জয়ের বড় প্রয়োজন ছিল

জয়ের বড় প্রয়োজন ছিল

ইকরামউজ্জমান: ক্রীড়ালেখক ও বিশ্লেষক

গত জুলাইয়ে বড় অসহায়ভাবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে সিরিজ (২-০) হেরেছে বাংলাদেশ দল। দুটি টেস্ট তিন দিনের মধ্যেই সাঙ্গ হয়েছে। বাংলাদেশ দল কোনো প্রতিরোধই গড়ে তুলতে পারেনি স্বাগতিকদের বিপক্ষে। প্রথম টেস্টে ইনিংস ও বড় রানের ব্যবধানে, দ্বিতীয় টেস্টে ইনিংস পরাজয় না হলেও হেরেছে বড় রানের ব্যবধানে। চার মাস পর চলতি সফরে সেই দাপুটে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দুই টেস্টের সিরিজে (২-০) পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করল স্বাগতিক দলের কাছে। একটি টেস্টও তিন দিনের বেশি গড়ায়নি। কী অদ্ভুত মিল। টিম বাংলাদেশ এবারই প্রথম টেস্ট ক্রিকেটের র‌্যাংকিংয়ে ওপরের একটি দলকে নিজেদের মাটিতে হোয়াইটওয়াশ করল।

বাউন্সি উইকেটের সুযোগ নিয়ে সফরকারী বাংলাদেশ দলকে বিপর্যস্ত করেছিল ক্যারিবিয়ানরা তাদের ঘরে, ফিরতি সফরে এসে স্পিনবান্ধব উইকেটে তাদের হাত এবার পুরোপুরি নিচে নামানো ছাড়া আর উপায় ছিল না। ভারতে দীর্ঘ সময় ধরে তিন সংস্করণের ক্রিকেট খেলে বাংলাদেশে এসেছে, অনেকেই মনে করেছিল ক্যারিবিয়ানদের কাছে স্বাগতিক দলের স্পিন আক্রমণ বড় বাধা হয়ে হয়তো দাঁড়াবে না। কেননা ব্যাটসম্যানরা তো ভারতীয় স্পিন আক্রমণের বিপক্ষে খেলেই বাংলাদেশে এসেছেন। বাস্তবতায় দেখা গেল ভারতীয় স্পিনের বিপক্ষে যতটুকু প্রতিরোধ গড়ে খেলা সম্ভব হয়েছে, বাংলাদেশের বিপক্ষে তা মোটেই সম্ভব হয়নি। এটা কি স্বাগতিক স্পিনারদের হাত ও প্রজ্ঞার জাদু, না উইকেটের আচরণের সহায়তা! সব দেশই উইকেট তৈরি করে প্রতিপক্ষের দুর্বলতা ও নিজেদের সবলতা বিচার করে, এটাই স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে সফলতার পাশাপাশি কিন্তু ব্যর্থতাও আছে। প্রতিপক্ষের জন্য গর্ত খুঁড়ে সেই গর্তে ঢুকে যাওয়ার নজিরও অনেক আছে। হ্যাঁ, এটাই ক্রিকেট। চিন্তার বাইরে অনেক কিছুই বড় সহজভাবে ঘটতে পারে। আবার প্রত্যাশার বড় অপ্রত্যাশিত মৃত্যুও হয়। মাঠে তো প্রতিদিনই জন্ম আবার মৃত্যু ছিল। আগাম কিছুই ধারণা করা যায় না। খেলাটা তো রহস্য আর অনিশ্চয়তার মোড়কে মোড়ানো।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজ বিজয় শুধু অনেক বড় প্রাপ্তি নয়, এই বিজয় ইতিহাসের পাতায় গুরুত্বের বিবেচনায় ওপরের দিকেই স্থান করে নিয়েছে। টেস্ট ক্রিকেটে ১৮ বছরের ইতিহাসে (১১২ টেস্ট) এবারই প্রথম বাংলাদেশ কোনো প্রতিপক্ষকে ইনিংস এবং ১৮৪ রানে পরাজিত করল। খেলার চাকাকে আগামী দিনে সামনের দিকে চালানোর ক্ষেত্রে এটা অবশ্যই বড় অনুপ্রেরণা। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ‘হোম অ্যাডভান্টেজকে’ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পেরেছে বাংলাদেশ দল। আর এটা সম্ভব হয়েছে খেলোয়াড়রা তাঁদের সামর্থ্যের প্রতি শুধু সুবিচার নয়, তাঁরা এক মন ও এক প্রাণের অধিকারী হয়ে খেলেছেন।

সিরিজ জয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশ গত জুলাইয়ে বড় বাজেভাবে হারার ক্রিকেটীয় মধুর প্রতিশোধ নিতে পেরেছে। দেশের ক্রিকেটের বাস্তবতায় আত্মবিশ্বাসে ভরপুর, স্মরণীয় এই দাপুটে জয়ের বড় প্রয়োজন ছিল। বিজয়ের মাসে দেশবাসীকে টেস্ট ক্রিকেট থেকে অসাধারণ জয় উপহার দেওয়ার জন্য দলের খেলোয়াড় ও টিম ম্যানেজমেন্টকে আমাদের অভিনন্দন।

ওয়ানডের মতো টেস্ট ক্রিকেটেও ধীরে ধীরে সমীহ জাগানো দল হিসেবে পরিচিত হওয়া সম্ভব—এই বিশ্বাসটা গুরুত্বপূর্ণ। সবাই মিলে দায়িত্বশীল, শৃঙ্খলিত ও পরিকল্পনামাফিক খেলতে পারলে এগিয়ে চলার রথ বন্ধ হবে না, সময় লাগবে, একটা সময় অস্বস্তি থেকে মুক্তি ঘটবে। তরুণ ক্রিকেটারদের মধ্যে সম্ভাবনা ও সামর্থ্যের কমতি নেই, দরকার সুশৃঙ্খলিত নির্দিষ্ট ‘প্রসেসের’ আওতায় বারুদগুলো জ্বালিয়ে দেওয়ার সঠিক উদ্যোগ গ্রহণ। মনে রাখতে হবে, সময় এখন ক্রিকেটের অনুকূলে। ক্রিকেট নিয়ে কাজ করার সপক্ষে।

জুনিয়র ও সিনিয়র ক্রিকেটারদের ‘কন্ট্রিবিউশন’ নিয়ে সরস আলোচনা সব সময় চলে। এর পেছনে যুক্তিসংগত কিছু কারণ আছে। তবে এ আলোচনার প্রেক্ষাপট কিন্তু বদলাতে শুরু করেছে। চলতি বছর জিম্বাবুয়ের সফর এবং এরপর চলমান ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের বিপক্ষে মাঠের সার্বিক অবস্থা ও প্রেক্ষাপটের দিকে তাকালে বড় ক্যানভাসে একটা আশাব্যঞ্জক দিক লক্ষণীয় হবে, সেটা হলো সিনিয়রদের পাশাপাশি জুনিয়ররাও নিয়মিতভাবে কন্ট্রিবিউট করছেন, আলো ছড়াচ্ছেন। বড় দাগের বিশ্লেষণে বোলিং ও ব্যাটিং উভয় ক্ষেত্রে এটা লক্ষণীয় হচ্ছে। এই যে দায়িত্ব নেওয়া, দায়িত্ব বোঝা, এটা একটা দলকে ক্রমেই ভারসাম্যময় করে তোলে। লড়াইয়ে সর্বশক্তি প্রয়োগ করা একসঙ্গে সবার মধ্যে জয়ের ক্ষুধা বাড়িয়ে দেয়। পাল্টে যায় মানসিক শক্তি ও প্রত্যয়। সবাই রেকর্ড করতে পারবেন না; কিন্তু পারবেন নিজ নিজ জায়গা থেকে দলের জন্য অবদান রাখতে। একটা দলের জন্য এটাই দরকার। মাঠের লড়াইয়ে নামার আগে মানসিকভাবে এগিয়ে থেকে নামার তো কোনো বিকল্প নেই। এই যে বাংলাদেশ দল প্রথম টেস্ট থেকে দ্বিতীয় টেস্টে সর্বক্ষেত্রে ভালো খেলেছে, কেন খেলা সম্ভব হয়েছে—এই যে খেলোয়াড়দের উপলব্ধি, এটা কিন্তু তাদের চিন্তা ও চেতনা ধীরে ধীরে পক্ব হচ্ছে তার লক্ষণ। ইতিবাচক আগ্রহের পারদ ক্রমেই ওপরের দিকে উঠছে। চিন্তা করলে দেখা যাবে প্রথম ইনিংসে ৫০৮ রানের ইনিংস এবং বোলিংয়ে মেহেদী মিরাজের সাত উইকেট (পুরো টেস্টে ১২ উইকেট) খেলাকে সহজেই স্বাগতিকদের অনুকূলে নিয়ে এসেছে। বলা হচ্ছে বাংলাদেশের মাহমুদ উল্লাহর সেঞ্চুরি, সাকিব ও নবাগত ওপেনিং ব্যাটসম্যান সাদমান ও লিটন চমৎকার ব্যাট করেছেন, সেখানে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংস মাত্র ১১১ রানে গুটিয়ে গেল কেন? ক্রিকেটে এ ধরনের প্রশ্নের উত্তরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে উইকেটের চরিত্র, খেলোয়াড়দের প্রয়োগ ও মনোবিশ্লেষণ। তবে এটা ঠিক বাংলাদেশের স্পিনাররা বল যতটুকু ঘোরাতে এবং বাঁক নেওয়াতে পেরেছেন তারচেয়ে বেশি কিন্তু মাথা খাটিয়ে বল করেছেন। স্পিনাররা চিন্তার শক্তিতে এগিয়ে চলার পথে হেঁটেছেন। এটা ভালো লক্ষণ।

দেশের উইকেটে চার স্পিনার নিয়ে দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে নেমেছিল বাংলাদেশ। দেশের টেস্ট ইতিহাসে এবারই প্রথম ‘জেনুইন’ কোনো পেসার নেওয়া হয়নি। বিষয়টা নিয়ে কথা উঠেছে। তবে সব কথার শেষ কথা বাংলাদেশ দল দারুণভাবে জিতেছে। সফরকারী দলের দুর্বলতা, স্বাগতিক দলের শক্তির কথা মাথায় রেখেই টিম কম্বিনেশন তৈরি করা হয়েছিল। এটা সুযোগের সদ্ব্যবহার। ক্রিকেটের সৌন্দর্য অবশ্যই অন্য রকম। অতএব পেসারদের এতে মন খারাপ করার কিছু নেই। পেসারদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ সামনে আসছে। আর উইকেট তৈরির বিষয়টা নিয়ে প্রচুর আলোচনা চলে, বিশেষ করে বাইরের উইকেটের কথা চিন্তা করে। আর এই চিন্তাকে দূরে ঠেলে রাখার সুযোগ নেই। সুযোগ নেই পেসারদের বিষয়ে গা ছাড়া ভাব প্রদর্শনের। একটি-দুটি খেলা নিয়েই তো আমাদের ক্রিকেট নয়, আমাদের ক্রিকেট তো সব সময়ের জন্য। দেশে ও দেশের বাইরের জন্য। আমরা তো শুধু দেশে নয়, বিদেশেও শক্ত চ্যালেঞ্জ উতরে টেস্ট জিততে চাই।

এবার লড়তে হবে ওয়ানডে। একদম ভিন্নধর্মী ক্রিকেট। এখানে চ্যালেঞ্জও শক্ত। আগামী ৯ ডিসেম্বর প্রথম ওয়ানডে ঢাকার মিরপুরে। বাংলাদেশ কয়েক মাস আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজে ওয়ানডে দারুণ খেলেছে। আমাদের দল কয়েক বছর ধরে ওয়ানডেতে ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলছে। টেস্ট সিরিজের পর দলের খেলোয়াড়রা এখন উজ্জীবিত এবং অনেক বেশি আত্মপ্রত্যয়ী। দেশের মাটিতে সময় ও সুযোগকে কাজে লাগাতে হলে দলগতভাবে ভালো খেলতে হবে। ক্রিকেটের মধ্যেই ডুবে থাকতে হবে ওয়ানডে চলাকালীন দিনগুলোতে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




bangladesherkhela.com 2019
Developed by RKR BD