সহিদুলের হাতে ফস্কে গেলো বাংলাদেশ

সহিদুলের হাতে ফস্কে গেলো বাংলাদেশ

পরাগ আরমান

সহিদুল আলমের হাত থেকে ফসকে যাওয়া বলে গোল হলো, আর তাতেই সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে দর্শক হয়ে গেলো বাংলাদেশ। প্রাণপণ লড়াই করেও গোল শোধ করা যায়নি। ফল হিসেবে দেশ-বিদেশের প্রস্তুতি আর হাই-প্রোফাইল কোচের সব প্রচেষ্টার ইতি ঘটে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে, নেপালের কাছে ২-০ গোলের পরাজয়ে। তবে টানা দুই ম্যাচ জিতে সেমিফাইনালে ওঠার ইতিবাচক মঞ্চও তৈরি করে রেখেছিল বাংলাদেশ। গ্রুপের শেষ ম্যাচে শুধু নেপালের সঙ্গে ড্র করলেই চলতো। কিন্তু গোলকিপার সহিদুল আলমের খেয়ালিপনায়, হাত ফসকে বল জালে প্রবেশ করায়, বাংলাদেশও পড়ে যায় বাদের তালিকায়।/ আসলে যে গোলটি সহিদুলের হাত ফসকে বাংলাদেশের জালে প্রবেশ করলো, ৫৬ হাজার বর্গ মাইলের ‘পাকা ধানে যেন মই’ দিয়ে দিলো। তেমন কোনো স্পিডি শট ছিলো না। কিংবা শিশিরেও ভেজা ছিলো না বলটি যাতে হাত থেকে ফসকে যেতে পারে। একটা প্রায় নিরীহ ফ্রিকিকের শটকে এভাবে নিজেদের জালে প্রবেশ করতে দেবেন গোলকিপার সহিদুল আলম দেখেও সেটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। মনেহয় চোখ তো ভুল কিছু দেখছে না। বরাবরই যে কথাটি বলা হয়ে থাকে, শুধু পারফরমেন্স দিয়েই জেতা যায় না, ম্যাচ জিততে হলে ভাগ্যেরও সহায়তা লাগে। দুই ম্যাচ জয়ের পরও লাল-সবুজের দলের বিদায়ে অনেকে ভাগ্যকে দুষছেন। ভাগ্যের ওপর দোষ চাপালেই কি দায়মুক্তি হয়ে যায়?

সম্প্রতি বাংলাদেশের ফুটবল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় ভারত, মালদ্বীপ, নেপালের চেয়ে দলগতভাবে অনেকটা পিছিয়ে আছে। নিজেদের ভুলে একটা বাজে গোল হজম করলেও তা শোধের ক্ষমতাও আছে ঐসব দেশের খেলোয়াড়দের। তাছাড়া ফুটবলারদের ব্যাক্তিগত দক্ষতায় কিংবা নৈপুন্যে সাফের প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর চেয়ে বেশ পিছিয়ে এদেশের ফুটবলাররা। এবারের সাফ টুর্নামেন্টে যে তিনটি গোল করেছে বাংলাদেশ তার দুটিই এসেছে ডিফেন্ডার তপু বর্মনের কল্যাণে। একটি মাত্র গোল করেন ফরোয়ার্ড মাহবুবুর রহমান সুফিল। সেটিও আবার বিশ্বনাথের লম্বা থ্রোর আশির্বাদে। আর বাংলাদেশী ফুটবলাররা যে অনেক পিছিয়ে তা প্রমানের জন্য তো নেপালের বিপক্ষে ম্যাচটিই যথেষ্ট। ৩৩ মিনিটে সহিদুল আলম সোহেলের হাত ফসকে গোল হওয়ার পরও তা পরিশোধের জন্য বাংলাদেশের হাতে ছিলো ৫৭ মিনিট। ইনজুরি সময়কে হিসেবে রাখলে পুরো একঘন্টা। এই এক ঘন্টায়ও গোল শোধ করতে পারেনি বাংলাদেশ। কারণ এদেশের ফরোয়ার্ডরা পুরোই নখদন্তহীন। অবশ্য খেলা শেষে সংবাদ সম্মেলনে কোচ জেমি ডে তো বলেই দিলেন, ‘বাংলাদেশে মান সম্মত কোনো ফরোয়ার্ড নেই। যারা একটু লড়াই করে দলকে ম্যাচে ফেরাতে পারে। ফরোয়ার্ড তৈরি করতে ফেডারেশন নয়- ক্লাবগুলোকেই এগিয়ে আসতে হবে।’ অবশ্য এখন যারা আছেন তারা নামেই শুধু বাঘ; মাঠে নেমে বিড়ালেরও অধম তারা। তা না হলে, সেমিতে খেলতে হলে যে দলটির একটি ড্র-ই যথেষ্ট, সেই দলটি একঘন্টা সময় পেয়েও কেনো গোল পরিশোধ করতে পারবেনা। সমীকরণ তো সহজই ছিলো, নিজেরাই তো কঠিণ করে ফেললো সেটা। তাতে কান্না আর হতাশার জলে ভাসলো পুরো জাতি। সেই সঙ্গে ধুঁয়ে-মুছে সাফ, সাফের সেমিফাইনাল খেলার স্বপ্ন্ও।

সাফে ভারতীয় দলেই ছিলেন না সুনীল ছেত্রী। না থাকলেও ছেত্রী এখনো তাদের বড় তারকা। সমমানের দলের বিপক্ষে যেকোনো পরিস্থিতিতে ম্যাচের গতিপথ বদলে দেয়ার ক্ষমতা আছে এই ভারতীয় ফরোয়ার্ডের। একই ক্ষমতা রয়েছে মালদ্বীপের আবদুল্লাহ আসাদুল্লাহ কিংবা নেপালের বিমল ঘারতি মাগারের। ভুটান দুঃস্বপ্নের সাফ শেষ করলেও দেশটির চেনচো গায়েলতসেনও ম্যাচ প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখেন। তাদের পাশে বসানোর মতো বাংলাদেশের কাউকেই খুঁজে পাওয়া যাবে কি? প্রশ্নটা একটা ক্যুইজ হয়ে যাবে।

বাংলাদেশের ফুটবলের এই অবনমন কিংবা হতাশাজনক ফলাফলের কারণ কি হতে পারে। এর উত্তরে এক কথায় বলা যায়, অবহেলা। দীর্ঘদিন ধরে ঘরোয়া ফুটবলের প্রতি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের শীর্ষকর্তাদের অবহেলার কারণেই দেশিয় ফুটবলে এই দৈন্যদশা। যেনতেন কওে পেশাদার লিগ শুরু করা আর শেষ করার মধ্যে হয়তো বাফুফের কর্মকর্তারা আত্মতৃপ্তি পেতে পারেন তাতে যে সামনে এগোনো যায়না। কিংবা সম্মানের সঙ্গে থাকা যায়না তা তারা বুঝতে পারেন না এবং চাননা বলেই দেশের ফুটবল গিয়ে ঠেকেছে তলানিতে। বাংলাদেশের ফুটবল পেশাদার যুগে প্রবেশের পর ৯ সংস্করণে একবারই সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন স্থানীয় ফুটবলার। ২০০৯ সালে ঢাকা আবাহনীর হয়ে এনামুল হক সেবার সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। বাকি ৮বারের প্রতিটিতেই ছিলো বিদেশী ফুটবলারদের দাপট। এ দেশের শীর্ষ ক্লাবগুলোর আক্রমণভাগ পুরোপুরি বিদেশীনির্ভর। সে কারণে স্থানীয়রা প্রথম একাদশে খেলার সুযোগ পাননা। আর খেলতেই যদি না পারেন তবে তাদের মধ্যে গোলক্ষুধা তৈরি হবে কি করে। তাতে ভালোমানের ফরোয়ার্ড তৈরি হচ্ছেনা এই দেশে। সেই কারণে ফলবিপর্যয়ে পড়তে হচ্ছে বাংলাদেশকে।

এই সব ব্যাপার জানেন বলেই নেপালের বিপক্ষে ম্যাচের আগে বাংলাদেশের কোচ জেমি ডে জানান, ‘কোনো দলকে বাংলাদেশ ৪/৫ গোল দেবে এমন স্বপ্নও দেখা যায় না। যতদিন স্থানীয় ফুটবলে আমূল পরিবর্তন না আসছে, ততদিন এমন ভাবনা মাথায়ও আনা যাবে না।’ কোচের ইঙ্গিত স্পষ্ট ঘরোয়া ফুটবলের দিকে। এখানে নিয়মিত খেলতে হবে, ধারাবাহিক হতে হবে স্থানীয় ফুটবলারদের। তখনই ভালো কিছুর প্রত্যাশা করা যাবে। কিন্তু সেই লক্ষণ কিংবা সুবাতাস নেই এদেশের ফুটবলে। বরং সবশেষ লিগের চেয়ে এবার আরো এক বিদেশী ফুটবলার বেশি খেলানোর সুযোগ পাচ্ছে ক্লাবগুলো। এর অর্থ স্থানীয়, বিশেষ করে উদীয়মানদের সুযোগ কমছে। হাতেগোনা দুয়েকজন ছাড়া ঢাকার ফুটবলে খেলতে আসা বাকি বিদেশীরা গড়পড়তা মানের। ব্যাক্তিগত দক্ষতা না থাকলেও শারীরিক সক্ষমতার কারণে বিদেশীদের খেলাচ্ছে ক্লাবগুলো।

তবে এভাবে ঘরের মাঠে দলের ব্যর্থতায় কিছুটা নড়েচড়ে বসেছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের গ্রুপ পর্ব থেকে বাংলাদেশের বিদায়ে হতাশ কাজী সালাউদ্দিন। এ ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করছেন তিনি। এই ব্যর্থতার জন্য ভুল দল নির্বাচনকে দায়ী করছেন অনেকে। এইসব আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই নিজের হতাশার কথা জানান বাংলাদেশের প্রথম পেশাদার ফুটবলার কাজী সালাউদ্দিন। তিনি বলেন, ‘সবার মতো আমিও হতাশ। ফুটবলে এমনটা হয়েই থাকে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এটা আমাদের বিপক্ষে হয়েছে।’ এরপর তিনি বলেন, ‘এরই মধ্যে আমি কারণ অনুসন্ধান শুরু করেছি। কোচ-ম্যানেজারসহ সংশ্লিষ্টদের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার আগ পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না।’

অবশ্য সাফ শুরুর আগে শ্রীলংকার বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচেও সহিদুলের ভুলে হেরে যায় বাংলাদেশ। ভুটানের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে এই গোলরক্ষককে একাদশে দেখে অনেকেই অবাক হন। পাকিস্তানের বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচেও তার ওপর আস্থা রাখে দল। দুই ম্যাচ ভালো করলেও তৃতীয় ম্যাচে গিয়ে একই ভুল করেন সহিদুল।

তার ভুলের, খেসারত হিসেবে দলের ভরাডুবি। তিন মাস আবাসিক ক্যাম্পে এই গোলরক্ষকের না থাকা। কাতার ও দক্ষিণ কোরিয়া সফরে দলের সঙ্গে না থাকা। এশিয়ান গেমসে আশরাফুল ইসলাম রানার দুর্দান্ত নৈপুণ্যের পরও তাকে বেঞ্চে বসিয়ে রেখে সহিদুল আলমকে খেলানোয় প্রশ্ন উঠছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




bangladesherkhela.com 2019
Developed by RKR BD