দুপুর ২:০২, রবিবার, ২৬শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ইং

মাত্র একটি জয়, যা থলিতে পুড়তে পারলেই ইংলিশদের বিপক্ষে প্রথম ও ঘরের মাটিতে টানা সপ্তম ওয়ানডে সিরিজ জয়ের অনন্য রেকর্ডটি নিজেদের করে নিতে পারবে টিম বাংলাদেশ। আর মাশরাফিদের অনন্য এই জয়ের পথে আশার আলো ছড়াচ্ছে ‘লাকি’ ভেন্যু চট্টগ্রাম জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামের অতীত রেকর্ড।

২০১১ সালের ১১ মার্চ এই মাঠে এই ইংল্যান্ডের বিপক্ষেই ২ উইকেটের জয়ে বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো ইংলিশদের হারের লজ্জা দিয়েছিল বাংলাদেশ। এরপর ২০১৩ সালে সফরকারী নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দুই ম্যাচ সিরিজের প্রথম টেস্টে এখানেই মুমিনুল হক খেলেছিলেন ক্যারিয়ার সেরা ১৮১ রানের চোখ ধাঁধাঁনো ইনিংস।

একই ম্যাচে বিশ্বের প্রথম বোলার হিসেবে সোহাগ গাজী থলিতে পুড়েছিলেন হ্যাটট্রিকসহ ৬ উইকেট ও অপরাজিত সেঞ্চুরি (১০১)’র অনন্য রেকর্ড। শুধু কি তাই? ২০১৫ সালের জুলাইয়ে তিন ম্যাচ সিরিজের শেষটিতে শক্তিশালী দক্ষিণ আফ্রিকাকে ৯ উইকেটের বড় ব্যবধানে হারিয়ে প্রথমবারের মতো দলটির বিপক্ষে সিরিজ জয়ের শেষ হাসি হেসেছিল টাইগাররা। ২০০৯ সালের রেকর্ডতো আরও আশা জাগানিয়া। জিম্বাবুয়েকে ৪৪ রানে অলআউট করে তৃতীয় সর্বনিম্ন ওয়ানডে সংগ্রহের লজ্জার রেকর্ডটিও এই মাঠেই দিয়েছিলেন সাকিব…রাজ্জাকরা।

সঙ্গত কারণেই বুধবার (১২ অক্টোবর) ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ নির্ধারণী এই ম্যাচেও জহুর আহমেদ চৌধুরি স্টেডিয়ামে স্বাগতিক বাংলাদেশই ‘ফেভারিট’ একথা চোখ বন্ধ করে বলা যায়।

‘লাকি’ ভেন্যুতে সিরিজ জয়ে মাশরাফিরা যদি তাদের স্বাভাবিক খেলাটি খেলতে পারেন, তাহলে কাজটি আরও সহজ হবে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের টেকনিক্যাল কমিটির উপদেষ্টা শফিকুল হক হীরা, ‘বেশি কিছু লাগবে না, দ্বিতীয় ওয়ানডের ধারাবাহিকতা ধরে রাখলেই হবে।’

এদিকে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দ্বিতীয় ওয়ানডে দিয়ে টাইগার একাদশে ফিরেছেন অলরাউন্ডার নাসির হোসেন। আর তার ফেরাকে দলের জন্য বিশেষ কিছু হিসেবেই দেখছেন হীরা, ‘নাসির হোসেনের অন্তর্ভুক্তি বাংলাদেশ দলের চেহারাই বদলে দিয়েছে।’

ইংলিশদের বিপক্ষে প্রথমবারের মতো ওয়ানডে সিরিজ জয়ের দারুণ সুযোগ বাংলাদেশের সামনে। সুবর্ণ এই সুযোগটিকে কাজে লাগাতে এই ক্রিকেট বোদ্ধা বাতলে দিলেন টাইগারদের করণীয়। এক্ষেত্রে প্রথমেই তিনি গুরুত্বারোপ করলেন টেলএন্ডারদের ব্যাটিং লাইন আপের উপর। যেখানে সাত নম্বরে নাসিরকে, মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতকে আট ও মাশরাফিকে নয় নম্বরে ব্যাটিংয়ের পরামর্শ দিলেন।

বোলিং লাইন আপের ক্ষেত্রে জানালেন, ‘তাইজুলকে খেলাতে হলে একজন পেসারকে বাদ দিতে হবে। সেক্ষেত্রে যে নামটি আসছে সেটি হলো…শফিউল। কেননা তাসকিন ভালো করছে, মাশরাফিতো আছেই। আর যদি সিমিং কন্ডিশন হয় তাহলে তিনজন পেসার খেলানো উচিত। তবে উইনিং কম্বিনেশন রাখা ভালো। স্পিনে সাকিব আছে। ওদেরও বাঁহাতি ব্যাটসম্যান আছে, তাই নাসির ও মোসাদ্দেককে দরকার হবে। তবে এখন যে কম্বিনেশনটি আছে সেটাই সেরা।’

ফিল্ডিং? ‘গত ম্যাচের মতো করলেই হবে’ বলে জানালেন হীরা।

হীরা ব্যাটিংয়ে ওপেনার তামিমকে পরামর্শ দিলেন এভাবে, ‘অবশ্যই ভালো খেলতে হবে। যেহেতু চিটাগংয়ের ছেলে তাই নিজের মাঠের সুবিধা ওর আদায় করে নেয়া উচিত। পুল শটগুলো শতভাগ কাজে লাগাতে হবে। বাংলাদেশের ইনিংসটি ওকেই গড়তে হবে।’

‘মুশফিককে স্লগ সুইপটা সাবধানে খেলতে হবে। কারণ স্লগ সুইপ থেকে ছয় মারার মতো যথেষ্ট শক্তি সে পাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। প্রথম শটে ছয় মারলেও দ্বিতীয়টি ঠিকই বাউন্ডারি লাইনে ধরা পড়বে। সেক্ষেত্রে তাকে কবজির টেকনিক প্রয়োগ করে খেলতে হবে। কবজি রোল করাতে হবে।’-যোগ করেন হীরা।

ইমরুল, সাব্বির ও রিয়াদের ব্যাপারে হীরার মন্তব্য, ‘ইমরুল স্বাভাবিক খেলাটি খেললেই হবে। সাব্বির আফগানিস্তানের বিপক্ষে যে ইনিংসটি খেলেছে তেমন আরেকটি ইনিংস খেললে চলবে। রিয়াদ ঠিক আছে।’ আর সাকিবের প্রসঙ্গে বললেন ‘ওকে ভালভাবে হাল ধরতে হবে। ইনিংস গড়তে হবে। সাকিব যখন নামবে, তখন হয়তো ২৫ ওভার বাকি থাকবে। তখন সতর্ক থেকে খেললে দল বড় ইনিংস সংগ্রহ করতে পারবে।’

‘লাকি’ ভেন্যু আর হীরার বাতলে দেয়া পরামর্শ দিয়েই পঞ্চম ইংলিশ বধের উন্মাদনায় মেতে উঠুক টিম বাংলাদেশ।

‘তিন মোড়লের’ এক ঘাতক

এম এরশাদ আলী : ক্রিকেট মাঠে অনেক বছর আধিপত্য ছিল ক্যারিবীয়দের। ওয়ানডে এবং টেষ্ট উভয় সংস্করণেই ছিল সমান দাপট। ক্রিটের নতুন সংস্করণ টি-টোয়েন্টিতে একক আধিপত্য না থাকলেও ক্যারিবীয়ান সাফল্য নেহাত কম নয়।

টি-টোয়েন্টিতে একমাত্র দল হিসেবে দু’বার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিস। আর ছেলেদের পথ অনুসরণ করে তাদের প্রমীলা ক্রিকেটাররাও হয়েছেন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। পিছিয়ে নেই তাদের যুবরাও। সর্বশেষ অনুষ্ঠিত যুব বিশ্বকাপের শিরোপা গেছে তাদেরই ঘরে।

ক্রিকেট মাঠে সম্প্রতি এসব সাফল্য মনে করিয়ে দেয় ব্রায়ান লারা, ক্লাইভ লয়েড, কার্টলি অ্যামব্রোসদের মতো কিংবদন্তী ক্রিকেটাদের কথা। তাদের অনুসারিরাও যে পিছিয়ে নেই তা এখন আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।

তিন বিভাগেই শিরোপা জয়ী ওয়েস্ট ইন্ডিজকে নিয়ে বিশ্ব এখন মাতোয়ারা। তাদের সাফল্যও আবার ক্রিকেট মাঠে এবং ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা-আইসিসিতে আধিপত্য বিস্তার করা তিনটি দেশ ভারত, অস্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ডকে হারিয়ে। ইতিমধ্যে ক্রিকেট বিশ্বে যারা ‘তিন মোড়লের’ খেতাব পেয়েছে। ক্যারিবীয় যুবরা শক্তিশালী ভারতকে হারিয়ে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের শিরোপা জিতেছে। বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়ে তারা জানান দিয়ে রাখলো ক্রিকেটে ক্যারিবীয় আধিপত্য কখনোই শেষ হবে না। এদিকে তাদের প্রমীলাদের কাছে বিধ্বস্ত বিশ্বকাপকে ‘নিজেদের’ করে নেয়া অস্ট্রেলিয়া। তারা শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে প্রথমবার আনন্দের জোয়ারে ভাসিয়েছেন আনন্দপ্রিয় দ্বীপবাসীদের। আর গতকাল স্যামুয়েলস-গেইল-ব্র্যাথওয়েটদের বুনো উল্লাসে মেতে ওঠার সাক্ষী তো পুরো বিশ্ব। ‘ভয়ংকর সুন্দর’ ক্রিকেট খেলে তারা হারিয়ে দিয়েছেন ক্রিকেটের জন্মভূমি ইংল্যান্ডকে। টি-টোয়েন্টিতে ‘ডাবল’ জয়ের রেকর্ড করেছেন স্যামিরা।

তাই ওয়েস্ট ইন্ডিজের ‘ট্রেবল’ জয়ের সাফল্য ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে ভিন্নমাত্রা পেয়েছে। ক্রিকেটে রাজনৈতীক প্রভাব কেউ দেখতে চায় না। অনৈতিক সুবিধা নিয়ে কোন দেশ ক্রিকেটে সাফল্য পাবে আর ক্রিকেটের সৌন্দর্য নষ্ট হবে এমনটা করোই কাম্য নয়। ফেসবুক, টুইটারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্রিকেটভক্তরা এভাবেই তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। বিশ্বকাপের ‘ট্রেবল জয়ী’ ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ডকে শুভেচ্ছার বন্যায় ভাসিয়েছেন ভক্তরা। ক্রিকেটের স্পিরিটে কালিমা যেন না লাগে এই বার্তাই দিয়েছেন তারা। তাদের একটাই চাওয়া জয় হোক ক্রিকেটের।

পরিবর্তন আসুক আমাদের মানসিকতায়

শায়খ মিশন : সাম্প্রতিক সময়ে উপমহাদেশের কোন দলের কাছে বাংলাদেশ হেরে গেলেই তা নিয়ে দর্শকদের মধ্যে এক ধরনের ক্ষোভ দেখা যায়। বিশেষ করে ২০১৫ সালের কোয়ার্টার ফাইনালে ভারতের কাছে হেরে যাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। চলমান বিশ্ব টি-টোয়েন্টিতে কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে সে অবস্থা এখন চরম আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন খেলোয়ারের পেজে দুই দেশের বাগবিতণ্ডা এখন অকথ্য বা অশ্রাব্য পর্যায়ে চলে গিয়েছে, যেটা মোটেও কাঙ্ক্ষিত নয়।
ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে বাংলাদেশ হেরে যাওয়ার পর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে ভারতীয় সমর্থকদের অত্যন্ত তীর্যক ও অপ্রকাশ্য মন্তব্য করতে দেখা যায়। প্রত্যুত্তরে বাংলাদেশের সমর্থকরাও একই ধরনের অকথ্য মন্তব্য করতে থাকেন। এর আগে এশিয়া কাপে পাকিস্তান বাংলাদেশের কাছে হেরে যাওয়ার পর পাকিস্তানের সমর্কথকদের সাথেও একই পরিস্থিতির তৈরি হয়। এছাড়াও অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে নেপালের বিপক্ষে ম্যাচেও নেপালী সমর্থকদের সাথে এই বাকযুদ্ধ লক্ষ্য করা গিয়েছে। যদিও এডমিন থেকে অনেককেই ব্যান করা হয়েছে, তবুও সংখ্যায় তারা এত বেশি যে কিছু অংশ থেকেই যাচ্ছে।
বাংলাদেশের ক্রিকেট আজ অনেকটাই বদলে গেছে, টাইগাররা এখন বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম পরাশক্তি। বাংলাদেশ এখন ভাল খেলে বলেই অন্য দেশের সমর্থকরা বাংলাদেশকে নিয়ে ভাবে, আমাদের বিপক্ষে তারা এখন জেতার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। কিন্তু তাই বলে আমাদেরও ভাষা নির্বাচনে সংযত থাকা উচিত। ক্রিকেটের বদলে যাওয়ার পাশাপাশি একটা ‘স্মার্ট ক্রিকেটিং ন্যাশন’ হিসেবেও আমাদের আত্মপ্রকাশ করার এখনই সময়। সে কারণে আমাদের কখনই অন্য দেশের সমর্থকদের সাথে অশ্রাব্য বাক্য বাণে লিপ্ত হওয়া উচিত নয়। আমরা অবশ্যই খেলা অথবা খেলোয়ারদের গঠনমূলক সমালোচনা করতে পারি, কিন্তু তাই বলে কুরুচিপূর্ণ কোন বক্তব্য অবশ্যই না। আবেগ থাকবেই, তবে পার্শ্ববর্তী দেশের সমর্থকদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখাটাই শ্রেয়।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে মাশরাফিকে নিয়ে সুনীল গাভাস্কারের মন্তব্যের পর অনেকেই এর পক্ষে বিপক্ষে মত দিয়েছেন। অনেকে আবার ভাষার শেষ সীমাও অতিক্রম করে গিয়েছেন। ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহর বাজে শট সিলেশনের পরও অনেকে তাদের নিয়ে খারাপ মন্তব্য করতে থাকেন। সমালোচনা বা গঠনমূলক আলোচনা চলতেই পারে, তবে সবারই উচিত মন্তব্য প্রকাশে সংযত থাকা। এর আগেও সাকিব কিংবা তামিমের ফর্মহীনতায়ও তাদের শুনতে হয়েছে খারাপ মন্তব্য। কিছু ভাল জয়ের পর যেমন কোন দল বা খেলোয়ারকে নিয়ে সহসাই অত্যুক্তি করা উচিত না, তেমনি আবার হেরে গেলেই সেই দল বা খেলোয়ারকে যা নয় তাই মন্তব্য করাও অনুচিত। খেলায় ভুল বা পরাজয় ঘটতেই পারে, আলোচনা-সমালোচনাও করা যাবে না তাও বলছি না। তবে সব কিছুই একটা নির্দিষ্ট মাত্রার মধ্যে থাকাটাই বাঞ্ছনীয়।
বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম উদীয়মান পরাশক্তি হিসেবে আমরা এখন যথেষ্টই শক্তিশালী দল। আশা করি, সামনে আমরা আরও এগিয়ে যাব, একদিন হয়তো আমাদেরই হাতে থাকবে বিশ্বকাপ ট্রফি। কিন্তু খেলার উন্নতির পাশাপাশি সমর্থক হিসেবে আমাদের মানসিকতারও উন্নতি প্রয়োজন। ধীরে ধীরে আমরা যেন একটি সভ্য ও সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য ক্রিকেট জাতি হিসেবে পরিগণিত হতে পারি, এখন থেকেই তার চর্চা করাটা দরকার। আমাদের মনে রাখা উচিত, সম্মান দিলেই সেটা পাওয়া সম্ভব। শেষমেষ প্রত্যাশা এটাই যে, খেলায় উন্নতির পাশাপাশি সমর্থক ও জাতি হিসেবেও আমরা বিশ্ব অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান শীর্ষ পর্যায়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হব। সে প্রত্যাশার প্রাপ্তির অপেক্ষায় রইলাম!
লেখক পরিচিতি : কম্পিউটার প্রকৌশলী

তাসকিনে নিষেধাজ্ঞা এবং আইসিসির ‘থলের বিড়াল’

হুসাইন আজাদ : বিধি অনুযায়ী, বোলারের যে নির্দিষ্ট ডেলিভারি সন্দেহজনক মনে হয়েছে, সেই ডেলিভারির ব্যাপারেই সুনির্দিষ্ট করে অফিসিয়ালদের রিপোর্ট করার কথা। হয়নি তা। অফিসিয়ালরা কেবল রিপোর্ট করলেন ‘তার অ্যাকশন সন্দেহজনক’। এই উল্টো অভিযুক্ত অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে হলো নির্বিচারে ‘অ্যাকশন’ পরীক্ষা। এবার ফলাফল।
বোলার যে তিন ধরনের ডেলিভারি দিয়ে থাকেন, তার মধ্যে স্টক ও ইয়র্কারে কোনো ত্রুটি ধরা পড়লো না। ত্রুটি ধরা পড়লো অবিশ্বাস্যভাবে মাত্র ৩ মিনিটের মধ্যে বাধ্য হয়ে ছোঁড়া ৯টি বাউন্সারের ৩টিতে, যে ৩টির গতি আবার অন্য ৬টির চেয়ে অনেক কম ছিল। বিস্ময়করভাবে এই ৩টির ত্রুটিকেই ধরা হলো ভিত্তি।
এমন বিতর্কিতভাবে ওই ৩টিকে ভিত্তি ধরা হলেও বিধি অনুযায়ীই সরাসরি নিষেধাজ্ঞা জারির কথা নয়, সর্বোচ্চ সতর্ক করে দেওয়ার কথা এই বলে যে, ‘তুমি এ ধরনের বল করা থেকে বিরত থাকবে। যদি আবার ছোঁড়ো, তবে দ্বিতীয়বার রিপোর্টেড হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারো।’
হলো না তা-ও। নিজেদের বিধি লঙ্ঘন করেই জারি হলো সরাসরি নিষেধাজ্ঞা। আরও বিস্ময়কর, হাস্যকর ও তামাশার ব্যাপার, যেই ডেলিভারিতে অভিযুক্ত করে বোলারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হলো, রিপোর্টের ম্যাচে সেই ডেলিভারিই দেননি ‘বলি’ হওয়া বোলার।
এমন ‘তামাশা’র শিকার হয়ে ‘বলি হওয়া’ বোলারের নাম তাসকিন আহমেদ। ক্রিকেটের এই সময়ের পেসারদের মধ্যে প্রধান সারির ‘গতিদানব’। আর এই ‘তামাশার নাটক’ মঞ্চস্থ করায় অভিযুক্ত খোদ ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসি। আইসির পেছনের কলকাঠির পরিচালক হিসেবে নাম আসছে ক্রিকেটের একটি মোড়ল দেশের।
নিজেদের বিধি নিজেরা লঙ্ঘন করে তাসকিন আহমেদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির ফলে আইসিসির ষড়যন্ত্রের ‘থলের বিড়াল’ বেরিয়ে পড়েছে বলে তুমুল সমালোচনা চলছে পুরো ক্রিকেটবিশ্বে। সমালোচনার ঝড় বইছে ফেসবুক-টুইটারসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সমালোচনায় বিদ্ধ হচ্ছে ক্রিকেটের অভিযুক্ত মোড়ল রাষ্ট্রটিও।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মতো আসরের মাঝপথে শনিবার (১৯ মার্চ) প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আরাফাত সানি ও তাসকিন আহমেদের ওপর নিষেধাজ্ঞার কথা জানায় আইসিসি। সানির ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট করে বলা হয়, ‘তার কনুই বল ছোঁড়ার সময় সীমা লঙ্ঘন করে’। কিন্তু তাসকিন আহমেদের ব্যাপারে একেবারেই অস্পষ্ট করে বলা হয়, ‘তার সব ডেলিভারি বৈধ নয়’।
এ নিয়ে সন্ধ্যায়ই ক্ষোভ প্রকাশ করেন বোলিং অ্যাকশন ইস্যুতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) আইনজীবী হয়ে কাজ করা সুপ্রিম কোর্টের ব্যারিস্টার মুস্তাফিজুর রহমান খান। তিনি আইসিসির ধারা, তাসকিনের পরীক্ষার প্রক্রিয়া ও পরবর্তী পদক্ষেপের বিস্তারিত তুলে ধরেন তার একটি ফেসবুক পোস্টে। সেখানে এ আইনজীবী বলেন, ফাইজলামির একটা সীমা আছে। এই নিষেধাজ্ঞা প্রহসন। তাসকিন অবিচারের শিকার হয়েছেন।
মুস্তাফিজুর রহমান খান বলেন, আইন অনুসরণ করলে তাসকিন আহমেদকে সর্বোচ্চ সতর্ক করা যায় নির্দিষ্ট ডেলিভারিটির ক্ষেত্রে, কিন্তু নিষিদ্ধ করার সুযোগ নেই। তারপরও নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে আইসিসি তাদের তৈরি করা নিয়ম নিজেরাই ভেঙেছে।
যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, বোলিং অ্যাকশন সম্পর্কিত আইসিসির আইনের ২.২.৬ ধারায় বলা আছে, যে ডেলিভারির জন্য আম্পায়াররা বোলারকে সন্দেহ করেছেন, ল্যাব পরীক্ষায় সেই নির্দিষ্ট ডেলিভারিই করে দেখাবেন বোলার। কিন্তু অফিসিয়ালরা তাসকিনকে নির্দিষ্ট কোনো ডেলিভারির জন্য অভিযুক্ত করেননি। কেবল বলেছেন, ‘তার অ্যাকশন সন্দেহজনক’। ‍আম্পায়ারদের অভিযোগটাই ভুল।
তাদের ইচ্ছে অনুযায়ী পরীক্ষা হওয়ার পরও তাসকিন যে ধরনের বল করে থাকেন তার মধ্যে স্টক ও ইয়র্কারের অ্যাকশনে কোনো ঝামেলা হয়নি। অ্যাকশনে ত্রুটি ধরা পড়েছে কেবল তার বাউন্সারে। হিমাচলের ধর্মশালার বৈরী পরিবেশে টানা তিন ম্যাচ খেলে ক্লান্ত হয়ে আইসিসির ল্যাবে যাওয়ার পর হিমাচলে টানা তিন ম্যাচ খেলে ক্লান্ত তাসকিনকে মাত্র ৩ মিনিটে অবিশ্বাস্যভাবে ৯টি বাউন্সার করানো হয়েছে। এরমধ্যে ৬টি বাউন্সারেরই অ্যাকশন বৈধ ছিল। ত্রুটি ছিল ৩টির, যে ৩টির গতি আবার বেশ কম ছিল অন্য ৬টির তুলনায়। অথচ এই ৩টির ভিত্তিতেই তার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হলো।
মজার ব্যাপার হলো, যে ম্যাচে তাসকিনের অ্যাকশন নিয়ে আইসিসির অফিসিয়ালরা সন্দেহ প্রকাশ করেন, সে ম্যাচে তিনি কোনো বাউন্সারই দেননি। যদিও আইসিসির ২.২.৬ ধারাতেই বলা আছে, ‘যে ম্যাচে সন্দেহে পড়বেন সেই ম্যাচের করা নির্দিষ্ট ডেলিভারির বাইরে অন্য কোনো ডেলিভারি এই পরীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত নয়’।
মুস্তাফিজুর রহমান খান বলেন, বোলিং অ্যাকশন নিয়ে মাঠের দুই আম্পায়ারের সন্দেহ প্রকাশ থেকে শুরু করে ল্যাব পরীক্ষার পর নেওয়া কোনো সিদ্ধান্তেই আইসিসি নিজেদের নিয়ম নিজেরা অনুসরণ করেনি।
বিসিবির এ আইনজীবী স্পষ্ট করে বলেন, তাসকিন অবিচারের শিকার। আমি বিসিবিকে ধারাগুলো নির্দিষ্ট করে এর আওতায় সংশ্লিষ্ট কোর্টে আবেদন করার পরামর্শ দিয়েছি।
মুস্তাফিজুর রহমান খানের ফেসবুক পোস্টটি ছড়িয়ে পড়তেই আইসিসিবিরোধী বিতর্কের আগুনে যেন ঘি পড়ে যায়। প্রশ্নবিদ্ধ পরীক্ষার প্রক্রিয়া নিয়ে ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে সমালোচনার শূলে চড়াচ্ছেন টাইগার ক্রিকেটপ্রেমীরা। তাদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এই প্রশ্নবিদ্ধ পরীক্ষা প্রক্রিয়াই আইসিসির নির্লজ্জ ষড়যন্ত্রের ‘থলের বিড়াল’ বের করে দিয়েছে। আর এই ষড়যন্ত্রের পেছনে ক্রিকেটের একটি মোড়ল রাষ্ট্রকেও সরাসরি দায়ী করছেন তারা।
খোদ টাইগার অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজাও তাসকিনের ওপর নিষেধাজ্ঞাকে মানতে পারছেন না। তিনি রোববার (২০ মার্চ) বেঙ্গালুরুতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে কেঁদেই ফেলেন। বলেন, ‘তাসকিনের বোলিং অ্যাকশনে কোনো ত্রুটি ছিল না। তারপরও কেন তাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে? এর উত্তর আমার জানা নেই। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, তাসকিনের প্রতি সুবিচার করা হয়নি।’ এজন্য বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে (বিসিবি) দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম কামাল তার ফেসবুক পোস্টে বলেন, ‘প্রিয় বিসিবি, ‘আইছিছি’র সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সুইজারল্যান্ডের লুজানে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালতে যান। যা করার দ্রুত করুন। গোটা বাংলাদেশ আপনাদের সাথে থাকবে। আপনারা যদি লড়তে পারেন, তবে ইতিহাস সৃষ্টি করবেন। ‘আইছিছি’কে ‘আইসিসি’ বানাতে পারবেন।’
আইসিসির এ নিষেধাজ্ঞা হাস্যকর ও নিন্দনীয় অভিহিত করে লেখক ফরিদুল ইসলাম নির্জন তার ফেসবুকে বলেন, ‘এখন বিশ্বজুড়ে কনে পক্ষের লোক আইসিসির চাকরির কথা শুনলে মেয়ে বিয়ে দিতে চায় না।’
মনির হোসেন মনির নামে এক ক্রিকেটপ্রেমী স্পষ্ট করে বলেন, ‘এটা বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে ভারতীয় গভীর চক্রান্তের অবৈধ নীলনকশা।’
ক্রিকেটপ্রেমী আরিফ‍ুর রহমানের মতে, এই নিষেধাজ্ঞা পাড়ার খেলার মতো। অমুক অমুক ভালো খেলোয়াড় প্রতিপক্ষে খেলতে পারবেন না। তারা খেললে দুই দলের শক্তি সমান থাকবে না। আবার এমনও, মাঠে ফিল্ডার বসে থাকার ভিত্তিহীন অজুহাতে বড় ভাই আম্পায়ারের নো কল করা। আইসিসি একটি ক্রিকেটের মোড়ল রাষ্ট্রের দালাল হয়ে কাজ করছে। যে রাষ্ট্রের গণমাধ্যমে এখন তাসকিনের রক্তাক্ত ‍মুণ্ডু ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
আরিফুর বলেন, এই প্রশ্নবিদ্ধ পরীক্ষা ও তার ফলাফল পরবর্তী পদক্ষেপের মাধ্যমে আসলে আইসিসি যে নির্লজ্জ ষড়যন্ত্র করেছে, সেটাই থলে থেকে বিড়াল হয়ে বেরিয়ে গেল।
এ বিষয়ে প্রায় সব ক্রিকেটপ্রেমীই বিসিবিকে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেন। অন্যথায় ভবিষ্যতে আরও বেশি ভুগতে হবে বলে সতর্ক করেন তারা।
-বাংলানিউজ

সময়ের হাত ধরে ক্রিকেটে বাংলাদেশের উত্থান

অন্য অনেক দেশের মতই বাংলাদেশের প্রথম পছন্দের খেলা ছিল ফুটবল। এখনও গ্রাম-গঞ্জে বড় কোন ফুটবল ম্যাচ আয়োজন হলে হাজার হাজার মানুষ মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে যায় খেলা দেখতে। ফুটবলের প্রতি মানুষের ভালবাসা যেন আদি এবং অকৃত্রিম। বিশ্বকাপ ফুটবল এলেই দেখা যায়, এ দেশের প্রায় প্রতিটি বাড়ির ছাদে উড়বে ব্রাজিল না হয় আর্জেন্টিনা, জার্মানি কিংবা স্পেনের পতাকা। দেখে মনে হবে যেন, প্রতিটি বাড়িতেই একএকটি দেশের উপনিবেশ।

সত্যিই এক মাসের জন্য, বাংলাদেশের ঘরে ঘরে যেন উপনিবেশ কায়েম করে ব্রাজিলের সুপার পাওয়াররা। ফুটবলের এমন জনপ্রিয়তাকে ছাপিয়ে বাংলাদেশে ক্রিকেটই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। সেই ৮০’র দশকেও ক্রিকেটের সঙ্গে পরিচিত ছিল না খুব বেশি মানুষ। ৯০-এর দশক থেকে পরিচিত হয়ে উঠতে উঠতে ১৯৯৭ সালে এসে প্রবল পরাক্রমে বাড়তে থাকে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা।

কিভাবে, কখন থেকে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করে- সেটাই তুলে ধরা হলো পাঠকদের সামনে-

প্রথম আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা ১৯৭৯ সালে ইংল্যান্ডে আইসিসি ট্রফিতে। একদিনের ম্যাচে বাংলাদেশের বিশ্ব ক্রিকেটে অভিষেক এশিয়া কাপ দিয়েই। তখন এশিয়া কাপে একদিনের ম্যাচ হতো। সেটা ১৯৮৬ সালের ৩১ মার্চ এবং প্রথম ম্যাচটাই বাংলাদেশকে খেলতে হয়েছিল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। যে পাকিস্তানকে হারিয়ে এবার ফাইনালে পৌঁছে গিয়েছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার্সরা। দশ নম্বর দেশ হিসেবে ২০০০ সালে প্রথম টেস্ট ক্রিকেট খেলার ছাড়পত্র পায় বাংলাদেশ। সেটা হয়েছিল ঢাকায় ভারতের বিরুদ্ধে। আবার সেই ভারতের সামনে বাংলাদেশ। এবার এশিয়া কাপ ফাইনাল।

এত বছরে অনেক প্রতিবন্ধকতাকে কাটিয়ে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। অতীতে যে সাফল্যের মুখ দেখেনি তা নয়; কিন্তু সেটা ধারাবাহিক ছিল না। একটি ম্যাচ জয় তো চারটিতে হার। তবে এ বছর এশিয়া কাপের শুরু থেকেই নিজেদের প্রতি মুহূর্তে চিনিয়েছেন মাশরাফি, সাকিবরা।

একটা সময় পর্যন্ত বাংলাদেশে সব খেলার সেরা বাঙালির ভুমি ফুটবলই ছিল। কিন্তু একটু একটু করে বাংলাদেশ ক্রিকেটের উত্থানে মানুষ ক্রিকেটপ্রেমী হতে শুরু করে। ১৯৯০ থেকে বাংলাদেশ ক্রীড়াক্ষেত্রের দখল নেয় ক্রিকেট। ১৯৯৭ সালে মালয়েশিয়ায় প্রথম আইসিসি ট্রফি জিতে ইংল্যান্ডে ১৯৯৯ বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন করে নেয় বাংলাদেশ ক্রিকেট টিম। এটা ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেটের সব থেকে বড় সাফল্য এবং প্রথম বিশ্বকাপেই পাকিস্তানকে ৬২ রানে হারিয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশ। হারিয়েছিল স্কটল্যান্ডকেও। তখনও আইসিসির সম্পূর্ণ সদস্য হতে পারেনি তারা। তখন অ্যাসোসিয়েট মেম্বার হিসেবেই বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন করেছিল বাংলাদেশ। ২০০০-এর ২৬ জুন বাংলাদেশকে সম্পূর্ণ সদস্যপদ দেয় আইসিসি।

খারাপ সময়ও কম যায়নি। পর পর সব থেকে বেশি টেস্ট ম্যাচ হারের রেকর্ড রয়েছে বাংলাদেশেরই। এর সঙ্গে বিশ্বকাপে ওই দুটো ম্যাচ জয়ের পর আবার বাংলাদেশ একদিনের ম্যাচে জয়ে ফেরে জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে ২০০৪ সালে। বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট সিরিজ জয় ২০০৯ এ ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে। ৩১২টি একদিনের ম্যাচ খেলে ৯৮টি জিতেছে বাংলাদেশ। টি২০ খেলেছে ৫৪টি। জয় মাত্র ১৮টিতে।

র‌্যাংকিংয়ের দিক থেকেও সেরা ফর্মে রয়েছে বাংলাদেশ। টেস্টে ৯, ওয়ানডে তে ৭, টি২০-তে এই মুহূর্তে রয়েছে ১০ নম্বর স্থানে। এশিয়া কাপ শেষে টি২০ র‌্যাংকিংয়ে যে অনেকটাই উত্থান হবে সেটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

আল আমিনের ফিরে আসা

যখনই তাঁর হাতে বল তুলে দেওয়া হয়েছে, আস্থার প্রতিদান দিয়েছেন আল আমিন২০১৫ সালটা আল আমিনের কাছে অম্লমধুর এক বছর। গত বছর বাংলাদেশ দল উড়িয়েছে একের পর এক সাফল্যের পতাকা, আর সেটা দূর থেকেই দেখতে হয়েছে তাঁকে। হয়তো কখনো কখনো বুক চিড়ে দীর্ঘশ্বাসও বেরিয়ে এসেছে, ‘যদি থাকতে পারতাম দলে’!
গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়ায় ‘শৃঙ্খলা ভঙ্গের’ অভিযোগে হঠাৎ বিশ্বকাপ শেষ হয়ে গিয়েছিল আল আমিনের। সেই যে বাদ পড়লেন, প্রায় পুরোটা বছর থাকতে হলো দলের বাইরে। লম্বা এক বিরতির পর বাংলাদেশ দলে ফিরলেন গত নভেম্বরে, জিম্বাবুয়ে সিরিজে। দারুণ বোলিংয়ে বোঝালেন, কেন তাঁকে দলে দরকার।
গত নভেম্বর-ডিসেম্বরে বিপিএলে দুরন্ত আল আমিনকেই দেখা গেল। বরিশাল বুলসের হয়ে সিলেট সুপার স্টারসের বিপক্ষে সেই হ্যাটট্রিকটা দর্শকদের স্মৃতিতে গেঁথে থাকবে বহুদিন! হ্যাটট্রিকটা করেছিলেন কাকে বোল্ড করে মনে আছে? টেকনিকে দেশের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিমের মিডল স্টাম্প আক্ষরিক অর্থেই ভেঙে দিয়েছিলেন! গতি আর সুইংয়ের মিশেলে সেই ডেলিভারিটা বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যানও খেলতে পারতেন কিনা সন্দেহ!
এবার এশিয়া কাপেও স্বরূপে আল আমিন। ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে বাংলাদেশকে প্রথম উইকেট এনে দিয়েছিলেন তিনিই। সেদিন ভারতীয় ওপেনার শিখর ধাওয়ান তো আল আমিনের বলটা বুঝতেই পারেননি। দলের সর্বোচ্চ ৩ উইকেট পেলেও ম্যাচ শেষে মুখে হাসি ছিল না তাঁর, দল যে হেরে গেছে! শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেও আল আমিন দুর্দান্ত, পেলেন দলের সর্বোচ্চ ৩ উইকেট। হাসিটা অটুট রইল ম্যাচ শেষেও। কারণ, দল পেয়েছে দারুণ জয়।
পাকিস্তানের বিপক্ষে চনমনে আল আমিনকেই পাওয়া গেল। পেলেন আবারও সর্বোচ্চ ৩ উইকেট। যখনই তাঁর হাতে বল তুলে দেওয়া হয়েছে, নিয়মিত উইকেট শিকারে আস্থার প্রতিদান দিয়েছেন অধিনায়কের। এ পর্যন্ত টুর্নামেন্টে আল আমিন নিয়েছেন ১০ উইকেট, বাংলাদেশের পক্ষে তো বটেই, এশিয়া কাপের মূল পর্বে খেলা দলগুলোর মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ।
টি-টোয়েন্টিতে তিনি কতটা ধারাবাহিক, এই পরিসংখ্যানেই তার প্রমাণ মিলবে। ক্রিকেটের ছোট সংস্করণে আল আমিনের অভিষেক ২০১৩ সালের নভেম্বরে, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। আল আমিনের অভিষেকের পর বাংলাদেশ যতগুলো টি-টোয়েন্টি খেলেছে, এর মধ্যে সবচেয়ে সফল বোলার তিনি। এ সময়ে ১৭টি টি-টোয়েন্টিতে নিয়েছেন ৩০ উইকেট। ২০ ম্যাচে ২২ উইকেট নিয়ে এর পর সাকিব আল হাসান।
নামের পাশে কতটি উইকেট যোগ হলো, এ নিয়ে অবশ্য কোনো ভাবনা নেই আল আমিনের, ‘আসলে কত উইকেট পেলাম, তা নিয়ে ভাবি না। আমার কাছে উইকেট নেওয়ার চেয়ে দলে অবদান রাখাটা গুরুত্বপূর্ণ। সব সময়ই সেটাই করার চেষ্টা করি।’
আল আমিনের চ্যালেঞ্জ
চার বছর পর আবার বাংলাদেশ উঠল এশিয়া কাপের ফাইনালে। মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে পাকিস্তানের বিপক্ষে ২০১২ এশিয়া কাপের ফাইনালে সাকিব আল হাসান-মুশফিকুর রহিমদের সেই কান্না কি আল আমিনকেও স্পর্শ করেছিল? জাতীয় দলে তখনো তাঁর আসা হয়নি। মিরপুর একাডেমি ভবনে বসে দেখেছিলেন কান্নাভেজা ফাইনাল। সেদিনের স্মৃতি মনে করে বললেন, ‘অমন হারে কার না খারাপ লাগে। খুব কষ্টই পেয়েছিলাম।’
সময় আল আমিনকে দাঁড় করিয়েছে নতুন চ্যালেঞ্জের সামনে। এখন তিনি বাংলাদেশ দলের সদস্য, মাশরাফি-মুশফিকদের সঙ্গে তিনিও অধরা শিরোপা জয়ের সন্ধানে নামবেন রোববারের ফাইনালে। ভারতের বিপক্ষে ফাইনাল নিয়ে অবশ্য তাঁকে খুব একটা রোমাঞ্চিত দেখাল না। তবে ইতিহাস গড়ার স্বপ্নটা ঠিকই উঁকি দিচ্ছে বাংলাদেশ দলের এই পেসারের মনে, ‘আর দশটা ম্যাচের মতোই ভাবছি ফাইনালটা। যখন মাঠে নামি, কিছুই মাথায় থাকে না। থাকে শুধু একটা জিনিস—ভালো করতে হবে।’
এখন এশিয়া কাপের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণী মঞ্চেও দুরন্ত আল আমিনের দেখার অপেক্ষায় সবাই।

মাশরাফির ‘নেতা’ হয়ে ওঠার নেপথ্যে

নেতাই তো। মাশরাফি বিন মুর্তজা একজন নেতা। জাদুকরী নেতৃত্ব দিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটকে বদলে দেওয়া এক নেতা। যিনি দলের জন্য নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দেন, দেশের স্বার্থে নিজের শরীর-পরিবার সবই তুচ্ছ তার কাছে। তিনি আশ্চর্য নেতৃত্বগুণে পুরো দলকে, পুরো দেশকে উজ্জীবিত করে তোলেন। এমন জাদুকরী যার দক্ষতা, দেশের প্রতি যার এমন টান। তিনি শুধু একজন ক্রিকেটারই নন, তিনি নেতাও।

মাশরাফির নেতৃত্বেই গত দেড় বছর ধরে নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসে সেরা সময় পার করছে বাংলাদেশ। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলা, পাকিস্তান, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জয়, সর্বশেষ দ্বিতীয়বারের মতো এশিয়া কাপের ফাইনালে ওঠা- প্রতিটিতে দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন মাশরাফি।

তবে নেতা হয়ে ওঠা মোটেই সহজ ছিল না মাশরাফির জন্য। পোড়াতে হয়েছে অনেক কাঠখড়। দুই হাঁটুতে যার সাত-সাতবার অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছে, তার ক্রিকেট খেলাটাই তো অবিশ্বাস্য ব্যাপার! সেখানে অসাধারণ নেতৃত্ব দিয়ে দলকে একের পর এক ম্যাচ জেতাচ্ছেন। হয়ে উঠেছেন সত্যিকারের নেতা। কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকাকে দেওয়া দীর্ঘ এক সাক্ষাৎকারে বিভিন্ন কথার ফাঁকে এই ‘নেতা’ হয়ে ওঠার পেছনের গল্পটাও বলেছেন মাশরাফি।

গৌতম ভট্টাচার্যের নেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে অধিনায়কত্ব নিয়ে মাশরাফি বলেন, ‘আমি যখন ক্যাপ্টেন হই তখন ক্যাপ্টেন্সি নিয়েই আমার কোনও ধারণা ছিল না। বাবার সঙ্গে কথা বলি যে এত চোটাআঘাত আর শরীরে সাতটা অপারেশন নিয়ে আমার ক্যাপ্টেন হওয়া আদৌ উচিত কি না? বাবা বললেন, হয়েই যাও। তুমি পারবে। কিন্তু আমার মনে সেই ভয়। আবার না ইনজিওর্ড হয়ে যাই। ভাবলাম কেমন ক্যাপ্টেন হব আমি? মনে হলো আমি যেমন আবেগপ্রবণ সৌরভ গাঙ্গুলির স্টাইলের ক্যাপ্টেন্সিটাই আমায় স্যুট করবে। ওই যে লর্ডসে জার্সি খোলা ওটা নিয়ে কত কথা হয়েছে। কিন্তু আবেগ চাই ওটা করার জন্য।’

মনে হলো আপনার সেই আবেগ আছে- এমন প্রশ্নে বাংলাদেশ অধিনায়ক বলেন, ‘হ্যাঁ। তারপর ঠিক করলাম ড্রেসিংরুমটাকে ঠিক রাখতে হবে। ম্যাচ বাই ম্যাচ ভাবব। একসঙ্গে অনেকটা নয়। আর জুনিয়র-সিনিয়রে কোনো গ্যাপ হতে দেব না। ইউটিউবে অনেক ক্যাপ্টেনের ইন্টারভিউ এই সময় দেখে আমি ক্যাপ্টেন্সি ব্যাপারটা বুঝতে চেষ্টা করেছি। একটা শো রয়েছে ওখানে, যেখানে ভিভিএস লক্ষ্মণ আর দাদা (সৌরভ গাঙ্গুলি) ৪৫ মিনিট কথা বলেছে। ওইটা শুনে আমি ঠিক করি ক্যাপ্টেন হিসেবে আমি কী ভাবে এগোব। ম্যাচ হারতে পারি কিন্তু আবেগটা যেন রিয়েল হয়। যেন সব সময় টিম সেরাটা দেয়।’

অনেক সময় বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের অনেকেই ‘হিরো’ মনে করেন। তবে মাশরাফির কাছে সবচেয়ে বড় হিরো বাংলাদেশের বীর মুক্তিযোদ্ধারা। মাশরাফি বলেন, ‘সবচেয়ে বড় হিরো আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা। তাদের জন্যই তো আজ স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা রয়েছি। আমি ওদের অসম্ভব সম্মান করি। আমি সম্মান করি বৈজ্ঞানিকদের। ওদের এক-একটা আবিষ্কার জাতিকে কত বছর আগে নিয়ে যায়। আমি সম্মান করি ডাক্তারদের। যারা মানুষের জীবন বাঁচান। এর চেয়ে মহৎ কাজ আর কী হতে পারে। আমাদের নিয়ে যত নাচানাচিই হোক, আমরা কি কারও জীবন বাঁচাতে পারছি?’

ক্রিকেটের পাশাপাশি বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের অন্যান্য বিভাগেও সমর্থন করার আহ্বান জানিয়ে মাশরাফি বলেন, ‘আমি ভেতর থেকে বিশ্বাস করি আমাদের সমর্থন করছেন খুব ভালো। আমার টিম কৃতজ্ঞ। কিন্তু সেই মেয়েটিকেও করুন যে স্যাগ গেমসে (সাউথ এশিয়ান গেমস) চারটে সোনা জিতে সবার অলক্ষ্যে ঢাকা ফিরেছে। আমরা যদি স্পোর্টসের লোক হই তো ওই মেয়েটিও স্পোর্টসেরই লোক। সাপোর্ট জীবনের সব বিভাগে করুন। তা হলেই তো বাংলাদেশ এগোতে পারবে। শুধু ক্রিকেটে পড়ে থেকে কী লাভ!’

মাশরাফি মনে করেন, ভালো ক্রিকেটার হওয়ার সঙ্গে ভালো মানুষ হওয়াটাও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এক প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ অধিনায়ক বলেন, ‘দেখুন আমি শচীনের (টেন্ডুলকার) একটা ইন্টারভিউ পড়েছিলাম। যেখানে ও বলেছিল, ভালো ক্রিকেটার তো অনেকেই হতে পারে। ভালো। সঙ্গে ভালো মানুষ হওয়াটা অনেক ইম্পরট্যান্ট। আমি ওই কথাটা মনে রেখেছি। ক্রিকেট তো ক’দিনের। ভালো মানুষ হিসেবে যেন সবার মনে বেঁচে থাকতে পারি। তাই বলে চোট রয়েছে, সাতবার অপারেশন হয়েছে- এই সহানুভূতি নিয়ে ক্রিকেট খেলতে চাই না। আমার যেন ছোট ছোট কন্ট্রিবিউশন থাকে। কাল (বুধবার) হাফিজের উইকেটটা। আমার দুটো বাউন্ডারি। এগুলোও থাকতে হবে।’

দেশের মাটিতে বাংলাদেশের খেলা মানেই গ্যালারীভর্তি বাংলাদেশি সমর্থক। সমর্থকদের সামনে খেলতে কেমন লাগে- এমন প্রশ্নে মাশরাফি বলেন, ‘আমরা তো ক্রিকেট খেলে আমাদের দেশের জনগণকে কিছু দিতে পারিনি। দিনের পর দিন ওরা হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। তখনও টিমে ভালো প্লেয়ার ছিল। সুমন (হাবিবুল বাশার) ছিল। আশরাফুল ছিল। কিন্তু এক-দুজন ভালো খেলত। টিমটা জিতত না। ২০০৭ ওয়ার্ল্ড কাপের ইন্ডিয়া ম্যাচটা আমরা প্রথম বড় খেলা জিতলাম। ওই ম্যাচটা যত দিন বেঁচে আছি মনে রাখব। কী কী প্লেয়ার ছিল ইন্ডিয়ার। শচীন, রাহুল, কুম্বলে, দাদা (সৌরভ)। ওই ম্যাচ থেকে আমাদের কনফিডেন্স পাওয়া শুরু। ইদানীং আমরা দেশের মাঠে কিছু জিতছি। বলতে পারেন সমর্থকদের কাছে যে ধার-কর্জ হয়েছিল তার কিছু কিছু করে ফেরত দিচ্ছি। এবার বিদেশেও ভালো খেলতে হবে।’

আগামী রোববার এশিয়া কাপের ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে মাঠে নামতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ফাইনালে ভারতকে ভেবারিট মনে করলেও নিজেদের লড়াই করার আত্মবিশ্বাসের কথাও জানালেন মাশরাফি, ‘খুব পরিষ্কারভাবেই ভারত ভেবারিট। এটা তো র‌্যাঙ্কিংয়ে এক নম্বরের সঙ্গে দশ নম্বরের খেলা। আমাদের অবশ্য কনফিডেন্স আছে ভালো লড়ব। মুস্তাফিজকে মিস করছি। কাল (বুধবার) ও থাকলে পাকিস্তান ১০০ করতে পারত না। ও থাকলে ফাইনালে অনেক সুবিধে হত। তবে লড়ব। যা হবে, হবে।’

গত বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে এই ভারতের বিপক্ষেই আম্পায়ারের বিতর্কিত সিদ্ধান্তে হেরে গিয়েছিল বাংলাদেশ। তাই বলে এশিয়া কাপের ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটাকে প্রতিহিংসার ম্যাচ ভাবতে নারাজ মাশরাফি, ‘না কোনো টিমকে চার্জ করার জন্য এই প্রতিহিংসা-টিংসা বলতে হবে আমি বিশ্বাস করি না। অবশ্যই জিততে চাই। কিন্তু তার জন্য কাউকে আঘাত করে কিছু বলতে হবে কেন? টিমকে শুধু এমন অ্যাঙ্গেল থেকেই মোটিভেট করতে হবে কেন? মেলবোর্নের ওই ম্যাচের রেশ আজ আমাদের মধ্যে নেইও।’

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের ভাবনা নিয়ে মাশরাফি বলেন, ‘আস্তে আস্তে হয়তো ছাড়তে হবে। কীভাবে এখনো ঠিক করিনি। টেস্ট ম্যাচটা হিসেবের মধ্যে নেই। যদিও ব্যক্তিগতভাবে আমি স্বপ্ন দেখি একদিন খুব ভালো টেস্ট টিম হয়েছে বাংলাদেশ। ওয়ানডেতে ভালো খেলতে খেলতে বাংলাদেশ প্রথম পাঁচে এসেছে। আমি বেঁচে থাকতে থাকতে বাংলাদেশ বিশ্বকাপ জিতবে কি না জানি না, কিন্তু এগুলো যেন দেখে যেতে পারি।’

স্বপ্ন নিয়ে ক্রিকেট একাডেমিতে

দীপ্ত, মেহেদি, তুর্য, সাপ্তিক- ‌তারা সবাই হতে চান বড় ক্রিকেটার। ক্রিকেটের প্রতি গভীর ভালোবাসা থাকায় বাবা-মাকে রাজি করিয়ে ভর্তি হয়েছেন শেখ জামাল ক্রিকেট একাডেমিতে।
সাকিব-তামিম-মাশরাফি-মুস্তাফিজ হয়ে বাংলাদেশ দলে খেলার স্বপ্ন নিয়ে খুব ভোরে বাবা-মায়ের হাত ধরে নেমে পড়েন ব্যাট-বলের মন্ত্র শিখতে। তাদের মতো আরও অনেক শিশু-কিশোর রয়েছেন ধানমন্ডিতে অবস্থিত এ ক্রিকেট একাডেমিতে।
মাত্র ২০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে গত বছরের জুনে শুরু হয় একাডেমির কার্যক্রম। এখন দুই সেশনে (সকাল ও বিকাল) কোচের দীক্ষা নিতে আসছেন প্রায় দেড়’শ শিক্ষার্থী। ধানমন্ডির এ মাঠটি বেশ বড় ও পরিকল্পিত হওয়ায় বেশ ভালো সুযোগ-সুবিধা পান ক্রিকেটাররা। চারটি নেটে চলে ব্যাটিং-বোলিং অনুশীলন। ১০ দিন অন্তর হয় অনুশীলন ম্যাচও।
অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধার চেয়ে বড় বিষয়, এখানে রয়েছেন দক্ষ ও পরিশ্রমী কোচ। ক্রিকেটার তৈরিতে কাজ করছেন হেড কোচ মোহাম্মদ সেলিম ও সহকারী কোচ মনিরুল ইসলাম তাজ। মোহাম্মদ সেলিম জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার। বাংলাদেশের হয়ে দুটি টেস্ট ও একটি ওয়ানডে খেলেছেন এ উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান। সহকারী কোচ মনিরুল ইসলামের রয়েছে ৯ বছর প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলার অভিজ্ঞতা। খুলনার এ দুই কোচ মিলে ভবিষ্যতের ক্রিকেটার তৈরিতে অবদান রেখে চলেছেন। এখান থেকে ভবিষ্যতের ক্রিকেটার বের করে আনার ব্যাপারে আশাবাদী মোহাম্মদ সেলিম।
আলাপচারিতায় এই কোচ বলেন, এখানে বেশ ভালো কয়েকজন ক্রিকেটার আছে। যাদের ভবিষ্যতে আরও ভালো করার সম্ভাবনা আছে। মাত্র তো ৬ মাস হলো। সাধারণত ব্যাটিংয়ের সকল টেকনিক শিখতেই একটা ছেলের দুই বছর লাগে। মেহেদি, মাহিন, আনাস ওরা পরিশ্রম করলে ভালো জায়গায় খেলতে পারবে।
ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি হতে অভিভাবকদের আগ্রহের প্রসঙ্গটি উঠতে সেলিম বলেন, আমাদের সময়ে ক্রিকেট খেলতে অনেক বিড়ম্বনাই সহ্য করতে হয়েছে। ছাত্রদের বাবা-মায়েরা এসে বসে থাকেন। অনুশীলন শেষে বাচ্চাদের বাসায় নিয়ে যাচ্ছেন। আর আমাদের সময় বাসায় লাঠি প্রস্তুত থাকতো (হাসি..)। অভিভাবকরা বাসায় ঢুকতে দিত না। তারপরও আমরা খেলতে যেতাম। আসলে যাদের ক্রিকেটে আগ্রহ আছে, ভালো করার সম্ভাবনা আছে, তাদের ছোটবেলাতেই ক্রিকেটে আসা উচিত। ক্রিকেটকে এখন পেশা হিসেবে নেয়া যায়।

ক্রীড়াঙ্গনে দেশের সাফল্যের বছর

২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের অর্জনে ক্রিকেটই দেখিয়েছে সাফল্যের পথ। ফুটবলে অনূর্ধ্ব-১৬ সাফ কিংবা অনূর্ধ্ব-১৪ বালিকাদের এশীয় স্তরের সাফল্য প্রমাণ করে এগোচ্ছে ফুটবলও।
ওয়ানডে বিশ্বকাপে আফগানিস্তান, স্কটল্যান্ড ও ইংল্যান্ডকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল। আম্পায়ারদের বিতর্কিত সিদ্ধান্তে কোয়ার্টারে ভারতের সাথে হারেও মাথা-উচুঁ টিম-টাইগার্সের। তার নেতৃত্বেই বছরজুড়ে দেশ-বিদেশে বাংলাদেশের স্মরণীয় ঘটনা রয়েছে।
হোমে পাকিস্তান ও জিম্বাবুয়েকে ওডিআইয়ে হোয়াইটওয়াশ, ভারত ও সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে ২-১ এ দুটি সিরিজ জয়। বছর জুড়ে ১৮ ওয়ানডে’র ১৩টিতে জিতে বিশ্বের দ্বিতীয় সেরা এবং এশিয়ার সেরা ওয়ানডে দল বাংলাদেশ। তরুণ টাইগারদের রাজসিক উত্থানও দেখেছে ২০১৫। টানা সাফল্যে আইসিসি বর্ষসেরা ওয়ানডে দলে মুস্তাফিজুর রহমান।
ক্রিকেটে মেয়েরাও পিছিয়ে ছিলো না। বাছাইপর্বে রানার্সআপ হয়ে ২০১৬ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের মূলপর্বের টিকিট পেয়েছে টিম টাইগ্রেস। সাহস দেখিয়েছেন আইসিসির প্রথম বাংলাদেশী সভাপতি আ.হ.ম মুস্তফা কামাল। অন্যায়ের প্রতিবাদে সভাপতির পদ ছাড়ার সাহসী সিদ্বান্ত নিতে পিছপা হননি এই ক্রিকেট ব্যক্তিত্ব। আর নিরাপত্তা শঙ্কায় অক্টোবরে অস্ট্রেলিয়া দলের বাংলাদেশ সফর বাতিল যে যৌক্তিক ছিলো না তা প্রমাণ হয়েছে সফল বিপিএলের পাশাপাশি জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট দল আর খোদ অস্ট্রেলিয়া ফুটবল দলের বাংলাদেশ সফরে।
২০১৮ বিশ্বকাপ ফুটবলের বাছাই পর্বে এই অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে হোম এন্ড অ্যাওয়ে ম্যাচ খেলা বড় অভিজ্ঞতা ফুটবলারদের জন্য। তবে বিদেশী কোচ লোডভিক ডি ক্রুইফ এবং ফ্যাবিও লোপেজকে বিদায় করে শেষ পর্যন্ত দেশী কোচ মারুফুলের হাতে বাংলাদেশের ফুটবলযাত্রা।
ভারতের কেরালায় সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে ‘টিম-বাংলাদেশ’ এখন কঠিন এক পরীক্ষায়। তার আগে কিশোর ফুটবলে এসেছে সাফল্য। তারুণ্যের জয়জয়কারে সাফ অনূর্ধ্ব-১৬ কিংবা মেয়েদের এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ টুর্নামেন্টে শিরোপা জয় দেখাচ্ছে উজ্জ্বল আগামীর প্রতিশ্রুতি।

নতুনদের উত্থান, কমেছে সাকিব-তামিম নির্ভরতা

সাজ্জাদ খান : প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি সাফল্য নিয়ে ২০১৫ সাল শেষ করেছে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল। শুরুর সাফল্যের ট্রেন বছরের শেষভাগেও ছিল গতিশীল। বছরজুড়ে ধারাবাহিক সাফল্যে দেখিয়ে ২০১৫ সালকে অনেক অর্জনের বছরে রূপ দিয়েছেন ক্রিকেটাররা। সাফল্যের এ ধারায় সবচেয়ে উজ্জ্বল ছিল ওয়ানডের বাংলাদেশ। অবিশ্বাস্যভাবে ১৮ ম্যাচের ১৩টিতে জয় পেয়েছে মাশরাফিবাহিনী। বিশ্বকাপে তিনটি জয়। এরপর সাফল্যের ধারাপাতে দেশের মাটিতে টানা চারটি (পাকিস্তান, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবুয়ে) ওয়ানডে সিরিজ জিতেছে টিম বাংলাদেশ।
সাফল্যের বছরটিতে অনেক অর্জনের মাঝে রয়েছে আরও এক অজর্ন। একটা লম্বা সময় পর্যন্ত সাকিব আল ‍হাসান ও তামিম ইকবাল হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রতিচ্ছবি, পোস্টারবয়। মাঠ ও মাঠের বাইরে এ দু’জনের ছিল একচেটিয়া ‍আধিপত্য, প্রভাব। ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ, বিজ্ঞাপন-সবখানেই একফ্রেমে থাকতেন এ দুই বন্ধু। একটা সময়ে ‘ডোন্ট কেয়ার’ ভাবখানাও তাই এসে যাচ্ছিলো তাদের মধ্যে! জনপ্রিয়তা আর খ্যাতিতে তারা পেছনে ফেলেছিলেন অন্য সবাইকে। দলের ভেতরে এ দু’জনের প্রতিযোগী কেউ ছিলেন না সে অর্থে।
অন্য ক্রিকেটারদের সঙ্গে তাদের দূরত্বের প্রভাব পড়েছিল দলের পারফরম্যান্সেও। নামি-দামি ক্রিকেটার থাকতেও দল হিসেবে জ্বলে ওঠাও হচ্ছিল না বাংলাদেশের। দল হয়ে খেলতে না পারায় ২০১৪ সালে যাচ্ছেতাই পারফর্ম করতে হয়েছে। এ ‍নিয়ে দুশ্চিন্তায় আচ্ছন্ন হন বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসানও। বেক্সিমকো কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে দলের মধ্যে এ ভাঙনের কথা তিনিই প্রথম জানিয়েছিলেন সংবাদমাধ্যমকে।
Saltamami-2দলের মাঝে নেতিবাচক এ জালের জট খোলে দ্রুতই। জিম্বাবুয়ে সিরিজের পর ২০১৫ সালের শুরুতে বিশ্বকাপের জন্য মাশরাফি বিন মর্তুজাকে অধিনায়কত্ব দেওয়ার পর থেকেই পাল্টাতে থাকে টাইগার শিবির। বিসিবির কঠোরতা ও নতুন তারকা ক্রিকেটারদের উত্থানে দলের মাঝে শুরু হয় অনিন্দ্য সুন্দর এক প্রতিযোগিতা।
সিনিয়র ক্রিকেটার সাকিব-তামিম-মাশরাফি-মুশফিকদের সঙ্গে বাংলাদেশের হাল ধরেন সৌম্য-তাসকিন-সাব্বিররা। নতুনদের মধ্যে লিটন কুমার দাসও বাংলাদেশ দলে জায়গা করে নিয়েছেন। নিজেকে অতটা মেলে ধরতে না পারলেও ভালো টিমমেট হওয়াতে নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছেন লিটন।
আলাদা করে লিখতেই হচ্ছে টাইগারদের পেস ‍আক্রমণের নতুন অস্ত্র মুস্তাফিজুর রহমানকে নিয়ে। মুস্তাফিজ সংক্রান্ত আলোচনা এখনো ভেসে বেড়াচ্ছে বাংলাদেশের ক্রিকেটের আকাশে-বাতাসে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক মৌসুমে মুস্তাফিজুর ছাড়িয়ে গেছেন কল্পনার সীমানা। গুগলের সার্চ ইঞ্জিনে বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি খোঁজা হয়েছে এই ‘কাটার স্পেশালিষ্ট’কে। টাইগারদের এ পেসার হয়েছেন আইসিসির বর্ষসেরা ওয়ানডে স্কোয়াডের অন্যতম সদস্য।
অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের মিশেলে অসাধারণ এক ক্রিকেট দল এখন বাংলাদেশ। সর্বশেষ আবু হায়দার রনি বিপিএলে ঝলক দেখিয়ে জানান দিলেন, আমিও জায়গা চাই জাতীয় দলে! পুরোনোদের সঙ্গে নতুনরাও হাল ধরতে চাইছেন। দলে ঢোকার এ সুস্থ প্রতিযোগিতায় কখনো কখনো বেশি এগিয়ে থাকছেন নতুনরাই।
ক্রিকেটারদের পাইপলাইন সমৃদ্ধ হওয়ায় মাঠে ‍পারফরম্যান্সের প্রতিযোগিতা ছাড়া অন্য সব প্রতিযোগিতা এখন বন্ধ। টিমে থাকা, একাদশে ‍জায়গা পাওয়াতেই ফোকাস করছেন ক্রিকেটারা। ‘উদ্ধত্য’ ধরনের কিছু আপনা-আপনিই পালিয়ে গেছে ক্রিকেটারদের ভেতর থেকে। সাফল্য ধরে রাখাটাই মূল চ্যালেঞ্জ এখন ক্রিকেটারদের।
কোনো একটি সিরিজে চ্যালেঞ্জ নিতে ব্যর্থ হলে দল থেকেই ছিটকে পড়তে পারেন দলের সেরা ক্রিকেটারটিও। বাংলাদেশের ক্রিকেটে সাকিব-তামিম এ দুটি নামের প্রতি মাত্রাতিরিক্তি নির্ভরতা কমে আসা যেন বাংলাদেশের ক্রিকেট এগিয়ে যাওয়ার বার্তাই বহন করে। ফর্মহীনতার পরও লিটনকে সুযোগ দিয়ে অধিনায়ক মাশরাফি বুঝিয়ে দিয়েছেন ভালো টিমমেট হওয়াও একটা বড় গুন। যেটা টিম হয়ে উঠতে সাহায্য করে। এমন অধিনায়কের সামনে সব উদ্ধত্যতা আপনা-আপনিই নেই হয়ে যায়।

সাফল্যে ঘেরা টাইগারদের ২০১৫

মুশফিক পিয়াল : বিদায়ের পথে আরও একটি বছর। ২০১৫ সালকে বিদায় দিয়ে ২০১৬ সালকে স্বাগত জানানোর অপেক্ষায় প্রত্যেকটি মানুষ। আগের বছরের সালতামামিজুড়ে ছিল শুধুই হাহাকার। তবে, ২০১৫ সালটি বাংলাদেশ ক্রিকেটের একটি সফল বছরের সমাপ্তি। সফল সমাপ্তি এই অর্থে বলা যে, এই বছরে প্রাপ্তির পাল্লা অনেকাংশে সমৃদ্ধ।
২০১৫ বছরটিকে বাংলাদেশ মনে রাখবে অনেক দিন। এ রকম সোনালি সময় আর কখনো পার করেনি বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। ১৯৮৬ সাল থেকে ওয়ানডে ক্রিকেট খেললেও ২০১৫ সালে এসে নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বোচ্চ সাফল্যই মিলেছে বাংলাদেশের। এ বছর ১৮ ম্যাচের ১৩টিতেই জিতেছে টাইগাররা। হারিয়েছে পূর্ণশক্তির ইংল্যান্ড, পাকিস্তান, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলকে।
নতুন বছরে পা রাখার আগে পেছন ফিরে দেখা যাক ২০১৫ সালে বাংলাদেশের ক্রিকেটে ঘটে যাওয়া কিছু আলোচিত-সমালোচিত ঘটনা। দেশের ক্রিকেট ২০১৫ সাল ইতিবাচক-নেতিবাচক দুভাবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে। মাঠের লড়াইয়ে তামিম-সাকিব-মাশরাফি-মুশফিকদের বছরটা ছিল জমজমাট। পুরোনো সৈনিকদের সঙ্গে লড়াইয়ে সামিল হয়েছিলেন নতুন যোদ্ধা সাব্বির-লিটন-সৌম্য-মুস্তাফিজরা।
Banglawash-600x400
বিশ্বকাপে ক্রিকেট বিশ্বকে কাঁপিয়ে আর ইংল্যান্ডকে হারিয়ে যে ইঙ্গিত দিয়েছিল বাংলাদেশ দল, তার পূর্ণতা আসে দেশের মাটিতে টানা চারটি ওয়ানডে সিরিজ জয় দিয়ে।
একটু পেছনে যাওয়া যাক। শঙ্কা আর অনিশ্চয়তা নিয়ে ২০১৪ সালের শুরুটা হয়েছিল। শ্রীলঙ্কা, এশিয়া কাপ, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, ভারত এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজে ধারাবাহিক ব্যর্থতা ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটের নিত্যসঙ্গী। পরাজয়ের বৃত্তেই বন্দি ছিল টাইগাররা। সে বছরের জুলাইয়ে বিশ্বসেরা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানকে সবধরনের ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ করে বিসিবি। তবে, নভেম্বরে জিম্বাবুয়ে সিরিজ দিয়েই আত্মবিশ্বাসের টনিক ফিরে পায় বাংলাদেশ, সঙ্গে সাকিবকেও ফিরে পায় টাইগার দলটি। বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য বছরের শেষভাগে এসে মরূদ্যানে এক পশলা বৃষ্টির মতোই ছিল জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজের ফল (৮-০)। জিম্বাবুয়েকে টেস্ট এবং ওয়ানডেতে ধবলধোলাই করে বছরের শেষটা রাঙিয়ে দেন মুশফিক-মাশরাফিরা।
কিন্তু, বছরের একদম শেষ ভাগে এসে ক্রিকেটপাড়ায় নতুন বিতর্কের জন্ম দেন পেসার রুবেল হোসেন। অভিনেত্রী হ্যাপি তার বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা করলে ক্রিকেটের গায়ে লাগে কলঙ্ক। তবে, ২০১৫ সালে অনুষ্ঠেয় ওয়ানডে বিশ্বকাপে টাইগারদের এ পেসার যে পারফর্ম করেছেন এক নিমিষেই সব বিতর্ক উড়ে চলে যায় ক্রিকেটের বাইরে। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের মাটিতে আয়োজিত বিশ্বকাপে ঝড় তোলার প্রত্যয় নিয়ে দলের সঙ্গে যান পেসার আল আমিন হোসেন। টিম কারফিউ ভঙ্গ করে তিনি রাতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়ে টিম হোটেল থেকে বাইরে বের হন। ফলশ্রুতিতে আল আমিনকে বিশ্বকাপ দল থেকে বহিষ্কার করে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এ বছর ক্রিকেটাররা নেতিবাচক কারণে সংবাদ শিরোনাম হয়েছেন আরও একবার। গৃহপরিচারিকা নির্যাতনের অভিযোগে সস্ত্রীক শাহাদাত হোসেনের কারাগারে যাওয়া ছাড়া এ বছর কোনো কলঙ্ক নেই বাংলাদেশের ক্রিকেটে।
ফেরা যাক ২০১৫ সালের শেষ দিকে। চলতি বছর জিম্বাবুয়ের সঙ্গে সিরিজের মধ্যদিয়ে শেষ হয় টাইগারদের রূপকথার গল্পের উপসংহার। তবে, সফরকারীদের বিপক্ষে শেষ টি-টোয়েন্টি ম্যাচটিতে হেরে আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে বিদায় নেয় টাইগাররা।
এবার যাওয়া যাক বছরের শুরুতে। এর আগে বাংলাদেশ ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে সুপার এইটে খেলার কৃতিত্ব দেখালেও ২০১৫ সালেই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে সাফল্য রেখার দাগ টানা শুরু করে বাংলাদেশ। গ্রুপ পর্বের এক ম্যাচ বাকি থাকতেই এই অনন্য সাফল্য। ২০১৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি, বিশ্বমঞ্চে পুল ‘এ’র সপ্তম ম্যাচ, বাংলাদেশ বনাম আফগানিস্তান। ক্যানবেরার মানুকা ওভালে আফগানদের দাপটের সঙ্গে ১০৫ রানে হারিয়ে মিশন শুরু হয় টাইগারদের। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পরের ম্যাচটি বৃষ্টির কারণে পণ্ড হয়। লঙ্কানদের বিপক্ষে ২৬ ফেব্রুয়ারি ৯২ রানে হেরে বসে বাংলাদেশ। ০৫ মার্চ স্কটল্যান্ডকে ৬ উইকেটে হারায় লাল-সবুজের জার্সিধারিরা।
এর পরের ম্যাচ ০৯ মার্চ, অ্যাডিলেড, বিশ্বমঞ্চের ৩৩তম ম্যাচে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড। বিশ্বক্রিকেটকে আরেকবার চমকে দিয়ে সে ম্যাচে মাশরাফি বাহিনীর জয়টি ছিল ১৫ রানের। ক্রিকেটের সুতিকাগার ইংল্যান্ড দল পর পর দুই বিশ্বকাপে বাংলাদেশের কাছে হার মানতে বাধ্য হয়। ইংলিশদের হারিয়েই কোয়ার্টারে উঠে টাইগার বাহিনী। সে ম্যাচে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি করেন মাহমুদুল্লাহ। প্রতিকূল অবস্থায় ব্যাটিংয়ে নেমে তিনি ১০৩ রান করে বিশ্বকাপে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে সেঞ্চুরির খাতায় নাম লেখান। আস্থার প্রতিদান দিয়ে মুশফিক ৭৭ বলে ৮৯ রানের অনবদ্য একটি ইনিংস খেলেন। ৫০ ওভারে টাইগাররা ৭ উইকেটে ২৭৫ রান করে ইংল্যান্ডের জন্য চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়। বাঁচা-মরার খেলায় ইংলিশরা জেতার জন্য সাধ্যের সবটুকু ব্যয় করেও জয় পায়নি রুবেল, তাসকিন ও মাশরাফির দৃষ্টিনন্দন বোলিং সাফল্যের কারণে। ২৬০ রানে ইংলিশদের থামিয়ে দিতে রুবেল ৪টি, মাশরাফি আর তাসকিন ২টি করে উইকেট তুলে নেন।
অন্যতম ফেভারিট নিউনিল্যান্ডের বিপক্ষে গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে হেরে যায় বাংলাদেশ। তবে, লড়াই করেই ৩ উইকেটের হার মানে টাইগাররা। টানা দ্বিতীয় ম্যাচেও শতক হাঁকান মাহমুদুল্লাহ। ১২৮ রান করে অপরাজিত থাকেন তিনি। ৫৮ বলে সৌম্য করেন ৫১ রান। আর শেষ দিকে ব্যাটে ঝড় তুলে ২৩ বলে ৪০ রান করেন সাব্বির রহমান। মাশরাফির অনুপস্থিতিতে সে ম্যাচে imagesসাকিবের নেতৃত্বে খেলে টাইগাররা ৭ উইকেট হারিয়ে তোলে ২৮৮ রান। জবাবে ৭ বল হাতে রেখে ৭ উইকেট হারিয়ে জয় তুলে নেয় কিউইরা। কোয়ার্টার ফাইনালে ভারতের কাছে ১০৯ রানে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় বাংলাদেশ। কিন্তু সে ম্যাচটি কতটা বিতর্কিত ছিল, তা সবারই জানা।
এরপর ঘরের মাটিতে পাকিস্তান, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা আর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টানা তিনটি সিরিজ জেতে টাইগাররা। ওয়ানডে র্যাঙ্কিংয়ে সাতে উঠে আসে বাংলাদেশ। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির টিকিটি কেটে নেয় মাশরাফি বাহিনী। টেস্ট র্যাঙ্কিংয়েও নিজেদের সর্বোচ্চ চূড়ায় ওঠে মুশফিক বাহিনী।
এ বছরে বাংলাদেশ মোট ১৮টি ওয়ানডে খেলেছে (বিশ্বকাপের অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ বাদ দিয়ে)। এর মধ্যে ১৩টি ম্যাচেই বিজয়ীর হাসি নিয়ে মাঠ ছেড়েছে লাল-সবুজরা। এর আগে ২০০৯ সালেই সবচেয়ে সফল সময় পার করেছিল বাংলাদেশ। সেবার ১৯টি ওয়ানডের মধ্যে ১৪টি ম্যাচে জিতেছিল বাংলাদেশ।
টেস্টেও টাইগাররা ২০১৫ সালটি কাটিয়েছে দারুণভাবে। পাকিস্তান-ভারত-দ. আফ্রিকার বিপক্ষে ৫টি ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ। সাদা পোশাকে মাত্র একটি ম্যাচেই হারের মুখ দেখে মুশফিক বাহিনী, বাকি চারটি ম্যাচ ড্র হয়। ভারতের বিপক্ষে একমাত্র টেস্ট ড্র হওয়া ছাড়াও টেস্টের সে সময়কার এক নম্বর দল দ. আফ্রিকার বিপক্ষে দুই ম্যাচ টেস্ট সিরিজও ড্র হয়।
এর আগে অবশ্য পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে ৩২৮ রানের বড় ব্যবধানে হারে স্বাগতিক বাংলাদেশ। তবে তারও আগে প্রথম টেস্টে মিসবাহ উল হকের পাকিস্তানকে যেভাবে টাইগার ব্যাটসম্যানরা আঁচড়ে দিয়েছিল, সেটি সফরকারীরা যত দ্রুত ভুলে যেতে চাইবেন, টাইগারপ্রেমীরা ততটাই স্মরণ রাখতে চাইবেন। প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ ৩৩২ রানে অলআউট হলে পাকিস্তান প্রথম ইনিংসে ৬২৮ রানের বিশাল পাহাড় গড়ে। টাইগার স্পিনার তাইজুল সে ইনিংসে তুলে নেন ৬টি উইকেট। পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করে বাংলাদেশ ৬ উইকেট হারিয়ে তোলে ৫৫৫ রান। ড্র মেনে নেন সফরকারী অধিনায়ক। উদ্বোধনী জুটি থেকেই তামিম-ইমরুল তুলে নেন ৩১২ রান। তামিম ২০৬, ইমরুল ১৫০ আর সাকিব অপরাজিত ৭৬ রান করেন।
টি-টোয়েন্টি ফরমেটে টাইগাররা ২০১৫ সালে খেলেছে ৫টি ম্যাচ। এর মধ্যে দুটি ম্যাচেই জেতে স্বাগতিক হিসেবে খেলতে নামা বাংলাদেশ। পাকিস্তানের বিপক্ষে একমাত্র টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশ জেতে দাপটের সঙ্গে। সফরকারীদের ১৪১ রানকে লাল-সবুজরা টপকে যায় ২২ বল হাতে রেখে। সাকিব আর সাব্বির রহমানের দুটি অপরাজিত অর্ধশতকে ৩ উইকেট হারিয়ে সহজ জয় তুলে নেয় মাশরাফির দল। অপর জয়টি জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ম্যাচে ৪ উইকেটের। একই দলের বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচে বাংলাদেশ হার মানে ৩ উইকেটে। তার আগে দ. আফ্রিকার বিপক্ষে দুটি ম্যাচেই পরাজয়ের মুখ দেখে স্বাগতিক বাংলাদেশ।
আইসিসির নবতর সংস্করণ টি-টোয়েন্টিকে বলা হয় ক্রিকেট বিশ্বের অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার। তবে, এর কারণেই ক্রিকেটে কিছুটা হলেও অনিয়ম-দুর্নীতি বাসা বাঁধে। বিপিএল এর প্রথম আসর (২০১২) নিয়ে নানা রকম সমস্যা তৈরি হলেও, দ্বিতীয় আসরটিকে (২০১৩) দেশের ক্রিকেটের সবথেকে বড় কলঙ্ক হিসেবে ধরা হয়। এক বছর বাদে ফের ২০১৫ সালে বিপিএলের জমজমাট তৃতীয় আসরটি বসে বাংলাদেশে। এতে টি-টোয়েন্টির সবথেকে বড় বিজ্ঞাপন ক্রিস গেইল, শহীদ আফ্রিদিদের সঙ্গে অংশ নেন কুমার সাঙ্গাকারা, লেন্ডল সিমন্স, মারলন স্যামুয়েলস, রবি বোপারা, সুনীল নারাইন, মোহাম্মদ হাফিজ, মোহাম্মদ আমির, শোয়েব মালিকদের মতো তারকা ক্রিকেটাররা। টুর্নামেন্টের সমাপ্তি ঘটে নতুন দল কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের জয়ের মধ্য দিয়ে। টানা তিনটি শিরোপাই হাতে নেন কুমিল্লার দলপতি মাশরাফি বিন মর্তুজা।
এ বছর বাংলাদেশ পেয়েছে নতুন নতুন ম্যাচ উইনার। টেস্টের বিস্ময় মুমিনুল হক, তাইজুল ইসলাম, জুবায়ের লিখন আর ওয়ানডের চমক সৌম্য, সাব্বির, লিটন, মুস্তাফিজ, তাসকিনদের মতো বিশ্বমানের ক্রিকেটার নিজেদের যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন। বিশ্ব র্স্পোটস মিডিয়ায় বাংলাদেশের ক্রিকেটের উন্নতির কথা বারবার ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে। বলা যায়, বাংলাদেশের ক্রিকেটের সামগ্রিক ফলাফল নিশ্চিত উর্ধগামী।
২০১৫কে পেরিয়ে ২০১৬তে টাইগারদের সাফল্য লুটোপুটি খাবে, সেটিও বলার অপেক্ষা রাখে না। যে দেশে আইসিসির বর্ষসেরা ওয়ানডে একাদশের সদস্য ‘কাটার মাস্টার’ খ্যাত মুস্তাফিজ রয়েছেন, যে দেশে ক্রিকেট বিশ্বের তিন ফরমেটের সেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান রয়েছেন, যে দেশে ক্রিকেট বিশ্বকে বারবার চমকে দেওয়া অধিনায়ক মাশরাফি রয়েছেন- সে দেশটি ক্রিকেটের পরাশক্তিতে রূপান্তরিত হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে এটিও আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
-বাংলানিউজ

বিপিএল থ্রি নতুন বোতলে পুরোনো মদ !

সাইদুর রহমান শামীম : কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’,এ সময়ের উপমহাদেশীয় ক্রিকেটে দারুণ বাজারচলতি বাক্যটি। স্ক্যান্ডাল আর ক্রিকেটের তুমুল বানিজ্যিকরণের পরিণতিতে কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের হাড়িকাঠে বলি হয়েছে নারায়নস্বামী শ্রীনিবাসনের মতো মহীরুহ সংগঠক।
ভারতের আইপিএলে’র দল চেন্নাই সুপার কিংসের মালিকানায় সক্রিয় থাকায় প্রথমে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের গদি, এরপর ক্রিকেট বিশ্বের ভাগ্য নিয়ন্ত্রনকারী সংস্থা ‘আইসিসি-স্বর্গ’ থেকে পতন। তামিলনাড়ু–র এই ধনকুবের সেলিব্রেটি থেকে এখন রাতারাতি আম-জনতা ! শুধু কি শ্রীনিবাসন ! কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট কেড়ে নিয়েছে সুনীল গাভাসকার, রবি শাস্ত্রীদের আইপিএল গর্ভনিং কাউন্সিলের গ্ল্যামারাস (আর্থিক ব্যাপারতো আছেই) কুর্সি,সাবেক অলরাউন্ডার রজার বিনি’র নির্বাচকের লাভজনক চাকুরি।
ভারতের নিকট প্রতিবেশী বাংলাদেশের ক্রিকেটে অবশ্য কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টে বিব্রত হওয়ার বালাই নেই। ‘ম্যাচ-ফিক্সিং কান্ডে’ ক্রিকেটার-ফ্রাঞ্চাইজি মালিকদের শাস্তি সহ নানা অনিয়মে তিন বছর বন্ধ থাকার পর বিপিএল থ্রি শুরু’র প্রাক্কালে বিসিবি কর্তাদের প্রতিশ্রুতি ছিলো শ্বেতশুভর আয়োজনের।
বিপিএল থ্রি মাঠে গড়ানোর আগেই সেই প্রতিশ্রুতি উধাও। বিসিবি’র নির্বাচিত পরিচালক বিপিএল’র গর্ভনিং কাউন্সিলের সদস্য-সচিব হতেই পারেন, হওয়াটাই দস্তুর। তবে তিনি যদি আবার এক ফ্রাঞ্জাইজির মালিকানাধীন অন্য প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবি হন তাহলে কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট হতেই পারে। আর কিছু নাহোক,অন্তত ওই ফ্রাঞ্চাইজির ম্যাচ পরিচালনার সময় আম্পায়ার-ম্যাচ পরিচালনার সঙ্গে যুক্তরা যদি মনস্তাত্বিক চাপে পড়েন তাহলে তাদের কি দোষ দেয়া যায় ?
নির্বাচিত বোর্ড পরিচালকরা এবার ফ্রাঞ্চাইজি’র মালিকানা কিংবা টেকনিক্যাল ডিরেক্টর’র মতো লাভজনক পদে বেশ ভালোভাবেই ছিলেন। আগের আসরে অন্যতম ফ্রাঞ্চাইজি চিটাগং কিংসের কোচের দায়িত্ব নিয়ে বোর্ড পরিচালকের পদ স্বেচ্ছায় ছেড়েছিলেন খালেদ মাহমুদ সুজন। এবার সেই বোর্ড পরিচালকই স্বপদে বহাল থেকে অন্যতম ফ্রাঞ্চাইজি ঢাকা ডায়নামাইটসের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর হিসাবে ম্যাচ চলার সময়ে ডাগ-আউটে ছিলেন নিয়মিত।
আরেক ফ্রাঞ্চাইজি চিটাগং ভাইকিংসে একই ভুমিকায় বোর্ড পরিচালক আকরাম খান। শোনা যায়, বরিশাল বুলসের মালিকানায় আছেন বোর্ড পরিচালক আউয়াল চৌধুরী ভুলু। এ অবস্থায় যদি কেউ এদের বিরুদ্ধে কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের অভিযোগ নিয়ে আদালতের শরনাপন্ন হয় তাহলে শ্রীনিবাসনের বিরুদ্ধে দেয়া ভারতীয় হাইকোর্টের রায় হতে পারে উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত।
কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের লক্ষণরেখা ভাঙ্গতে দ্বিধা করেননি সংবাদকর্মীরাও । মিডিয়া হাউসের পেশাদার ক্রীড়া সাংবাদিকদের দু’একজন ফ্রাঞ্চাইজির মিডিয়া ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করেছেন। অতি উৎসাহী কেউ কেউ আবার একধাপ এগিয়ে দেশী-বিদেশী ক্রিকেটারদের এজেন্ট এমনকি বিসিবি’র বিভিন্ন ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের ঠিকাদারিও নিয়েছিলেন। স্বার্থের সংঘাত এড়িয়ে টু-পাইস কামানোর ক্ষেত্রে কয়েকজন ক্রিকেট সংগঠক ও মিডিয়া কর্মীদের কি অপূর্ব বোঝাপড়া !
টুর্নামেন্ট আয়োজনের ব্যাপারে গর্ভনিং কাউন্সিলের পারফরম্যান্সকে বড়জোর পাস মার্ক দেয়া যায়, লেটার-মার্ক কোনো মতেই নয়। অঞ্চলভিত্তিক ফ্রাঞ্চাইজি দেয়া হলেও ‘বিপিএল থ্রি’র ম্যাচ আয়োজনের ব্যাপারে বিসিবি পরিপূর্ণ হোম এন্ড অ্যাওয়ে পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারেনি। কুমিল্লা, রংপুর, বরিশাল কিংবা সিলেট’র সমর্থকরা নিজেদের মাঠে প্রিয় দলের খেলা দেখতে পাননি।
অথচ এই শর্ত পূরণ করা অসম্ভব ছিলো না। সিলেট, রাজশাহী, খুলনার আন্তর্জাতিক ভেন্যু’তে অনায়াসে আয়োজন করা যেতো একাধিক ম্যাচ। তাতে তৃনমূলে ক্রিকেট ছড়িয়ে দেয়ার জনপ্রিয় শ্লোগান বাস্তবতার মুখ দেখার পাশাপাশি বিসিবি’র কোষাগার আরো ফুলে ফেঁপে উঠতো। চার ছক্কার ধুমধাড়াক্কা টি-টুয়েন্টি ক্রিকেট এবার জাত হারিয়েছে নিস্প্রান।
‘বোলার্স ফ্রেন্ডলি’ উইকেটের কারণে। পরিসংখ্যানের দিকে তাকান, সেখানে বোলারদেরই জয়জয়কার। ১১/১২ ইনিংসে তিনশোর উপর রান মাত্র দু’তিনজনের। এরকম কাঠখোট্টা উইকেট টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটের দর্শকদের গ্যালারিমুখী করেনা। তারই প্রতিফলন দেখেছে দর্শক-মন্দায় ভোগা ‘বিপিএল থ্রি’। স্ক্যান্ডাল-জর্জরিত বিপিএল’কে বিশ্বাসযোগ্যতার নতুন উচ্চতায় তোলার সুযোগ ছিলো বিসিবি’র সামনে। আইসিসি’র এন্টিকরাপশন সিকিউরিটি ইউনিট (আকসু) ২০১২ সালে বিপিএল টু’তে সংঘটিত ম্যাচ ফিক্সিং’র ঘটনা উদঘাটন করে।
এবার বিসিবি’র নিজস্ব আকসু ইউনিট ছিলো ফিক্সিং সহ নানা অনিয়মের তদন্তে। বিসিবি’র বেতনভোগী ইউনিট কতটা দৃঢ়তার সাথে সে দায়িত্ব পালন করবে তা নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটাঙ্গন সংশয়ে ভুগতেই পারে। বিশেষ করে বিসিবি’র নির্বাচিত পরিচালকবৃন্দ যেখানে বিভিন্ন ফ্রাঞ্চাইজির পরিচালনার সঙ্গে জড়িত সেখানে বিসিবি’রই অধীনস্থ তদন্ত দলের স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের বিষয়টি বিশ্বাসযোগ্যতার মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হবে, এমনটা সর্বমহলের গ্রহনযোগ্যতা নাও পেতে পারে।