হংকং এস আই হতে পারে উদাহরণ

হংকং এস আই হতে পারে উদাহরণ

কবিরুল ইসলাম, হংকং থেকে

ইন্সপায়ার, ট্রেইন এন্ড এক্সেল- এই তিনটি শব্দই হচ্ছে হংকং স্পোর্টস ইন্সটিটিউটের (এইচ কে এস আই) মূল মন্ত্র। আমাদের যেমন জাতীয় ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি), ওদের তেমনি এইচ কে এস আই। বিশ্বমানের অ্যাথলেট তৈরির এ কারখানায় যে সকল আধুনিক সুযোগ সুবিধা আছে তা আমরা কল্পনাও করতে পারিনা। একটি দেশের স্পোর্টসের উন্নতি নিয়ে কি পরিমাণ ভাবনা থাকলে সে দেশের সরকার এতো সুযোগ-সুবিধা দিতে পারে অ্যাথলেটদের, সেটা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিণ। বছরে বাজেটের কি পরিমান টাকা খরচ করা হয় এখানে তার কোনো নির্ধারিত পরিমান নেই। যখন যেখানে যা দরকার, তাই খরচ করা হচ্ছে। এইচ কে এস আই"র মূল লক্ষ্যই হচ্ছে বিশ্বসেরা অ্যাথলেট তৈরি করা। এই প্রতিষ্ঠানটি হতে পারে আমাদের জন্য বড় উদাহরণ।

১৯৮০ সালে যাত্রা শুরু এই সংস্থাটির। প্রতিষ্ঠার মাত্র ১৬ বছরের মধ্যেই ১৯৯৬ আটলান্টা অলিম্পিকের উইন্ড সার্ফিং ইভেন্ট থেকে স্বর্ণ জয় করেন লি লাই সান। অলিম্পিকের মতো বিশ্বের সর্ব বৃহৎ ক্রীড়া আসর থেকে পদক ছিনিয়ে এনে বিশ্বমঞ্চে দেশের পতাকাকে উজ্জ্বল করেন হংকংয়ের অ্যাথলেটরা। প্রায় ৮ হাজার শতাংশের উপর নির্মিত এ স্পোর্টস কমপ্লেক্সের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা দেখলে মাথা ঘুরে যাবার উপক্রম। কি নেই এখানে- এমন প্রশ্নের উত্তর খুজলে পাওয়া মুশকিল। একজন অ্যাথলেটের জন্য ট্রেনিং থেকে শুরু করে ডোপ টেস্ট পর্যন্ত পরীক্ষা করার ব্যবস্থা আছে। পরিকল্পনার ছোঁয়া ও আধুনিকতার মিশ্রণে গড়া এ কমপ্লেক্সের প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশের সময়ই ধাক্কা খেতে হবে যে কাউকে। কতোটা উন্নত মননশীলতা থাকলে এতোটা সুন্দর ও পরিপাটিভাবে সাজানো যায় একটা কমপ্লেক্স। প্রতিটি জায়গার সদব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিটি রাস্তার দু'পাশে অ্যাথলেটদের হাটার জন্য আলাদা করে টার্ফ বসানো হয়েছে। যেন মাঠের বাইরেও তারা টার্ফ এ হাটার প্র‍্যাকটিস চালিয়ে যেতে পারে। ৫২ মিটারের সুইমিং পুলে রয়েছে আরো আধুনিকতার ছোঁয়া। ২৫ মিটারের পুলের প্রয়োজন হলে অন্য কোথাও যেতে হয় না। এই পুলের একটি অংশে রয়েছে অতিরিক্ত একটি ডাইভ পয়েন্ট। সেটি একটি ইলেক্ট্রিক সুইচের মাধ্যমে পুলের মাঝে এনে বসিয়ে ২৫ মিটার বানিয়ে ফেলা হয় ৫২ মিটারের পুলটাকে। টেবিল টেনিস, উশু ও সাইক্লিংয়ে অনেক এগিয়েছে দেশটি। অলিম্পিকে এরই মধ্যে গোল্ড মেডেল জয় করেছে তারা।

উশু প্লেয়ারদের জন্য আছে ৫টি কোর্ট। যেখানে সকাল-বিকাল দু'বেলাই উশু প্লেয়ারদের ট্রেনিং করান। মূল ভবনের পাশেই নির্মিত রাগবি মাঠের চারদিকেই গড়ে উঠেছে অ্যাথলেটিক্স টার্ফ ও হ্যামার থ্রো কোর্ট। রোয়ারদের ট্রেনিং করতে দূরে যেতে হয় না। ইন্সটিটিউটকে ঘিরে চারদিকে তৈরি করা হয়েছে কৃত্রিম লেক। যে লেকে অনুশীলন করেন তারা। ১৪১ টি রোইং বোরট আছে এই ইন্সটিটিউটে। পাশের লেকেই অনুশীলন করে থাকেন রোয়াররা। তারা শুধু ভর্তি হন এখানে। বাকী সব কিছুই সরকারি এ সংস্থা থেকে প্রদান করা হয়ে থাকে। টেনিস প্লেয়ারদের জন্য আছে ৬টি হার্ড কোর্ট এর পাশাপাশি আছে দু'টি উন্নতমানের ক্লে কোর্ট। হংকংয়ের টেনিস ফেডারেশনের ক্লে কোর্ট না থাকলেও এই ইন্সটিটিউটেই আছে। প্রকৃতির নিবিড় ছোঁয়ার ১৯ টি ডিসিপ্লিনের অ্যাথলেটদের ট্রেনিং করানো হয় এখানে। তবে তৃণমূল থেকে তুলে এনে নয়, বরং জাতীয় পর্যায়ে ভালো করা বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের অ্যাথলেটরা ভর্তির সুযোগ পেয়ে থাকেন। হংকং স্পোর্টস ইন্সটিটিউট এর কমিউনিকেশন ও রিলেশন ডিপার্টমেন্ট এর সহকারি অফিসার ম্যাং বলেন, '১৯৮০ সালে শুরুর পর থেকে আমাদের লক্ষ্যই ছিল ভালোমানের অ্যাথলেট তৈরি করা। সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় জকি ক্লাব আমাদের বিশাল পরিমান অর্থ সহযোগিতা করে থাকে। এখানে অ্যাথলেটদের ট্রেইনিংয়ের পাশাপাশি স্পোর্টস মেডিসিনের উপর ধারণা দেয়া হয়। ড্রাগের উপরও ক্লাস করানো হয়। আর মাঝে মধ্যেই অ্যাথলেটদের ব্লাড টেস্ট করানো করানো হয়। যেন তারা ডোপ কিংবা মাদক গ্রহণ থেকে দূরে থাকে।' অত্যাধুনিক ফিটনেস মেশিন দিয়ে সাজানো হয়েছে বিশালাকারের ফিটনেস ট্রেনিং সেন্টার। যেখানে ১০০জন এথলেট একসাথে ব্যায়াম করতে পারেন বলে জানান ম্যাং, 'এটা খুবই উন্নতমানের একটা জিম হাউজ। কারণ খেলোয়াড়দের ফিটনেসটা খুবই জরুরী। তাই আমরা ব্যায়ামের পাশাপাশি নিজস্ব কিচেনের বাবুর্চিরা নিউট্রিশাসদের পরামর্শ অনুযায়ী রান্না করে থাকেন। যেন খাবার-দাবারে পরিমান মতো সব ধরনের ভিটামিনের উপস্থিত থাকে।'

১২০০ এথলেটের ট্রেনিং সুবিধার এই ইন্সটিটিউটে আছেন ৩০০জন স্টাফ। ১৮৫ রুমে খেলোয়াড়দের আবাসন ব্যবস্থা। অনুশীলনের ব্যবস্থা থাকলেও পড়াশোনার কোনো ব্যবস্থা নেই এখানে। এখানকার অ্যাথলেটদের প্রশিক্ষনের জন্য মাঝেমধ্যেই বাইরে থেকে কোচ নিয়ে আসা হয়। আমাদের দেশের বিকেএসপির দেয়াল টপকে রাতের আধারে খেলোয়াড় পালানোর অহরহ ঘটনা থাকলেও এখান থেকে কোনো অ্যাথলেট পালিয়ে বাইরে গেছে, এমন কোনো নজির নেই। নিয়মানুবর্তিতা আর অধ্যাবসায় কাকে বলে, সেটা এই ইন্সটিটিউট না ঘুরলে বুঝা দায়। উন্নত প্রশিক্ষন ব্যবস্থা আর শৃঙ্খল জীবনই যে পারে একজন খেলোয়াড়কে উন্নতির চরম শিখরে পৌছে দিতে, তার উৎকৃষ্ট উদাহরন হংকং স্পোর্টস ইন্সটিটিউট।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




bangladesherkhela.com 2019
Developed by RKR BD