রাত ৪:১৩, শনিবার, ১৯শে অক্টোবর, ২০১৮ ইং
/ ক্রিকেট / খেলা ছেড়ে‌ও ক্রিকেটর সঙ্গে থাকতে চাই : জাহানারা
খেলা ছেড়ে‌ও ক্রিকেটর সঙ্গে থাকতে চাই : জাহানারা
অক্টোবর ৮, ২০১৮



সেই কিশোর বয়সে ক্রিকেটের সঙ্গে সখিতা তার। বয়স এখন পঁচিশ ছুঁই ছুঁই। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের পেস আক্রমণের মূল ভরসাই তিনি। কিছুদিন আগে, টাইগ্রেসদের অধিনায়ক‌ও ছিলেন তিনি। বলিছ, জাহানারা আলমের কথা। তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেটের গ্ল্যামার্স গার্ল নামেও পরিচিত। তবে, ক্রিকেটই এখন তার ধ্যান-জ্ঞান। একটাই লক্ষ্য দেশের হয়ে নিজের সেরাটা দেয়া। জানা যাক, জাহানার আলমের স্বপ্ন-বাস্তবতার কথা।

প্রশ্ন: ক্রিকেট খেলায় এলেন কী করে?
জাহানারা: আমি তখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী, বাবাকে বাসায় এসে বলেছিলাম আমাকে স্পোর্টস টিচার অনুশীলনে যেতে বলেছেন। বাংলাদেশের পরিস্থিতি তো জানেন, মেয়েদের জন্য খেলা কতটা কঠিন। বিশেষ করে মা-বাবা মেয়েদের নিয়ে কতটা ভয়ে থাকেন। কিন্তু আমার বাবা বলেছিল, তুমি খেলো কোনো সমস্যা নেই। সেই থেকে শুরু। আমি ভলিবল, বাস্কেটবল খেলতাম। এরপর ২০১৪তে আমাদের শ্রদ্ধেয় প্রয়াত কোচ সালাউদ্দিন স্যার ডেকে বললেন ক্রিকেট খেলতে, বাবা এবার‌ও মানা করেননি। সেই থেকে শুরু।

প্রশ্ন: ক্রিকেটার নারী হিসেবে জীবনের পরিবর্তনগুলো কী?
জাহানারা: আমার একটা সময় ভাত ছাড়া চলতোই না। তিন বেলাই ভাত চাই আমার। বিশেষ করে গরম ভাতের সঙ্গে আলুর ভর্তা, ডিম ভাজি আর ডাল সকালে না খেলে দিনটাই ভালো যেত না বলে মনে হতো। কিন্তু এখন সেই জাহানারা ভাত দেখলে ভয় পায়। বলতে গেলে তিন বেলা রুটিই আমি খাই। আমার খুব প্রিয় ছিল আইসক্রিম। কিন্তু এখন বছরে একবারও খাই না। মেয়েরা পরিবারের সঙ্গে থাকতেই বেশি পছন্দ করে। কিন্তু এখন আমার পরিবার বলতে দল। পারিবারিক কোনো অনুষ্ঠানে যোগ দেয়া তো দূরের বিষয়, এমনকি ঈদের দিনও দলের সঙ্গে কাটাতে হয়। বলতে গেলে দলই আমার দ্বিতীয় পরিবার। আমার খুব প্রিয় ছিল সাইকেল বা বাইক চালানো। খুব ইচ্ছা করে। কিন্তু সাইকেল নিয়ে বাসা থেকে বের হতে ভয়- যদি ইনজুরি হয়। একজন মেয়ের যে সাধারণ স্বপ্ন থাকে, বলতে গেলে তার সবই গলাটিপে মারতে হয়েছে। এক কথায় সাধারণ নারী জীবন ও ক্রিকেটার নারীর জীবনে অনেক অনেক পার্থক্য।

প্রশ্ন: আপনি এদেশের ক্রিকেটে গ্লামার গার্ল হিসেবেই পরিচিত। নিশ্চয়ই অনেক বিয়ের প্রস্তাব পান?
জাহানারা: অনেক ছেলে নানাভাবে প্রস্তাব দেয় বিয়ের জন্য। কত যে পাগলামি করে অনেকে। দেখা যায় কোথাও খেতে গিয়েছি আমার অর্ডারের বাইরেও কিছু খাবার হাজির। জানতে চাইলে জানা যায়, কেউ আমাকে উপহার হিসেবে পাঠিয়েছে। কোনো শপে গেলে হঠাৎ উপহার চলে আসে। শুধু দেশেই নয় বিদেশ থেকেও প্রস্তাব আসে। কিন্তু আমি এসব পাগলামি ভয় পাই। বিয়ে এখন আমি করতে চাই না। কারণ আমি চাই না আমার ক্রিকেট জীবনে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা আসুক। এমন নয় যে, মেয়ে ক্রিকেটাররা বিয়ে করে না। আমাদের দলে দু’জন বিবাহিত আছেন। কিন্তু তারা শ্বশুর বাড়ি থেকে স্বামীর কাছ থেকে দারুণ সাপোর্ট পাচ্ছেন। আল্লাহ তাদের মিলিয়ে দিয়েছে বলে আমিও যে এমন পাব তা নয়। তাই যতদিন ক্রিকেট খেলবো-ততদিন ঝুঁকি নিতে চাই না। আমি দুই বছর আগেও বলেছি আরো পাঁচ বছর ক্রিকেট খেলবো। এখন দুই বছর পার করে এসে বলছি আরো পাঁচ বছর খেলবো।

প্রশ্ন: একজন নারী ক্রিকেটারের জন্য পরিবারের সমর্থন কতটা প্রয়োজন?
জাহানারা: এখন নারী ক্রিকেটের যতটা মূল্যায়ন আমরা যখন শুরু করি তখন ততটা ছিল না। বিশেষ করে পেছন থেকে নানা কথা শুনতে হতো। শুধু তাই নয় একজন নারী ক্রিকেটারের পরিবারকে সবচেয়ে বেশি কথা শুনতে হয়। যেমন আমার বাবাকেও শুনতে হয়েছে। তাকে অনেকেই বলেছে যে, মেয়ে মানুষ খেলছে, বিয়ে দেবেন কিভাবে। পড়ালেখা নষ্ট হবে। এমন কত কথা। কিন্তু আমার বাবা তাদের একটাই কথা বলেছেন যে, খেলছে খেলতে থাক। শুধু তাই নয়- আমি যখন এসএসসি পরীক্ষা দেই তখনই খেলা ছিল। বাবা বলেছেন চিন্তা কর না খেলো। পরীক্ষা তিন বারও দেয়া যায়।

প্রশ্ন: মেয়েদের নয় ছেলেদের একাডেমিতেই আপনি অনুশীলন করেন, সেটি কেন?
জাহানারা: আমি অনেক আগেই খুলনার মেয়েদের কোচের (ইমতিয়াজ হোসেন পিলু) কাছে কোচিং ছেড়েছি। আমার মনে হয়েছে সেখানে কোচিং করলে আমার উন্নতি হবে না। সেই থেকে আমি ছেলেদের একাডেমিতেই কোচিং করি অনুশীলন করি। এখন মনে হয় আমার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল না।

প্রশ্ন: শুনেছি ক্রিকেটে থেকে আয়ের বেশির ভাগই মেকআপের পেছনে ব্যয় করেন?
জাহানারা: হা…হা.. হা… ভুল শোনেননি। আমি ছোটবেলা থেকেই সাজতে খুব পছন্দ করি। হ্যাঁ, প্রচুর প্রসাধনী কিনি দেশ-বিদেশ থেকে। তবে, ক্রিকেটের প্রয়োজনীয় সবও কিনতে হয়। না হলে খেলবো কি করে?

প্রশ্ন: মেয়েরা এশিয়া কাপ জিতেছে ছেলেরা পারছে না, এই বিষয়টা কীভাবে দেখেন?
জাহানারা: আমি কোনোভাবেই মাশরাফি, মুশফিক, সাকিব ভাইদের সঙ্গে নিজেদের তুলনা করতে রাজি নই। অনেকেই বলেছেন এমন কথা। কিন্তু আমার সেটি ভালো লাগেনি। আমরা এশিয়া কাপ জিততে পারি কিন্তু এই বাংলাদেশকে ক্রিকেট জাতি হিসেবে পরিচয় করিয়েছে ছেলে ক্রিকেটারই। আমরা হাজার কাপ জিতলে তাদের সঙ্গে তুলনা চলে না।

প্রশ্ন: ক্রিকেট ছাড়ার পর কি করতে চান?
জাহানারা: আমি ক্রিকেটের জন্য পড়ালেখা ঠিকভাবে করতে পারছি না। আমার খুব ইচ্ছা গ্রাজুয়েশনটা শেষ করি। আশা করি সেটি করবো। আর ক্রিকেট ছাড়লেও ক্রিকেটের সঙ্গে থাকতে চাই।



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :