মামুনুলদের বদলে দিলেন মারুফ

ওয়ান…টু…থ্রি।
মূল অনুশীলন পর্ব শেষ। খালি পায়ে স্ট্রেচিংয়ের জন্য সবার বুট একই সময়ে খোলার সংকেত দিলেন মারুফুল হক। ফুটবলারদের ‘সময়জ্ঞান’ আরও বাড়ানোরই উদ্যোগ। হন্তদন্ত হয়ে তাঁরা কাজটা করলেন। হালকা শীতের ছায়া সুনিবিড় বিকেএসপিতে সূর্য তখন প্রায় ডুবুডুবু।
দৃশ্যটা মনে গেঁথে রাখার মতোই। ফুটবল দলের অনুশীলন ক্যাম্পে কখনো এমনটা চোখে পড়েনি! সবাই একসঙ্গে বুট খোলায় বিরাট কিছু হয়ে যায়নি। সাফ জিতে ফেলবে বাংলাদেশ সেই নিশ্চয়তাও নেই। কিন্তু শিক্ষণীয় একটা বার্তা এতে ছিল—ভালো কিছু অর্জনে ‘দশে মিলে করি কাজ’।
সেই ‘ভালো কিছু’র নাম সাফ শিরোপা। ২০০৩ সালে ঘরের মাঠে জয়ের পর যেটি হয়ে গেছে অধরা। গত চারটি সাফের তিনটিতেই গ্রুপ থেকে বিদায়। এবার কী হবে কৌতূহলভরেই দেখার অপেক্ষা সবার। তবে ‘দক্ষিণ এশিয়ার বিশ্বকাপ’ জয়ের মিশনে কিছু ইতিবাচক সূচক ফুটে উঠছে মারুফের তত্ত্বাবধানে। কোচ ইমামতি করছেন নিজেই, ২৫ খেলোয়াড় নামাজ পড়ছেন এক সঙ্গেই। এই সাত-আট দিনেই দলের শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতা বদলে দিয়েছেন। খেলোয়াড়দের গা ছাড়া মনোভাব দেখানোর দিন শেষ।
কিন্তু সবচেয়ে বেশি জরুরি মাঠে সামর্থ্য দেখানো। গ্রুপে আফগানিস্তান বা মালদ্বীপ ম্যাচ থেকে অন্তত তিন পয়েন্ট নিয়ে সেমিতে যাওয়াই মূল চ্যালেঞ্জ। মারুফ তা পেরোনোর মন্ত্রটা জানেন। খেলোয়াড়দের বলেছেন, ‘তোমরা নিজেকে চ্যাম্পিয়ন ভাবো। কল্পনা করো ভারত থেকে ৪ জানুয়ারি সাফ ট্রফি নিয়ে ঢাকায় নামছ, লাখ লাখ লোক তোমাদের সংবর্ধনা দিতে এসেছে। দৃশ্যটা ভাবলে মনের মধ্যে একটা জেদ আসবে। আমরাও পারব আত্মবিশ্বাস হবে।’
অনুশীলন শেষে হোস্টেলে ফেরার পথে সাফ জয়ের স্বপ্নসারথি মারুফ বলছিলেন কথাগুলো। দারুণ আত্মবিশ্বাসী এক কোচকেই দেখা গেল। এভাবে এতটা আন্তরিকতার সঙ্গে অনেক দিন কোনো কোচের দিকনির্দেশনা পায়নি বাংলাদেশ দল। মারুফ সত্যিই নতুন কিছু আমদানি করছেন, খেলোয়াড়দের তৈরি করতে দিচ্ছেন নানা মন্ত্র। যার মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো ভঙ্গুর নয়, শক্ত মানসিকতায় গড়ে ওঠা।
সুখবর এটাও, কোচের উজ্জীবনী মন্ত্র নিতে পারছেন ফুটবলাররা। তাই ভোজবাজির মতো সব পাল্টে ফুটবল দলের অন্দরে বইছে বদলের হাওয়া। খেলোয়াড়দের চলনবলন-কথাবার্তা সবকিছুতেই পরিবর্তনের ছোঁয়া। লোপেজের আড়াই মাসের থমথমে ঘরে এখন প্রাণের বন্যা। খেলোয়াড়দের আর নিজের পজিশন নিয়ে দুশ্চিন্তা নেই।
‘মুক্ত’ ফুটবলাররা কঠোর পরিশ্রমে আত্মমগ্ন। ভোর সাড়ে ছয়টা থেকে তিন বেলা অনুশীলন, সন্ধ্যার পর জিম। সেই জিম শেষ করতে বলছেন কোচ, অথচ খেলোয়াড়েরা আরেকটু সময় থাকছেন, তাঁদের মধ্যে বাড়তি তাড়নাটা বোঝাই যাচ্ছে। যা কোচকে ফেলে দিয়েছে একটা মধুর সমস্যায়। ২৮ জন থেকে কোন ২০ জনকে বেছে নেবেন, সেটিই এখন তাঁর বড় চিন্তা।
খেলোয়াড়দের মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময় ‘প্রকল্পও’ চালু করেছেন মারুফ। খেলোয়াড়েরা কে কার সঙ্গী হয়ে এক রুমে থাকবেন, সেটিও ঠিক করে দিয়েছেন। কোচ জোড়া বেঁধেছেন এভাবে, ওয়ালী-নাসির, জামাল-মিশু, কেষ্ট-সোহেল রানা, হিমেল-সোহেল, হেমন্ত-জনি। জাহিদের সঙ্গে জুয়েল। এভাবেই নিজেদের মধ্যে অভিজ্ঞতা আদান-প্রদান এবং একটা দল হয়ে ওঠার কাজটা চলছে।
সবচেয়ে ‘বড় দুজন’ মামুনুল-এমিলি একই রুমে। অধিনায়ক মামুনুল আপ্লুত হয়ে পড়েন সাফ প্রসঙ্গ তুলে, ‘সাফটা এবার জিততেই হবে। কোচকে আমরা কথা দিয়েছি সবার মুখে হাসি ফোটাব।’ পাঁচটি সাফ খেলা বাংলাদেশ দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ফুটবলার এমিলি পাশের বিছানা থেকে বলে ওঠেন, ‘মারুফ ভাই আমাদের বদলে দিয়েছেন। আমরা এবার দেশের ফুটবল বদলাতে চাই।’
সেই বদল দেখতে স্বপ্নাতুর অপেক্ষা গোটা দেশের।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




bangladesherkhela.com 2019
Developed by RKR BD