এদেশের নারী ক্রিকেট একটা জায়গায় থেমে আছে

এদেশের নারী ক্রিকেট একটা জায়গায় থেমে আছে

গত সেপ্টেম্বরে জাতীয় দলের সবশেষ ওয়ানডে ম্যাচে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেছিলেন তিনি। তাতে ১-০ ব্যবধানে জেতা সিরিজের সেরা খেলোয়াড়ও হয়েছিলেন তিনিই। রক্ষণশীল পরিবার থেকে উঠে আসা সেই রুমানা আহমেদই এখন বাংলাদেশ জাতীয় নারী দলের অধিনায়ক। ব্যাটে ও বলে, নিয়মিত পারফর্মার। বাংলাদেশ ক্রিকেট নিয়ে আশা-ভালোবাসা ও প্রত্যাশার কথা জানাচ্ছেন রুমানা আহমেদ।

প্রশ্ন : বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটে ইতিহাসে প্রথম হ্যাটট্রিক আপনার। আয়ারল্যান্ডে। ২০১৬ সালে। এটা তো অমরত্ব পেয়ে যাওয়া। সেদিনকার অনুভূতি কেমন ছিলাে?
রুমানা : তখন এবং এখন দুই ক্ষেত্রেই আমার অনুভূতি একইরকম। এটা আমার অন্যরকম রেকর্ড। নিজেই অবাক হয়ে যাই যে আমি হ্যাটট্রিক করেছি। সবচেয়ে বড় কথা ওদের দেশে ওদের আম্পায়ার আমাকে পর পর তিনটা এলবিডব্লিউ দিয়েছে। এটা আসলে ভাবতেই পারিনি। অবাক করেছে আমাকে।
প্রশ্ন : ১০৬ রান করেও ঐ ম্যাচ ১০ রানে জিতেছিলেন। এমন টাফ ম্যাচ কি আর খেলেছেন?
রুমানা : হ্যাঁ, আরও বেশ কিছু ম্যাচেই আমরা কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছি। দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়েছি। ভারতের বিপক্ষে একটা ম্যাচে খুব কাছে গিয়ে অল্পের জন্য হেরেছিলাম।
প্রশ্ন : আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে আপনার হ্যাটট্রিকের ম্যাচে স্পিনাররা নিয়েছিলেন ৮ উইকেট। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি স্পিন, পিছিয়ে পেসাররা। এটা কি আমাদের দেশের নারীদের শারীরিক সামর্থ্যের কারণে ঘটছে?
রুমানা : আসলে পেস বা স্পিন ব্যাপার না, ব্যপারটা হচ্ছে যত্ন নেওয়ার। যাদের যত্ন নেবেন তারাই ভালো করবে। আমাদের পেসাররা দুর্বল এটা ঠিক না। বলতে পারেন আমাদের পেসার সংখ্যার স্বল্পতা। এটাই কারণ। আমাদের জাহানারা আর পান্না ছাড়া তেমন ভালো কোন পেসার নেই। ওরা নিয়মিত বল করে যাচ্ছে। ওয়ানডেতে ওরা ২০ ওভার করে আবার টি-টয়েন্টি ৮ ওভার করছে। পেসার বের করার জন্য একটা পেসার হান্ট হয়েছে, এরপর তেমন যত্ন নেওয়া হয়নি। এবার কিছু টুর্নামেন্টে আমাদের পেসাররা ভালো করেছে। তাদের যদি যত্ন নেওয়া যায় দেখা যাবে স্পিনারদের চেয়ে পেসাররাই ভালো করবে।
প্রশ্ন : হঠাৎ করে অধিনায়ক হয়েছিলেন। তার কিছুদিন আগেই অধিনায়ক ছিলেন জাহানারা। এভাবে আচমকা নেতৃত্ব পাওয়াটা কি আশা করেছিলেন?
রুমানা : আসলে এটা খুব অবাক করা একটা ব্যপার ছিল। এটা শোনার পর থেকেই আমার গা হাত পা কাঁপছিল। আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না যে হঠাৎ এমন একটা পরিবর্তন আসবে। জাহানারার অধিনায়কত্ব তখন এক বছরও যায়নি। তাও দুই সংস্করণেই পরিবর্তন। আশা ছিল পেতে পারি তবে এভাবে হঠাৎ পাবো আশা করতে পারিনি।
প্রশ্ন : দক্ষিণ আফ্রিকাকে শেষ সিরিজে একটি ম্যাচে কক্সবাজারে হারিয়েছিলেন। কিন্তু ওদের সাথে আমাদের পার্থক্য আসলে কতোটা?
রুমানা : পার্থক্যতো আমরা ওদের দিকে তাকালেই দেখতে পারি। এবারের বিশাকাপে ওরা কিন্তু খুব ভালো করছে। ওরা খুব ইতিবাচক ক্রিকেট খেলে। অনেক নিশ্চিন্তে খেলে। আমরা বছরে চার পাঁচটা ম্যাচ বা যাই খেলি তা দেখা যায় বিশেষ কোন টুর্নামেন্ট। ধরেন বিশ্বকাপ বা বাছাই পর্ব কিংবা এশিয়া কাপ। আমাদের প্রস্তুতিটা কম থাকে। নিজেদের তৈরি করতেও ঠিকমতো পারি না। এদিক থেকে ওরা অনেক এগিয়ে।
প্রশ্ন : জাহানারা বলেছেন, চলমান ২০১৭ বিশ্বকাপেই আমাদের খেলার যোগ্যতা ছিল। আপনি কি তা বিশ্বাস করেন? আর বিশ্বাস করলে কেন হলো না?
রুমানা : তাতো অবশ্যই। আমাদের দলের প্রশংসা অন্য সব দলই করে। অনেক দলের ম্যানেজাররা এসে বলে তোমাদের বোলিং লাইন আপ অনেক ভালো।
প্রশ্ন : আগামী বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে খেলতে হলে কোন কোন ক্ষেত্রে উন্নতি করতে হবে?
রুমানা : আপনারা যাচাই করলেই দেখবেন আমরা খেলা পাই কয়টা। আন্তর্জাতিক ম্যাচ না পেলেও আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেট দিকে এগিয়ে থাকতে হবে। একদিক না পেলে আরেক দিক থাকতে হবে। যদি দুইটাই বন্ধ থাকে তাহলে উন্নতি হবে কি দিয়ে।
প্রশ্ন : বিশ্বকাপ বাছাইয়ে আমাদের দুর্বলতা ব্যাটিংকে সবল বলা হয়েছিল। কিন্তু তা হয়নি। বোলিংই টেনে নিয়ে গেছে। ব্যাটিংয়ে এই নিয়মিত ব্যর্থতার কারণ কি?
রুমানা : আসলে ব্যাটাররা ব্যর্থ এটা আমি বলবো না কারণ আমি নিজেও একজন ব্যাটার। আর একজন ব্যাটার যতো খেলবে ততো তার খেলার ধার বাড়বে। ব্যাটিং একটা সাধনার ব্যপার। এটা ম্যাচ খেলার উপর অনেকটা নির্ভর করে। বোলিং কিন্তু করা যায়। কারণ একটা ভুল হলেও ফিরে আসার সুযোগ থাকে। কিন্তু ব্যাটারদের একটাই সুযোগ। ভুল হলেই শেষ।
প্রশ্ন : লেগ স্পিন সবচেয়ে কঠিন আর্ট। এমন কঠিন বোলিংয়ে আসার পেছনে গল্প কি?
রুমানা : হ্যাঁ, এটা আসলেই একটা গল্প। আমি কিন্তু প্রথমে লেগ স্পিনার ছিলাম না। ২০০৯ সালে আমি দল থেকে বাদ পরি এরপর আমি অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম। নিজে নিজে অনুভব করেছিলাম আমার অনেক ঘাটতি আছে। দলে ফিরতে হলে আমাকে সেরা হয়েই ফিরতে হবে। এই মনোবল নিয়ে তখন আমি নিজে নিজে লেগ স্পিন শুরু করি পাশাপাশি ব্যাটিং। বাংলাদেশে তখন লেগ স্পিনার তেমন ছিলো না তাই আমার স্যারেরাও অনেক উৎসাহ দিয়েছেন। যার কারণে আস্তে আস্তে আত্মবিশ্বাসী হয়ে গেছি।

প্রশ্ন : বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট এখন কোথায় আছে? দ্রুত উন্নতি করতে হলে কি করতে হবে?
রুমানা : আমাদের ক্রিকেট আসলে একটা জায়গায় এসে থেমে আছে। আমরা কিন্তু শুরুটা ভালো করেছিলাম। কিন্তু এরপর একটা জায়গায় এসে থেমে গিয়েছি। আমাদের পাশের সবাই এগিয়ে গেছে। আমরা সেই আগের জায়গাই আছি। ২০১১ সালে ওয়ানডে স্ট্যাটাস পাওয়ার পর আমরা কয়টা ম্যাচ খেলেছি। এই ছয় বছরে দেখেন আমরা কয়টা ম্যাচ খেলেছি আর অন্যরা কয়টা। তবে আমাদের মেধা কিন্তু কম নেই। আমাদের বেশ ভালো কিছু খেলোয়াড় আছে। অনেক রেকর্ডও আছে। কুবরা কিংবা পিঙ্কির কথাই ধরেন, খুব ভালো খেলছে। আমাদের আসলে প্রতিভার বিকাশ হচ্ছে না।
প্রশ্ন : এই দেশে মেয়ে ক্রিকেটারদের ঘাটতি। আরো মেয়ে ক্রিকেটার পাইপলাইনে আনতে কি করা দরকার?
রুমানা : আমাদের কিন্তু হাতে গোনা কয়েকটা জায়গায় মেয়েদের অনুশীলন করানো হয়। গুনে গুনে বলে দেওয়া যাবে কোথায় কোথায়। খুলনায় আমাদের পিলু স্যার, বগুড়ায় মোসলেম স্যার আর বিকেএসপি। অন্য জায়গায় মেয়েদের সুযোগ নেই। ছেলেরা যে কোন জায়গায় এমনকি রাস্তায়ও খেলতে পারে। ছেলেদের বিভিন্ন এলাকায় বোর্ড থেকে কোচও আছে। বয়সভিত্তিক দল আছে। তেমন করে যদি মেয়েদের কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হতো তাহলে ভালো হতো। অনেক মেয়েরা খেলায় এসে আবার নিরাশ হয়ে ফিরে যায় কারণ মাঠে খেলা থাকে না। মেয়েদের ‘এ’ দলের কাজ যদি শুরু হতো। মেয়েদের অনুশীলনের সুযোগ ও খেলার মাঠ বাড়িয়ে দেওয়া যায়।
প্রশ্ন : আপনার দলের সবচেয়ে বেশি শক্তি আর দুর্বলতা কোথায়?
রুমানা : আমরা কিন্তু নিজেদের প্রকাশ করার সুযোগ খুব কম পাচ্ছি। আমরা যে উন্নতি করেছি এটা দেখানোর জায়গাটা কম। আমাদের ব্যাটিং এবং বোলিং ঠিক আছে। আমার মনে ফিল্ডিংয়ে আরও কিছু কাজ করা দরকার। ফিল্ডিংটায় আমরা একটু পিছিয়ে আছি। ফিল্ডিং যে খুব খারাপ ছিল তা না হঠাৎ করে কিছুদিন থেকে আমাদের এখানে ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
প্রশ্ন : ক্যারিয়ার শেষে নিজেকে কোথায় দেখতে চান?
রুমানা : আমি নিজেকে একজন সফল অলরাউন্ডার হিসেবে দেখতে চাই। সেরা ১০ অলরাউন্ডারের তালিকায় থাকতে চাই। আর আমার এখন প্রথম লক্ষ্য আমাদের দলকে র্যায়ঙ্কিংয়ের সেরা আটে এনে আমাদের মেয়েদের সুযোগ সুবিধা বাড়ানো।
প্রশ্ন : কোন খেলোয়াড়কে আপনি ফলো করেন কিংবা আপনার আদর্শ কে?
রুমানা : আদর্শ বলতে আমি অনেক আগে থাকতেই শেন ওয়ার্নকে ফলো করি। ওনার বল আমার কাছে ম্যাজিক বল বলে মনে হয়। ওনার বল যত দেখি তত অবাক হই। এখন উনি নাই সত্যি বলতে কি অনেক মিস করি উনাকে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




bangladesherkhela.com 2019
Developed by RKR BD