১২তম এসএ গেমসের যবনিকা : পরবর্তী আসর নেপালে

১২তম এসএ গেমসের যবনিকা : পরবর্তী আসর নেপালে

গত ৫ ফেব্রুয়ারি ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের আসাম রাজ্যের রাজ্যের গৌহাটিতে পর্দা উঠেছিল সাউথ এশিয়ান (এসএ) গেমস-এর ১২তম আসরের। যদিও পরদিন আরেক আয়োজক মেঘালয়ের শিলংয়েও আরেকটি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ইন্দিরা গান্ধী অ্যাথলেটিকস স্টেডিয়ামে ‘এই পৃথিবী এক ক্রীড়াঙ্গন’… প্রয়াত ভুপেন হাজারিকার থিম সংয়ের সঙ্গে ভারতীয় ফুটবল লিজেন্ড বাইচুং ভুটিয়ার হাত দিয়ে যে মশাল প্রজ্বলিত হয়েছিল তা একই ভেন্যুতে মঙ্গলবার নিভে গেল আনুষ্ঠানিকভাবে। শেষ হলো আট দেশের প্রায ২৬০০ অ্যাথলেটদের (কর্মকর্তা ও আম্পয়ার জাজ মিলিয়ে প্রায় ৩৫০০ ) মিলন মেলা। ১৯৮৪ সালে নেপালের কাঠমুন্ডুতে যে আসরের সূচনা হয়েছিল আগামী ২০১৮ সালে সেখানেই বসবে পরবর্তী আসর। গত সোমবার গৈহাটিতে সাউথ এশিযান অলিম্পিক কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আগামী মাসেই সম্ভাব্য তারিখ এবং ডিসিপ্লিন চূড়ান্ত হবে। যদিও ১৯৯৯ সালে কাঠমুন্ডুতে দ্বিতীয়বার বসেছিল এ আসর, তখন এর নাম ছিল সাফ গেমস।
স্বাগতিক ভারত বরবারের মত পদক তালিকায় শীর্ষস্থান ধরে রেখে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। ১৮৮ স্বর্ণ, ৯০ রৌপ্য, ৩০ ব্রোঞ্জ মিলিয়ে তাদের সংগ্রহ ৩০৮টি পদক। তবে শেষ দিন মহিলারা সফল হলেও, স্বাগতিকদের হতাশায় ডুবিয়ে পুরুষদের ফুটবলে স্বর্ণ জিতেছে নেপাল। পাকিস্তানকে টপকে লংকানরা পদক তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে, তাদের সংগ্রহ ২৫ স্বর্ণ, ৬৩ রৌপ্য এবং ৯৮টি ব্রোঞ্জ পদক। তাদের পরই পাকিস্তান ১২ স্বর্ণ, ৩৭ রৌপ্য ও ৫৭ ব্রোঞ্জ সহ ১০৭ পদক। গেমসে নতুন রেকর্ড হয়েছ ১২টি ইভেন্টে।
এবারের আসরে বাংলাদেশের ২২৩ পুরুষ এবং ১৪৭ মহিলা খেলোয়াড়, ৬০ কোচ, ৩৯ ম্যানেজার এবং অন্যান্য কর্মকর্তাসহ মোট ৪৬৯ সদস্যের দল অংশগ্রহণ করে। এই কন্টিনজেন্টের সঙ্গে বিভিন্ন ডিসিপ্লিনে ১১ বিদেশী প্রশিকও ছিলেন। তাছাড়া বাংলাদেশ অলিম্পিক এ্যাসোসিয়েশন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, হেড কোয়ার্টার্স অফিসিয়াল এবং টিম ডাক্তারসহ সর্বমোট ৫৩১ সদস্য বিশিষ্ট বাংলাদেশ দল গঠন করা হয়। দল ভারি হলেও পদকের ঝোলা কিন্তু ততটা ভারি হয়নি! যা বাংলাদেশের জন্য লজ্জার, হতাশার।
Bangladesh in SA Games
বর্ণাঢ্য ক্রীড়া আসরে প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির সেভাবে সমন্বয় ঘটাতে পারেনি বাংলাদেশ। ২০১০ ঢাকা এসএ গেমসে বাংলাদেশ ১৮ স্বর্ণ, ২৪ রৌপ্য ও ৫৫ তামা পদক পেয়েছিল। এবার চার স্বর্ণের পাশাপাশি ১৫ রৌপ্য ও ৫৬ ব্রোঞ্জ। তারা গতবারের ১৮ স্বর্ণের অর্ধেকও জেতেনি! অথচ গেমসে অংশ নিতে ভারত যাওয়ার আগে দলের কর্মকর্তারা বড় মুখ করে অনেক পদক জয়ের আশাবাদ ব্যক্ত করে গিয়েছিলেন। পদক বাংলাদেশ পেয়েছে ঠিকই, তবে সেগুলোর বেশির ভাগই তামা! কিছু পদক রূপার। এবার বাংলাদেশের অর্জন ছিল মাত্র চার স্বর্ণ। এর ৩টিই জিতেছেন নারী ক্রীড়াবিদরা। ভারোত্তলনে মাবিয়া আক্তার সীমান্ত জেতেন প্রথম স্বর্ণটি। তারপর জলকন্যা মাহফুজা আক্তার শিলা সাঁতারে রেকর্ড গড়ে একাই জেতেন দুই স্বর্ণ। আর পুরুষদের মধ্যে একমাত্র স্বর্ণজয় করেন পিস্তল শুটিংয়ে শাকিল আহমেদ। সাঁতারে স্বর্ণ এলেও, শুটিং থেকে আরও স্বর্ণ পদকের প্রত্যাশা ছিল।
এ্যাথলেটিক্স, কাবাডি, ফুটবল-এই তিন ডিসিপ্লিন থেকে একটি সোনাও জেতেনি বাংলাদেশ। অথচ এই তিনটি খেলা নিয়ে বাংলাদেশী ক্রীড়াপ্রেমীদের আগ্রহ ছিল বেশি। বিশেষ করে ফুটবলে স্বর্ণ না পেলেও অন্তত রৌপ্য জেতা উচিত ছিল বলে মনে করেন অনেকেই। মহিলা ও পুরুষ উভয় দলই তামা জিতেছে। ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে উভয় দলই হেরেছে ভারতের কাছে। মহিলা দলের হার ছিল বেশি হতাশার। কেননা তারা ওই ম্যাচে ড্র করলেই ভারতকে টপকে ফাইনালে উঠতে পারতো। কিন্তু ম্যাচে তারা হেরে যায় বড় ব্যবধানে। আর পুরুষ দল তো দুর্বল ভুটানের সঙ্গে শুরুতেই ড্র করে সমালোচিত হয়। পরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কোনমতে সেমিতে উঠলেও বাজে খেলে ভারতের কাছে হেরে বিদায় নেয়।
গত আসরে বাংলাদেশের ১৮ স্বর্ণ পদকের মধ্যে কারাতে ডিসিপ্লিনে চারটি, গলফে দুটি ও ক্রিকেটে একটিসহ মোট ৭টি স্বর্ণপদক এসেছিল। এবারের আসরে ওই ইভেন্টগুলো না থাকায় পদক সম্ভাবনার দিক থেকে অনেক পিছিয়ে পড়ে বাংলাদেশ। এসএ গেমসকে সামনে রেখে গত বছরের আগস্ট থেকে বাংলাদেশ অলিম্পিক এ্যাসোসিয়েশনের (বিওএ) উদ্যোগে বিভিন্ন ফেডারেশন তাদের প্রস্তুতি পর্ব শুরু করে। এবারের আসরে আরচারি, এ্যাথলেটিক্স, বক্সিং, ব্যাডমিন্টন, টেবিল টেনিস, কাবাডি শুটিং, সুইমিং, ভলিবল, তায়কোয়ানদো, ভারোত্তোলন, কুস্তি, সাইকিং, বাস্কেটবল, হ্যান্ডবল, ফুটবল, জুডো, টেনিস, হকি, খো খো, উশু ও স্কোয়াশসহ ২২টি ডিসিপ্লিনে অংশ নেয় বাংলাদেশ।
২০১০ সালে ঢাকায় গত আসরে শ্রীলঙ্কা ছিল চতুর্থ আর বাংলাদেশ ছিল তৃতীয় স্থানে। এবার বাংলাদেশকে টপকে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে লঙ্কানরা। কোন সন্দেহ নেই, অবিশ্বাস্য উত্থান! উত্থান ঘটেছে আফগানিস্তানেরও। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি পদক তালিকায় সোনা জয়ের (৭-৯-১৯) দিক থেকে পেছনে ফিলে দিয়েছে বাংলাদেশকে। তারা এখন চার নম্বরে। বাংলাদেশ আছে পাঁচ নম্বরে। স্বর্ণ না পেলও এবারই প্রথমবারের মত রৌপ্য নিয়ে পদক তারিকায় এসেছে মালদ্বীপ ও ভুটানের নাম। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসরে বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদরা যেভাবে পিছিয়ে পড়েছে তাতে করে হয়ত মালদ্বীপ ভুটানও একদিন পদক তালিকায় বাংলাদেশকে পিছনে ফেলতে পারে, এমন শংকা রয়েই যায়।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




bangladesherkhela.com 2019
Developed by RKR BD