রাত ২:৩২, শনিবার, ২১শে জুলাই, ২০১৭ ইং
/ আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি / মাঠের বাইরেও বাংলাদেশ-ভারত যুদ্ধ
মাঠের বাইরেও বাংলাদেশ-ভারত যুদ্ধ
জুন ১৪, ২০১৭

একদিকে বিরেন্দর শেবাগ, অন্যদিকে বাংলাদেশের ক্রিকেট সমর্থকরা। গরম করে তুলছেন ফেসবুকসহ সোশ্যাল মিডিয়া। সময়ে-অসময়ে বাংলাদেশকে খোঁচা মেরে কথা বলাটা যেন অভ্যাসে পরিণত করেছেন শেবাগ। সেই খোঁচাটা ভারত সেমিফাইনালে ওঠার পরপরই তিনি দিয়ে দিলেন। তাতে যেন বেজে উঠল যুদ্ধের দামামা। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কাঁপিয়ে তোলা হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া।

এখন আর ভারত বনাম বাংলাদেশ মানে নীরব ক্রিকেট দ্বৈরথ নয়। বরং দুই দেশের সমর্থকদের তীব্র রেষারেষি আর সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং ওয়েবসাইটে রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা। ভারতীয় পত্রিকাগুলোর মতে, বাংলাদেশের সমর্থকরা নাকি ইচ্ছা করেই ঝগড়ার আবহ তৈরি করার চেষ্টা শুরু করে দিয়েছে।

কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায় তেমনই খেলা হলো, ‘সেমিফাইনালে বাংলাদেশ খেলবে ভারতের বিরুদ্ধে, এটা জানার পর থেকেই ফেসবুকে বাংলাদেশের সমর্থকরা টিপ্পনী কেটে একটা ঝগড়া করার আবহ তৈরি করার চেষ্টা শুরু করে দিয়েছেন। ভারত তো খেলবে ১৫ জনে। ১১ জন ক্রিকেটারের সঙ্গে মাঠের দু’জন আম্পায়ার, থার্ড আম্পায়ার এবং রিজার্ভ আম্পায়ারের কথা বোঝাতে চাইছেন তারা।’

ভারতীয়দের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিল যেন একটি ছবি। সোশ্যাল দুনিয়ায় ইতোমধ্যে ছবিটি ভাইরাল হয়ে গেছে। কম্পিউটারের কারসাজিতে দেখানো হচ্ছে, বাঘের গায়ে বাংলাদেশের পতাকা। আর ছোট একটি কুকুরের গায়ে ভারতের পতাকা। বিশাল সেই বাঘটি হালুম করে হামলে পড়তে চাইছে ছোট কুকুরটির ওপর।

বাংলাদেশের সমর্থকরা বোঝানোর চেষ্টা করছে, বাংলাদেশই ফেবারিট। কুকুরের গায়ে ভারতের পতাকা জড়িয়ে দিয়েই পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তুলেছে বাংলাদেশের সমর্থকরা। ভারতীয়রা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না। কলকাতার মিডিয়া থেকে শুরু করে পুরো ভারতেরই বিভিন্ন মিডিয়ায় ছবিটি প্রকাশ করছে। বাংলাদেশের সমর্থকদের এ অপমান গায়ে জ্বালা ধরিয়ে দিয়েছে যেন ভারতীয়দের। এটাই না আবার বুমেরাং হয়ে যায় বাংলাদেশের জন্য!

নিঃসন্দেহে ছবিটি বেশ অপমানজনক। খেলায় প্রতিযোগিতা থাকবেই। সুস্থ প্রতিযোগিতা বলেই হয়তো খেলাধুলা মানুষের কাছে বিনোদনের অন্যতম একটা মাধ্যম এবং এত জনপ্রিয়। পরস্পর পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয় প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো। প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় ভক্ত-সমর্থকদের মধ্যেও। কিন্তু ভারত-বাংলাদেশের ক্রিকেট লড়াইয়ে কেন যেন ভক্তদের মধ্যে একটা অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়ে গেছে। গত দুই বছরে এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা ক্রমেই বাড়ছে।

বাংলাদেশ-ভারত ক্রিকেটে এই লড়াইয়ের সূচনাটা ২০০৭ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজে বিশ্বকাপের ম্যাচ দিয়ে। গ্রেগ চ্যাপেল-রাহুল দ্রাবিড়ের ভারতকে হারিয়ে তাদের শুধু গ্রুপ পর্ব থেকেই ছিটকে দেয়নি বাংলাদেশ, খুঁচিয়ে তুলল এক নতুন তিক্ততার কাহিনিও। যখন মাশরাফি মর্তুজা ম্যাচ জিতে বলে দিলেন, ‘লিফটের মধ্যে অনিল কুম্বলেদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। ওদের কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছিল, ধরেই নিয়েছে আমাদের হারিয়ে পরবর্তী রাউন্ডে চলে গেছে। সেটা দেখেই সতীর্থদের গিয়ে বলি, এই উপেক্ষার জবাব দিতে হবে বন্ধুরা।’

মাশরাফিরা জবাব দিয়েছিলেন। ভারতকে হারিয়ে তারা শোকস্তব্ধ করে দেন শচিন, সৌরভদের। এরপর থেকে আর কখনও পুরনো বন্ধুত্বের সম্পর্ক ফিরে আসেনি। বরং রেষারেষি আর বাগযুদ্ধ বেড়েছে। চট্টগ্রামে টেস্ট খেলতে গিয়ে বিরেন্দর শেবাগ সোজাসাপ্টা ঘোষণা দিলেন, বাংলাদেশ টেস্টটা কিছুতেই জিতবে না। সাংবাদিকরা জিজ্ঞেস করলেন, কেন? শেবাগ বললেন, কারণ খুব সহজ। ওদের ২০টা উইকেট নেয়ার ক্ষমতা নেই।

পরদিন টেস্টের প্রথম দিনই দারুণ বল করল বাংলাদেশ। তুলে নিল ভারতের আট উইকেট। পাল্টা হুঙ্কার ছেড়ে গেলেন মুশফিকুর রহীম। তোপের মুখে পড়লেন শেবাগ। সেই থেকে শুরু হয়ে গেল নতুন এক রেষারেষি এবং কথার যুদ্ধ।

২০১৫ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের বিপক্ষে মাঠে নামার আগেই ‘মওকা’ ‘মওকা’ বিজ্ঞাপন দিয়ে বাংলাদেশের সমর্থকদের তাতিয়ে দিয়েছিল ভারতীয়রা। সেউ উত্তেজনার ঢেউ গিয়ে আছড়ে পড়ে মাঠেও। রোহিত শর্মার বিরুদ্ধে আউটের আবেদন নাকচ হওয়া নিয়েই গ্যালারিতে ফেটে পড়লেন বাংলাদেশের ক্রিকেট ভক্তরা। সেই উত্তেজনা বেশ কয়েক দিন চলেছিল।

ধোনির ভারত এর পর বাংলাদেশে গিয়ে একদিনের সিরিজ হারল। সে সময় বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মাঠের মধ্যে উচ্ছ্বল উৎসব ভালো লাগেনি ভারতীয়দের। তাদের কারও কারও মনে হয়েছিল, মাশরাফিদের উৎসবের ভঙ্গি শালীনতা ছাড়িয়েছিল। আবার বাংলাদেশের মিডিয়ায় ফানি ম্যাগাজিনে গোটা ভারতীয় দলের গ্রুপ ছবিতে ধোনি-কোহলিদের মাথা ন্যাড়া করে দেয়া হয়েছিল। ন্যাড়া করেছিলেন নাকি কাটার মাস্টার মোস্তাফিজ।

এর কয়েক দিন পরই এশিয়া কাপে খেলতে গিয়ে ইন্টারনেট স্লেজিংয়ের মুখে পড়লেন ভারতীয় ক্রিকেটাররা। তাসকিন আহমেদের ছবি ভাইরাল হয়ে যায় সেবার। তাসকিনের হাতে ধোনির কাটা মুণ্ডু। ভারতীয় শিবিরেও সেই খবর ছড়িয়ে পড়ল। ধোনি ফাইনালে তার জবাব দিলেন, পরপর দুই ছক্কা মেরে।

এবার আবার মুখোমুখি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনালে। ভেন্যু বার্মিংহাম। এবং ইতোমধ্যেই দুটো ব্যাপার নিয়ে খোঁটাখুঁটি শুরু হয়ে গেছে। এবার আবারও সামনে এসে গেলেন শেবাগ।

দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে ভারতের সেমিফাইনাল নিশ্চিত হওয়ার পর টুইটারে অভিনন্দন জানিয়ে শেবাগ লিখেন, ‘সেমিফাইনাল এবং ফাইনালের জন্য শুভেচ্ছা রইল।’ তার টুইট দেখে বাংলাদেশি ক্রিকেট ভক্তরা ফের ক্ষিপ্ত। তাদের বক্তব্য, শেবাগ কি তাহলে বাংলাদেশকে পাত্তাই দিচ্ছেন না? আগেভাগেই কোহালিদের ফাইনালে তুলে দিয়েছেন? না হলে ফাইনালেরও শুভেচ্ছা কেন?

বাংলাদেশের সমর্থকদের ক্ষেপে ওঠার আরও একটি কারণ আছে। সেমিফাইনাল ম্যাচের টিকিট। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির দুটো সেমিফাইনাল হচ্ছে কার্ডিফে এবং বার্মিংহ্যামে। শুরুতে কে কোনটাতে খেলবে বোঝা যাচ্ছিল না; কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেট ভক্তরা দুই জায়গারই প্রচুর টিকিট আগে থেকে কেটে রেখেছিল। বাংলাদেশের সমর্থকরা এ পথে হাঁটেননি। কারণ, তাদের সামনে সেমিফাইনালটা ছিল অনিশ্চিত।

এজবাস্টনে এ কারণে টিকিট পাচ্ছে না বাংলাদেশের সমর্থকরা। গ্যালারিতে তাই বাংলাদেশি সমর্থকের চেয়ে ভারতীয়দের সংখ্যাই থাকবে বেশি। ওদিকে বাংলাদেশি ভক্তরাও টিকিটের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। টাইগাররা এই প্রথম আইসিসির কোনো ইভেন্টে সেমিফাইনালে খেলতে যাচ্ছে। বাংলাদেশের সমর্থকরা এই ইতিহাসের সাক্ষী হতে চান। কিন্তু টিকিট যে নেই। চলছে হাহাকার।



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :