সকাল ১০:৫৮, শুক্রবার, ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
/ কলাম/ফিচার / মোস্তফা মামুনের ‘টাচলাইন থেকে’
মোস্তফা মামুনের ‘টাচলাইন থেকে’
আগস্ট ৯, ২০১৮



তিনি বলেন চমৎকার করে। তবে তার লেখনি আরো দারুণ। আজ বৃহস্পতিবার দৈনিক কালের কন্ঠে প্রকাশিত তাঁর সাপ্তাহিক কলাম টাচলাইন থেকে-র মধ্যে লেখা `বিসর্জন' শিরোনামের লেখাটি বেশ সুখপাঠ্য। এবং যুক্তিগ্রাহ্য। বাংলাদেশের খেলার পাঠকদের উদ্দেশ্যে তাই এই লেখাটি হুবহু তুলে দেয়া হলো।

তখন আমরা শুধুই ‘ভবিষ্যৎ’ খুঁজতাম। আকরাম-আমিনুলরা সেঞ্চুরি করলে লেখি হয়তো ৬ লাইন, কিন্তু নতুন কেউ ৩০ করলে তার জন্য বরাদ্দ ৯ লাইন। অদেখা কেউ কোথাও বড় স্কোর করলে কিংবা বেশি উইকেট পেলেই তাত্ক্ষণিক তদন্ত—বয়স কত? হবে নাকি! দেখে দেখে বিরক্ত এক সিনিয়র ক্রিকেটার একদিন ধরে বসলেন।

‘আপনারা না একটু বেশি বেশি।’

‘কেন বেশি বেশি?’

‘এই যে যাকে-তাকে মাথায় উঠিয়ে দিচ্ছেন। সিনিয়র কেউ ভালো করলে লিখতে চান না, আর দুই দিনের ছেলেদের নিয়ে…’

‘ও এই কথা! আমরা তো উৎসাহ দিতে চাই। আপনাদের তো আর অত উৎসাহ দরকার নেই, নতুন ক্রিকেটারদের দরকার। (এটা চেপে গেলাম যে, আপনাদের দিয়ে খুব বেশি দূর যাওয়া যাবে না বলে নতুন প্রজন্মের কাছে ভরসা করতে চাইছি। আপনাদের চেয়ে প্রতিভাবানদের সন্ধান চলছে আসলে)।’

সিনিয়র ক্রিকেটারটি একটু হাসলেন। তাচ্ছিল্যের গলায় বললেন, ‘উৎসাহ দিচ্ছেন না উচ্ছন্নে নিয়ে যাচ্ছেন কে জানে!’

‘উচ্ছন্নে নিয়ে যাওয়ার প্রশ্ন আসে কেন?’

‘দেখেন কিছু অর্জনের আগেই কাউকে নিয়ে বেশি লিখলে ওর মাথা ঘুরে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ওর মনে হতে পারে, আর পরিশ্রমের কী দরকার! এমনিই তো হয়ে যাচ্ছে।’

সেদিন জানলাম অকাতরে প্রশংসা করে যাওয়ারও একটা ক্ষতিকর দিক আছে। অতি উৎসাহ তৈরি করে দেয় উচ্ছন্নে যাওয়ার পথ। কিন্তু তাহলেও সেই সময়ের উৎসাহ পাওয়ারা তো খুব ডোবাননি। আশরাফুলের পথচ্যুতির উদাহরণ আছে বটে, কিন্তু মাশরাফি থেকে সাকিব, তামিম, মুশফিক, শাহরিয়ার নাফীস—বড় সম্ভাবনার ছবি নিয়ে যাঁরা এসেছিলেন তাঁরা তো রাজত্ব করেই গেছেন। কিন্তু এখন! মাত্রই আমেরিকা জয় করে এলেও এটা ভুলে গেলে ভুল হবে যে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের পথচলায় সামনের চেয়ে পেছনের টানই বেশি। ওদের অধারাবাহিকতায় সিনিয়র ক্রিকেটারের কাঁধের ওপর এমন চাপ পড়েছে যে মোটামুটি পাঁচজনে মিলে একটা ১১ জনের দলকে টানতে হচ্ছে। এবং আশঙ্কার কথা হলো সিনিয়রদের বয়স কমছে না; বাড়ছে। কয়েক বছর পর ওরা যখন যাবেন তখন এই পথহারারা বাংলাদেশকে অন্ধকার গ্রহেই নিয়ে চলেন কি না, সেটা বড় একটা দুশ্চিন্তার বিষয়।

দুশ্চিন্তা যথেষ্ট করা হয়ে গেছে এই কয়েক বছরে। চলুন একটু কারণ খোঁজার চেষ্টা করি। প্রথম কারণটা অবশ্যই ক্রিকেটীয়। ক্রিকেটীয় কারণটা আবার দুই রকম হয়। একটা হতে পারে যে একটা দেশের পরের প্রজন্ম যথেষ্ট মেধাবী নয়। কিন্তু এই কারণটা বাংলাদেশের বর্তমান প্রজন্মের জন্য প্রযোজ্য হবে না। মুস্তাফিজ, সাব্বির, লিটন, সৌম্যরা তো সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিজেদের ক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছেন যথেষ্ট। তাহলে কারণ এটা নয়। এবার দ্বিতীয় ক্রিকেটীয় ব্যাপারটা একটু দেখি।

ক্রিকেটীয় বা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সব সময় বলা হয় যেকোনো তরুণ ক্রিকেটারের জন্য প্রথম বছরের চেয়ে পরের বছরগুলো কঠিন। এখন ক্রিকেট স্ট্র্যাটেজিটা প্রতিপক্ষের বিশ্লেষণনির্ভর, সেখানে নতুন খেলোয়াড়ের সুবিধা হলো তাকে কেউ সেভাবে চেনে না বলে শক্তি-দুর্বলতা অতটা বিশ্লেষণ হয় না। দ্বিতীয়ত, নতুন খেলোয়াড় তো আর নির্ধারক হবে না কাজেই তাকে নিয়ে অত বেশি ভাবার কাজ নেই। সেই উদাসীনতার সুযোগে সহজাত প্রতিভাবানদের পক্ষে নিজেদের প্রকাশ করা খুবই সম্ভব, যেটা করেছে বাংলাদেশের এই প্রজন্মের প্রতিভাবানরা। খেয়াল করে দেখুন, মুস্তাফিজ-সৌম্যদের প্রথম বছরের পারফরম্যান্স ক্ষেত্রবিশেষে সাকিব-তামিমদের শুরুকেও হার মানানো। এই পারফরম্যান্সের পর তাঁদের স্বভাবতই যেতে হয়েছে প্রতিপক্ষের গবেষণাগারে। তৈরি হয়ে গেছে প্রতিষেধক। কিন্তু এটাও তো খুব হাতি-ঘোড়া ব্যাপার নয়। যত বড় খেলোয়াড় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সফল প্রথম বছর কাটিয়েছে দ্বিতীয় বছরে তাঁদেরকে বিশ্লেষণের চক্করে ফেলে ‘হাত-পা কাটার’ উদ্যোগ হয়েছে। এখন নিজেদের কোচিং দলের কাজ হচ্ছে প্রতিপক্ষের বিশ্লেষণের পর তাঁকে ঘিরে যে ছক তৈরি হবে সেটা কাটার ব্যবস্থা করে দেওয়া। সেই জায়গাতে বাংলাদেশের দুর্বলতা ঐতিহাসিক। এরও আগে ঠিক এই কারণে পুরোপুরি বিকশিত হতে পারেননি রাজিন সালেহ কিংবা অলক কাপালি। দ্বিতীয় পর্যায়ে নিজেদের ক্রিকেটে যে রকমের বর্মে সজ্জিত হওয়া দরকার ছিল সেটা ওরা পারেননি বলেই হারিয়ে গেছেন হাহাকার হয়ে। এখনকার তরুণদের ক্ষেত্রে এটা একটা সমস্যা কিন্তু একমাত্র সমস্যা নয়। সম্ভবত বড় সমস্যাও নয়। বড় সমস্যা অন্য। সেটা ক্রিকেটের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর সামাজিক ক্ষেত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত।

কয়েক মাস আগে জাতীয় দলের এক পেসার ক্রিকেট বোর্ডের কাছে একটা ছুটির দাবি নিয়ে নাকি এসেছিলেন। ছুটি চান এ জন্য যে এই সময় তিনি একটা সিনেমায় অভিনয় করতে চান। নায়ক হওয়ার জন্য কোটি টাকার প্রস্তাব। ভাবা যায়, যে দেশে এক কোটি টাকাতে একটা সিনেমা তৈরি হয়ে যায় সেখানে অপরীক্ষিত একজন ক্রিকেটারকে নায়ক বানাতে এক কোটি টাকার প্রস্তাব! হ্যাঁ, ক্রিকেটারদের বাজারমূল্য এখন এতটাই আকাশচুম্বী। দেশের সব ভালো-মন্দ জিনিস বিক্রিতেও সবার চাই একটা জাতীয় ক্রিকেটারের মুখ, শপিং মল-বিপণিবিতানের উদ্বোধনের আমন্ত্রণের মিছিল, এমনকি রাজনীতির ময়দানেও ওদের নিয়ে টানাটানি। এই জায়গাটাতেই ঘটছে মাথা ঘুরে যাওয়ার চাহিদা। একজন ২০-২২ বছরের তরুণ জাতীয় দলে ঢুকছে আর ঢুকে দেখছে দুনিয়াটা কেমন স্বর্গ হয়ে যাচ্ছে। নিমিষেই কোটিপতি, তুঙ্গস্পর্শী তারকাখ্যাতি। সাধারণ পরিবারের, সেভাবে পড়াশোনা না করা একজন তরুণ যখন চাঁদটা এমন হাতে পেয়ে যাচ্ছে তখন তুষ্টি তাঁকে ভর করবেই। অন্য যেকোনো খেলায় বা যেকোনো ক্ষেত্রে জাতীয় দলে ঢুকলেই তারকা হওয়া যায় না, তারকা হতে গেলে সেখানে সাফল্য লাগে। কিন্তু বাংলাদেশের তরুণ ক্রিকেটারদের অল্পবিস্তর সাফল্যতেই চলছে আর সেটাই কেড়ে নিচ্ছে পরের পর্যায়ে যাওয়ার তাড়না। একজন সাবেক জাতীয় ক্রিকেটার এ রকম বিশ্লেষণ শুনে বলছিলেন, ‘ঠিক আছে কিন্তু ওদের সামনে তো সাকিব-তামিম আছে। ওরা তো দেখছে আরেক ধাপ পেরোলেই একেবারে বিশ্বপর্যায়ের তারকা হওয়া যাচ্ছে। সেটা ওদের টানবে না!’

টানছে না কারণ তারা দেখতে পায় সেটা করার জন্য আরো অনেক-অনেক পরিশ্রম করতে হয়। এবং এ রকম পরিশ্রম, ত্যাগের পর আসলে সেই জায়গায় যে পৌঁছানো যাবে তারও তো নিশ্চয়তা নেই। মাঝখান দিয়ে ভোগ আর উপভোগের এই সময়টা নষ্ট হয়ে যাবে। কী দরকার! তাই অনিশ্চিত স্বপ্নের পেছনে না ছুটে রংচং করা বর্তমান নিয়েই মেতে থাকে, যে রং একসময় কালি হয়ে টেনে নিয়ে যায় অন্ধকারের দিকে।

কেউ কেউ প্রশ্ন করবেন, সাকিব-তামিম-মুশফিকরা কী করে পারলেন! প্রলোভন তো ওদেরও ছিল। উত্তর, সাকিবরা যখন প্রথম জাতীয় দলে ঢোকেন, মানে তরুণ বয়সে ক্রিকেট অত বড় পণ্য ছিল না বলে পা পিছলানোর অতগুলো পথ ছিল না। তবু যে কিছু ছিল না এমন নয়। সেই পথ আটকে রেখেছে তখনকার দলের মধ্যে থাকা মধ্যবিত্ত সাংস্কৃতিক বোধ এবং নিজেদের পরিবার-পরিবেশ থেকে বয়ে আনা বোধ। যে বোধ শেখাত, খ্যাতি শুধু ভোগের নয়, দায়িত্বেরও। কিন্তু এখনকার অস্থির সময়ের বাণিজ্যমুখী চরিত্র সব বোধ কেড়ে নিয়ে রেখে দিয়েছে শুধু দুটি শব্দ। উপার্জন এবং ভোগ।

এই উপার্জন এবং ভোগের চক্করে জন্ম হচ্ছে তৃতীয় একটা শব্দের। শব্দটা ‘বিসর্জন।’



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :