মাশরাফি ম্যাজিকে সমতা

মাশরাফি ম্যাজিকে সমতা

এম এস সাহাব : ব্যাট-বলে মাশরাফি বিন মুর্তজার অধিনায়োকচিত পারফরমেন্স ও ফাস্ট বোলার তাসকিন আহমেদের বিলম্বিত ম্যাজিকে দারুণ জয়ে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে সমতা ফিরিয়েছে স্বাগতিক বাংলাদেশ। আগের ম্যাচে জয়ের সম্ভাবনা জাগিয়ে হঠাৎই ম্যাচে হেরে বসেছিল টাইগাররা। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ১-০ তে পিছিয়ে পড়া বাংলাদেশ সিরিজে ফিরবে-এমন প্রত্যাশা থাকলেও রোববার ব্যাটিংটা ভালো হয়নি। মিরপুর স্টেডিয়ামে দ্বিতীয় ওয়ানডেতে মাহমুদুল্লাহ (৭৫) ও মাশরাফির (৪৪) কল্যাণে ৮ উইকেটে ২৩৮ রান তুলতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ। প্রথম ম্যাচে তিন শতাধিক রান করা ইংলিশদের জন্য এ রান পেরুনো খুব একটা কঠিন হবে না বলে অনুমেয় হচ্ছিল। কিন্তু অধিনায়ক মাশরাফি ব্যাটিংয়ের পর (২৯ বলে ২টি চার ও ৩টি ছক্কায় করেন ৪৪ রান) দারুণ বোলিংয়ে দলকে ম্যাচে ফেরার পথ দেখান। প্রথম স্পেলেই তুলে নেন ৩ উইকেট। এর মধ্যে আগের ম্যাচের সেঞ্চুরিয়ান স্ট্রোকসও রয়েছেন। যিনি রানের খাতা খোলার আগে মাশরাফির বলে বোল্ড হন। ফলে মাত্র ২৬ রানে চার উইকেট পতন ঘটে সফরকারীদের। পঞ্চম উইকেটে বাটলার (৫৭) ও বেয়ারস্টো (৫৩ বলে ৩৫) প্রতিরোধ গড়ে তুলেন ৭৯ রানের জুটি। কিন্তু দ্বিতীয় স্পেলে বোলিংয়ে এসে আগুন ছড়িয়ে দেন তাসকিন। ইংলিশ প্রতিরোধই শুধু ভাঙেননি, টপাটপ তুলে নেন ৩ উইকেট। আর তাতেই বাংলাদেশের জয়ের পথ রচিত হয়ে যায়।
বাংলাদেশ ম্যাচ জিতে ৩৪ রানে। ৩২ বল বাকি থাকতে। ইংলিশ ইনিংস শেষ হয়ে যায় ২০৪ রানে। সিরিজে এখন ১-১ সমতা। তৃতীয় ও শেষ ম্যাচ ১২ অক্টোবর চট্টগ্রামে।
253267
অফ স্টাম্পের বাইরের বল তাড়া করতে গিয়ে মুশফিকুর রহিমের গ্লাভসে জমা পড়েন জনি বেয়ারস্টো (৫৩ বলে ৩৫)। ভাঙে ওভার প্রতি ৫.৭১ করে করা ৭৯ রানের জুটি। এরপর তাসকিন আহমেদের বলে এলবিডব্লিউ হয়ে ফিরেন জস বাটলার (৫৭ বলে ৫৭)। অফ স্টাম্পে গিয়ে খেলা বাটলারের পায়ে বল লাগলে আউট দেননি আম্পায়ার। রিভিউ নিতে দেরি করেনি বাংলাদেশের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা। তাতে পাল্টায় আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত। উল্লাসে মেতে উঠে পুরো গ্যালারি। সাকিব আল হাসানের দুর্দান্ত এক ক্যাচে পরিণত হয়ে ফিরেন মইন আলি। কাভারে থেকে ঘুরে দারুণ এক দৌড়ে ঝাঁপিয়ে ক্যাচ তালুবন্দি করেন সাকিব। নাসির হোসেনের বলে উড়িয়ে মারতে গিয়ে টাইমিংয়ে গড়বড় করেন মইন। ১৭ রানে চার উইকেট হারিয়ে ইংল্যান্ডে স্কোর দাঁড়ায় ৮ উইকেটে ১৩২। এরপর আবারও ঘুরে দাঁড়াতে চেয়েছিল সফরকারীরা। শেষ উইকেট জুটিতে রশিদ (অপরাজিত ৩৩) ও বল (২৮) ৪৫ রান তুলে নিয়ে বাংলাদেশ শিবিরে ভয়ের সৃষ্টি করেছিলেন। কিন্তু শেষ অবদি জয় বাংলাদেশেরই হয়। আর জয়ের নায়ক সেই অধিনায়ক মাশরাফি। তিনি বোলিংয়ে ফিরে চতুর্থ বলেই আউট করেন বলকে। বাউন্ডারি লাইনের কাছ থেকে নাসির নেন বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির ক্যাচটি। মাশরাফি ৮.৪ ওভার বল করে ২৯ রানে নেন ৪ উইকেট। আর তাসকিন নিয়েছেন ৮ ওভারে ৪৭ রানে ৩ উইকেট।
এর আগের ম্যাচে শতক করা বেন স্টোকসকে রানের খাতাই খুলতে দেননি মাশরাফি। ফুল লেংথ বলে ড্রাইভ করতে গিয়ে ব্যাট ছোঁয়াতে পারেননি স্টোকস। ৪ উইকেট হারিয়ে বিপদে ইংল্যান্ড। জ্বলে ওঠার আগেই জেসন রয়কেও ফিরিয়ে ইংল্যান্ডকে চাপে ফেলেন মাশরাফিই। সোজা বলে খেলতে গিয়ে এলবিডব্লিউ হন রয় (২১ বলে ১৩)। অভিষেকে দারুণ এক অর্ধশতক করা বেন ডাকেটকে দ্বিতীয় ম্যাচে শূন্য রানে ফেরান সাকিব আল হাসান। এই বাঁহাতি স্পিনারের বল ডাকেটের ব্যাট-প্যাডের মাঝ দিয়ে স্টাম্পে আঘাত হানে। জেমস ভিন্সকে (১০ বলে ৫) ফিরিয়ে প্রথম আঘাত হানেন মাশরাফি বিন মুর্তজা। তার ফুল লেংথ বলে ভিন্সের ড্রাইভে পয়েন্টে ক্যাচ তালুবন্দি করেন মোসাদ্দেক হোসেন।
এদিকে, ব্যাটিংয়ের শুরুতে লড়াই করেন মাহমুদউল্লাহ, শেষটায় ঝড় তুলেন মাশরাফি বিন মুর্তজা। তাতে বাঁচা-মরার ম্যাচে লড়াইয়ের পুঁজি গড়ে বাংলাদেশ। টস হেরে ব্যাট করতে নেমে ৮ উইকেটে ২৩৮ রান করে। ইংল্যান্ডের শুরুর আঁটসাঁট বোলিংয়ে রানের জন্য লড়াই করেন ইমরুল কায়েস ও তামিম ইকবাল। প্রথম পাঁচ ওভারে দুইজন খেলেন ২১টি ডট বল। দুই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যানই ফিরেন ক্রিস ওকসের শর্ট বলে। সপ্তম ওভারে লেগ স্টাম্পের বলে হুক করতে গিয়ে ডিপ স্কয়ার লেগে ক্যাচ দেন ইমরুল। পুল করে মিড উইকেটে ধরা পড়েন তামিম।
প্রথম ওভারেই সাফল্য পান গত ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় জেইক বল। বাউন্স ঠিকমতো খেলতে না পেরে ব্যাটের নিচের কানায় লেগে বোল্ড হন রানের জন্য সংগ্রাম করতে থাকা সাব্বির রহমান।
253270-3
৩৯ রানে প্রথম তিন ব্যাটসম্যানকে হারানো বাংলাদেশ প্রতিরোধ গড়ে মাহমুদউল্লাহ ও মুশফিকুর রহিমের ব্যাটে। প্রথম দুই বলেই চার হাঁকানো মুশফিক এই ম্যাচেই বাংলাদেশের তৃতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে পৌঁছান চার হাজার রানে।
হঠাৎ ছন্দ হারিয়ে ফেলা মুশফিক খেলছিলেন দারুণ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে। পরের বলে পুলে গড়বড় করে শেষ হয় তার ২১ রানের ইনিংস। উইকেট ধরে রাখার সঙ্গে রানের গতি বাড়ানো ৫০ রানের এই জুটি ভাঙার পর আবার দিক হারায় স্বাগতিকদের ইনিংস।
আগের ম্যাচে দারুণ এক ইনিংস খেলা সাকিব আল হাসান বেন স্টোকসের লেগ স্টাম্পের বাইরের বলে উইকেটকিপারকে ক্যাচ দিয়ে বিদায় নেন।
তরুণ মোসাদ্দেক হোসেনকে নিয়ে ৪৮ রানের আরেকটি জুটিতে প্রতিরোধ গড়েন মাহমুদউল্লাহ। নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারানো স্বাগতিকরা শেষের ঝড়ের দিকে তাকিয়ে ছিল তার দিকেই। দলকে বিপদে ফেলে ফিরে যান তিনিও।
আদিল রশিদের বলে সুইপ করতে গিয়ে বলে ব্যাট ছোঁয়াতে পারেননি মাহমুদউল্লাহ। আম্পায়ার আউট দেওয়ার পর রিভিউ নিয়েছিলেন; কিন্তু তাতে সিদ্ধান্ত পাল্টায়নি। ৮৮ বলে ছয়টি চারে ৭৫ রান করেন মাহমুদউল্লাহ। দলীয় ১৬১ রানে ষষ্ঠ ব্যাটসম্যান হিসেবে তিনি ফিরে যাওয়ার পরও ক্রিজে ছিল বিশেষজ্ঞ ব্যাটসম্যানদের জুটি।
আগের ম্যাচে শেষটায় তালগোল পাকিয়ে হারা বাংলাদেশ এই ম্যাচে ব্যাটিংয়ে শক্তি বাড়াতে দলে ফেরায় নাসির হোসেনকে। ‘দ্য ফিনিশার’ নামে পরিচিত এই ব্যাটসম্যানকে খুব একটা সঙ্গ দিতে পারেননি মোসাদ্দেক। রশিদের শর্ট বলে বাজে এক শটে ফিরেন এই তরুণ।
১৬৯ রানে প্রথম ৭ ব্যাটসম্যানকে হারানো বাংলাদেশের সামনে দুইশই তখন অনেক দূরের পথ। গত কিছু দিন ধরেই শেষের ব্যাটিংটা মাশরাফি বিন মুর্তজার দুর্ভাবনার ব্যাপার। সেখান থেকে দলকে বের করে আনতে সামনে থেকেই নেতৃত্ব দিয়েছেন অধিনায়ক। অষ্টম উইকেটে নাসিরের সঙ্গে ৮.১ ওভারে গড়েছেন ৬৯ রানের দারুণ এক জুটি।
মইনের বলে দারুণ দুই ছক্কায় মাশরাফির শুরুটা ছিল ঝড়ো। ডেভিড উইলির এক ওভারে একটি ছক্কা-চারে নেন ১৫ রান। সে সময়ে শান্তই ছিলেন নাসির, অধিনায়ককে যত বেশি সম্ভব স্ট্রাইক দেওয়াতেই ছিল তার মনোযোগ। সেখানে সফলও তিনি।
শেষ ওভারে রান আউট হয়ে শেষ হয় মাশরাফির ৪৪ রানের ইনিংস। ২৯ বলের ইনিংসে দুটি চার ও তিনটি ছক্কা হাঁকান বাংলাদেশের অধিনায়ক। ২৭ বলে দুটি চারে ২৭ রানে অপরাজিত থাকেন নাসির। ইংল্যান্ডের ওকস, বল ও রশিদ দুটি করে উইকেট নেন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




bangladesherkhela.com 2019
Developed by RKR BD