রাত ২:৪৫, মঙ্গলবার, ২৩শে অক্টোবর, ২০১৭ ইং
/ হকি / পাকিস্তানের সামনে এ কোন বাংলাদেশ!
পাকিস্তানের সামনে এ কোন বাংলাদেশ!
অক্টোবর ১২, ২০১৭

তিনি নেই। চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তবু তার কথা উঠলো ঘুরেফিরে। ১৯৮৫ সালের এশিয়া কাপ হকি যারা মাঠে গিয়ে দেখেছেন, যে সব ক্রীড়া অন্তঃপ্রাণ মানুষের মনে এখনো ৩২ বছর আগে হওয়া সেই হকি আসরের স্মৃতি ভাস্বর- তাদের সবার মুখেই জুম্মন লুসাইয়ের কথা।

ভাবছেন প্রায় তিন যুগ পর দেশে আবার মহাদেশীয় হকির সেরা আসর বসেছে, আর বাংলাদেশের হকি ইতিহাসের সব সময়ের অন্যতম সেরা ও সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার জুম্মন লুসাই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে পরপাড়ে চলে গেছেন বলেই তার কথা মনে হচ্ছে!

হ্যাঁ, তা হচ্ছে অবশ্যই। তবে সেটা জুম্মন লুসাই একা নন, ১৯৮৫ সালের এশিয়া কাপ স্কোয়াডের বাকি দুই প্রয়াত সদস্য আব্দুল মালেক চুন্নু ও জসিমউদ্দীন কাঞ্চনের কথাও উচ্চারিত হচ্ছে। কিন্তু আজ এশিয়া কাপের প্রথম দিন জুম্মন লুসাইয়ের প্রসঙ্গ একটু বেশি করে উঠে আসছে ভিন্ন কারণে।

ইতিহাস ও পরিসংখ্যান জানাচ্ছে ৩২ বছর আগে দেশের মাটিতে প্রথম এশিয়া কাপে জয় দিয়ে শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের যাত্রা। তখনকার ঢাকা স্টেডিয়াম আজকের বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে ইরানকে ৩-১ গোলে হারিয়ে শুভ সূচনা করেছিল বাংলাদেশ। রক্ষণদূর্গের অতন্দ্র প্রহরি ও পেনাল্টি কর্নার স্পেশালিস্ট জুম্মন লুসাই একাই সবগুলো গোল করেছিলেন। মোদ্দা কথা জুম্মন লুসাইয়ের অনবদ্য হ্যাটট্রিকে সূচিত হয়েছিল বাংলাদেশের জয়যাত্রা।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তথ্য হচ্ছে, ইরানের বিপক্ষে বাংলাদেশের সবগুলো গোলই এসেছিল পেনাল্টি কর্নার থেকে। যার সবগুলোই করেছিলেন জুম্মন। আজ পাকিস্তানের সাথে প্রথম ম্যাচে জয় দিয়ে শুরু দুরের কথা, ড্র‘ও করতে পারেনি বাংলাদেশ। ৭-০ গোলের বড় ব্যবধানে হারে শুরু হয়েছে জিমি-চয়নদের এবারের এশিয়া কাপ যাত্রা।

৩২ বছর আগে যার হ্যাটট্রিকে শুরু হয়েছিল এশিয়া কাপ, সেই জুম্মন লুসাই আজ বাংলাদেশ দলের খেলা দেখলে নিশ্চয়ই হতাশায় মুষড়ে পড়তেন। ৮৫‘র এশিয়া কাপ স্কোয়াডের অন্যতম সদস্য কামরুল ইসলাম কিসমতের মন খারাপ। খেলা শেষে এ সাবেক সেন্টার ফরোয়ার্ডের কন্ঠে হতাশা- ‘ভাই খুশি হতে পারলাম না। আরও বেটার পারফরমেন্সের আশায় ছিলাম। আমরা পাকিস্তানের যে দলের সাথে সমান তালে লড়ে মাত্র ১ গোলে হেরেছিলাম, সেই পাকিস্তানের সাথে এই পাকিস্তানের তুলনাই চলে না। সেই দল ছিল বিশ্বসেরা। ১৯৮৪ সালের অলিম্পিক স্বর্ণ বিজয়ী দল। সেই দল ছিল বিশ্বসেরা। হানিফ খান, হাসান সর্দার, কলিমউল্লাহ ও কাশিম জিয়ার মত বিশ্বমানের প্লেয়ার ছিলেন ঐ দলে। কিন্তু আজ যে পাকিস্তান খেললো সেই দলে একজনও বিশ্ব মানের খেলোয়াড় নেই। এই দলের কাছে এত গোলে হার মেনে নেয়া কঠিন।’

৮৫‘র এশিয়া কাপ স্কোয়াডের সদস্য কিসমত একা নন, তার পরের প্রজন্মের অন্যতম কুশলী সেন্টার হাফ এহসান রানার কন্ঠেও হতাশা- ভাই পাকিস্তানের এই দলটি আহামরি কোন দল নয়। আমরা ২ থেকে ৩ গোলে হার পর্যন্ত ঠিক ছিল; কিন্তু এত বড় ব্যবধানে হারা উচিৎ হয়নি।

শুধু কিসমত আর রানাই নন, বুধবার জিমি বাহিনীর সামগ্রিক পারফরমেন্সে সত্যিই হতাশ সবাই। হতাশ হবার অনেক যৌক্তিক কারণ আছে। প্রথম কারণ, পাকিস্তানের যে দলটির সাথে ৩২ বছর আগে বাংলদেশ বুক চিতিয়ে ৭০ মিনিট প্রাণপন লড়ে মাত্র এক গোলে হেরেছিল- সেটা ছিল সে সময়ের বিশ্ব হকির অন্যতম সেরা দল।

যারা এক বছরেরও কম সময় আগে লস অ্যাঞ্জেলস অলিম্পিকে অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস ও জার্মানির মত পরাশক্তিকে হারিয়ে অলিম্পিকে স্বর্ণ পদক জিতেছিল। সে সময়ের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের তকমাও গায়ে ছিল পাকিস্তানের। সেখানে এখন বিশ্ব হকিতে পাকিস্তান অনেক পিছিয়ে পড়া দল। বর্তমান র্যাঙ্কিং ১৪।

সেই দলের কাছে ১৫ মিনিটের প্রথম কোয়ার্টারে প্রায় সমান তালে লড়ার পর ১-০ গোলে পিছিয়ে থেকে পরের ৪৫ মিনিটে ছয় গোল হজম করা একটু চোখে লাগে বৈকি। এমন নয়, আগে কখনোই পাকিস্তানের কাছে সাত গোল খায়নি বাংলাদেশ। খেয়েছে। এর চেয়ে অনেক বড় ব্যবধানে হারের রেকর্ড আছে।

১৯৭৮ সালে ব্যাংকক এশিয়াডে পাকিস্তানের কাছে ১৭-০ গোলের বিরাট ব্যবধানে হেরেছিল বাংলাদেশ। তবে ১৯৮৫ সালের এশিয়া কাপেই পাকিস্তানীদের ভীত কাপিয়ে মাত্র ১-০ গোলে হেরেছিলেন ওসমান, জুম্মন লুসাই, জসিমউদ্দীন কাঞ্চন, আব্দুল্লাহ পিরু, শাহাবউদ্দীন চাকলাদার, সালাউদ্দীন তিসারা।

এশিয়া কাপে আগের ছয় সাক্ষাতে সেটাই সবচেয়ে কম গোলে হার বাংলাদেশের। বাকি পাঁচবার যথাক্রমে- ১৯৮২ সালে ৯-০, ১৯৯০ সালে ৭-২, ১৯৯৯ সালে ৬-০ , ২০০৩ সালে ৮-০ আর ২০০৭ সালে সর্বশেষ এশিয়া কাপের মোকাবিলায় পাকিস্তানের কাছে ১০-০ গোলে হেরেছিল বাংলাদেশ। আর এমনিতে গত দক্ষিণ এশীয় গেমসে শেষবারের সাক্ষাতে পাকিস্তানীরা ৬-০ গোলে জিতেছিল বাংলাদেশের বিপক্ষে।

তিন যুগ পর আবার ঘরের মাঠে এশীয় হকির আসরের উদ্বোধনী দিনে ৭-০ গোলের হারটাই কাটার মত বিঁধছে। জাগো নিউজের সাথে ব্যক্তিগত আলাপে ম্যানেজার রফিকুল ইসলাম কামালের কন্ঠেও খানিক আক্ষেপের সুর- ‘আসলে দেশের মাটিতে মহাদেশীয় হকির উদ্বোধনী দিন পাকিস্তানের মত বড় দলের সাথে খেলার জন্য যে মানসিক দৃঢ়তা, লড়াকু মনোবল ও ভাল খেলার দৃঢ় সংকল্প দরকার, আমাদের খেলোয়াড়দের মাঝে তার কমতি ছিল। প্রথম ১৫ মিনিটের কোয়ার্টারে দারুণ খেলেছে তারা। পরের কোয়ার্টারেও লড়াইয়ে ছিল; কিন্তু দ্বিতীয় কোয়ার্টারের শুরুতে জিমির একক প্রচেষ্টা পাকিস্তান গোকিপারকে পরাস্ত করলেও পোস্টে লেগে প্রতিহত হবার পর থেকেই ছন্দপতন। তারপর থেকে ক্রমেই ব্যাকফুটে চলে গেছে দল।’

কি আশ্চর্য্য! ৩২ বছর আগেও পাকিস্তানের সাথে সাইডপোস্ট বাংলাদেশের সামনে চীনের প্রাচির হয়ে দাড়িয়েছিল। বলার অপেক্ষা রাখে না, বাংলাদেশ হেরেছিল এক মাত্র গোলে। পাকিস্তান অধিনায়ক ও প্লে মেকার হানিফ খানের বাঁ-দিক থেকে বাড়ানো বল স্টিকে জমিয়ে ব্যক্তিগত মুন্সিয়ানার অনুপম প্রদর্শনীতে দারুণ এক গোলে বাংলাদেশকে হতাশায় ডুবিয়ে পাকিস্তানকে স্বস্তির এক জয় উপহার দিয়েছিলেন, সে সময়ের বিশ্বের এক নম্বর সেন্টার ফরোয়ার্ড হাসান সর্দার।

কাল জাগো নিউজের সাথে আলাপে সে গোলের বর্ননা দিয়েছেন ৮৫‘র এশিয়া কাপে বাংলাদেশ দল তথা ওই আসরের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় আব্দুল্লাহ পিরু।

পিরু জানান, ‘বাংলাদেশের সীমানায় ঢুকে বাঁ-দিক ঘেঁসে বল ধরে তা হাসান সর্দারকে দেন হানিফ খান। দীর্ঘদেহী হাসান সর্দার অসামান্য দক্ষতায় সেই বল স্টিকে নিয়ে শরীরের ঝাঁকুনি ও স্টিকের কারুকাজে আমাদের ডি বক্সের বাইরে কাঞ্চন ভাই ( প্রয়াত জসিমউদ্দীন কাঞ্চন ) আর নাসিম ভাইকে ( সেন্টার হাফ ওয়ালিউল ইসলাম, বর্তানে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী) শরীরের ঝাটকায় ও ডজ দিয়ে পিছনে ফেলে ভিতরে ঢুকে পড়েন।

তার নিপুন স্টিকওয়ার্ক আর ড্রিবলিংয়ের কাছে জুম্মন ভাইয়ের (প্রয়াত জুম্মন লুসাই) মত তুখোড় ডিফেন্ডারও পরাস্ত হন। তার প্রতিরোধ ছিন্ন করে হাসান সর্দারকে থামাতে আমিও প্রাণপন চেষ্টা করেছিলাম। দ্রুত গতি সম্পন্ন হাসান সর্দারকে রুখতে ছুটে গিয়ে ফ্লাইং ডাইভ দিয়ে তাকে আটকানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হই। আমাদের চারজনের গড়া রক্ষণ ফাঁদ ভেদ করে অসামান্য দক্ষতায় বলকে আমাদের গোলে পাঠিয়ে দেন হাসান সর্দার।’

বুধবার ১-০ গোলে পিছিয়ে থাকা অবস্থায়ও সেই সাইড পোস্ট বাংলাদেশের সমতার পথে বাঁধা হয়ে দাড়ায়। অধিনায়ক রাসেল মাহমুদ জিমি বক্সে ঢুকে একটু ডান দিক থেকে দুরের পোস্টে যে মাঝারি প্লেসিং করেন, তা পাকিস্তান গোলকিপারের গ্লাভসে লেগে দুরের পোস্টে আঘাত হানে। গোল শোধের সেই চেষ্টায় ভাগ্য বাধা হয়ে দাড়ানোর পর বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা খানিক হদোদ্যম হয়ে পড়ে একের পর এক গোল হজম করতে থাকেন।

কিন্তু আজ যে পাকিস্তান দল খেললো, সে দলে হাসান সর্দার, হানিফ খান, কালিমউল্লাহ, নাসির আলী বহুদুরে, তাহির জামান, কামরান আশরাফ, কামার ইব্রাহিম এমনকি মাঝে পাকিস্তানের মাঝ মাঠ আগলানো সাকলাইন ও ইমরানদের মানেরও কেউ নেই।

কিন্তু সেই দলের সাথেও বাংলাদেশ হারলো ৭ গোলে। ৩২ বছর আগে পাকিস্তানের বিশ্ব সেরা দলের সাথে প্রিয় জাতীয় দলের প্রানপন লড়াই ও কঠিন সংগ্রাম দেখা অনেকেই আজ জিমি , চয়নদের অসহায় আত্মসমর্পন দেখে হতাশ।



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :