রাত ১২:১৬, রবিবার, ২৪শে আগস্ট, ২০১৯ ইং
/ কলাম/ফিচার / ইনডোর এশিয়া কাপ: বাংলাদেশের হকির উন্নতির সূচক
ইনডোর এশিয়া কাপ: বাংলাদেশের হকির উন্নতির সূচক
আগস্ট ৩, ২০১৯



থাইল্যান্ডে হয়ে গেলো ইনডোর এশিয়া কাপ হকি প্রতিযোগিতার অষ্টম আসর। আর বাংলাদেশ, ইনডোর হকিতে এবারই প্রথম অংশ নেয়। কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য কিছু না কিছু হলেও প্রস্তুতি থাকে। অথচ আশ্চর্যের বিষয় প্রস্তুতি তো দূরের কথা এই প্রতিযোগিতায় নাম এন্ট্রি করার সময় বাংলাদেশ দল জানতোই না যে কিভাবে ইনডোর হকি খেলে। মাঠটাই বা কেমন। আইন-কানুন জানা তো দূর অস্ত। স্টিকের দৈর্ঘ্য কম, এমনকি গোলপোস্টও ছোটো। ইনডোর হকি বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের কাছে একেবারেই নতুন। এমনি এক হযবরল অবস্থায় বাংলাদেশ দল ইনডোর হকিতে অংশ নেয়। আগের কমিটি ইনডোর হকিতে নাম নিবন্ধন করায় নব-নির্বাচিত কমিটি অনেকটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যায়, ইনডোর এশিয়া কাপে অংশ নেওয়া নিয়ে। এরআগে ফাইভ-এ-সাইড টুর্নামেন্টে খেলার অভিজ্ঞতা থাকলেও ইনডোর হকি ছিল এবারই প্রথম। নিয়ম-কানুনও অজানা। মাঠও অচেনা। জানুয়ারি মাসে ইনডোর হকি খেলার আমন্ত্রণ পায় বাংলাদেশ।

শেষমেষ কি আর করা। এই চ্যালেঞ্জকে নিয়েই এগিয়ে যেতে চায় হকি ফেডারেশন। তাই খেলোয়াড়দেরকে ইনডোর হকির সাথে মানিয়ে নিতে ইউটিউবই ভরসা তখন বাংলাদেশের। ইউটিউব থেকে শিক্ষা নিয়ে খেলোয়াড়দের শেখানোর প্রাথমিক কাজটা চালিয়ে যান দলের স্বদেশী কোচেরা। তারপর ইরান থেকে উড়িয়ে আনা হয় প্রধান কোচ। হামিদ রেজা বুখারী নামের এই ইরানি কোচ, ইরানকে আগের সাতবার ইনডোর হকির শিরোপা জিতিয়েছেন। এর আগে তো সাতবারই হয়েছিল এশিয়ান ইনডোর হকি প্রতিযোগিতা। ২০০৮ সাল থেকে শুরু। প্রথমবারের স্বাগতিক ছিল মালয়েশিয়া। সেবার ছয় দলের এই প্রতিযোগিতায় স্বাগতিকদের ৩-২ গোলে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ইরান। সেই শুরু ইরানের। এরপর থেকে যতবারই এশিয়ান ইনডোর হকি হয়েছে ততবারই জিতেছে ইরান। আর তাদের কোচ ছিলেন হামিদ রেজা বুখারী। সেই কোচ এবার বাংলাদেশের শিবিরে আসেন। বিকেএসপিতে মাসখানেকের বেশি সময় ধরে চলে প্রশিক্ষণ। তাতে খেলাটির সাথে পরিচিত করে তোলার সাথে সাথে খেলোয়াড়দেরকে তৈরি করেন বুখারী। তার সাথে ছিলেন স্থানীয় কোচ জাহিদ হোসেন রাজু।

প্রস্তুতি শেষ এবার লড়াইয়ের পালা। প্রথম ম্যাচেই বাংরাদেশের প্রতিপক্ষ মালয়েশিয়া। এই প্রতিযোগিতায় তারা আবার চারবারের রানার্সআপ। আর বাংলাদেশ সবেমাত্র চিনতে শিখছে ইনডোর হকি। এমন পরাক্রমশালী দলের বিপক্ষে প্রত্যাশা একটাই থাকতে পারে তা হলো যত কম গোল খাওয়া যায়।তাই ছিল পরিকল্পনা। নিশ্চিত কোনো প্রতিরোধে ঠেকানো যায়নি মালয়েশিয়াকে। ইনডোর এশিয়া কাপ হকির প্রথম ম্যাচে মালয়েশিয়ার কাছে বড় ব্যবধানে পরাজিত হয় বাংলাদেশ। মালয়েশিয়া ৬-০ গোলে হারায় বাংলাদেশ হকি দলকে। তাতে ইনডোর হকিতে অভিষেকটা মোটেই ভালো হয়নি লাল-সবুজের দলের। অবশ্য জীবনে প্রথমবার ইনডোর হকি খেলতে নেমে এরচেয়ে আর কী ভালো ফল সম্ভব ছিলো জিমি-শিটুলদের! সুতরাং মালয়েশিয়ার মতো শক্তিশালী দেশের বিপক্ষে এমন ফলকে খারাপও বলার উপায় নেই। প্রথমার্ধের খেলা বুঝে উঠার আগেই চার গোল হজম করে ফেলে বাংলাদেশ। দ্বিতীয়ার্ধে একটু গুছিয়ে নিয়ে খেলা শুরু করে তারা। তাতে বেশি গোল আর হজম করতে হয়নি আশরাফুল-কৌশিকদের। দ্বিতীয়ার্ধে মাত্র দুই গোল দিতে পেরেছে মালয়েশিয়া। তাতে বাংলাদেশ দলের পরাজয় ৬-০ গোলের।

দ্বিতীয় ম্যাচে প্রতিপক্ষ আরো বড়। পরাজয়ের ব্যবধানটাও আরো বড়। সাতবারের চ্যাম্পিয়ন ইরানের কাছে বাংলাদেশের হার ৮-০ গোলের। প্রতি অর্ধে বাংলাদেশের জালে মেপে মেপে চারটি করে গোল দেয় ইনডোর হকিতে এশিয়ার সবচেয়ে সেরা দল ইরান। বড় ব্যবধানে পরাজয়! এটা তো আরাধ্যই ছিলো। এশিয়া চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে আর কতটা প্রতিরোধ গড়তে পারতো বাংলাদেশ। তবে সুযোগ পেলেই ইরানের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার চেষ্টা করেছে ফরহাদ আহমেদ সিটুলের দল। কিন্তু ইরানের রক্ষণভাগকে ফাঁকি দেওয়া যায়নি। প্রথম দুই ম্যাচে ১৪ গোল। যেকোনো দলের মনোবল ভেঙে যাওয়ার জন্য এটাই সবচেয়ে বড় কারণ। কিন্তু জিমি-সিটুলরা থেমে যাননি, নিজেদেরকে গুটিয়েও নেননি। পরের ম্যাচেই ফিরে আসার পালা। ব্যর্থতার গ্লানি ঝেড়ে-মুছে ঋজু হয়ে দাঁড়ানোর পালা লাল-সবুজের দলের।

মঈনুল ইসলাম কৌশিকের দুর্দান্ত পারফরমেন্সে ইনডোর হকিতে প্রথমবার জয় পায় বাংলাদেশ। তাতে থাইল্যান্ডের চনবুরিতে যেনো ইনডোর এশিয়া কাপ হকিতে নতুন করে ইতিহাস লিখে ফেলেন জিমি-সিটুলরা। এতোদিন বিশাল বিশাল ব্যবধানে পরাজয়ে অভ্যস্ত বাংলাদেশ এখন অন্যদেরকেও বড় ব্যবধানে হারানো শিখেছে। ইনডোর হকিতে নিজেদের তৃতীয় ম্যাচে ফিলিপাইনকে ৯-০ গোলে হারায় তারা। খেলার প্রথমার্ধেই ৬-০ গোলের লিড নেয় বাংলাদেশ। মঈনুল ইসলাম কৌশিক একাই করেন ছয়টি গোল। এই জয়ের ধারা আর ধরে রাখা যায়নি। গ্রুপের শেষ ম্যাচে স্বাগতিক থাইল্যান্ডের কাছে ৩-১ গোলে হারে বাংলাদেশ। প্রথমার্ধে ২-০ গোলে পিছিয়েছিল তারা। অবশ্য এই ম্যাচ জিতলেই পঞ্চমস্থান নির্ধারণী ম্যাচে খেলার জায়গা পেতো বাংলাদেশ। কিন্তু তা হয়। তবে তিন গোলে পিছিয়ে থাকার পরও ম্যাচে ফিরতে খেলোয়াড়দের মরিয়া ভাবটাই দলের জন্য অনেক প্রেরণার। বারবার থাইল্যান্ডের সীমানায় হানা দিয়ে একটি গোলও আদায় করে নেয়, ইনডোর ফরমেটে একেবারে নবীন এই বাংলাদেশ।

সব শেষে স্থান নির্ধারণী ম্যাচ। প্রতিপক্ষ চাইনিজ তাইপে। ৩২ নম্বর র‌্যাংকিংধারী এই দলটি ২০১৪ সালে আবার চতুর্থও হয়েছিল। এমন ঐতিহ্যের অধিকারী এক দলকে বিনা র‌্যাংকধারী দল বাংলাদেশ ৯-০ গোলের বড় ব্যবধানে হারিয়ে সপ্তম হয় বাংলাদেশ। ‘বি’ গ্রুপের চতুর্থ দল চাইনিজ তাইপেকে কোনো পাত্তাই দেয়নি শিটুল-কৌশিকরা। গতিময় খেলা দিয়ে প্রথমার্ধেই ৫-০ গোলে এগিয়ে যায় বাংলাদেশ। দ্বিতীয়ার্ধে আসে আরো চার গোল। এতে টুর্নামেন্টে প্রথম অংশ নেয়া দলগুলোর মধ্যে নিজেদেরকে সেরা প্রমান করলো লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। দলের পক্ষে আশরাফুল ইসলাম, মিলন হোসেন ও ফরহাদ হোসেন শিটুল দুটি করে এবং জিমি, কৌশিক ও খোরশেদ একটি করে গোল করেন। দশ দলের এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ মোট গোল করেছে ১৯টি। বাংলাদেশের মাইনুল ইসলাম কৌশিক ৮ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকার চতুর্থস্থানে ছিলেন।

প্রথমবার ইনডোর এশিয়া হকিতে অংশ নিয়েই দুই জয়। এটা তো বাংলাদেশ হকি দলের উন্নতিরই সূচক। সুতরাং বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন বাস্তবায়নে এখনই হকি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রয়োজন। ইচ্ছে থাকলেই যে ভালো কিছু করা সম্ভব সেটা তো ইতোমধ্যেই নির্বাচিত এই হকি কমিটি প্রমান করে দিয়েছে। এখন শুধু ধারাবাহিকতা ধরে রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পালা। তবেই একসময়কার এদেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খেলাটি নিয়ে গর্ব করার পর্যায়ে যাওয়া যাবে। সেইদিন আর দূরে নয়, যেদিন এই নতুন নেতৃত্ব এদেশের হকিকে বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দেবে। বিশ্বমঞ্চে অন্য সবার সাথে সগৌরবে উড়বে লাল-সবুজের পতাকা।



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :