয়েছিলাম আমরা সবাই। ফেডারেশন কাপের প্রস্তুতি এবং দলের স্পিরিট ছিল অন্য রকম। দুর্ভাগ্য হলো, সব ম্যাচ ভালো খেলার পর ফাইনালে আমরা বাজে খেলেছি। বেশি চাপ নেওয়ায় কেউ স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে পারেনি।

প্রশ্ন : চাপের কথাই যখন উঠল তখন একটা সত্যি জবাব চাই। পরশু আবাহনীর বিপক্ষে সাডেন ডেথে নিজে শট নেওয়ার সময় কি স্নায়ুচাপে ভোগেননি?

আনিসুর : কেউ বিশ্বাস করবে কিনা জানি না, কোনো চাপ ছিল না আমার মাথায়। তখন আমি যেটা বুঝেছিলাম, কলিনড্রেসের শট মিস হওয়ার পর বাকিরা সবাই ভয় পেয়ে গিয়েছিল। শেষ শটে ইমনকে আসতে দেখে আমি নিজে মারার সিদ্ধান্ত নিই। বল নিয়ে পেনাল্টি স্পটে যাওয়ার সময় রেফারি জালাল উদ্দিন বলেছিলেন, ‘বল ছাড়ো, তোমার জায়গায় যাও।’ আমি শট মারব বলায় তিনিও একটু বিস্মিত হয়েছিলেন। সোহেল ভাইও (আবাহনী গোলরক্ষক) হয়তো অবাক হয়েছিলেন। কিন্তু আমার ছিল আত্মবিশ্বাস, ভালো শট নিতে পারব।

প্রশ্ন : এটা কি আগের সিদ্ধান্ত ছিল? কোচই ঠিক করে দিয়েছিলেন?

আনিসুর : না না। এটা আমার তাত্ক্ষণিক সিদ্ধান্ত। টাইব্রেকারে শট নেওয়া আমার জন্য নতুন নয়। ২০১৩ সালে চট্টগ্রামে এ রকম ম্যাচে টাইব্রেকারে তিনটি সেভ করে এবং নিজে গোল করে কল্লোল সংঘকে জিতিয়ে প্রথম বিভাগে তুলেছিলাম। কক্সবাজারে ও চট্টগ্রামে খেলার সময় আমি নিয়মিত টাইব্রেকার মারতাম। তাই একটা আত্মবিশ্বাস ছিল।

প্রশ্ন : আপনি কি জানেন, ২০১৪ সালে কলকাতায় আইএফএ শিল্ড ফাইনালে শেখ জামালের বেশ কিছু সিনিয়র ফুটবলার টাইব্রেকার মারতে অনীহা প্রকাশ করেছিলেন? শেষ পর্যন্ত ৩-৪ গোলে হারে তারা।

আনিসুর : আমার অত বিস্তারিত মনে নেই। তবে টাইব্রেকারে গোলরক্ষকের চেয়ে শ্যূটারদের ওপর চাপ থাকে বেশি। তারা গোল করতে না পারলে দল পিছিয়ে পড়বে। এই চাপটা যারা জয় করতে পারে তারাই ভালো মারে এবং সফল হয়।

প্রশ্ন : কিন্তু আপনি বললেন যে আপনার ওপর চাপ ছিল না!

আনিসুর : টেনশন জিনিসটা আমার একটু কম। ছোটবেলায় বাবার ভয়েই একটু চাপ অনুভব করতাম, সেটাই উতরে গেছি। তা ছাড়া আমার মধ্যে দ্বিধা কাজ করে কম। আর গোলরক্ষকরা বোধ হয় একটু পাগলও হয় (হেসে)।

প্রশ্ন : বাবাকে এত ভয়ের কারণ?

আনিসুর : বাবাকে যমের মতো ভয় পেতাম। পড়ালেখা না করে ফুটবল খেলাটা তিনি পছন্দই করতেন না। এর পরও লুকিয়ে খেলতে চলে যেতাম। সে জন্য বকাঝকা, মারধর খেতে হতো। ২০১৪ সালে চট্টগ্রামে লিগ খেলব, সেটাতে আমাকে যেতে দিতে চাননি বাবা। এখন অবশ্য তিনি লোকজনের কাছে শোনেন, ছেলে ভালো খেলছে। তাই আর কিছু বলেন না। তবে ফুটবল খেলেও যে ভালো টাকা-পয়সা পাওয়া যায়, সেটাও তিনি জানেন না। এখনো বাড়ি (চকরিয়া, চট্টগ্রাম) থেকে আসার সময় বাবা তিন-চার হাজার করে টাকা দেন।

প্রশ্ন : আপনি ঢাকায় খেলা শুরু করেন ২০১৫ সালে চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে ফরাশগঞ্জের হয়ে। কিন্তু কোনো দলে এখনো এক নম্বর গোলরক্ষক হয়ে শুরু করতে পারেননি…

আনিসুর : ২০১৬ সালে প্রিমিয়ার লিগে মুক্তিযোদ্ধায় নাম লেখাই। এরপর গত মৌসুমে খেলেছি সাইফ স্পোর্টিং ক্লাবে, সেখানে লিগে ১০টি ম্যাচ খেলেছি। এবার অন্য ক্লাবে যাওয়ার কথা ছিল। শেষ পর্যন্ত বসুন্ধরা কিংসেও নাম লেখাই, ভেবেছিলাম ভাগ্য বদলাবে না। খেলার সুযোগ তেমন মিলবে না। কারণ মিতুল-মোস্তাক ভাইয়েরা আছেন। তবে ফেডারেশন কাপের প্রথম ম্যাচের পর থেকেই আমি নিয়মিত খেলে যাচ্ছি।

প্রশ্ন : মানে তিন থেকে এক নম্বর গোলরক্ষক?

আনিসুর : এক নম্বর কি না জানি না। সুযোগটা কাজে লাগাতে আমি মরিয়া। এর আগে আমি অনেক পরিশ্রমও করেছি। নিজেরও মনে হয়, আগের চেয়ে আমার গোলকিপিং ভালো হয়েছে। এ জন্য আমি জাতীয় দলের সাবেক গোলারক্ষক কোচ জেসন ব্রাউনের কাছে কৃতজ্ঞ।

প্রশ্ন : জেসন ব্রাউন গত বছর এসেছিলেন অ্যান্ড্রু অর্ডের সঙ্গে।

আনিসুর : ওনার আর্সেনাল একাডেমিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। তাঁর অধীনে করা ক্যাম্পেই আমার উন্নতি হয়েছে। খুব কষ্টে কেটেছে ক্যাম্পের দিনগুলো। তিনি আমার ভাত-মাংস খাওয়া একদম নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেন। অথচ মাংস ছাড়া আমার চলত না। কী সব শাক, লতাপাতা, মাছ খেতে হয়েছে। সুযোগ পেলেই আমাকে ডেকে ট্রেনিংয়ে নিয়ে যেতেন। অনেক সময় কাটাতে হতো হয় জিমে না হয় মাঠে। ঘুমাতে যাব, তখন হঠাৎ কোচ এসে আমাকে জিমে নিয়ে যেতেন। আমার ফিটনেস এবং টেকনিক্যাল ডেভেলপমেন্ট হয়েছে তখন। ওই সময় আমার ওজন কমে যায় পাঁচ কেজির মতো। বিদায়ের সময় কোচ বলে গিয়েছিলেন, আমি যেন শুনি তুমি এক-দুই বছরের মধ্যে জাতীয় দলে খেলছ।

প্রশ্ন : তাঁর টেকনিক্যাল প্র্যাকটিসটা কী রকম ছিল?

আনিসুর : বল কোন দিকে থাকলে কী পজিশনে থাকতে হবে, কোন বলের গ্রিপ কী রকম হবে সবই শিখেছি তাঁর কাছে। গোল কিপিং প্র্যাকটিসে জেসনের শটে যে জোর মোকাবেলা করেছি, সে রকম গতিতে আমাদের দেশের কোনো স্ট্রাইকার মারতে পারে না।

প্রশ্ন : দেশি গোলরক্ষকদের জন্য সুবিধা যে দেশে ভালো স্ট্রাইকার নেই, তাদের মুখোমুখি হতে হয় না!

আনিসুর : না। দেশে ভালো স্ট্রাইকার থাকলে আমাদের জাতীয় দলের জন্য সুবিধাই হতো। তবে লিগে তো বিদেশিদের মুখোমুখি হতে হয়। অনেক ভালো স্ট্রাইকার এখন ঢাকার মাঠে। তবে আমাদের ক্লাব প্র্যাকটিসে মার্কোস ভিনিসিয়াসকে ঠেকানো কঠিন। এই মুহূর্তে বোধ হয় তার মতো জোরে কেউ শট মারতে পারে না।

প্রশ্ন : ওই যে জেসন বলে গিয়েছিলেন জাতীয় দলের কথা, সেই লক্ষ্য পূরণ হবে কবে?

আনিসুর : আমি বয়সভিত্তিক দলগুলো পেরিয়ে এসেছি। গত বছর অর্ডের অধীনে এএফসি অনূর্ধ্ব-২৩ বাছাই পর্ব খেলেছি ফিলিস্তিনে গিয়ে। সেখানে আমি নিয়মিত খেলেছি এবং কোচও আমার পারফরম্যান্সে খুশি ছিলেন। এরপর এখন চলছে জেমি ডের যুগ, এ বছর ঢাকায় অনুষ্ঠিত সাফে আমি প্রথমবারের মতো স্কোয়াডে ঢুকেছি। এবার খেলার সুযোগ না পেলেও সামনে আমার পারফরম্যান্সই সেই দুয়ার খুলে দেবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




bangladesherkhela.com 2019
Developed by RKR BD