বাংলাদেশ হকি: সাফল্যের পথটা বন্ধুর

বাংলাদেশ হকি: সাফল্যের পথটা বন্ধুর

এস এম আশরাফ

‘জিততে চাও, তো পেনাল্টি কর্নার কাজে লাগাও’। হকির কোচিং দর্শনে কোচদের এই পরামর্শকে ধরা হয় মুল নীতি। অস্ট্রেলিয়া, আর্জেন্টিনা কিংবা নেদারল্যান্ডসের মতো উপরের র‌্যাঙ্কধারী দলগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে, তাদের পেনাল্টি কর্নারকে গোলে পরিনত করার সাফল্য শতকরা ৬০ ভাগ। সোজা হিসেব ১০ টি পিসি পেলে তার ৬ টি থেকেই তারা গোল আদায় করে নেন। এবার তুলনায় আসা যাক বাংলাদেশ নিয়ে। মাস্কাটে, মার্চে শেষ হওয়া এশিয়ান গেমস হকির বাছাইপর্বের ফাইনালে স্বাগতিক ওমানের বিপক্ষে বাংলাদেশ পেয়েছে ৯ টি পিসি। অথচ তার একটিকেও গোলের নিশানায় পাঠাতে পারেনি তারা। গ্রুপ পর্ব থেকে ফাইনাল এই পাঁচ ম্যাচে মাহবুব হারুনের দল পিসি পেয়েছে ৪০ টি। আর তা থেকে গোল সর্বসাকুল্যে ১৩ টি।

টুর্নামেন্ট শেষে কোচ, খেলোয়াড়রা তাই নির্দ্বিধায় স্বীকার করে নেন ব্যর্থতার কারন পেনাল্টি কর্নারই। যদি এই একটি বিষয়কে আমলে নেয়া হয়, তাহলেতো আর কোন কথাই থাকলোনা। কেউ ভাবতেই পারে, এবার এটা নিয়ে কাজ করলেই আগষ্টে এশিয়ান গেমসের মুল পর্ব থেকে সাফল্য নিয়ে আসা যাবে।

তবে সাফল্যের চাবি পাওয়া কি এত সহজ? ঐ টুর্নামেন্ট বিশ্লেষন করলে আরো কিছু সমস্যা নিয়ে কাজ করতে হবে। যেমন খেলোয়াড়দের ম্যাচ টেম্পারমেন্ট নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। শুরুর কয়েক মিনিটে গোল না পেলেই তারা অস্থির হয়ে পড়েন। সবকিছুতেই অতিরিক্ত তাড়াহুড়ো। এ সময় যেনো কোচের দেয়া সব পরামর্শই গুলিয়ে ফেলেন। ওমানে ফাইনাল ম্যাচ শেষে কোচ মাহবুব হারুন তার শিষ্যদের প্রশ্ন করেছিলেন, কি ব্যাপার যা বললাম তার কিছুইতো করলেনা। ঐ সময় খেলোয়াড়দেও উত্তর ছিলো, ‘তারা সব ভুলে গেছেন। এই লেভেলের খেলায় এমন অযুহাত কি মানায়’? যে কারনে অনেকের উপরই বিরক্তি ঝড়েছে তার কন্ঠে।

প্রকাশ্যে না বললেও, অধিনায়ক রাসেল মাহমুদ জিমি মন ভরাতে পারেননি তার। যার স্টিক সামর্থ্য রাখে ম্যাচ ঘুড়িয়ে দেবার, তিনিই যেনো কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলেন, বল পজেশন সেন্স, আর কখনও কখনও সতীর্থদের সাথে বোঝাপড়ার অভাবটা ছিলো দৃষ্টিকটু। অন্যদিকে, পেনাল্টি কর্নার স্পেশালিষ্ট মামুনুর রহমান চয়নের স্টিকও জ¦লে উঠতে পারেনি প্রয়োজনের মুহুর্তে।

তবে ওমান সফরের পুরোটাই হতাশার নয়, ছিলো আশারা আলোও। তরুন স্ট্রাইকার মিলন হোসেন অনেকের চোখেই ছিলেন দলের সেরা পারফরমার। এই টুর্নামেন্ট দিয়েই অভিষিক্ত দ্বীন ইসলাম ইমন তার উপর আস্থা রাখতে ভরসা যুগিয়েছেন। ব্যক্তিগতের পাশাপাশি দলীয় পারফরম্যান্স বিশ্লেষন করলে, সব দলের চেয়েই এগিয়ে রাখতে হবে বাংলাদেশকে। পঞ্চম স্থান নির্ধারনী ম্যাচে যদিও গোল দেয়ার সংখ্যায় এগিয়ে যায় হংকং। তবে সেরা চার দলের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সবার উপরে। প্রতিপক্ষের জালে তারা বল পাঠিয়েছে ৩৮ বার। যেখানে চ্যাম্পিয়ন ওমানের গোল সংখ্যা ২২ টি।

জিপিআরএস সিস্টেম থাকলে নিশ্চিতভাবেই দেখা যেতো পুরো ম্যাচে খেলোয়াড়দের রানিংয়ের দুরত্বে সব দলের চেয়েই এগিয়ে বাংলাদেশ। ওমানের একজন সাবেক খেলোয়াড় বলছিলেন তোমাদের মাঝমাঠের প্লেয়াররা কমপক্ষে ৭ কি: মি: দৌড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় দলগুলোর খেলোয়াড়রা যেখানে গড়ে ৮ কি: মি: দৌড়ান।

তাই জিমি, চয়ন আশরাফুলদের কমিটমেন্ট নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই। টেকনিক আর ম্যাচ টেম্পারমেন্টের বিষয়টা মাথায় নিয়ে এগুলেও হয়তো অনেকদুর যাওয়া সম্ভব।

সে লক্ষ্যে অবশ্য হাত বাড়াতে হবে হকি ফেডারেশনকেও। এই আধুনিক যুগেও ঢাল তলোয়াড় ছাড়া এক নিধিরাম সর্দার দিয়ে দল চালানোর তত্ত্বে এগুচ্ছে ফেডারেশন। নেই একজন ফিজিও, নেই ভিডিও এনালিস্ট, এমনকি ট্রেইনারও। আছে আধুনিক জিমের অভাবও। অথচ বিশ্বকাপ খেলার স্বপেই কিনা বিভোর হকি ফেডারেশন। কোচিংয়ে টেকনিক্যাল সাপোর্ট ছাড়া কখনই কি একটা দলের পক্ষে দুর পথ পাড়ি দেয়া সম্ভব?

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




bangladesherkhela.com 2019
Developed by RKR BD