সন্ধ্যা ৭:০৭, বৃহস্পতিবার, ১৫ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং
/ আর্ন্তজাতিক / ইতিহাস রচিত হোক সিলেটে
ইতিহাস রচিত হোক সিলেটে
নভেম্বর ৩, ২০১৮



ইকরামউজ্জমান : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক।

সিলেটিদের জন্য আজ বড্ড আবেগ, আনন্দ আর স্মরণীয় দিন। আজ থেকে তিন দিকে চা-বাগান পরিবেষ্টিত, সবুজের সমারোহের মধ্যে স্থাপিত সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে জিম্বাবুয়ে-বাংলাদেশের মধ্যে অনুষ্ঠিত টেস্ট ম্যাচের মাধ্যমে সিলেট টেস্ট ভেন্যুর যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে। এটি দেশের অষ্টম টেস্ট ভেন্যু। ক্রিকেটের ইতিহাসে সিলেট নামটি অন্তর্ভুক্ত হবে।

আমি সিলেটের ভূমিপুত্র। ঢাকায় আমার ছোট্ট ডেরায় অবস্থান করে আবেগতাড়িত এবং স্মৃতিকাতর। ষাটের দশকের দিনগুলোতে প্রতিবছরই সিলেটে যাওয়া হতো। তখন সিলেটের চৌহাট্টায় আলিয়া মাদরাসা মাঠে শীতের মিঠে রোদে লীগ ও টুর্নামেন্টের খেলা দেখা সেই সকাল থেকে দুপুর, অপরাহ্ন গড়িয়ে বিকেল উপভোগ করার সেই মধুময় দিনগুলো এখনো ভীষণ টানে! কৃত্রিমতামুক্ত, সেই সরল ক্রিকেট মাঠে বারবার ফিরে যাই! এ ছাড়া শহর থেকে অনেক দূরের চা-বাগানের মাঠে ‘টি-প্লান্টার’দের রবিবাসরীয় সেই ক্রিকেট, ম্যাচ শুরু থেকে অঢেল সুস্বাদু খাবারের পাশাপাশি আরাম কেদারায় গা এলিয়ে দিয়ে নারী-পুরুষ একসঙ্গে খেলা উপভোগের সেই অভিজ্ঞতা তো কখনো ভোলার নয়!

আজ বিশেষ স্মারক মুদ্রার মাধ্যমে উভয় দলের অধিনায়ক টসে অংশ নেবেন, ঘণ্টা বাজিয়ে শুরু করা হবে টেস্ট ম্যাচ—এই স্মরণীয় সময়ে তো মাঠে উপস্থিত থাকতে পারব না! যেসব সিলেটি খেলোয়াড় টেস্ট খেলেছেন তাঁদের মধ্যেও কেউ কেউ থাকবেন না। সিলেটের ক্রিকেট উন্নয়নে বছরের পর বছর যাঁরা কাজ করেছেন, এখন অনেক সংগঠকও এই আলো-ছায়ার পৃথিবীতে আর নেই! জীবন এমনই। সব আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত হয় না।

সিলেটে ক্রিকেট এসেছে দেড় শ বছরের অনেক আগে টি-গার্ডেনের বিদেশি প্লান্টার আর ব্রিটিশ আর্মি অফিসারদের মাধ্যমে। স্পোর্টিং ইন্টেলিজেন্স পত্রিকায় ছবিসহ খেলার খবরে দেখা যায়, ১৮৪৫ সালের মার্চ মাসে সিলেট শহরে ব্রিটিশ আর্মি অফিসারদের সঙ্গে সিপাইদের খেলা হয়েছে।

বাংলাদেশ টেস্ট স্ট্যাটাস পেয়েছে ২০০০ সালে। ভারতের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক হয়েছে ঢাকার বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে ২০০০ সালের ১০ নভেম্বর। দেশের প্রথম টেস্ট একাদশে ছিলেন সিলেটের হাসিবুল হোসেন শান্ত। পরবর্তী সময়ে রাজেন সালেহ, অলক কাপালি, এনামুল হক জুনিয়র, তাপস বৈশ্য, আবুল হোসেন রাজু, নাজমুল হোসেন, আবু জায়েদ রাহি টেস্ট খেলেছেন। এবার জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট স্কোয়াডে আছেন সিলেটের আবু জায়েদ রাহি ও সৈয়দ খালেদ আহমদ (এখনো টেস্ট ক্যাপ মাথায় পরেননি)। দুজনই পেস বোলার। এই দুজনের কি জন্মভূমির মাটিতে প্রথম টেস্ট খেলার ইচ্ছা পূরণ হবে?

বাংলাদেশ প্রথম টেস্ট জিতেছে (৩৫তম টেস্টে) জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৬ থেকে ১০ জানুয়ারি ২০০৫ সালে চট্টগ্রামের আব্দুল আজিজ স্টেডিয়ামে ২২৬ রানে। তখন জিম্বাবুয়ে দলটি ছিল শক্তিশালী। এর আগে অনুষ্ঠিত ছয়টি টেস্টের মধ্যে জিম্বাবুয়ে জিতেছিল চারটিতে আর দুটি টেস্ট ড্র হয়েছিল। চট্টগ্রাম টেস্ট বিজয়ের নায়ক সিলেটের স্পিনার এনামুল হক জুনিয়র। ৭২ ওভার বল করে ১৭টি মেডেনসহ ২০০ রান দিয়ে ১২ উইকেট নিয়েছিলেন। এরপর ঢাকা টেস্ট ড্র হওয়ায় বাংলাদেশ প্রথম সিরিজও জেতে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে খেলেছে ১৪টি টেস্ট। এর মধ্যে পাঁচটিতে জিতেছে জিম্বাবুয়ে, ছয়টিতে বাংলাদেশ এবং তিনটি টেস্ট ড্র হয়েছে। সিলেটে খেলতে নামার আগ পর্যন্ত ১০৮টি টেস্টের মধ্যে বাংলাদেশ জিতেছে ১০টি টেস্ট। ২০১৩ সালের ২৫ এপ্রিলের পর থেকে জিম্বাবুয়ে নিজ দেশে এবং বাংলাদেশে খেলতে এসে কোনো টেস্টে জিততে পারেনি টাইগারদের বিপক্ষে।

তাই পরিসংখ্যান বাংলাদেশের অনুকূলে। জিম্বাবুয়ে দলটি এখন পুনর্গঠনে আছে। চলতি সফরে ওয়ানডেতে ‘হোয়াইটওয়াশ’ হয়েছে। আজ থেকে টেস্ট ক্রিকেট। এই খেলার প্রয়োগ, মেজাজ, মানসিকতা একদম ভিন্ন। টেস্টকে বলা হয় আসল ক্রিকেট। আর এই দীর্ঘ সংস্করণের ক্রিকেট লড়াই শক্ত ও রোমাঞ্চকর। একগুচ্ছ স্পিন, টেকনিক, ট্যাকটিকস ও পদ্ধতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পরীক্ষা হয়। পরীক্ষা দিতে হয় মনঃসংযোগ, ধৈর্য, আত্মবিশ্বাস, দায়িত্বশীলতা, সামর্থ্য ও শৃঙ্খলার। বাংলাদেশ টেস্ট কম খেলার সুযোগ পায়। গত ১৮ বছরে খেলেছে ১০৮টি টেস্ট। দীর্ঘ সংস্করণের খেলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অভ্যস্ত হওয়া এবং রপ্ত করার বিষয়। খেলোয়াড়রা দলগতভাবে ওয়ানডেতে ভালো খেলছেন বলেই তাঁদের আত্মবিশ্বাস ও সাহস বেড়েছে। তাঁরা ভাবতে পারছেন টেস্ট ক্রিকেটেও ভালো করার সামর্থ্য তাঁদের আছে। সাদা পোশাকের খেলায় তাঁরা রং চড়াতে চান।

দেশের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পাঁচ স্তম্ভের মধ্যে তিন স্তম্ভ নেই টেস্ট ক্রিকেটে! মাশরাফি আগেই বিদায় নিয়েছেন, সাকিব ও তামিম চোটে থাকায় দলে নেই। সাকিব ও তামিম এই দুজনকে বাদ দিয়ে তো টেস্ট স্কোয়াড গঠন করা হয়নি আগে কখনো! স্কোয়াড গঠনের ক্ষেত্রে তাই পরীক্ষা-নিরীক্ষার পাশাপাশি বেশ কিছু বিষয় মাথায় রাখতে হয়েছে নির্বাচকদের। এর প্রতিফলন মাহমুদ উল্লার নেতৃত্বে টেস্ট স্কোয়াডে লক্ষণীয় হচ্ছে। যেটি গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো ব্যাটিং, বোলিংয়ে (পেস ও স্পিন আক্রমণে) কাউকে কাউকে বেশি দায়িত্ব নিয়ে খেলতে হবে। এটা চাপ নয়, নিজেকে তুলে ধরার সুযোগ। সিলেটে রোমাঞ্চকর টেস্টের পরিসমাপ্তি ঘটবে জয়ের স্বাদ দিয়ে—এ প্রত্যাশা নিয়েই খেলা দেখবেন।



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :