দশ বছরে ক্রীড়াঙ্গন এগিয়েছে বেশি

দশ বছরে ক্রীড়াঙ্গন এগিয়েছে বেশি

ইকরামউজ্জমান: ক্রীড়ালেখক ও বিশ্লষক।

 

 

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দখলদার পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়েছিল। দেখতে দেখতে ৪৭ বছর চলে গেছে। গত ৪৬ বছরে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে আমাদের অনেক অগ্রগতি ঘটেছে। এই সময়ের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের সূচকে অনেক দেশকে আমরা পেছনে ফেলে এগিয়ে গেছি। সম্মিলিত প্রয়াসে এই সাফল্য সম্ভব হয়েছে। সাফল্যের এই ধারাবাহিকতাকে ধরে রেখে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। জাতির আদর্শিক অবস্থানকে গুরুত্ব দিতে হবে। জাতীয় জীবনে তো যাত্রাপথের শেষ নেই। আমরা লক্ষ্য ঠিক করে কাজ করেছি বলেই সফল হয়েছি। তবে আত্মতৃপ্তির সুযোগ নেই। আমরা অবশ্যই আগামী দিনে আরো বিভিন্ন ক্ষেত্রে জয়ী হয়ে দেশকে আন্তর্জাতিক বিশ্বে তুলে ধরতে পারব।

আমাদের বড় শক্তি হলো দেশের মানুষ। তাদের অফুরন্ত প্রাণশক্তি আর সম্ভাবনা। তাদের অদম্য মনোবল আর সাহস। সাহসী সম্মিলিত মানবগোষ্ঠী তো কখনো হারে না। জাতীয় জীবনে সামাজিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে চলার বড় ক্যানভাসে ক্রীড়াঙ্গনের চেষ্টা ও সফলতার স্থান আছে। আছে আশাসঞ্চারী ইতিবাচক দিক। ১৯৭১ সালের আগে অবহেলা আর পদে পদে বৈষম্যের শিকার সেই ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে স্বাধীনতার পরের ক্রীড়াঙ্গনের কোনো মিল নেই। স্বাধীনতার আগে যা কল্পনাও করতে পারিনি, সেটাই বাস্তবায়িত হয়েছে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে। আর দেশ স্বাধীন হয়েছে বলেই ক্রীড়াঙ্গনের অন্তরস্থিত শক্তি বিকাশের সুযোগ ঘটেছে। তবে এটা ঠিক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শ বাস্তবায়নে ঘাটতি থাকায় দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ক্রীড়াঙ্গন ঘিরে যে স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম, সেটা বাস্তবায়িত হয়নি।

আমরা কিন্তু হতাশ নই। নৈরাশ্যবাদীরা বড় তালিকা তৈরি করতে পারবেন জানি। বিশ্বাস করি, সুষ্ঠু ক্রীড়াবান্ধব পরিবেশে এবং রাষ্ট্রীয় ক্রীড়া পৃষ্ঠপোষকতায় টেকসই উন্নয়নের পথ ধরে ক্রীড়াঙ্গন এগিয়ে যাবে। ক্রীড়াঙ্গনের দিকে তাকালে লক্ষ করবেন তারুণ্যের মিছিল ক্রমেই বড় হচ্ছে। তারুণ্যের সপক্ষে সবাই ঐক্যবদ্ধ। এ ক্ষেত্রে বাস্তবতার আলোকে সচেতনতা ক্রমেই বাড়ছে। ক্রীড়াঙ্গনের ডাকে অহরহ সাড়া দিচ্ছে তারুণ্য। আর তারুণ্য সাড়া দিচ্ছে বলেই ক্রীড়াঙ্গন এগোচ্ছে বিভিন্ন খেলায়। তারুণ্য বাধা পেরিয়ে জয়ী হচ্ছে। তারা দেশের জন্য লড়তে ভয় পায় না। তখনই আনন্দে জ্বলে উঠি, যখন দেখি তরুণরা দেশের জন্য সাহসের সঙ্গে লড়ে, সেই লড়াইয়ের মধ্যে দেখি দেশপ্রেম আর দেশের জন্য প্রচণ্ড ভালোবাসা। তারুণ্য বড় স্বপ্ন দেখে ক্রীড়াঙ্গনে, আর সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে। মনের বিশ্বাসটা আমাদের শক্ত হয়—দেশের ক্রীড়াঙ্গন পিছিয়ে থাকবে না, হারবে না, এগিয়ে যাবে। আর এগিয়ে নিয়ে যাবে বাঁধনহারা তারুণ্য, যারা ভয় পায় না, দেশের কথা ভাবে। দেশের সম্মান, মর্যাদা ও গৌরবের প্রশ্নে যারা আপসহীন।

তারুণ্য শুধু ক্রীড়াঙ্গনের আসল শক্তি নয়। জাতীয় জীবনেও তারুণ্য অনেক বড় ‘ডিসাইডিং ফ্যাক্টর’। এটা এর জন্যই বলছি, আগামী ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ৩০০ আইন প্রণেতা নির্বাচিত হবেন। মোট ভোটার এবার ১০ কোটি ৪১ লাখ ৯০ হাজার ৪৮০ জন। এর মধ্যে ভোটারের বয়স ১৮ থেকে ২৮ বছরের মধ্যে ২২ শতাংশ। এসব তরুণের মধ্যে আবার প্রায় এক কোটি ২৩ লাখ এবার প্রথম ভোট দেবে। নির্বাচনের ফল নির্ধারণে তরুণদের ভূমিকা হবে গুরুত্বপূর্ণ।

দলীয় রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে এটা বলা যায় ক্রীড়াঙ্গনে কিন্তু দেশের সাফল্যের ক্ষেত্রে সবাই ঐক্যবদ্ধ এবং এক। সবাই মিলে বিজয়ের আনন্দ উপভোগ করে। ঠিক একইভাবে ব্যর্থতা ও হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পরিপ্রেক্ষিতে মন খারাপ করে। আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে খেলাধুলার চর্চার গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। বাড়ছে সচেতনতা। দেশের জনসাধারণ এখন ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে ভাবে। তারা দেশজুড়ে সক্রিয় ক্রীড়াঙ্গন দেখতে চায়। চায় দেশজুড়ে ক্রীড়াঙ্গন জাগুক। স্বাধীনতার ৫০ বছর উদ্যাপনের আগেই বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন হোক স্থিতিশীল এবং ফলদায়ক। অবসান ঘটুক সব ধরনের বৈষম্য আর অনাচারের। ক্রীড়াঙ্গন উজ্জীবিত হোক মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শে। ক্রীড়াঙ্গন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে বেশ কিছু দুর্বলতা এবং প্রতিবন্ধকতা বছরের পর বছর ধরে পরিলক্ষিত হচ্ছে। এগুলো কাটিয়ে উঠতে হবে ক্রীড়াঙ্গন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। ভবিষ্যতমুখী ক্রীড়া উন্নয়নে এর কোনো বিকল্প নেই।

আগেই উল্লেখ করেছি, রাজনীতিতে বিভেদ আছে, তবে ক্রীড়াঙ্গনের বৃহত্তর স্বার্থে ভালো ও মন্দে বিভেদ নেই। স্বাধীনতার পর গত ৪৬ বছরে যখন যে সরকার ক্ষমতায় ছিল, প্রত্যেকেই ক্রীড়াঙ্গনকে ঘিরে কমবেশি উৎসাহ দেখিয়েছে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। তবে এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার ক্রীড়াঙ্গনের জন্য গত ১০ বছরে সবচেয়ে বেশি করেছে। ক্রীড়াঙ্গনকে গুরুত্ব দিয়েছে। ক্রীড়াঙ্গনে নির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে তারুণ্য নিয়ে ভেবেছে। এভাবে অতীতে আর কোনো সরকার ভাবেনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গন থেকে সাফল্য এসেছে। নতুন নতুন ক্রীড়াকাঠামো নির্মাণ ছাড়াও বিরাজমান বস্তুগত সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করা হয়েছে। ক্রীড়াঙ্গন প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হয়েছে।

বর্তমান সরকারের গত ১০ বছরে ক্রিকেট, ফুটবল, হকি, গলফ, আর্চারি, শ্যুটিং, দাবা, ভারোত্তোলন, সাঁতার, অ্যাথলেটিকস, ভলিবলসহ বিভিন্ন খেলায় সবচেয়ে বেশি সাফল্য এসেছে। দেশের মাটিতে সাংগঠনিক দক্ষতার মাধ্যমে সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে আয়োজিত হয়েছে আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপ, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, বিশ্ব রোলার স্কেটিং চ্যাম্পিয়ন, এশিয়া কাপ ক্রিকেট, হকি, আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্ট, সাফ গেমস ছাড়াও বিভিন্ন খেলার আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট ও চ্যাম্পিয়নশিপ। এছাড়া গত ১০ বছরে প্রতিটি রাজস্ব বাজেটে পরিমাণে কম হলেও শুধু ক্রীড়াচর্চার ক্ষেত্রে বরাদ্দ বেড়েছে। বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচি, বিদেশে অংশগ্রহণ এবং এর আগে প্রস্তুতিপর্বের জন্য বিশেষ অনুদান—সব সময় পেয়েছে ক্রীড়াঙ্গন সরকারের তরফ থেকে।

আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে দলের নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা তরুণদের সুস্থ বিনোদনের জন্য প্রতিটি উপজেলায় একটি যুব বিনোদন কেন্দ্র এবং প্রতিটি জেলায় একটি করে যুব স্পোর্টস কমপ্লেক্স গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছেন। এ ছাড়া বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল অবস্থানকে আরো সুদৃঢ় করার পাশাপাশি ফুটবল, হকিসহ অন্য খেলাধুলাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




bangladesherkhela.com 2019
Developed by RKR BD