রাত ১২:০৪, মঙ্গলবার, ২০শে আগস্ট, ২০১৮ ইং
/ টেবিল টেনিস / টেবিল টেনিসে কোন পথে?
টেবিল টেনিসে কোন পথে?
এপ্রিল ১৬, ২০১৮



এস এম আশরাফ

‘ব্রোঞ্জতো পাক্কাই, আমাদের লক্ষ্য রৌপ্য জেতা’। সদ্য শেষ হওয়া দক্ষিণ এশীয় ক্লাব কাপ টেবিল টেনিস টুর্নামেন্ট শুরুর আগে নেপাল কোচ সঞ্জয় আরিয়াল। ‘রৌপ্যতো নিশ্চিতই তবে স্বর্নের আশা করতে পারছিনা’। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে বাংলাদেশের এক কর্মকর্তা। শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ এশীয় ক্লাব কাপ টেবিল টেনিস চ্যাম্পিয়নশীপে নেপালের লক্ষ্যটাই পুরন হয়। রৌপ্য জিতে নেয় সেদেশের ক্লাব হুয়াই টিটি। আর তাদের কাছে হেরেই ব্রোঞ্চের হতাশায় পুড়তে হয় স্বাগতিকদের পাললিক ক্লাবকে। আসরের অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন ভারতের ক্লাব ওয়েস্ট বেঙ্গল।

এবার দু দলের দু রকম ফলাফলের কারনটা বের করা যাক। আগষ্টে এশিয়ান গেমসে টেবিল টেনিস ইভেন্টকে সামনে রেখে নেপালের প্রস্ততিটা শুরু হয়েছে দেড় বছর আগে থেকেই। বয়স ভিত্তিক অনূর্ধ্ব-১০,১২,১৪,১৬ এই চারটি গ্রুপে ভাগ করে চলছে তাদের ক্যাম্প। অথচ বাংলাদেশে বয়সভিত্তিক কোন দলই নেই। আর এবার যারা বাংলাদেশের হয়ে খেলেছেন তারা টুর্নামেন্ট শুরুর খবরটাই জানতে পারেন কিছুদিন আগে। তাই সেভাবে প্রস্ততিও নিতে পারেননি। আরো বিস্ময় হলো এই পেশাদারিত্বের যুগেও বাংলাদেশ জাতীয় দলে নেই কোন কোচ। স্বাগতিকদের পাললিক ক্লাবও খেলেছে কোচ ছাড়াই। তাই রৌপ্য জয়ের মিশনে নেপালের সাফল্য আর বাংলাদেশের ব্যর্থতা মোটেও ঝড়ে বক পড়া নয়।

প্রতিযোগীতার পেছনের গল্পটা

পুরো আয়োজনের পৃষ্ঠপোষকতা করেছে চট্টগ্রামের ‘অ্যাডভোকেট গোলাম মোস্তফা মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’। প্রতি বছর ঐতিহ্যবাহী মেজবান করে যার নামে ট্রাস্ট তার মৃত্যুবার্ষীকি পালন করতো পরিবারের সদস্যরা। তবে এবার একটু ভিন্ন আঙ্গিকে করার অভিপ্র্রায় থেকেই এই আয়োজনের সূত্রপাত। মোস্তফা সাহেবের ছেলে আজম চৌধুরী একজন টেনিস খেলোয়াড়। সেই সুত্রেই যোগাযোগ বাংলাদেশ টেবিল টেনিস ফেডারেশনের সাথে। তারাই প্রস্তাবটি দেয় দক্ষিণ এশীয়ার সেরা ক্লাবগুলো নিয়ে এমন আয়োজনের। সেই লক্ষ্যে পাঠানো আমন্ত্রন পত্র স্বাদরে গ্রহন করে ভারতের টেবিল টেনিস লিগ চ্যাম্পিয়ন বেঙ্গল ক্লাব, ভুটানের থিম্পু টিটি ক্লাব, নেপালের হুয়াই ক্লাব, মালদ্বীপের মলদোভিয়ান ক্লাব, শ্রীলঙ্কার সাউদার্ন ক্লাব এবং বাংলাদেশের লিগ চ্যাম্পিয়ন পাললিক ক্লাব। পাকিস্তানের জিমখানা আসতে পারেনি তাদের খেলোয়াড়রা কমনওয়েলথ গেমসে চলে যাওয়ায়।

ভারত কেনো এগিয়ে?

টেবিল টেনিসে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ফলাফলে চোখ বুলালে দেখা যাবে বিশ^মঞ্চে একমাত্র ভারতীয়রাই প্রতিদন্ধীতা গড়ে তুলছে। ভারতের যে প্লেয়াররা এবার বাংলাদেশে খেলতে আসেন তারা বি’ দলের সদস্য। মুল দল তখন অস্ট্রেলিয়ায় কমনওয়েলথ গেমসে। অথচ এই দলটির কাছেই পাত্তা পায়নি বাকি ৫ দল। অবশ্য এর ব্যাতিক্রম হলে সেটাই হতো অঘটন। কমনওয়েলথ গেমসে দুবারের স্বর্ণ আার একবারের ব্রোঞ্জজয়ী শুভজিত সাহাকে নিয়ে ভারতের যে দলটি এই টুর্নামেন্টে খেলতে এসেছে তারা সারা বছর খেলার মধ্যেই থাকে।বাকিদের থেকে ভারতের এগিয়ে থাকার কারনটা জানতে চেয়েছিলাম শুভজিতের কাছে। উত্তরটা শুনুন তার মুখেই, ‘দেখুন একটা প্লেয়ার সব ভুলে তখনই খেলায় মন দিতে পারবে, যখন দেখবে তার ভবিষ্যত নিয়ে অনিশ্চিয়তা নেই। ভারতে খেলোয়াড়দের এগিয়ে থাকার অন্যতম কারন এটাই। আমাদের খেলা ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে আর ভাবতে হয়না। আমাদের ওখানে খেলোয়াড়দের চাকরি দিয়ে দেয়া হয় বিভিন্ন সংস্থায়। সে জন্য খেলতে পারি নিশ্চিন্তে’। যে দেশে ক্রিকেটেই ধ্যানজ্ঞান সকলের। সেখানে টেবিল টেনিসের মতো খেলাতে প্লেয়ার সংকটের ধারনা হতে পারে যে কারো। তবে বেঙ্গল ক্লাবের কোচ সুব্রত রায়ের বক্তব্যে পরিস্কার হয়ে যায় এই খেলাতেও তরুনদের আগ্রহের কথা। তিনি বলেন,‘যে কোন খেলায় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য একটা ভুমিকা পালন করে, এই যেমন শিলিগুড়িতে ২৫ থেকে ৩০ টা ক্লাব আছে টেবিল টেনিসের। ক্রিকেট ক্লাব হয়তো এর চেয়ে চার পাঁচটা বেশী হবে। এখানকার খেলোয়াড় সহজে চাকরি পেয়ে যায় বলে খেলতে পারে মন খুলে। সকালে হাজিরা খাতায় একটা স্বাক্ষর দেওয়া ছাড়া সময় দিতে হয়না চাকরিতে। তাই ওরা সকালে এবং বিকেলে টানা তিন ঘন্টা অনুশীলন করতে পারে। বিদেশে অনেক লিগও খেলতে যায়। গত বছর থেকে চালু হয়েছে ফ্রাঞ্চাইজি লিগ যা আরো সাহায্য করছে খেলার উন্নতিতে। অবশ্য শুধু চাকরির নিশ্চয়তাই নয়, যে কোন খেলাধুলায় এগিয়ে যাওয়ার পেছনে সরকার এবং ফেডারেশনের ভুমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের টেবিল টেনিস ফেডারেশন সেই কাজটি যথার্থ ভাবেই করে চলেছে। খেলোয়াড় বাছাইয়ের কাজটা জাতীয় দলের কোচরা করে থাকেন অনুর্ধ্ব-১০ থেকেই। সেখান থেকে অনুর্ধ্ব-১২, অনুর্ধ্ব-১৪, অনুর্ধ্ব-১৬ এবং বি দল ঘুড়ে জাতীয় দলে সুযোগ করে নেয় খেলোয়াড়রা।

বাংলাদেশীদের আফসোস

বয়স ৩৫ ছাড়িয়েছে দুজনেরই। এখনও তারা র‌্যাকেট হাতে বাংলাদেশের কান্ডারী। বলছি মানস চৌধুরী এবং মাহবুব বিল্লার কথা। কথা প্রসঙ্গে মানস চৌধুরীকে একবার প্রশ্ন করেছিলাম, এখনো কেনো খেলে যাচ্ছেন, আর কি কেউ নেই।‘উত্তরে তিনি বললেন, আমাকে আগে কেউতো হারাক, আমিতো তার কাছেই জায়গা ছেড়ে দেবো। সে অপেক্ষাতেইতো এখনো সময় গুনছি।’ আসলে এটাই বাস্তবতা। খেলোয়াড় নেই আমাদের। তাই গত এক দশকে খন্দকার মাহবুব বিল্লাহ ছয়বার আর মানস চৌধুরী জাতীয় চ্যাম্পিয়ণ হয়েছেন পাচবার। যদিও গত জাতীয় চ্যাম্পিয়নশীপে দুজনের রাজ্য দখল করে নিয়েছিলেন জাভেদ আহমেদ। সে কথা স্মরন করাতে দুজনই স্বস্তির নিশ^া:স ফেললেন। কেউ আসছে বলে। তবে খুব বেশী আশা দেখছেননা তারা। দায়টা ফেডারেশনের ঘাড়েই চাপালেন মানস। ‘কর্মকর্তারা ভালো ফল চান। আরে ভাই আগেতো গাছ লাগান তারপর না ফল খাবেন। একই সুর মাহবুবের কন্ঠেও, ‘দেশের অন্য জেলাগুলোতে টেবিল েেটিসর চর্চা নেই। নড়াইলে একসময় খেলাটা হতো এখন ওরাও বিবর্ন। কর্মকর্তারা একু আন্তরিক হলে কিন্ত ভালো করতে পারি আমরা।

অসহায় ফেডারেশন

টেবিল টেনিস নিয়ে নিজের অসহায়ত্ব তুলে ধরলেন ফেডারেশনের সাধারন সম্পাদক খন্দকার হাসান মুনীর। সব সমস্যার মুলে অর্থকেই সামনে নিয়ে আসলেন, ‘দেখুন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ থেকে বছরে আমরা বারো ল টাকা পাই মাত্র। মানে প্রতিমাসে এক লাখ টাকা। সেখানে কর্মচারীদের বেতন আর রনাবেনেই চলে যায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা। তারপর আর কি করে টুর্নামেন্ট আয়োজন করা যায়। স্পন্সরদের এখানে আনতেও বেশ বেগ পেতে হয়।’ তাই ক্রীড়া মন্ত্রনালয়কে এ ব্যাপারে এগিয়ে আসার আহবান জানালেন। তার মতে এমন অনেক জায়গা আছে যেখানে অর্থ বেশী খরচ করা হয়, তা না করে বরং, টেবিল টেনিসে বরাদ্দ বাড়ালে সাফল্য পাওয়াার সম্বাবনাও বেড়ে যাবে।’ পাশাপাশি নতুন আশার কথাও শোনালেন, আগামী তিন মাসের মধ্যে একজন বিদেশী কোচ নিয়োগ দিতে চান তারা। ফেডারেশনের কথার সঙ্গে কাজের মিল হলে আসলে লাভবান হবে বাংলাদেশই। সে দিকটাতেই তাকিয়ে টেনিস খেলোয়াড়রাও।



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :