বিপিএল থ্রি নতুন বোতলে পুরোনো মদ !

সাইদুর রহমান শামীম : কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’,এ সময়ের উপমহাদেশীয় ক্রিকেটে দারুণ বাজারচলতি বাক্যটি। স্ক্যান্ডাল আর ক্রিকেটের তুমুল বানিজ্যিকরণের পরিণতিতে কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের হাড়িকাঠে বলি হয়েছে নারায়নস্বামী শ্রীনিবাসনের মতো মহীরুহ সংগঠক।
ভারতের আইপিএলে’র দল চেন্নাই সুপার কিংসের মালিকানায় সক্রিয় থাকায় প্রথমে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের গদি, এরপর ক্রিকেট বিশ্বের ভাগ্য নিয়ন্ত্রনকারী সংস্থা ‘আইসিসি-স্বর্গ’ থেকে পতন। তামিলনাড়ু–র এই ধনকুবের সেলিব্রেটি থেকে এখন রাতারাতি আম-জনতা ! শুধু কি শ্রীনিবাসন ! কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট কেড়ে নিয়েছে সুনীল গাভাসকার, রবি শাস্ত্রীদের আইপিএল গর্ভনিং কাউন্সিলের গ্ল্যামারাস (আর্থিক ব্যাপারতো আছেই) কুর্সি,সাবেক অলরাউন্ডার রজার বিনি’র নির্বাচকের লাভজনক চাকুরি।
ভারতের নিকট প্রতিবেশী বাংলাদেশের ক্রিকেটে অবশ্য কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টে বিব্রত হওয়ার বালাই নেই। ‘ম্যাচ-ফিক্সিং কান্ডে’ ক্রিকেটার-ফ্রাঞ্চাইজি মালিকদের শাস্তি সহ নানা অনিয়মে তিন বছর বন্ধ থাকার পর বিপিএল থ্রি শুরু’র প্রাক্কালে বিসিবি কর্তাদের প্রতিশ্রুতি ছিলো শ্বেতশুভর আয়োজনের।
বিপিএল থ্রি মাঠে গড়ানোর আগেই সেই প্রতিশ্রুতি উধাও। বিসিবি’র নির্বাচিত পরিচালক বিপিএল’র গর্ভনিং কাউন্সিলের সদস্য-সচিব হতেই পারেন, হওয়াটাই দস্তুর। তবে তিনি যদি আবার এক ফ্রাঞ্জাইজির মালিকানাধীন অন্য প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবি হন তাহলে কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট হতেই পারে। আর কিছু নাহোক,অন্তত ওই ফ্রাঞ্চাইজির ম্যাচ পরিচালনার সময় আম্পায়ার-ম্যাচ পরিচালনার সঙ্গে যুক্তরা যদি মনস্তাত্বিক চাপে পড়েন তাহলে তাদের কি দোষ দেয়া যায় ?
নির্বাচিত বোর্ড পরিচালকরা এবার ফ্রাঞ্চাইজি’র মালিকানা কিংবা টেকনিক্যাল ডিরেক্টর’র মতো লাভজনক পদে বেশ ভালোভাবেই ছিলেন। আগের আসরে অন্যতম ফ্রাঞ্চাইজি চিটাগং কিংসের কোচের দায়িত্ব নিয়ে বোর্ড পরিচালকের পদ স্বেচ্ছায় ছেড়েছিলেন খালেদ মাহমুদ সুজন। এবার সেই বোর্ড পরিচালকই স্বপদে বহাল থেকে অন্যতম ফ্রাঞ্চাইজি ঢাকা ডায়নামাইটসের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর হিসাবে ম্যাচ চলার সময়ে ডাগ-আউটে ছিলেন নিয়মিত।
আরেক ফ্রাঞ্চাইজি চিটাগং ভাইকিংসে একই ভুমিকায় বোর্ড পরিচালক আকরাম খান। শোনা যায়, বরিশাল বুলসের মালিকানায় আছেন বোর্ড পরিচালক আউয়াল চৌধুরী ভুলু। এ অবস্থায় যদি কেউ এদের বিরুদ্ধে কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের অভিযোগ নিয়ে আদালতের শরনাপন্ন হয় তাহলে শ্রীনিবাসনের বিরুদ্ধে দেয়া ভারতীয় হাইকোর্টের রায় হতে পারে উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত।
কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের লক্ষণরেখা ভাঙ্গতে দ্বিধা করেননি সংবাদকর্মীরাও । মিডিয়া হাউসের পেশাদার ক্রীড়া সাংবাদিকদের দু’একজন ফ্রাঞ্চাইজির মিডিয়া ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করেছেন। অতি উৎসাহী কেউ কেউ আবার একধাপ এগিয়ে দেশী-বিদেশী ক্রিকেটারদের এজেন্ট এমনকি বিসিবি’র বিভিন্ন ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের ঠিকাদারিও নিয়েছিলেন। স্বার্থের সংঘাত এড়িয়ে টু-পাইস কামানোর ক্ষেত্রে কয়েকজন ক্রিকেট সংগঠক ও মিডিয়া কর্মীদের কি অপূর্ব বোঝাপড়া !
টুর্নামেন্ট আয়োজনের ব্যাপারে গর্ভনিং কাউন্সিলের পারফরম্যান্সকে বড়জোর পাস মার্ক দেয়া যায়, লেটার-মার্ক কোনো মতেই নয়। অঞ্চলভিত্তিক ফ্রাঞ্চাইজি দেয়া হলেও ‘বিপিএল থ্রি’র ম্যাচ আয়োজনের ব্যাপারে বিসিবি পরিপূর্ণ হোম এন্ড অ্যাওয়ে পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারেনি। কুমিল্লা, রংপুর, বরিশাল কিংবা সিলেট’র সমর্থকরা নিজেদের মাঠে প্রিয় দলের খেলা দেখতে পাননি।
অথচ এই শর্ত পূরণ করা অসম্ভব ছিলো না। সিলেট, রাজশাহী, খুলনার আন্তর্জাতিক ভেন্যু’তে অনায়াসে আয়োজন করা যেতো একাধিক ম্যাচ। তাতে তৃনমূলে ক্রিকেট ছড়িয়ে দেয়ার জনপ্রিয় শ্লোগান বাস্তবতার মুখ দেখার পাশাপাশি বিসিবি’র কোষাগার আরো ফুলে ফেঁপে উঠতো। চার ছক্কার ধুমধাড়াক্কা টি-টুয়েন্টি ক্রিকেট এবার জাত হারিয়েছে নিস্প্রান।
‘বোলার্স ফ্রেন্ডলি’ উইকেটের কারণে। পরিসংখ্যানের দিকে তাকান, সেখানে বোলারদেরই জয়জয়কার। ১১/১২ ইনিংসে তিনশোর উপর রান মাত্র দু’তিনজনের। এরকম কাঠখোট্টা উইকেট টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটের দর্শকদের গ্যালারিমুখী করেনা। তারই প্রতিফলন দেখেছে দর্শক-মন্দায় ভোগা ‘বিপিএল থ্রি’। স্ক্যান্ডাল-জর্জরিত বিপিএল’কে বিশ্বাসযোগ্যতার নতুন উচ্চতায় তোলার সুযোগ ছিলো বিসিবি’র সামনে। আইসিসি’র এন্টিকরাপশন সিকিউরিটি ইউনিট (আকসু) ২০১২ সালে বিপিএল টু’তে সংঘটিত ম্যাচ ফিক্সিং’র ঘটনা উদঘাটন করে।
এবার বিসিবি’র নিজস্ব আকসু ইউনিট ছিলো ফিক্সিং সহ নানা অনিয়মের তদন্তে। বিসিবি’র বেতনভোগী ইউনিট কতটা দৃঢ়তার সাথে সে দায়িত্ব পালন করবে তা নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটাঙ্গন সংশয়ে ভুগতেই পারে। বিশেষ করে বিসিবি’র নির্বাচিত পরিচালকবৃন্দ যেখানে বিভিন্ন ফ্রাঞ্চাইজির পরিচালনার সঙ্গে জড়িত সেখানে বিসিবি’রই অধীনস্থ তদন্ত দলের স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের বিষয়টি বিশ্বাসযোগ্যতার মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হবে, এমনটা সর্বমহলের গ্রহনযোগ্যতা নাও পেতে পারে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




bangladesherkhela.com 2019
Developed by RKR BD