দুপুর ২:৪০, শুক্রবার, ২৮শে জুলাই, ২০১৭ ইং
/ ক্রিকেট / তবু বাংলাদেশের দিন
তবু বাংলাদেশের দিন
অক্টোবর ২৯, ২০১৬

একেবারে দিনের শেষ বলে আউট হলেন মাহমুদউল্লাহ। কে জানে, মাথার ভেতর কী ঘুরপাক খাচ্ছিল তার। প্যাভিলিয়নের পথে যেখানে যেতে পারতেন নামের পাশে ‘অপরাজিত’ কথাটা লিখে, সেখানে ফিরলেন রাজ্যের হতাশা মাথায় চেপে।

সোনায় রাঙানো একটা দিনের শেষ দৃশ্যটা বিবর্ণ হলেও দিনটা বাংলাদেশের। তা মাহমুদউল্লাহর আউট কিংবা যতই শেষ দিকে ৯৯ রানের জুটিতে পিছিয়ে পড়া ইংল্যান্ড লিড নিয়ে প্রথম ইনিংস শেষ করুক না কেন। বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে এমন দিন কবে এসেছে! পরাশক্তি ইংল্যান্ডকে ২৪৪ রানে গুটিয়ে দিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে দ্বিতীয় দিন শেষ করেছে ১২৮ রানের লিড নিয়ে। ৩ উইকেটে ১৫২ রানে দিন শেষ করা স্বাগতিকরা লিডটা কত দূর নিয়ে যেতে পারে, সেটাই এখন দেখার।

অভিষেকে আলো ছড়ানো মেহেদী হাসান মিরাজ আবারও করলেন বাজিমাত। এই স্পিনার আবারও ৬ উইকেট শিকার করলে ইংলিশরা গুটিয়ে যায় ২৪৪ রানে। তাতে ২৪ রানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করে বাংলাদেশ। শুরুটাও হয়েছিল দারুণ। আগের ইনিংসে সেঞ্চুরি পাওয়া তামিম ইকবাল ইংল্যান্ডের বোলারদের ওপর চড়াও হয়ে ব্যাট করছিলেন ওয়ানডে ধাচে, তাতে ইঙ্গিত ছিল আরও একটি বড় ইনিংসের। কিন্তু হলো না, ৪০ রান করে এই ওপেনার আউট হয়ে যান জাফর আনসারির বলে। অ্যালিস্টার কুক বল তালুবন্দি করলে এই বোলার পান আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রথম উইকেট। তামিমের ওই ধাক্কা সামলানোর আগেই আবার আঘাত ইংলিশদের। তার পর পরই যে ফিরে গেলেন মমিনুল হক! বেন স্টোকসের বলে ১ রান করে প্যাভিলিয়নে ফিরেছেন মমিনুল।

দ্রুত ২ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায় বাংলাদেশ। ইমরুল কায়েস ও মাহমুদউল্লাহ জুটি গড়ে সেই চাপ কাটিয়ে স্কোর বাড়িয়ে নিচ্ছিলেন স্বাগতিকদের। ইমরুল পূরণ করেন তার টেস্ট ক্যারিয়ারের চতুর্থ হাফসেঞ্চুরিও, দিন শেষে যিনি অপরাজিত আছেন ৫৯ রানে। মাহমুদউল্লাহকে সঙ্গে নিয়ে এই ওপেনারের তৃতীয় উইকেটে গড়া জুটির ওপর ভর দিয়ে বাংলাদেশের লিড ছাড়ায় ১০০। মাহমুদউল্লাহও হাঁটছিলেন হাফসেঞ্চুরির পথে। দ্বিতীয় দিনে না পারলেও তৃতীয় দিনের শুরুতে সেটা পূরণ করবেন, এটাই ছিল সবার প্রত্যাশা। দিনের শেষ অংশ বলে উইকেটে টিকে থাকাটাই ছিল তখন মুখ্য বিষয়। অথচ দলের অভিজ্ঞ একজন ব্যাটসম্যান হয়েও করলেন শিশুসুলভ কাজ! শেষ মুহূর্তে খেলতে গেলেন তিনি ‘বিগ’ শট; ফল যা হওয়ার তাই, লাইনে থাকা আনসারির বলটা সরাসরি আঘাত করলো স্ট্যাম্পে। মিরপুরের উইকেট ছাপিয়ে ওই আঘাতটা লাগলো কোটি ক্রিকেট প্রেমির মনেও। তার ৪৭ রানের ইনিংস থামলে ভাঙে ইমরুলের সঙ্গে গড়া ৮৬ রানের জুটি।

উইকেট উৎসব চলেছে কিন্তু দিনের শুরু থেকেই। যখন দ্বিতীয় দিনে এক ওভার হতে না হতেই উইকেট উৎসবে মাতে বাংলাদেশ। মেহেদী হাসানের বলে বোল্ড হয়ে ফিরে যান ১০ রান করা মঈন আলী। ওই ধাক্কা সামলে উঠার আগেই আবার আঘাত বাংলাদেশের। এবার তাইজুল ইসলামের বলে রানের খাতা খোলা আগেই প্যাভিলিয়নে ফেরেন বেন স্টোকস। তাতে ইংল্যান্ড হারায় পঞ্চম উইকেট।

দিনের শুরুতে দ্রুত উইকেট হারিয়ে চাপে পড়া ইংল্যান্ডকে টেনে উঠানোর চেষ্টা করছিলেন জো রুট ও জনি বেয়ারস্টো। এই দুজনের জুটিতে ১০০ রানও পার করে ইংল্যান্ড। যদিও এই জুটিকে বেশি দূরে এগোতে দেননি মেহেদী হাসান, এই স্পিনারের বলে এলবিডাব্লিউ হয়ে ফিরে যায় বেয়ারস্টো (২৪)। মেহেদী জাদুর শেষ এখানেই নয়, বল হাতে তুলছেনই যেন উইকেট উৎসব করার জন্য। অভিষেক টেস্টে আলো ছড়ানো মেহেদী  উজ্জ্বলতা ছড়ালেন মিরপুরেও। চট্টগ্রাম টেস্টের পর ঢাকাতেও ৫ উইকেটের দেখা পেয়েছেন এই স্পিনার। জাফর আনসারিকে শুভাগত হোমের ক্যাচ বানিয়ে টেস্ট ক্যারিয়ারে দ্বিতীয়বারের মতো ৫ উইকেটের ঘর পূরণ করলেন মেহেদী। শেষ পর্যন্ত এই স্পিনার ৮২ রান খরচায় প্রথম ইনিংস শেষ করেছেন ৬ উইকেট নিয়ে।

যদিও দ্বিতীয় দিনে সবচেয়ে মূল্যবান উইকেটটি নিয়েছেন তাইজুল ইসলাম। বাঁহাতি স্পিনার যে ফিরিয়েছেন সেট হয়ে যাওয়া জো রুটকে। একের পর এক উইকেট হারানোর পর আশার আলো হয়ে জ্বলে ছিলেন শুধু জো রুট। ইংল্যান্ডের ‘শেষ সম্বল’ হিসেবে ব্যাটিং করে অন্তত একটা প্রান্ত আগলে রেখেছিলেন তিনি। হাফসেঞ্চু্রিও পূরণ করলেন, যদিও এগোতে পারলেন না বেশি দূর। তাইজুলের ঘূর্ণিতে বোকা বনে গিয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরে গেলেন ৫৬ রান করে। এলবিডাব্লিউয়ের বিপরীতে রিভিউও চাইলেন না এই ব্যাটসম্যান! চাইবেন কী করে, বল ব্যাটে না লাগার পর তো নিজেই বুঝে গিয়েছিলেন কত বড় ভুলটা করলেন তিনি। তাই ক্ষুব্ধতার প্রকাশটাও দেখা গেল তার মাঠের অমন অঙ্গভঙ্গিতে।

তার উইকেটটি হারানোর পর আবার দাঁড়িয়ে যায় ইংলিশদের টেল এন্ডাররা। নবম উইকেট জুটিতে ক্রিস ওকস ও আদিল রশিদ যোগ করেন ৯৯ রান। ভয়ঙ্কর হয়ে উঠা এই জুটি ভেঙেছেন সেই মেহেদী হাসান মিরাজই। ৪৬ রান করা ক্রিস ওকসকে আউট করেন তিনি শুভাগত হোমের হাতে ক্যাচ বানিয়ে। আর তাইজুল দ্রুত স্টিভেন ফিনের (০) উইকেটটি তুলে নিলে ২৪৪ রানে অলআউট হয় ইংল্যান্ড। রশিদ অবশ্য অপরাজিত ছিলেন ৪৪ রানে।

এর আগে ইংল্যান্ড ৩ উইকেট হারিয়ে প্রথম দিন শেষ করেছিল ৫০ রানে। বৃষ্টির কারণে আগেভাগে খেলা শেষ হয়ে যাওয়ায় দিনের খেলা পুরোটা হয়নি। তার আগেই অবশ্য বাংলাদেশি বোলাররা দ্রুত উইকেট তুলে নেয় ইংলিশদের। শুরুটা করেছিলেন সাকিব আল হাসান। বেন ডাকেটের টেস্ট ক্যারিয়ারকে আরও হতাশায় ডুবিয়ে মাত্র ৭ রানে প্যাভিলিয়নে পাঠান সাকিব। অধিনায়ক অ্যালিস্টার কুকের ভাগ্যও বদলায়নি ঢাকায়। চট্টগ্রাম টেস্টের পর মিরপুরেও কিছু করতে পারেননি তিনি মেহেদী হাসান মিরাজের কারণে। এই অফ স্পিনারের ঘূর্ণি বলেই যে এলবিডাব্লিউ হয়ে কুক আউট হন ১৪ রান করে। ব্যর্থতার বৃত্ত ভাঙতে পারেননি গ্যারি ব্যালান্সও। ওই মেহেদীর বলেই তিনি ৯ রান করে ধরা পড়েন মুশফিকুর রহিমের গ্ল্যাভসে।

মিরপুরও দেখলো মেহেদীর ঝলক। আবারও ৬ উইকেট নিয়ে ইনিংস শেষ করলেন মাত্রই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখা ১৯ বছর বয়সী এই অলরাউন্ডার। বল হাতে তার যা করার প্রথম ইনিংসে আপাতত করে রেখেছেন, এখন দায়িত্ব ব্যাটসম্যানদের। মেহেদীদের স্বস্তিতে রাখার মতো লিড এনে দেওয়া চাই শুধু।



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :