সকাল ১১:৫৫, বুধবার, ১৯শে ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং
/ ক্রিকেট / বিশ্বক্রিকেটে বাংলাদেশের বেড়ে উঠার গল্প
বিশ্বক্রিকেটে বাংলাদেশের বেড়ে উঠার গল্প
ডিসেম্বর ৩, ২০১৮



ফারদিন আল সাজু

আজ সকিব ও তার দল ক্রিকেটবিশ্বকে যে নজির দেখেয়েছে তা কখনো ভোলার নয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ইনিংস ও ১৮৪ রানে হারিয়ে নিজেদের টেস্ট ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জয় তুলে নেয় টাইগাররা। সেই সাথে দুইম্যাচ সিরিজে ‌ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হোয়াইটওয়াশ করার স্বাদও পায় লাল-সবুজের পতাকাধারীরা। নিজেদের ১৩তম টেস্ট বিজয়ে প্রথমবার ইনিংস ব্যবধানে জয়ের নজির গড়লো বাংলাদেশ। ক্রিকেটের এদেশের পথ চলা শুরু সেই ১৯৮৩ থেকে। হাটি হাটি পা পা করে বাংলাদেশ আজ বড় বড় দলকে হারাতে শুরু করেছে। একসময় বাংলাদেশ জন্য পুরো ৫০ ওভার ব্যাটিং করা কিংবা ১৬০ রানের বেশি করাই ছিল যেন একটা আনন্দের উপলক্ষ। আমি যখন ছোট ছিলাম তখন আমাদরে এলাকায় ক্রিকেট বলতেই ছিল ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ। তখন ভারত-পাকিস্তান খেলার উত্তেজনা যেন ফুটবলের ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার মতই ছড়িয়ে পড়ত এলাকাতে।

আমাদের বাবা-চাচা-ফুফাতো ভাইদের কাছে শুনতাম কপিল দেব, জাভেদ মিয়াদাদ, জোয়েল গার্নার কিংবা ভিভ রিচার্ডসের কথা। এরপর ৯০-র দশক গেল ওয়াসিম আকরাম, সৌরভ গাঙ্গুলি আর ওয়াকার ইউনুসের গল্প শুনতে শুনতে। ক্রিকেটে বাংলাদেশ তখন পুচকে এক শিশু মাত্র। বড় ভাইদের কাছে শুনেছি বাংলাদেশ যখন ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি জিতেছিল তখন নাকি সারা দেশে মহা-উৎসব শুরু হয়ে গিয়েছিল। এরপর ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপে যখন পাকিস্তানকে হারিয়েছিল বাংলাদেশ তখন নাকি বাংলাদেশের উৎসব বিশ্বকাপ জয় করার উৎসবের চেয়ে কোনও অংশে কম ছিল না।

ছোটবেলায় তো বড় ভাইদের মুখে শুধুই ঐ জয়ের কথা শুনতাম। এরপর একুশ শতক আসে। বাংলাদেশ টেস্ট স্ট্যাটাস অর্জন করে ২০০০ সালে। অনেক দেশ বাংলাদেশে এসে ম্যাচ খেলে যায় কিন্তু বাংলাদেশ আর জয়ের দেখা পায়না। ১৯৯৯ সালে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে বাংলাদেশ হারিয়েছিল স্কটল্যান্ড এবং শক্তিশালী পাকিস্তানকে। কিন্তু ২০০৩ বিশ্বকাপ যেন বাংলাদেশের জন্য ছিল একটা দুঃস্বপ্ন। কোনও ম্যাচে জয়তো পেলই না বরং কানাডার মত দূর্বল দলের কাছেও লজ্জাজনকভাবে হারতে হয়।

১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপে জয়ের পর অনেক ম্যাচই খেলল বাংলাদেশ। কিন্তু সেই জয় আর ধরা দিচ্ছিল না। মাঝে ২০০৩ সালে মুলতান টেস্টে পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশ জিততে জিততে ১ উইকেটে হেরে যায়। খালেদ মাহমুদসহ সারা বাংলাদেশ কেঁদেছিল সেদিন। ৫ বছর কেটে গেল কিন্তু জয় যেন অধরাই রয়ে গেল বাংলাদেশের কাছে। এরপর আসল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।

২০০৪ সালের ২০ মার্চ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৮ রানের জয় ছিল ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপের পর বাংলাদেশের প্রথম জয়। আর সবমিলিয়ে চতুর্থ জয়। আমার স্পষ্ট মনে আছে, পরের দিন পত্রিকায় প্রধান শিরোনাম ছিল, কতদিন পর বাংলাদেশের জয়! সে বছর ডিসেম্বরে বাংলাদেশ তাদের শততম ওয়ানডে ম্যাচ খেলতে নেমেছিল ভারতের বিপক্ষে। এমনিতেই ছিল শততম ম্যাচ, তার উপরে তখনকার বাংলাদেশ যখন ভারতকে ১৫ রানে হারিয়ে দিল তখন আমার মত ক্লাস টু পড়ুয়া বাচ্চাদেরও যেন আনন্দের সীমা ছিল না।

২০০৫ সালের জানুয়ারি মাসেই বাংলাদেশ আমাদের এনে দিল আরও বেশি আনন্দের উপলক্ষ। বাংলাদেশ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট জেতার সাথে সাথে জিতে নিল প্রথম টেস্ট সিরিজও। টেস্ট সিরিজ জেতার পর ওয়ানডে সিরিজও নিজেদের করে নেয় বাংলাদেশ। তখন বাংলাদেশের তারকা বলতে বর্তমান তারকা তামিমের অগ্রজ নাফিস ইকবাল, হাবিবুল বাশার, তাপস বৈশ্য, মাশরাফি মুর্তজা, মানজারুল ইসলাম রানা, আশরাফুল প্রমুখ। বাংলাদেশকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তোলার কৃতিত্ব আরেকজনের। তিনি হলেন তখনকার বাংলাদেশের কোচ ডেভ হোয়াটমোর। আজও বাংলাদেশ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে ডেভ হোয়াটমোরকে।

১৮ জুন ২০০৫ সালে নতুন এক ইতিহাস রচনা করে বাংলাদেশ। তখনকার অস্ট্রেলিয়া দল এমনই শক্তিশালী ছিল যে, তাদের সমকক্ষ কোনো দল ছিল না। কার্ডিফে আশরাফুলের সেঞ্চুরিতে ভর করে সেদিন অস্ট্রেলিয়াকে ৫ উইকেটে হারিয়েছিল বাংলাদেশ।/ ২০০৫ সালের কার্ডিফের স্মৃতি:/ আস্তে আস্তে বাংলাদেশকে সমীহ করা শুরু করে অন্য দলগুলো। বাংলাদেশ হয়ে উঠে অঘটনঘটনপটিয়সী এক দল। বাংলাদেশ তখন যে কোনো ম্যাচে ফেভারিট না থাকলেও হঠাৎ হঠাৎ বড় দলগুলোকে হারিয়ে কঠিন বিপদে ফেলতে পারত। যতই দিন যেতে থাকে বাংলাদেশের জয়ের ধারাবাহিকতা ততই বাড়তে থাকে। বাংলাদেশ সবচেয়ে বড় অঘটন ঘটিয়ে বসে ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে। সেবার বাংলাদেশ প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় করে দেয় শক্তিশালী ভারতকে। সেই ম্যাচেই তামিমকে হয়তোবা চিনেছিল ভারতকে যার পরিপূর্ণতা পেয়েছে আজকে।

২০০৮ সাল থেকেই বাংলাদেশ ক্রিকেট দলে থিতু হয়ে বসেন বর্তমান বাংলাদেশ দলের ভরসার নামগুলো যেমন- সাকিব, তামিম, মুশফিক, মাহমুদুল্লাহ প্রমুখ। জয়ের ধারায় থাকলেও কিছু কিছু সময় হোঁচটও খেয়েছিল বাংলাদেশ। ২০০৯ ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টিতে আয়ারল্যান্ডের কাছে অপ্রত্যাশিত হার কিংবা ২০১১ সালের বিশ্বকাপে ঘরের মাঠে কোয়ার্টার ফাইনালে যেতে না পারার ব্যর্থতাই হয়তোবা আজকের বড় বাংলাদেশ হয়ে উঠার শিক্ষা ছিল। বাংলাদেশ জিতলেও তখনও জয়ের ধারাবাহিকতা আসে নি। ২০১২ এশিয়া কাপে প্রথম ধারাবাহিকতা দেখিয়েছিল বাংলাদেশ। সেবার এশিয়া কাপে ভারত এবং শ্রীলংকাকে পেছনে ফেলে পাকিস্তানের সাথে ফাইনাল খেলে বাংলাদেশ। ফাইনালে ২ রানে পরাজয়ের পর সাকিব-তামিমদের কান্না আজও দেশের মানুষদের কষ্ট দেয়।

২০১৩ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দেশের মাটিতে সিরিজ জিতে বাংলাদেশ। ২০১৪ সালের এশিয়া কাপটা ছিল ২০০৩ বিশ্বকাপের মতই একটা দুঃস্বপ্ন। কিন্তু সমস্ত দুঃস্বপ্ন ফিকে হয়ে যায় মাশরাফি বিন মুর্তজা অধিনায়ক হওয়ার পর থেকে। ২০১৫ সালের বিশ্বকাপ থেকেই নতুন বাংলাদেশকে দেখে বিশ্ব। সেবার অস্ট্রেলিয়ার প্রতিকূল কন্ডিশনেও ইংল্যান্ডকে বিদায় করে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল বাংলাদেশ। বিশ্বকাপের পর একে একে ওয়ানডে সিরিজে পরাজিত করে পাকিস্তান, ভারত আর দক্ষিণ আফ্রিকাকে। শুরু হয় নতুন বাংলাদেশের পথচলা। মানুষ ভুলে যেতে থাকে আগের সাপোর্ট করা ভারত, পাকিস্তান কিংবা অন্য দলগুলোকে। মানুষের তখন থেকেই বাংলাদেশকে নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখা শুরু হয়। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। আগে ছোট ছোট দলগুলোর সাথে ঘন ঘন সিরিজ খেলত বাংলাদেশ। কিন্তু বদলে যাওয়া বাংলাদেশ ঘন ঘন সিরিজ খেলা শুরু করল বড় দলগুলোর সাথে। এতদিন বাংলাদেশ শুধু ওয়ানডেতে ভালো করত। আস্তে আস্তে বাংলাদেশ টেস্ট এবং টি-টোয়েন্টিতেও ভালো করা শুরু করল। এইতো কিছুদিন আগেও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ‌ওয়েস্ট ইন্ডিজকে সিরিজ হারিয়ে আসল বাংলাদেশ। অন্য বড় দলগুলোর মতই হার-জিতের সমন্বয়েই চলছে বাংলাদেশের ক্রিকেট। ২০১৬ ও ২০১৭ তে বিশ্ব ক্রিকেটের দুই পরশক্তি ইংল্যন্ড ও অস্ট্রেলিয়কে হারিয়ে বাংলাদেশ আবরো প্রমান করে যে বাংলাদেশ কোন ছোট দল নয়। তারা বিশ্ব ক্রিকেটের সব দলের সাথে জয় ছিনিয়ে আনতে পারে।

বাংলাদেশ এখন নিয়মিতই জিতছে। কিন্তু বাংলাদেশ জিতলে আগের মত উৎসব এখন আর হয় না। হয়তোবা দেশের মানুষ উৎসবটা জমিয়ে রেখেছে কোনও একদিন বাংলাদেশ বিশ্বকাপ জিতলে উৎসব করবে বলে। কিন্তু আমাদের প্রজন্ম একটা দিক দিয়ে অনেক সৌভাগ্যবান। আমরাই প্রথম প্রজন্ম যারা সেই বাংলাদেশ থেকে এই বাংলাদেশ হয়ে উঠা নিজের চোখে দেখেছি। আমরাই প্রথম প্রজন্ম যারা পরবর্তী প্রজন্মকে বাংলাদেশের বীরত্বগাথার গল্প শোনাতে পারব। বলতে পারব মাশরাফির দেশপ্রেমের আবেগ কিংবা তামিমের ভাঙা হাত নিয়ে এক হাতে লড়ার মত শত শত গল্প।



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :