লুকাকু: ফুটবলের চির পুরাতন গল্প

লুকাকু: ফুটবলের চির পুরাতন গল্প

বিশ্বকাপের প্রথম দুই ম্যাচে চার গোল। বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে হ্যারি কেন ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর সঙ্গে সমানে পাল্লা দিচ্ছেন তিনি। এডেন হ্যাজার্ড, কেভিন ডি ব্রুইনের পাশাপাশি তাঁকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে বেলজিয়ামের ‘সোনালি প্রজন্মের’ আশার স্বপ্ন।
কিন্তু, রোমেলু লুকাকুর এই উত্থান মোটেই স্বপ্নের সরণী বেয়ে নয়। ছেলেবেলায় মারাত্মক আর্থিক অনটনই ছিল তাঁর সঙ্গী।

বিশ্বকাপের আগে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লুকাকুর স্মৃতিচারণা, ‘প্রতিদিনই লাঞ্চের মেন্যুতে থাকত শুধু রুটি আর দুধ। তবে সেই দুধ খাঁটি নয়। জল মেশানো। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে মায়ের কাছে খেতে চেয়েছিলাম। সামান্য দেরি হচ্ছে দেখে রান্নাঘরে ঢুকে দেখি, দুধের গ্লাসে জল মেশাচ্ছেন মা। আমি ঢুকতেই কেঁদে ফেললেন। তারপর আমায় বুকে জড়িয়ে ধরে বেড়ে গেল কান্নার তীব্রতা। মায়ের সেই ছবি এখনও স্পষ্ট মনে আছে। বাড়িতে ছিল না কারেন্টও। কারণ, সেই সময় বেলজিয়ামে বিদ্যুতের দাম ছিল প্রচণ্ড। তাই বিল কমানোর জন্য রাতের বেলায় অন্ধকারে থাকারই অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। তারই মধ্যে আমরা দুই ভাই মিলে মাকে সান্ত্বনা দিতাম, এই অভাবের দিন তাড়াতাড়ি কাটবে।’

প্রথম দু’টি ম্যাচে চার গোল করে অনেকের কাছেই নায়কের মর্যাদা পেয়ে গেছেন রোমেলু লুকাকু। কিন্তু, বেলজিয়াম সমর্থকদের একাংশ এখনও তাঁকে দেখে অন্য চোখে। এলিট ক্লাসের ফুটবলার হিসেবে মানতে চান না। কারণ একটাই। ইউরোপের এই দেশে গরীব হয়ে জন্মালে অবহেলা নিত্যসঙ্গী। সমাজের তথাকথিত ধনীরা দরিদ্রকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। দেখে অবহেলার চোখে। তাই বেলজিয়ামের হয়ে গোলের পর গোল করলেও কেভিন ডি ব্রুইন-এডেন হ্যাজার্ডদের মতো ভালোবাসা এখনও লুকাকুর অধরা। বর্তমানে ফুটবল খেলে যথেষ্ট রোজগার করলেও ধূসর অতীতের মধ্যে দিয়েই তাঁকে চেনেন অনেকে। সুযোগ পেলেই ভরিয়ে দেন সমালোচনায়।

প্রচণ্ড আর্থিক অনটনের মধ্যে বড় হলেও ফুটবলের প্রতি প্রেমই বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে লুকাকুর। প্রতিটি ম্যাচেই গোল করতে চাইতেন তিনি। ভাবতেন, এই চামড়ার বলই তাঁর হাতে তুলে দেবে সাফল্যের পেয়ালা। গত শনিবার তিউনিশিয়ার বিরুদ্ধে মাঠে নামার ২৪ ঘণ্টা আগে আক্ষেপের সুরে লুকাকুকে বলতে শোনা যায়, ‘বেলজিয়ামের অনেকেই চান আমি বিশ্বকাপে ব্যর্থ হই। এ এক নিদারুণ যন্ত্রণা… যা আমাকে আরও গোল করতে প্রতি মুহূর্তে উৎসাহিত করে।’

রোমেলু লুকাকুর বাবা-মা, দু’জনেই কঙ্গোর অভিবাসী। আর্থিক অনটনকে জয় করার লক্ষ্যেই তাঁরা বেলজিয়ামে আসেন। বাবা রজার লুকাকু পেশাদার ফুটবলার হলেও সৌভাগ্যের খোঁজে দেশ ছাড়ায় সেই স্বপ্নের অকালমৃত্যু ঘটে। তাই তিনি চাইতেন, দুই ছেলেই যেন নামী খেলোয়াড় হতে পারেন। তবে চাইলেই তো আর সবকিছু পাওয়া যায় না! রোমেলু ছোটবেলা থেকেই প্রচণ্ড জোরে বলে শট নিতে পারেন। সেই সময় অবশ্য কোনও ট্রেনিং সেন্টারে ছেলেকে ভরতি করানোর মতো সামর্থ ছিল না রজারের। ১৬ বছর বয়সে এক বন্ধুর সহযোগিতায় রোমেলু যোগ দেন অ্যান্ডারলেখটে। তারপর চেলসি, এভারটন ঘুরে তিনি এখন হোসে মরিনহোর ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডে।

তবে ক্লাব ফুটবল নয়, এই মুহূর্তে লুকাকুর মনে একটাই স্বপ্ন। বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হওয়া। পানামা ও তিউনিশিয়ার বিরুদ্ধে দু’টি করে গোল পেয়ে আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বেড়েছে। মনের কোণে রয়েছে স্বপ্ন, দেশকে বিশ্বকাপ জেতাতে পারলে হয়তো ধূসর অতীত ভুলে গিয়ে তাঁকে প্রাপ্য সম্মানটুকু দেবেন বেলজিয়ামবাসীরা।

" class="prev-article">Previous article

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




bangladesherkhela.com 2019
Developed by RKR BD