চ্যাম্পিয়ন এবাদতের অন্য গল্প

চ্যাম্পিয়ন এবাদতের অন্য গল্প

তার বড় হ‌ওয়ার স্বপ্নটা ছিলো ভলিবল ঘিরে। ছিলেন মূলত: ভলিবল খেলোয়াড়। সেখান থেকে স্বপ্নের সিড়ি ভেঙে ভেঙে বড় হতে শুরু করলেন। আর বাড়তে থাকলো স্বপ্নের পরিধি। ভলিবল খেলোয়াড় এবাদত হোসেন হয়ে গেলোন ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ের নায়ক।নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের পর ম্যাচ সেরার পুরস্কার নিতে গিয়ে নানা প্রশ্ন করতে গিয়ে সে প্রসঙ্গটাই সামনে চলে এলো। 

মাউন্ট মঙ্গানুইয়ের বে ওভালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৮ উইকেটের বিশাল জয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করলো বাংলাদেশ। টেস্টের বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন নিউজিল্যান্ডকে তাদেরই মাটিতে হারিয়ে দেয়া! বড়ই স্পর্ধার ব্যাপার। সেটাই করে দেখালো বাংলাদেশ। সেই ইতিহাস সৃষ্টির মূল কারিগর বাংলাদেশের ফাস্ট মিডিয়াম বোলার এবাদত হোসেন চৌধুরী।

দ্বিতীয় ইনিংসে ২১ ওভার বল করে ৪৬ রান দিয়ে একাই নিলেন ৬ উইকেট। এবাদতের একের পর এক উইকেট নেয়াতেই কিউইরা দ্বিতীয় ইনিংসে অলআউট হয় ১৬৯ রানে। বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ালো কেবল ৪০ রানের। মুশফিক-মুমিনুল ৮ উইকেটের জয় নিয়েই মাঠ ছেড়ে আসেন।

তবে, এই জয় সম্ভব হয়েছে কেবল এবাদতের বিধ্বংসী বোলিংয়ের কারণেই। অথচ, এবাদতের এই জায়গায় আসাটা এত সহজ ছিল না। হয়তো বা ক্রিকেটারই হতে পারতেন না তিনি। সেটা কেবল সম্ভব হয়েছে তার অদম্য ইচ্ছা আর অসম্ভব একটি সুন্দর স্বপ্নের কারণে।এবাদত জানান, ‘ভলিবল থেকে ক্রিকেটে আসার গল্পটা অনেক লম্বা। আমি ক্রিকেটটা উপভোগ করছি। বাংলাদেশ ও বিমানবাহিনীর প্রতিনিধিত্ব করাটাও।’ 

মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার কাঁঠালতলী গ্রাম থেকে উঠে এসেছেন এবাদত হোসেন। আগে পাড়ার মাঠে মাঝেমধ্যে ক্রিকেট খেলতেন। বাবা চাকরি করতেন বিজিবিতে। বাবার দেখানো পথেই হাঁটলেন এবাদত। ২০১২ সালে যোগ দেন বিমান বাহিনীতে।

নিয়মমাফিক জীবনের মাঝে সুখ খুঁজতে গিয়েও আবিষ্কার করলেন এটি তাঁর জন্য নয়। খেলার মাঠ এবাদতকে খুব টানে। যে কারণে ছকে বাঁধা জীবনে চাকরির পাশাপাশি চলছিল খেলাধুলাও; ভলিবল, হ্যান্ডবল, বাস্কেটবল এসব। এরপর বিমানবাহিনীর নিয়মিত ভলিবল খেলোয়াড় হয়ে যান।

কিন্তু ভলিবলেও নিজেকে বেধে রাখতে পারলেন না। কারণ তার মন পড়ে থাকে ক্রিকেট মাঠে। তার প্রতিষ্ঠান বিমানবাহিনীও এবাদতের স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে আসে। তার খেলাধুলায় বাধা দেয় না। যার ফলশ্রুতিতে ধীরে ধীরে ক্রিকেটে নিজেকে জড়াতে শুরু করেন। ২০১৪ সালে সিটি ক্লাবের হয়ে ঢাকায় প্রথম বিভাগ ক্রিকেট খেলার সুযোগ পান এবাদত। ক্রিকেটে পরিচিত হতে থাকেন ধীরে ধীরে। ২ বছর পর সামনে চলে আসে সূবর্ণ সুযোগ।

২০১৬ সালে রবির সহযোগিতায় বিসিবি আয়োজন করে পেসার হান্টের। সারাদেশ থেকে প্রতিভাবান পেসারদের তুলে আনার লক্ষ্য নিয়ে এই পেসার হান্টের আয়োজন করে তারা। এখানেই নিজের ভাগ্য পরীক্ষা করতে যান এবাদত হোসেন। প্রথমে ঢাকা থেকে এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার কথা থাকলেও পরবর্তীতে ফরিদপুর গিয়ে পেসার হান্টে অংশ নেন।

এবাদতের পাশাপাশি প্রায় ১৪ হাজার ৬৪১ জন প্রতিযোগী নিজেদের ভাগ্য পরীক্ষা করতে সেখানে যান। এতো মানুষের ভিড়ে শুধু দুটি বল করার সুযোগ পান তিনি। যেখানে একটি বল করলেন ১৩৯.০৯ কিলোমিটার গতিতে। এই দুটি বল করেই নির্বাচকদের নজর কাড়েন।

পেসার হান্টে নির্বাচিত হওয়ার পর পরবর্তী ধাপে পরীক্ষা দিতে এবাদত চলে আসেন ঢাকার মিরপুর স্টেডিয়ামে। এখানে পেসারদের নির্বাচিত করার কাজ ছিল পাকিস্তানের সাবেক পেসার আকিব জাবেদের। বলের গতি দিয়ে কোচদের সন্তুষ্ট করতে সক্ষম হন বিমাবাহিনীর এ তরুণ।

এমনকি সবর্শেষ প্রায় লক্ষাধিক প্রতিযোগীর মধ্যে পেসার হান্টে প্রথম হলেন তিনি। প্রায় ৬৩ জনকে বাছাই করা হয় প্রতিযোগিতাটি থেকে। এই কজনের মধ্যে ১৩৯ কিলোমিটার গতিতে বল করে প্রথমস্থান অধিকার করেন এবাদত।

এরপর তিনি চলে আসেন হাই পারফরমেন্স দলের হয়ে ট্রেনিং করতে। আকিব জাবেদও এবাদতকে নিয়ে গ্রিন সিগন্যাল দিয়ে যান। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার অভিষেক হয় ২০১৯ সালের মার্চে। নিউজিল্যান্ডের মঠেই তার অভিষেক ঘটে। কিউইদের বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচ দিয়ে প্রথমবারের মতো জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নামেন তিনি।

২০১৯ সালেই কোলকাতায় ভারতের বিপক্ষে ৯১ রানে ৩ উইকেট নিয়ে একবার আলোচনায় আসেন এবাদত। এবার তো তিনি হয়ে গেলেন চ্যাম্পিয়ন ক্রিকেটার। বাংলাদেশকে এনে দিলেন ঐতিহাসিক এক জয়। এবাদতের ক্রিকেটার হ‌ওয়ার গল্পটা এমনই চমকপ্রদ।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




bangladesherkhela.com 2019
Developed by RKR BD