বিপলুর বাড়িতে উৎসবের আমেজ

বিপলুর বাড়িতে উৎসবের আমেজ

কবিরুল ইসলাম, সিলেট থেকে

কাক ডাকা ভোরেই বিভিন্ন এলাকা থেকে আসতে শুরু করেছেন আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব আর এলাকাবাসী। সবাইকেই আপ্যায়ন করতে হচ্ছে। কেউ ফুল, কেউ বা আবার মিষ্টি নিয়ে আসছেন, লাওস ম্যাচে জয়ের নায়ক বিপলু আহম্মেদের বনকলা এলাকার বাড়িতে। মানুষের এমন ভিড় সামলাতে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে সত্তোরোর্ধ্ব বাবা-মা এবং ভাই-বোনদের। তবে এমন বিড়ম্বনাতে কোন আক্ষেপ নেই তাদের। সবাইকে সানন্দে অভর্থনা জানাচ্ছেন। বসতে দিচ্ছেন বৈঠকখানায়। বাড়ির বিশাল আঙ্গিনাতে করতে হয়েছে আসনের ব্যবস্থা। বাড়িতে যেনো বইছে ঈদের আমেজ। এ আনন্দ উৎসবটা শুরু হয়েছে বাংলাদেশ-লাওস ম্যাচের পর থেকেই। ম্যাচ শেষ হওয়ার পর সিলেট সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আশফাক আহম্মেদ নিজেই মিষ্টি নিয়ে চলে আসেন বিপলুদের বাড়িয়ে। রাতে বিশাল মিছিলও করেছেন এলাকাবাসী। একুশ বছর বয়সী বিপলু এখন সিলেটের নায়ক। এক ম্যাচেই বনে গেছেন ‘মহা তারকা।’

সাত ভাই দুই বোনের মধ্যে সবার ছোট বিপলুর এমন কীর্তিতে আনন্দে মাতোয়ারা বাবা-মা, ভাই-বোনরা। খুশীতে কেঁদেছেনও তারা। তবে এ অশ্রু আনন্দের। এ অশ্রু অনেক বড় সফলতার। যাকে ঘিরে এ উৎসব, সেই বিপলুও কাল ছুটি নিয়ে বাসায় ছুঁটে আসেন দুপুরে। ১টা ৩৫ মিনিটে বাড়িতে প্রবেশ করতেই ছুঁটে আসেন বড় বোন। কপালে এঁকে দেন চুমো। বা-মাকে বুকে জড়িয়ে নেন বিপলু নিজেই। তাদের সালাম করে ম্যান অব দ্যা ম্যাচের পুরস্কারটি তুলে দেন বাবার হাতে। ছেলের খেলা দেখতে পরশু মাঠে যেতে পারেননি বাবা-মা। ঘরে বসেই খেলা দেখেছেন। ৬০ মিনিটে বিপলুর পা থেকে যখন জয় সূচক একমাত্র গোলটি আসে, তখন কিছুতেই বিশ^াস করতে পারছিলেন না বাবা রেহান মিয়া। মা হালিমা বেগম গোলের পরপরই খুশীতে কেঁদে ফেলেছেন। রাতে ছেলের সঙ্গে ভিডিও কলে কথাও বলেছেন। কিন্তু মোবাইলে কথা বলে কি আর মন ভরে। তাইতো বাসায় আসার জন্য অনুরোধ করেছিলেন আদরের ধনকে। মায়ের আবদার রাখতেই বিপলু দুপুরে চলে আসেন বাসায়। ছেলেকে নিজ হাতে খাইয়ে দেয়ার জন্য রান্নাও করে রেখেছিলেন।

সাত ভাইয়ের মধ্যে ছয়জনই ফুটবল খেলে থাকেন। তবে বিপলু ও তার বড় ভাই শিপলু ছাড়া ঢাকার মাঠে আর কারো খেলার অভিজ্ঞতা নেই। কিন্তু জেলা পর্যায়ের শীর্ষ ক্লাবে খেলেছেন সবাই। পুরো সিলেটেই তারা ‘ফুটবল পরিবার’ হিসেবে পরিচিত। ফুটবল পরিবারে জন্ম নেয়া বিপলু মূলত আজকের এ অবস্থানে এসেছেন বড় ভাই বাবলু আহম্মেদের অনুপ্রেরনাতে। তার হাত ধরেই প্রথম ফুটবলে হাতেখড়ি জাতীয় দলের এ এটাকিং মিডফিল্ডারের। ছোট ভাইয়ের এমন সফলতায় দারুন উচ্ছ্বসীত বাবলু, ‘দল বেঁধে সবাই গিয়েছিলাম মাঠে খেলা দেখতে। সে যখন গোল করেছে তখন আমি আনন্দে দিশেহারা হয়ে গিয়েছিলাম। ওকে আমার প্রত্যাশা অনেক। আমি চাই সে দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে ভারতের জনপ্রিয় টুর্নামেন্ট আইএসএলের মত টুর্নামেন্টে সে অংশগ্রহন করুক।’

পিতা মো. রেহান মিয়া ছেলের ছেলের এমন পারফর্মেন্সে বেজায় খুশী, ‘আমি খুবই আনন্দিত। সিলেটের জন্য এবং হযরত শাহজালাল (রা:) এর মান রেখেছে আমার ছেলে। আমার ৭ ছেলের সবাই কমবেশী খেলাধুলা করেছে। কাউকেই আমি খেলার জন্য কখনো মানা করিনি। আজ আমার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে।’ মা হালিমা খাতুন নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে গিয়ে বারবার কেঁদে ফেলছিলেন, ‘টিভিতে যখন দেখলাম আমার বিপলু গোল করেছে, তখন খুশিতে আমার কান্না চলে এসেছিল। সকালেই প্রতিবারের মত আমাকে ফোন করে দোয়া করতে বলেছিল ও (বিপলু)।’

যার পা থেকে আসা একমাত্র গোলে বাংলাদেশ আজ স্বপ্ন দেখছে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপের সেমি ফাইনালে খেলার, সেই বিপরু জানান, ‘হোম গ্রাউন্ডে খেলা ছিল তাই টেনশনটাও ছিল বেশী। তবে বড় ভাই বাবলু সকালে টিম হোটেলে গিয়ে আমাকে প্রেশার না নিয়ে স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে বলেছিলেন। ম্যাচের শুরু থেকেই আমার চেষ্টা ছিল গোল করার। কিন্তু হচ্ছিল না। বাট যখন ঐ সুযোগটা পেয়েছি তখনি বলটা আউট সুইং করেছিলাম। আর সেটাই কাজে এসে যায়।’

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




bangladesherkhela.com 2019
Developed by RKR BD