ওয়ালশই হতে পারেন আলোকবর্তিকা

ওয়ালশই হতে পারেন আলোকবর্তিকা

তার আসা নিয়ে অনেক হৈ চৈ ও রাজ্যের কথা-বার্তা হয়েছে; কিন্তু রাজধানীতে পা রাখার মুহুর্তটি একদমই অনাড়ম্বর। স্বদেশি গর্ডন গ্রিনিজ ১৯ বছর আগে বাংলাদেশে এসে যে রাজকীয় সংবর্ধনা পেয়েছিলেন, কোর্টনি ওয়ালশ তার কিছুই পাননি। তাকে স্বাগত জানাতে বোর্ডের শীর্ষ কর্তাদের কেউ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে উপস্থিত ছিলেন না। এমনকি ক্রিকেট অপারেশন্স কমিটির ম্যানেজার-সহকারি ম্যানেজারও যাননি। শুধু লজিস্টিক ম্যানেজার সজিব আর ওয়াসিম খানকেই দেখা গেছে বিমান বন্দরে। নীরবে ঢাকায় পা রাখা কোর্টনি ওয়ালশ তিনদিন কাজ করে দেশেও ফিরলেন নিভৃতে।

প্রথমবার বাংলাদেশে এসে বিমানবন্দরে রাজকীয় সংবর্ধনা জোটেনি, তা নিয়ে ওয়ালশের বিন্দুমাত্র পদক্ষেপ নেই। থাকার কথাও নয়। এ ক্যারিবিয়ান গ্রেট ব্যক্তি জীবনে খুবই সাদাসিধে।

তার রাজধানীতে পা রাখা, প্রথম মিডিয়া সেশনে উপস্থিত হওয়া এবং কোচিং করার সময়ের পোশাক- কোনটাতেই এতটুকু কেতাদুরস্ত ভাব ও চাকচিক্য চোখে পড়েনি। সেই জ্যামাইকা থেকে নিউইয়র্ক, অবুধাবি হয়ে ঢাকায় প্রথম যখন পা রাখলেন, তখন তার পানে ছিল একটি হালকা হলুদাভ হাফশার্ট। পরদিন দুপুরে ঠিক সেই শার্টের ওপর বেøজার চাপিয়ে মিডিয়ার সামনে আসা।

আর প্র্যাকটিসে তার ড্রেস হলো কালো রঙ্গের শর্টস আর সাদা গোল গলার পাতলা গেঞ্জি। সেটাও ‘নাইকি, পুমা, এ্যাডিডাস কিংবা রিবোকের ব্র্যান্ডে’র নয়। অতি সাধারণ।

শুধু চাকচিক্যহীন অনাড়ম্বর চলাফেরাই নয়। চিন্তা-ভাবনা এবং মানসিকতায়ও ওয়ালশ অন্যরকম। গর্ডন গ্রিনিজের মত রাশভারি নন। তারকাসূলভ উন্নাসিকতার ছিটেফোটাও নেই। সবচেয়ে বড় কথা, সাধারণত প্রশিক্ষকদের মাঝে যে শিক্ষকসূলভ আচরণ দেখা যায়, ওয়ালশের মাঝে তার কিছুই নেই। হাঁটা-চলা, কথাবার্তা ও আচরণ অতি সাধারণ।

প্রথম দিন মিডিয়ার সঙ্গে কথোপাকোথনে পরিষ্কার হয়েছে,  তিনি নিজেকে শুধু পেশাদার কোচ ভাববেন না। কোচিং তার কাছে শুধু পেশা নয়। তাই তো মুখে এ কথা, ‘আমি শুধু কোচের দায়িত্বই পালন করবো না। মেন্টরের (পরামর্শক) ভূমিকাও রাখবো। কোচিংয়ের পাশাপাশি নিজেকে অভিভাবকের মতই দেখতে চাই। ফাস্ট বোলারদের কোচের পাশাপাশি ছেলেদের সাথে আমার আচরণ হবে পিতার মত।’

প্রথম দিন প্র্যাকটিসেও সে সত্যের দেখাই মিলেছে। প্রথম তিনদিনের প্র্যাকটিস সেশনে কখনো তার ভূমিকা ছিল দর্শক, কোন সময় পর্যবেক্ষক আবার বেশীর ভাগ সময় অভিভাবকের।

রুবেল হোসেন, আল আমিন ও কামরুল ইসলাম রাব্বি অকপটে স্বীকার করেছেন, ‘শুরুতেই বোঝা গেছে তিনি কঠিন মানসিকতার মানুষ নন। আমরা নেটে কেউ বাজে বোলিং করলে বকা ঝকা করেননি। রক্তচক্ষুও দেখাননি। বরং কেউ খাটো লেন্থে বল ফেললে বলেছেন, ওপরে ওপরে বল ফেল। কেউ একটু ভাল ডেলিভারি ছুড়লে সঙ্গে সঙ্গে হাততালি দিয়েছেন।

হাই প্রোফাইল ক্যারিয়ার। অতিবড় ক্রিকেট বোদ্ধাও মানছেন, ওয়ালশ ওয়েস্ট ইন্ডিজ তথা বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ফাস্ট বোলারদের একজন। পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, টেস্টে উইকেট শিকারির তালিকায় তার অবস্থান চার নম্বরে। উইকেট প্রাপ্তিতে ওয়ালশের ওপরে শুধু মুত্তিয়া মুরালিধরন (১৩৩ টেস্টে ৮০০ উইকেট), শেন ওয়ার্ন (১৪৫ টেস্টে ৭০৮) ও অনিল কুম্বলে  (১৩২ টেস্টে ৬১৯)।

বলার অপেক্ষা রাখে না, এরা তিনজনই কিন্তু স্পিনার। উইকেট শিকারে শীর্ষ পাঁচের চার নম্বরে থাকা ওয়ালশ ফাস্ট বোলারদের মধ্যে স্মরনাতীতকালে সর্বাধিক ১৩২ টেস্ট খেলেছেন। ম্যাচ সংখ্যায় তার কাছাকাছি আছেন শুধু কপিল দেব (১৩১)। আর অজি ফাস্ট বোলার গ্লেন ম্যাকগ্রা খেলেছেন ১২৪ টেস্ট।

এমন উজ্জ্বল বোলিং ক্যারিয়ারই শুধু নয়, তার সততাও অতুলনীয়। ১৯৮৭ সালে বিশ্বকাপে পাকিস্তানের সাথে অস্তিত্ব রক্ষার ম্যাচে চরম সততার নিদর্শন দেখান ওয়ালশ। ক্রিকেটে প্রচলিত নিয়মের মধ্যে থেকেও একটু অখেলোয়াড়োচিত মনোভাবের আশ্রয় নিলে পাকিস্তানের শেষ ব্যাটসম্যান সেলিম জাফরকে রান আউট করে দিতে পারতেন ওয়ালশ। তাহলে তার দল ওয়েস্ট ইন্ডিজ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌছে যেত।

পাকিস্তান ইনিংসের শেষ দুই বলে পর পর দুইবার সেলিম জাফর বোলিং প্রান্তের ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে যান। ওয়ালশ অনায়াসে বেলস তুলে নিলেই সেলিম জাফর আউট হয়ে যেতেন; কিন্তু ওয়ালশ তা না করে ‘জেন্টলম্যান গেম’ ক্রিকেটের সত্যিকার মহিমাকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
এমন এক  বড় তারকা এখন মাশরাফি, রুবেল, আল-আমিন, তাসকিন ও মোস্তাফিজদের বোলিং কোচ।

তারপরও সংখ্যায় খুব কম হলেও কিছু তীর্যক মন্তব্য হাওয়ায় উড়ছে। সমালোচকদের কারো কারো মুখে এমন কথা- ‘পুরোদস্তুর কোচিং বলতে যা বোঝায়- ওয়ালশ তা করেননি কখনো। তিনি প্রথাগত বা ডিগ্রিধারী লেভেল ১, ২, ৩ কিংবা ৪ করা কোচ নন। বাংলাদেশে আসার আগে তিনি ছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দলের নির্বাচক। পেশাদার প্রশিক্ষক হিসেবে এটাই তার প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট। খেলোয়াড়ী জীবনে দারুন ফিটনেস সচেতন এক হারা গড়নের ওয়ালশ যে কোচিং করানো থেকে দুরে ছিলেন, পেটে জমা বাড়তি মেদই তার প্রমাণ। তিনি কী ডিগ্রিধারি কোচদের মত তাত্তি¡ক বিষয়গুলো হাতে ধরে শেখাতে পারবেন?’

এটা সত্য, কারণ ফাস্ট বোলিংয়ের ওপর সে অর্থে তেমন কোন কোচিং ডিগ্রি নেই ওয়ালশের। তাতে বড় কোন সমস্যাও নেই। নিজে ছিলেন তুখোড় ফাস্ট বোলার। ক্যারিয়ারের শুরুতে কাছে পেয়েছেন মাইকেল হোল্ডিং, ম্যালকম মার্শাল ও জোয়েল গার্নারের মত কালজয়ী ফাস্ট বোলারদেরকে। শুধু সান্নিধ্যই নয়। বেড়ে উঠেছেন তাদের সাহচর্য্যে। মাইকেল হোল্ডিং, ম্যালকম মার্শাল ও জোয়ের গার্নারের প্রয়োজনীয় ও সময়োচিত পরামর্শে তার ক্যারিয়ার হয়েছে সমৃদ্ধ। ফাস্ট বোলিংয়ের প্রয়োজনীয় নিগুঢ় রহস্য তার জানা, নখদর্পনে।

মোটা দাগে বললে ফাস্ট বোলারের অত্যাবশ্যকীয় উপাদানের সবটুকুই তার মাঝে বিদ্যমান। কখন কোন পরিস্থিতিতে কী করণীয়? গব তার জানা। তিনি নিজেই আদর্শ ফাস্ট বোলারের প্রতীক, প্রতিমূর্তি। সাড়ে ছয় ফুট লম্বা, চওড়া কাঁধ। মসৃন রানআপ। হাই আর্ম অ্যাকশন। ১৩৫-১৪০ কিলোমিটার গতিতে বল করতে পারতেন অবলীলায়।

লাইন-লেন্থ ছিল নিখুঁত। ভাল সুইং করানোর দক্ষতাও ছিল। ফাস্ট বোলারদের যে দুটি অস্ত্র সবচেয়ে ভয়ঙ্কর, সেই বাউন্সার ও ইয়র্কার দেয়াতেও ছিলেন সিদ্ধহস্ত। এ প্রয়োজনীয় উপাদানের পাশাপাশি ম্যাচ কন্ডিশন, উইকেটের চরিত্র ঠাওরে এবং ব্যাটসম্যানের চরিত্র ও এপ্রোচ বুঝে বোলিং কৌশল আঁটার কাজটিও খুব ভালই জানেন তিনি।

শুধু জানা নয়, প্রায়োগিক ক্ষমতাও ছিল অসাধারণ। এটাই কোন ড্রিগ্রিধারি ফাস্ট বোলিং কোচের সাথে ওয়ালশের মৌলিক ও বড় পার্থক্য। ফাস্ট বোলিংয়ের যাবতীয় কৌশল জানা আর জায়গামত প্রয়োগ করা এক কথা নয়। এ দুই গুণের সমন্বয় খুব কম হয়। ওয়ালশের মাঝে আছে সেই দূর্লভ সমন্বয়। তার পাশাপাশি আরও একটা বড় বৈশিষ্ট্য আছে। যা মিলবে না অতি বড় হাই প্রোফাইল কোচের মাঝেও। তিনি হচ্ছেন ইনজুরি মুক্ত ফাস্ট বোলারের প্রতিচ্ছবি।

অনেক মেধাবী, ১৪০-১৪৫ কিলোমিটার গতিতে বল করার সহজাত ক্ষমতার অধিকারী দ্রুত গতির বোলার অকালে ঝরে পড়েছেন ইনজুরি আক্রান্ত হয়ে। এই ইনজুরি কেড়ে নিয়েছে বাংলাদেশের সব সময়ের অন্যতম সেরা পেসার মাশরাফি বিন মর্তুজার ক্যারিয়ারের স্বর্ণ সময়। বার বার ইনজুরির ভয়াল থাবা আর অপারেশনের টেবিলে গিয়ে ক্যারিয়ারের একটা বড় সময় মাঠের বাইরে কাটাতে হয়েছে নড়াইল এক্সপ্রেসকে।

ক্যারিয়ার শুরু করতে না করতেই কাঁধের ইনজুরিতে কাটার মাস্টার মোস্তাফিজ। ফাস্ট বোলারদের ক্যারিয়ারে যে ইনজুরি সবচেয়ে বড় বাধা, সেটাকে ওয়ালশের চেয়ে ভালো বোঝার ক্ষমতা আর কে আছেন? কেউ নেই। তিনিই খেলেছেন ১৩২ টেস্ট। কী করে দীর্ঘদিন নিজেকে ফিট রেখে ইনজুরিমুক্ত থেকে মাঠে ধারাবাহিকভাবে পারফর্ম করা যায়- ওয়ালশের চেয়ে আর কে তা ভাল জানেন?

যত বড় ডিগ্রিধারি কোচই হোন না কেন, কোন প্রথাগত কোচ শুধু তাত্তি¡ক পরামর্শ দিয়ে কাউকে ইনজুরিমুক্ত রাখতে পারবেন না। এজন্য দরকার বাস্তব অভিজ্ঞতা। যার পুরোটাই আছে ওয়ালশের। এমন বহু গুণে গুণান্বিত ফাস্ট বোলিং কোচের  কথা-বার্তা আর দেয়া প্রয়োজনীয় বুদ্ধি-পরামর্শের যথাযথ অনুসরণ এবং জায়গামত প্রয়োগ করতে পারলে ক্যারিয়ার সায়াহ্নে দাঁড়ানো মাশরাফির বলের ধারও ৩২/৩৩ বছরে আরও বেড়ে যেতে পারে।

রুবেল, আল-আমিন, তাসকিন ও মোস্তাফিজের বোলিং এখন যে অবস্থায় আছে, সেটা হয়ে উঠতে পারে অনেক শানিত। এখন কাজ একটাই, শুধু ওয়ালশের পরামর্শ মেনে চলা আর শেখানো কলাকৌশলগুলো রপ্ত করে জায়গামত প্রয়োগ ঘটানো। তাহলে অবশ্যই সাফল্য ধরা দেবে। আর সাফল্যে কত কিছুই না বদলায়! বদলে যাবে বাংলাদেশের বোলিংয়ের চিত্রও। স্পিন বোলিং নির্ভর বোলিং ডিপার্টমেন্ট তখন হয়ে যাবে ফাস্ট বোলিং নির্ভর।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




bangladesherkhela.com 2019
Developed by RKR BD