বিকাল ৪:২৯, সোমবার, ২৪শে জুলাই, ২০১৭ ইং

ভারতের শিলং এবং গুয়াহাটিতে অনুষ্ঠিত দক্ষিণ এশিয়ান (এসএ) গেমসে পদকজয়ী খেলোয়াড়দের সংবর্ধনা দিয়েছে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ)। আজ (মঙ্গলবার) রাতে ঢাকার একটি পাঁচ তারকা হোটেলে সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। এ উপলক্ষে অনুষ্ঠানস্থলে বসেছিল খেলোয়াড়-সংগঠকদের মিলনমেলায়।
এবার অনুষ্ঠিত এসএ গেমসে বাংলাদেশের অ্যাথলেটরা জিতেছে মোট চারটি সোনা, ১৫টি রুপা এবং ৫৬টি ব্রোঞ্জসহ মোট ৭৫টি পদক। প্রতিটি সোনার জন্য বিওএর আর্থিক পুরস্কার পাঁচ লাখ টাকা। রুপা তিন লাখ ও ব্রোঞ্জ এক লাখ টাকা করে। সব মিলিয়ে অ্যাথলেটদের মোট এক কোটি ২১ লাখ টাকা আর্থিক পুরস্কার দেয়া হয়েছে।
দুটি সোনা ও রিলে দলের সদস্য হয়ে একটি ব্রোঞ্জ জেতা সাঁতারু মাহফুজা খাতুন শিলা পেয়েছেন সর্বোচ্চ ১০ লাখ ২৫ হাজার টাকা। সোনাজয়ী শ্যুটার শাকিল আহমেদের প্রাপ্তি পাঁচ লাখ ২৫ হাজার টাকা। আরেক সোনাজয়ী মাবিয়া আক্তার সীমান্ত (ভারোত্তোলন) পেয়েছেন পাঁচ লাখ টাকা।
টাকার সঙ্গে খেলোয়াড়দের দেওয়া হয়েছে একটি করে ফুলের তোড়া। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। উপস্থিত ছিলেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বীরেন শিকদার, বিওএর মহাসচিব সৈয়দ শাহেদ রেজা, পদকজয়ী ফেডারেশনগুলোর কর্মকর্তারাসহ আরও অনেকে।

ধৈর্যের পুরস্কার পেয়েছি: আব্দুল্লাহ হেল বাকী

স্বর্ণ ধরা দিয়েও দিচ্ছিল না। ২০১০ এর ঢাকা এসএ গেমসের পর শ্যুটার আবদুল্লাহ হেল বাকির কাছে আন্তর্জাতিক ইভেন্টে স্বর্ণ যেন সোনার হরিণই হয়ে থাকছিল। অবশেষে স্বর্ণ উঠলো দেশের অন্যতম সেরা শ্যুটার বাকির হাতে। যদিও এককে নয়, বাকি স্বর্ণ জিতেছেন নারী শ্যুটার সৈয়দা আতকিয়া হাসান দিশার সঙ্গে, মিশ্র দ্বৈতে। আজারবাইজানের বাকুতে চলমান চতুর্থ ইসলামী সলিডারিটি গেমসের দ্বিতীয় দিনে এ দুই জন স্বর্ণ জিতেছেন মিশ্র দলগত ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে। ঢাকা এসএ গেমসে বাকি ১০ মিটার এয়ার রাইফেলের দলগত ইভেন্টে স্বর্ণ জিতেছিলেন আসিফ হোসেন ও শোভন চৌধুরীকে নিয়ে। গত এসএ গেমসে একই ইভেন্টে বাকি রৌপ্য জিতেছিলেন শোভন চৌধুরী ও অঞ্জন কুমার সিংহকে নিয়ে। তার আগে গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে পেয়েছিলেন রৌপ্য পদক। বারবার স্বর্ণের কাছ থেকে ফিরে এসেও হাল ছাড়েননি বাকি। ধৈর্য্য ধরে সাধনা করে গেছেন। যার ফল তিনি পেলেন অর্ধযুগ পর। বাকুতে পদক জয়ের পরপরই নিজের ফেসবুক ওয়ালে সাফল্যের জন্য বাকি আল্লার কাছে শুকরিয়া আদায় করেন। সমর্থন দেয়ার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন শুভাকাঙ্খীদের, ‘গত ৩/৪ বছরে ৩টি বিশ্বকাপসহ অনেকগুলো আন্তর্জাতিক গেমসে অংশ নিয়েছি; কিন্তু ২০১৬ এসএ গেমসে টিম ইভেন্টে সিলভার বাদে মেডেল পাইনি কোনটাতেই। ফাইনালে গিয়েও শেষ হচ্ছিল না মনের মতো। কোচ বারবার ধৈর্য্য ধরে রাখার উপদেশ দিয়ে নিজের উপর আস্থা না হারানোর কথা বলেছিলেন। আমি কোচের কথাতেই বিশ্বাসটা ধরে রেখেছিলাম’- পদক জয়ের পর গণমাধ্যমকে বলেন বাকি। স্বর্ণ জয়ের অনুভূতি জানাতে গিয়ে বাকি বলেন, ‘এ পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় পদক জয়ই থাকে সবার লক্ষ্য। আর যদি সেটা হয় স্বর্ণপদক, তার অনুভূতি প্রকাশ করা যায় না। আমার অনুভূতিটাও বলে বোঝানো যাবে না। আমি মনে করি এই পদকটি আমার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট হিসেবেই এসেছে। এখন আমার একটাই লক্ষ্য টোকিও অলিম্পিকে কোটা প্লেস।’

বাকি-দিশার হাত ধরে বাকুতে এল প্রথম স্বর্ণ

আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে চলমান ইসলামী সলিডারিটি গেমসের প্রথম দিনে শ্যুটিং থেকে এসেছিল রৌপ্য পদক। রাব্বি হাসান মুন্নার রৌপ্যকে ছাড়িয়ে এবার গেমসে লাল-সবুজ পতাকা ওড়ালেন আবদুল্লাহ হেল বাকি ও সৈয়দা আতকিয়া হাসান দিশা।

রোববার মিশ্র দলগত ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে স্বর্ণ জিতেছেন বাংলাদেশের এ দুই শ্যুটার। ইসলামী সলিডারিটি গেমসে এটি বাংলাদেশের প্রথম স্বর্ণ জয়।

এটি শ্যুটিংয়ে নতুন ইভেন্ট। সর্বশেষ দিল্লিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে এ ইভেন্টটি পরীক্ষামূলকভাবে হয়েছিল। এবার গেমসে রাখা হয়েছে এ ইভেন্টেটি। বাকি-দিশা জুটি ফাইনালে ৫-১ পয়েন্টে হারিয়েছেন ইরানের খেদমতি-নুরুজিয়ান জুটিকে। এ ইভেন্টে ব্রোঞ্জ জিতেছেন তুরস্কের ওমর-সীমানুর জুটি।

ইসলামিক গেমসে শুটিংয়ে রুপা বাংলাদেশের

সবার প্রত্যাশা ছিল আবদুল্লাহ হেল বাকিকে ঘিরে। কিন্তু বাকি নয়, চতুর্থ ইসলামিক সলিডারিটি গেমসে ছেলেদের ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে রুপা জিতে সবাইকে চমকে দিয়েছেন তরুণ শুটার রাব্বি হাসান। শনিবার আজারবাইজানের বাকুতে ২৪৫.৫ পয়েন্ট স্কোর করে রুপা জেতেন রাব্বি। ২৪৯.৮ স্কোর করে সোনা তুরস্কের ওমর আকগুনের।
সকালে শুরুটা দুর্দান্ত করেছিলেন বাংলাদেশের দুই শুটার। রাব্বি ৬২৪ স্কোর করে বাছাইপর্বে দ্বিতীয় হয়ে শুট-অফে (পদকের লড়াই) পৌঁছান। কমনওয়েলথ গেমসে রুপাজয়ী আবদুল্লাহ হেল বাকি ৬২০.৩ স্কোর করে শুট-অফে গিয়েছিলেন ষষ্ঠ হয়ে । কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাকি পদক পেলেন না। তাঁর স্থান পঞ্চম। রুপার পদক জিতে দিনটাকে স্মরণীয় করে রেখেছেন রাব্বি।
এদিকে মেয়েদের ১০ মিটার এয়ার রাইফেল ইভেন্টে পদকের লড়াইয়ে আছেন সৈয়দা আতকিয়া হাসান দিশা। তিনি বাছাইপর্বে ৪১০.৪০ স্কোর করে ষষ্ঠ হয়ে উঠেছেন শুট-অফে।
শুটিং ছাড়াও আজ গেমসের দ্বিতীয় দিনে বাংলাদেশ জিমন্যাস্টিকস, কারাতে ও ভারোত্তলনে নামবে পদকের লড়াইয়ে। সাঁতারে বাছাইপর্বে মেয়েদের ৫০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোকে মাহফুজা খাতুন শিলা, ১০০ মিটার ব্যাকস্ট্রোকে নাঈমা আক্তার, ৮০০ মিটার ফ্রি স্টাইলে নাজমা খাতুন, ৫০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোকে আরিফুল ইসলাম পুলে নামবেন। ভারোত্তলনে ফুলপতি চাকমা ৫৩ কেজিতে ওজন তুলবেন। কারাতেতে মাউনজেরা বর্ণা ৫০ কেজি ওজন শ্রেণিতে ও আল আমিন ইসলাম ৬০ কেজিতে অংশ নেবেন। জিমন্যাস্টিকসে সাদ্দাম হোসেন ফ্লোর এক্সারসাইজ, প্যারালাল বার ও রিংসে অংশ নেবেন।
ইসলামিক সলিডারিটি গেমসে অংশ নিচ্ছে ৫৪টি মুসলিম দেশের ৩০০০ অ্যাথলেট। একেবারে শেষ মুহূর্তে গেমস থেকে নাম প্রত্যাহার করেছে সুদান, লিবিয়া ও কুয়েত। ২২ মে পর্দা নামবে এই গেমসে।

শ্যুটিংয়ে ব্যর্থতার একদিন

এসএ গেমসের শ্যুটিং থেকে স্বর্ণ, রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ পদক জয় করেছেন বাংলাদেশী শ্যুটাররা। আশা-নিরাশার দোলাচালে থাকা শ্যুটিং থেকে শাকিলের হাত ধরে স্বর্ণ পদক আসায় এ ইভেন্ট থেকে আরও একটি স্বর্ণ পদকের আশা করেছিলেন সবাই। কারণ শাকিল ৫০ মিটার এয়ার পিস্তল থেকে অপ্রত্যাশীতভাবেই দেশকে পদক জয়ের আনন্দে ভাসিয়েছিলেন। তাকে ঘিরে কোন প্রকার স্বপ্ন ছিল না ফেডারেশন কর্মকর্তাদের। আব্দুল্লা হেল বাকীকে ঘিরে যতো স্বপ্নের জাল বুনেছিলেন সবাই। অথচ সেই বাকী যখন রেঞ্জে নেমে নিজের প্রিয় ইভেন্টে পুরোপুরি ব্যর্থ হলেন, তখন আবারো শাকিলকে ঘিরে নতুন করে আশার জাল বুনতে শুরু করেন কর্মকর্তরা। কিন্তু শনিবার তিনি রেঞ্জেই নামতে পারলেন না। হঠাৎ করেই সকালে অসুস্থ হয়ে পড়েন এ শ্যুটার।
শাকিলের অসুস্থতার দিনে ব্যর্থ হয়েছেন দেশের অন্য শ্যুটাররাও। কাহিলিপাড়া শুটিং রেঞ্জ থেকে কোন সুখবর দিতে পারেননি জাকিয়া-সুরাইয়ারা। মহিলাদের ব্যাক্তিগত ৫০ মিটার রাইফেল পজিশনেও একই হাল লাল-সবুজের মেয়েদের। সুরাইয়া আক্তার ৩৭৭.৬ স্কোরে সপ্তম এবং উম্মে সুলতানা জাকিয়া ৩৭৩.৩ স্কোরে আটজনের মধ্যে অষ্টম হন। অবশ্য এই ইভেন্টে তিনটি পদকই গেছে স্বাগতিক শুটারদের ঘরে। পুরুষদের দলগত ১০ মিটার এয়ার পিস্তলে ১৬৫৫ স্কোর করে বড় হতাশার জন্ম দিয়েছেন একক ইভেন্টে স্বর্ণপদক জেতা শাকিলরা। পাঁচ দেশের মধ্যে চতুর্থ হয়েছে বাংলাদেশ। লাল-সবুজদের আনোয়ার হোসেন ৫৬০, সাব্বির আল আমিন ৫৪৮ এবং শাকিল ৫৪৭ স্কোর করেন। এই ইভেন্টে ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলংকা যথাক্রমে স্বর্ণ, রুপা ও ব্রোঞ্জ জিতেছে।
মেয়েদের ৫০ মিটার দলগত রাইফেল থ্রি পজিশনে চার দলের মধ্যে চতুর্থ হয়েছেন বাংলাদেশের মহিলা শুটাররা। উম্মে সুলতানা জাকিয়া, সুরাইয়া আক্তার ও নাফিসা তাবসসুমের দল ১৬৫৪ স্কোর গড়ে চতুর্থ হন। এই ইভেন্টে স্বাগতিক ভারত ১৭২৬ স্কোরে স্বর্ণ, ১৬৮৬ স্কোরে শ্রীলংকা রুপা ও ১৬৫৬ স্কোরে ব্রোঞ্জপদক জেতে পাকিস্তান। মহিলাদের দলীয় ২৫ মিটার পিস্তলে ১৫৪৭ স্কোর করে চতুর্থ হয়েছে বাংলাদেশ। আরদিনা ফেরদৌস ৫২৬, সিনথিয়া নাজনিন ৫১৭ এবং অন্তরা ইসলাম ৫০৪ স্কোর করেন।
শাকিলের অসুস্থতা সম্পর্কে বাংলাদেশ শুটিং ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ইন্তেখাবুল হামিদ অপু বলেন, ‘১০ মিটার এয়ার পিস্তলে এককের মতো দলীয় বিভাগেও আমাদের বাজির ঘোড়া ছিলেন শাকিল আহমেদ। কিন্তুসকাল থেকেই বমি করছিলেন তিনি। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। ফলে ১০ মিটার একক পিস্তলের বাছাইয়েও অংশ নেয়া হয়নি তার। তাছাড়া আনোয়ারের স্কোরও তেমন ভালো ছিল না। তাই এই ইভেন্টে পদক জিততে পারিনি আমরা।’ শাকিলের কথা, ‘সকাল থেকেই হঠাৎ করে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। খুব খারাপ লাগছিল। তাই নিজের সেরাটা খেলতে পারিনি। ফলে পদকও জেতা হয়নি।’

সোনার সম্ভাবনা জাগিয়েও পারলেন না শোভন

দক্ষিণ এশিয়ান গেমসের ব্যক্তিগত ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে সোনার পদক জেতার দারুণ সম্ভাবনা জাগিয়েও শেষ পর্যন্ত রুপা পেয়েছেন শোভন চৌধুরী। শুক্রবার গুয়াহাটির শুটিং রেঞ্জে ১০ মিটার এয়ার রাইফেলের দলগত রুপাও পেয়েছে শোভন, আব্দুল্লাহ হেল বাকি ও অঞ্জন কুমার সিনহাকে নিয়ে গড়া বাংলাদেশ দল (১৮৪৫.৮)। স্বাগতিক ভারতের শুটাররা (১৮৬৩.৪) পেয়েছে দলগত সোনা। শ্রীলঙ্কা পেয়েছে ব্রোঞ্জ।
ফাইনালে শুট আউটে দারুণ লক্ষ্যভেদ করে ১২ শটের পর সবার উপরে ছিলেন শোভন। তবে ১৭ ও ১৮তম শটে ১০ -এর নিচে স্কোর করে ভারতের চ্যান সিংয়ের পেছনে পড়ে যান তিনি। শেষ দুটি শটে আর ব্যবধানটা কমানো যায়নি।
শেষ পর্যন্ত স্বাগতিকদের চ্যান সিং ২০৪.৬ স্কোর গড়ে সোনা জেতেন। শোভনের স্কোর ২০৩.৬। ভারতের তারকা শুটার গগন নারাং পেয়েছেন ব্রোঞ্জ। ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে যাকে ঘিরে বাংলাদেশের প্রত্যাশা ছিল বেশি, সেই আব্দুল্লাহ হেল বাকি হয়েছেন পঞ্চম।
চলতি আসরে শুটিং থেকে বাংলাদেশকে এখন পর্যন্ত একমাত্র সোনাটি এনে দিয়েছেন শাকিল আহমেদ। গত বুধবার ৫০ মিটার পিস্তলে সোনা জিতেন এই শুটার।
১৯৯১ সালের এসএ গেমসে শুটিং যোগ হয় প্রথমবার। সেবার বাংলাদেশ তিনটি সোনা জিতেছিল। পরের আসরে নিজেদের রেঞ্জে মিলেছিল সাতটি সোনার পদক। ১৯৯৫ সালের এসএ গেমসে শুটিং থেকে বাংলাদেশ পেয়েছিল পাঁচটি সোনার পদক। গত আসরেও এই ডিসিপ্লিন থেকে তিনটি সোনার পদক পায় বাংলাদেশ।

প্রত্যাশা আরও বেশি

কবিরুল ইসলাম, গোহাটি থেকে : ৫০ মিটার পিস্তলে প্রায় দুই যুগ পর সাফে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ ক্রীড়া আসরে শ্যুটার শাকিল আহম্মেদ স্বর্ণ উপহার দিয়েছেন জাতিকে। দুই যুগের স্বর্ণ পদকের বন্ধাত্বতা ঘোঁচানোর পর এবার ১০ মিটার পিস্তল ইভেন্টে নিয়েও স্বর্ণ জয়ের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন সবাই। শকিল আহম্মেদের প্রিয় এ ইভেন্ট নিয়েই এখন আশার আলো দেখছেন ফেডারেশনের কর্মকর্তারা। আর স্বপ্ন দেখবেনই না কেন? এটাই যে খুলনার এ শ্যুটারের প্রিয় ইভেন্ট। শনিবার সকালেই গৌহাটির কাহিলিপাড়া শ্যূটিং রেঞ্জে নামবেন তিনি। আর শুক্রবার সকালে রেঞ্জে পদকের জন্য লড়াই করবেন দেশ সেরা শ্যুটার আব্দুল্লা হেল বাকী। তিনি নামবেন ১০ মিটার এয়ার রাইফেল ইভেন্টে।
কৃহস্পতিবার সকালে নিবিড় অনুশীলনে সময় কাটিয়েছেন শাকিল আহম্মেদ। আর বিকালে রেঞ্জে নিজেকে ঝালিয়ে নেন আব্দুল্লাহ হেল বাকী। বাংলাদেশ শ্যুটিং ফেডারেশনের কর্মকর্তারা অবশ্য এ দুই শ্যুটারকে এদিন সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে দিতে চাননি। এমনকি অনুশীলনের সময়টাও জানাতে চাননি। মনোযোগ রেঞ্জের বাইরে চলে যেতে পারে, এ শঙ্কা থেকেই কর্মকর্তাদের এমন লুকোচুরি শাকিলকে নিয়ে।
অনুশীলন শেষে অল্প সময়ের জন্য নাগাল পাওয়া গিয়েছিল আগের দিন স্বর্ণ জয়ী শাকিলের। সেখানেই তিনি জানালেন, ‘আগের দিনের স্বর্ণটা আমার প্রত্যাশার বাইরে ছিল। কিন্তু কালকের (শুক্রবার) ইভেন্টটাই আমার প্রিয়। আমার বিশ্বাস এ ইভেন্ট থেকে স্বর্ণ জয় করতে পারবো।’
গত বছর দিল্লিতে অনুষ্ঠিত সাউথ এশিয়ান জুনিয়র চ্যাম্পিয়নশীপে ব্রোঞ্জ জিতেছিলেন শাকিল। সেই থেকেই তার আত্মবিশ্বাসের পারদটা বেশ উর্ধ্বমূখী, ‘গতবার কি করেছিলাম, সেটা এখন আমার কাছে অতিতের মতো। আমি ঐ স্বর্ণ নিয়ে ভাবতে চাইছি না। আমার ভাবনায় এখন কেবল কালকের (শুক্রবার) ইভেন্ট। সবাই আমাকে নিয়ে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। মনোযোগ যেনো গেমস থেকে সরে না যায়, সে জন্য কর্মকর্তারাও আমাকে কারো সঙ্গে কথা বলতে নিষেধ করেছেন।’
রেঞ্জে অনুশীলন শেষে দেশে থাকা মায়ের সঙ্গে সেল ফোনে কথা সেরে নিলেন শাকিল। দোয়া চাইলেন মায়ের কাছে। দেশকে যেনো আরও একটি স্বর্ণ এনে দিতে পারেন।
শুক্রবার সকালে রেঞ্জে নামবেন বাংলাদেশের আরেক আশার প্রতীক আব্দুল্লা হেল বাকী। ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে তাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে স্বাগতিক ভারতের শ্যুটার গগন নারায়ন, জিনসেন, ইমরান খানদের। গগন নারায়ন তো দেশের হয়ে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ক্রীড়া আসর অলিম্পিকে ব্রোঞ্জ পদক জয় করেছেন। আর ইমরান খান ঢাকায় অনুষ্ঠিত গত এসএ গেমসের সোনা জয়ী শ্যুটার। এ ইভেন্টে লড়াইটা বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণই হবে। শুধু বাকীই নন, রিয়াসাত ও শোভন চৌধুরীও থাকবেন সহযোদ্ধা হিসেবে। তারপরও এই ইভেন্টে স্বর্ণের জন্য বাংলাদশের বাজি আবদুল্লা হেল বাকীর জন্যই। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ শুটিংয়ের অন্যতম একটি নাম আবদুল্লা হেল বাকী। দেশের ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে অন্যতম সেরা শুটার। ২০১৪ সালে স্কটল্যান্ডের গ্লাসাগোতে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ গেমসের ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে ভারতের অভিনব বিন্দ্রার কাছে হেরে ২০২.১ স্কোর করে রুপা জিতেছিলেন বাকী। চলতি এ গেমসকে সামনে রেখে নিজেদের বেশ ভালোভাবেই ঝালাই করেছেন স্বাগতিক শ্যুটাররা। তাই গগন-জিনসেনদের নিয়ে চিন্তিত বাকী নিজেও,-‘আমার প্রতিদ্বন্দ্বি শ্যুটার বেশ শক্ত। একজন অলিম্পিয়ান পদক জয়ীও আছেন। তবে আমি আমার সেরাটাই দিতে চাই। শ্যুটিংয়ে ফাইনাল শটটা অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ। ফাইনাল শটে অনেক কিছুই নির্ভর করে। এটার জন্য মনোযোগ ধরে রাখাটা জরুরি।’ নিজের ইভেন্ট নিয়ে বেশ আত্মবিশ্বাসী বাকী। স্বাভাবিক যে স্কোরটা তিনি এ ইভেন্টে করে থাকেন, সেটা করতে পারলেও নাকি স্বর্ণ জয়ের সম্ভবনা আছে তার।

স্বর্ণ জিতে অবাক শাকিল!

এসএ গেমসে বাংলাদেশ পেল চতুর্থ স্বর্ণ

কবিরুল ইসলাম, গোহাটি থেকে : এসএ গেমসের শ্যুটিংয়ের শুরুতেই চমক দেখিয়েছে বাংলাদেশ। ৫০ মিটার পিস্তলে অপ্রত্যাশীতভাবে দেশকে স্বর্ণ পদক এনে দিয়েছেন শাকিল আহম্মেদ। এই ইভেন্টে প্রায় দুই যুগ ধরে কোন স্বর্ণ ছিল না বাংলাদেশের ঝুলিতে। তাই পিস্তল ইভেন্ট নিয়ে কোন আগ্রহ ছিল না কারো ভেতরেই। হিসেব-নিকেশের বাইরে থাকা সেই ইভেন্ট থেকেই দেশের হয়ে চতুর্থ স্বর্ণ পদক জয় করেন খুলনার এ শ্যুটার। স্বাগতিক ভারতের শ্যুটার ওম প্রকাশকে পেছনে ফেলে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছেন প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক কমপিটিশনে লড়াই করতে আসা শাকিল। তিনি স্কোর করেছেন ১৮৭ দশমিক ৬। এই ইভেন্টের ব্রোঞ্জ গেছে পাকিস্তানের কলিমউল্লাহ খান। চলতি এ গেমসে এটা বাংলাদেশের পুরুষ অ্যাথলেটদের প্রথম স্বর্ণ পদক জয়। এর আগে ভারোত্তোলন থেকে মাবিয়া আক্তার সীমান্ত দেশের হয়ে প্রথম স্বর্ন জয় করেছিলেন। আর সুইমিং ইভেন্ট থেকে মাহফুজা আক্তার শিলা টানা দু’টি স্বর্ণ জয় করে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছিলেন।
পিস্তলে সর্বশেষ বাংলাদেশকে স্বর্ণ এনে দিয়েছিলেন আতিকুর রহমান। সেটি ছিল ১৯৯১ সালে শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে অনুষ্ঠিত সাফ গেমসে। দুই বছর পর ঢাকায় অনুষ্ঠিত সাফ গেমসেও স্বর্ণ জয় করে দেশের পতাকাকে উর্ধ্বমূখী করেছিলেন আতিক। এরপর এ ইভেন্টে শুরু হয় স্বর্ণ খড়া। কোন শ্যুটারই স্বর্ণ পদক বয়ে আনতে পারছিলেন না। প্রায় দুই যুগ পর পিস্তল ইভেন্টের হারানো গৌরব ফিরে আসলো শাকিলের হাত ধরে। নিজের ইভেন্ট থেকে স্বর্ণ জয় করতে পারবেন, সেটা কল্পনার মধ্যেও ছিল না শাকিলের। যখন পদক নিশ্চিত হয়ে গেলো, তখন গৌহাটির কাহিলিপাড়ার শ্যূটিং রেঞ্জে উৎসবে মেতে উঠলেন শ্যুটিং ফেডারেশনের কর্মকর্তারা। বাংলাদেশীদের উৎসবে রংয়ে রঙ্গীন হয়ে উঠলো পুরো রেঞ্জ। স্বর্ণ জয়ী শাকিল নিজেও অবাক হয়ে রইলেন খানিক সময়। স্বাগতিক শ্যুটার ওম প্রকাশকে পেছনে ফেলে স্বর্ণ জয় করাটা তার কাছে তখনও বিশ্বাস হয়নি। যখন ঘোর ভাঙ্গল তখন আর আবেগ ধরে রাখতে পারছিলেন না এ শ্যুটার, ‘সত্যিকার অর্থেই আমি ভাবতে পারিনি ওম প্রকাশকে পেছনে ফেলে স্বর্ণ জিততে পারবো। তবে আত্মবিশ্বাসের কোন কমতি ছিল না। আমি আমার মনোযোগ এক মুহূর্তের জন্যও নষ্ট করিনি। নিজের শতভাগ দিয়ে চেষ্টা করেছি। আর তাতেই সফল হয়েছি। দেশের জন্য এতো বড় সম্মান বয়ে আনতে পেরে আমি খুব খুশী। এ অনুভুতি আসলে ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।’
স্বর্ণ জয় করতে গিয়ে স্বাগতিক শ্যুটার সঙ্গে বেশ ঘাম ঝড়াতে হয়েছে শাকিলকে,-‘ভারতীয়দের প্রস্তুতি আমাদের চেয়ে অনেক ভালো। তাদের পরাজিত করতে অনেক মনসংযোগের প্রয়োজন হয়েছে। শেষ পর্যন্ত জয়ী হতে পারায় বেশ ভালো লাগছে।’ সেনাবাহিনীতে চাকরী করা এ শ্যুটারের সাফল্যের জন্য নিজ সংস্থার প্রতি কৃতজ্ঞ,-‘সেনাবাহিনী আমাকে নানাভাবে সাহায্য করছে। তাদের সহযোগিতা ছাড়া এই সাফল্য পাওয়া সম্ভব হতো না। সেনাবাহিনীর কাছে আমি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ।’ সাফ গেমসে স্বর্ণ জয়ের পর এখন তার আত্মবিশ্বাস বেশ উর্ধ্বমূখী। চোখ তার আরও বড় আসরে। নিজেকে সেভাবেই গড়ে তুলতে চান খুলনার এ শ্যুটার,-‘বাংলাদেশের যে কোনো ক্রীড়াবিদের জন্য সাফ গেমসে স্বর্ণ জয় বেশ গৌরবের। তবে আমি আরো বড় আন্তর্জাতিক আসরে দেশের হয়ে পদক জিততে চাই।’

চতুর্থ স্বর্ণ জিতলেন শ্যুটার শাকিল

দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় ক্রীড়া ইভেন্ট এসএ গেমসে এতদিন আধিপত্য ছিল বাংলাদেশের মেয়েদেরই। তিনটি স্বর্ণ জিতেছেন মেয়েরা। দুটি মাহফুজা আক্তার শিলা এবং একটি মাবিয়া আক্তার সীমান্ত। বিদেশের মাটিতে মেয়েরা দেশের পতাকা পতপত করে ওড়াতে সক্ষম হলেও কোন ছেলে এখনও পর্যন্ত স্বর্ণ জয়ের গৌরব অর্জন করতে পারেনি। অবশেষে সেই আক্ষেপটা ঘোঁচালেন শ্যুটার শাকিল। শ্যুটিংয়ের ৫০ মিটার ফ্রি পিস্তলের শ্যুট-অফে স্বর্ণ জিতলেন তিনি।
শ্যুটিংয়ে ৫০ মিটার ফ্রি পিস্তলের শ্যুট-অফে উঠেছিলেন শাকিল আহমেদ, আনোয়ার হোসেন ও মহেন্দ্র কুমার। স্বর্ণ জয়ের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শেষ পর্যন্ত জয় হলো বাংলাদেশের শাকিলেরই। সেনাবাহিনীর এই শ্যুটার আজ ১৮৭.৬০ স্কোর করে জিতে নিয়েছেন স্বর্ণপদক। এ নিয়ে এসএ গেমসে মোট ৪টি স্বর্ণ পদক জিতল বাংলাদেশ। শাকিলের পাশাপাশি আনোয়ার ও মহেন্দ্র আরেকটু ভালো করতে পারলে এই ইভেন্টের দলগত সোনাটিও হতে পারত বাংলাদেশের।
কিন্তু আনোয়ার ষষ্ঠ ও মহেন্দ্র অষ্টম হওয়ায় বাংলাদেশকে দলগত ব্রোঞ্জ নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। তবে শাকিল স্বর্ণ জিততে পারলেও, নিশ্চিত একটি স্বর্ণ হাতছাড়া হয়েছে বাংলাদেশের। মেয়েদের ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে নিশ্চিত স্বর্ণ জয়ের সম্ভাবনা থাকলেও, তাতে কোনো পদকই সম্ভবত আনতে পারছেন না সুরাইয়ারা।