ক্রিকেট আমার কাছে ধর্মের মতো: মুশফিকুর রহিম

ক্রিকেট আমার কাছে ধর্মের মতো: মুশফিকুর রহিম

: ত‌ওসিয়া ইসলাম :

মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার নেতৃত্বে বাংলাদেশের ক্রিকেট বদলে গেছে। আর গেলো তিন বছরে বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলছে ক্রিকেটের সব ফরম্যাটেই। ঘরের মাটিতে ইংল্যান্ড কিংবা শ্রীলংকায় গিয়ে তাদের টেস্টে হারানোতে মুশফিকুর রহিমকেও কৃতিত্ব দিতে হবে। ক্রিকেট বোর্ডের নিয়মের কড়াকড়িতে সব সময় খেলোয়াড়দের সাথে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলার সুযোগ পাওয়া যায় না। টেস্ট অধিনায়ক নিজেই কিছুটা সাহায্য করলেন একান্ত এই আলাপচারিতার বিষয়ে। তারই চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো।
২০০৫ সালে ইংল্যান্ড সফরে হঠাৎই দলে জায়গা পেয়ে যান। ২০ জনের প্রাথমিক দলে না থেকেও হঠাৎ করেই দুই টেস্ট আর ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ছয় ওয়ানডের দলে খালেদ মাসুদের সাথে বিকল্প উইকেটকিপার হিসেবেই মূল স্কোয়াডে মুশফিকুর রহিম। সে সময় জোর আলোচনা ছিলো, রাজনৈতিক কারণে তাকে দলে নেয়া হয়েছে। কিছুটা নড়বড়ে সুচনার পর অল্প দিনেই মুশফিকুর রহিম হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশ দলের অপরিহার্য অংশ। জায়ান্টদের বিপক্ষে বাংলাদেশ মাঠে নামার সুযোগ কম পাওয়াতেই টেস্ট অভিষেকের এক যুগ পার করেও ম্যাচ খেলেছেন মাত্র ৫৪টি। তার মতে, কেবল মুশফিক নিজে নন, দলের আরো কয়েকজন খেলোয়াড় আছেন, যারা ডিজার্ভ করেন আরো বেশি টেস্ট খেলার। কারণ সমসাময়িকদের মধ্যে অ্যালিস্টার কুক, অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুসরা শততম টেস্টও খেলে ফেলেছেন। অবশ্য এ পর্যন্ত খেলা ৫৪ টেস্টেই নিজের জাতটা ঠিকই চেনাতে পেরেছেন বগুড়ার এই সন্তান। ব্যাটিং গড় ৩৫-র বেশি। তবে গেলো কয়েক বছরে বাংলাদেশের পারফরমেন্স আর র‌্যাংকিংয়ের উন্নতিতে এখন বড় বড় টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোও আগ্রহী বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলতে। তাতেই ‘মিস্টার ডিপেন্ডেবল’ আশা করেন হয়তো বারো বছরে যে কয়টি টেস্ট খেলেছেন, আগামী কয়েক বছর খেললেই ক্যারিয়ার শেষে সংখ্যাটা দ্বিগুণ হবে। আর সে কারণেই ব্যক্তিগত লক্ষ্যটাও ডানা মেলে। অবসরের আগে নিজের ব্যাটিং গড় দেখতে চান কম করে হলেও ৪৫-র বেশি। সাথে নিজের নামের পাশে আরো কয়েকটি সেঞ্চুরিও চাই তার।

ব্যক্তিগত লক্ষ্য আর স্বপ্ন নিয়ে কথা বলতে গিয়েই জানালেন, ক্যারিয়ারে অন্তত একটি ডাবল বা ট্রিপল সেঞ্চুরির স্বপ্ন ছিলো। কিন্তু কখনওই ভাবেন নি, তিনিই হবেন বাংলাদেশের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরিয়ান। বিশেষ করে গল টেস্টের ওই সময়টায় তার চেয়েও আগ্রাসী ব্যাট করতে থাকা আশরাফুলই প্রথম ওই মাইলফলকে পৌঁছানোর দাবিদার ছিলেন বলে মনে করেন তিনি। নিজের নামের পাশে এমন কৃতিত্বেও অহংবোধ নেই তার। ডাবল সেঞ্চুরির পর নাকি তার মনে হয়েছে, তিনি কেবল একটা কাজের সুচনা করেছেন। এরপর বাংলাদেশের আরো অনেক ব্যাটসম্যান করবেন ডাবল সেঞ্চুরি। তার বিশ্বাসটা এরই মধ্যে সত্যি হয়েছে। তামিম আর সাকিব ঠিকই বাংলাদেশকে এনে দিয়েছেন এই সম্মান। মুশফিকও এখন আশা করেন আবারো সে কীর্তি গড়ার।
অধিনায়কত্ব এমন একটি বিষয়, যে মুদ্রার দুই পিঠই দেখেছেন মুশফিক। ব্যাটিং আর উইকেট কিপিং করে অধিনায়কত্বের চাপ নিতে পারছেন নাÑÑ এমন অভিযোগেই ২০১৪ সালের শেষ দিকে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে মুশফিকুর রহিমের কাছ থেকে অধিনায়কের দায়িত্ব সরিয়ে নেয় বিসিবি। এরপর মাশরাফী বিন মোত্তর্জার শ্রেষ্ঠত্বের ছায়ায় ঢাকা পড়ে মুশফিকের অধিনায়ক দর্শন। কিন্তু তারও আছে, পৃথক এক দর্শণ। গেলো তিন বছরে তারই অধিনায়কত্বে উন্নতি হয়েছে টেস্টে বাংলাদেশের পারফমেন্স। অধিনায়ক হওয়াকে সম্মানের বলে মনে করলেও তার মতে, “একাদশে থাকাটাই বড় কথা। পারফরমেন্স ভালো থাকলে একদিকে যেমন একাদশে জায়াগা পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে, তেমনি আস্থা রেখে বোর্ড অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে সম্মান জানায়। তবে কোনো খেলোয়াড়ই সবসময় অধিনায়ক থাকতে পারে না। এটা একটা সময়ের ব্যাপার।”

মুশফিকুর রহিম: ব্যস্ত আলাপচারিতায়

তবে যতদিন অধিনায়ক হিসেবে আছেন, নিজের দায়িত্বটা ভালোই জানা ৩০ বছর বয়সী এই ডানহাতি ব্যাটসম্যানের। তার চোখে, একজন অধিনায়কের সবচেয়ে বড় দায়িত্বই হচ্ছে সতীর্থদের পাশে থাকা। বিশেষ করে বলেন, সামর্থ্যবান ফর্মহীন খেলোয়াড়দের পাশে থাকার কথা। মুশফিক মনে করেন, ফর্ম ভালো থাকলে তাকে আলাদা করে সমর্থন করার প্রয়াজন পড়ে না। কিন্তু যার সামর্থ্য আছে কিন্তু সময়টা খারাপ যাচ্ছে, তাকে সাহস আর সমর্থন দিয়ে তার সেরাটা বের করে আনাতেই অধিনায়কের স্বার্থকতা। উদাহরণ হিসেবে বললেন, প্রায় দু’বছর ফর্মে না থাকার পরও, একরকম উল্টো স্রোতে হেঁটেও তামিমকে একাদশে খেলিয়ে গেছেন তিনি; যার ফল এখন পাচ্ছে বাংলাদেশ দল। মাহমুদুল¬াহ রিয়াদকে দীর্ঘদিন একাদশে খেলানো নিয়ে তাকে ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছ থেকে শুনতে হয়েছে ব্যক্তিগত সম্পর্কের খোটা। তবে তিনি বলছেন, একজন তামিম বা একজন রিয়াদ ২০-৩০ বছরেও তৈরি হয় না। আর ব্যক্তিগত কারণে ক্রিকেটকে ক্ষতিগ্রস্থ করার তো প্রশ্নই আসে না। চমকে দিয়ে বললেন, ক্রিকেটটা তার কাছে ধর্মের মত। বিশ্বাস করেন, মানুষের কাছে যদি পার পেয়েও যান, মৃত্যুর পর তো সৃষ্টিকর্তার কাছে জবাবদিহি করতেই হবে। তাই এখানে তিনি শতভাগ সৎ। ক্রিকেটের সাথে কখনও প্রতারণা করেন নি; করবেনও না।
মুশফিকের চোখে, গেলো কয়েক বছরে বদলে যাওয়া বাংলাদেশের সাফল্যের মূলে দলের মধ্যে বর্তমানে বিরাজ করা দৃঢ় বন্ধন। কেবল অধিনায়ক, কোচ বা ম্যানেজমেন্ট নয়, কোন খেলোয়াড়ের খারাপ সময় গেলে যেমন ড্রেসিং রুমের সব খেলোয়াড় তার পাশে থাকে। তেমনি, একজনের ভালো পারফরমেন্সে সতীর্থরা উল্লাসে মাতে বেশি। তাই তো বিশ্বকাপে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে মাহমুদুল্লাহ’র সেঞ্চুরি হোক, কিংবা তৃতীয় বাংলাদেশি হিসেবে সাকিব আল হাসানের ডাবল সেঞ্চুরি; উদযাপনটা আগে করেন অন্যপ্রান্তে থাকা মুশফিকুর রহিম। আর আগামী কয়েক বছরে এই বন্ধনের কারণেই বাংলাদেশ র‌্যাংকিংয়ে আরও ওপরে উঠে যাবে বলে বিশ্বাস মুশফিকের।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




bangladesherkhela.com 2019
Developed by RKR BD