টেস্টে এমন দিন আসেনি কখনো

টেস্টে এমন দিন আসেনি কখনো

স্টিভেন ফিনের প্যাডে বল লাগতেই বাংলাদেশের আবেদন, আম্পায়ার আঙুল তোলা মাত্র বাধভাঙা উল্লাসে মাতোয়ারা মুশফিক-সাকিব-মিরাজরা। সেই আনন্দ ততক্ষণে ছড়িয়ে পড়েছে গোটা বাংলাদেশে। টেস্ট ক্রিকেটে এমন আনন্দ করার উপলক্ষ খুব বেশি আসেনি যে বাংলাদেশের সামনে। বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত ৯৫টি টেস্টে খেলে জয় পেয়েছে মাত্র ৮টি ম্যাচে। তাই কিভাবে আসবে এমন আনন্দ! হয়তো রবিবারের এই সাফল্য বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের নতুন গতিপথ তৈরি করে দেবে।

সাকিব যখন বেন স্টোকসকে বোল্ড করে সাজঘরে ফিরিয়ে দিলেন তখনই নিশ্চিত হয়ে যায় বাংলাদেশ জয়ের আনন্দে মাতোয়ারা হতে যাচ্ছে। আশার পালে হাওয়াও লাগছিল হয়তো আজই আসছে সেই মুহূত। এসেও গেল। আর সেটা উদযাপনটাও হলো অন্যরকমভাবে। সাকিব তার ক্যারিয়ারে সাফল্যে অনেক উদযাপনই করেছেন, তবে রবিবারের মতো কোনও উদযাপন করেননি তিনি। সাকিবের অফস্ট্যাম্পের বলটি যখন টার্ন নিয়ে স্টোকসের অফস্ট্যাম্প ভেঙ্গে দিল, সাকিব তখন অদ্ভুতভাবেই সেই উইকেটের উদযাপন করলেন। গ্যালারির দিকে মুখ করে তিনি স্যালুট করলেন! অদ্ভুত এই আানন্দে গ্যালারিতে উচ্ছ্বাস বাড়লো ক্রিকেট ভক্তদের।

ঢাকা টেস্টে ইংল্যান্ডকে পুরো তিন দিন কোণঠাসা করে বাংলাদেশ তৃতীয় দিনের শেষ বিকালে ১০৮ রানের জয় তুলে নিয়েছে। এমন জয় এর আগে কখনোই আসেনি। টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ বড় দলের বিপক্ষে জয় পেয়েছে কেবলমাত্র ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। ক্যারিবিয়ান ক্রিকেট ওই দলটা ছিল মূলত দ্বিতীয় সারির। ওই সময়ে বোর্ডের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটার খেলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। তারকাহীন এমন দলের বিপক্ষে তাই জয়টা খুব আলোড়িত করেনি টাইগার ভক্তদের। আজ যেমনটা করলো।

আর তাই তো রবিবার ম্যাচের তৃতীয় দিনে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ঐতিহাসিক এক জয়ের দেখা পেল বাংলাদেশ। এই সিরিজের আগে বাংলাদেশ-ইংল্যান্ড দুই দল আটটি ম্যাচ খেলেছে, যার বেশির ভাগই ইনিংস ব্যবধানে হেরেছিল লাল-সবুজরা। এবার অবশ্য প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হয়েছে। গত দুই বছর ধরে দারুণ ক্রিকেট খেলা বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ ছিল টেস্ট ক্রিকেটে নিজেদের সেরাটা দেখানোর। সেই চ্যালেঞ্জে ইংলিশদের অহং মাটিতে মিশিয়ে অবিশ্বাস্য এক জয় পেল টাইগাররা।

জয়ের পর মিরাজকে ঘিরে ‍পুরো দল উল্লাসে মেতেছে, পুরো গ্যালারি তখন আনন্দে মাতোয়ারা। হবেই বা না কেন, এই জয় যে অনন্য, এই জয় যে অতুলনীয়। টেস্ট ক্রিকেটে যারা সব সময় প্রথম শ্রেণির, সেই ইংল্যান্ডে জয়; তাও আবার কিনা তিন দিনে, ভাবা যায়!

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে চট্টগ্রামে প্রথম টেস্টে জেতার প্রবল সম্ভাবনা জাগিয়েও শেষ পর্যন্ত ২২ রানে হেরেছিল বাংলাদেশ। সেখানে বেশিরভাগ সেশনই প্রভাব বিস্তার করেছিল বাংলাদেশ। ঢাকা টেস্টের সাফল্য আরও ছড়িয়ে গেছে। ৫ দিনের টেস্ট তিন দিনে শেষ হলেও এই ৯ সেশনের বেশিরভাগ সময়ই আধিপত্য দেখিয়েছে টাইগাররা।

ররিবার সকালে বাংলাদেশ দ্রুত আউট হলে ইংলিশদের জন্য লক্ষ্য নির্ধারণ হয় ২৭৩ রান। অধিনায়ক অ্যালিস্টার কুক ও ওপেনার বেন ডাকেট যখন দ্রুত গতিতে ১০০ রানের জুটি গড়েছিলেন, তাতে করে মনে হচ্ছিল বাংলাদেশের কাছ থেকে ম্যাচটি ছিনতাই হয়ে যাচ্ছে। কেননা ২৫০ প্লাস রান তাড়া করে জেতার রেকর্ড খুবই সীমিত। কিন্তু চিত্রনাট্যটা বদল হতে থাকে বেন ডাকেট ফিরে যাওয়ার পর। একে একে মিরাজের ঘূর্ণি জাদুতে ইংলিশ টপ অর্ডার ব্যর্থ হলে ম্যাচ পুরোপুরি বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

এ দিন শুরুতে সাকিব নিষ্প্রভ হলেও শেষটা রাঙিয়েছেন তিনিই। চার বলের ব্যবধানে বেন স্টোকস, আদিল রশিদ ও জাফর আনসারিকে ফিরিয়ে দিয়ে তিনিই জয়ের মঞ্চটা প্রস্তুত করেন। শেষটায় তুলির আঁচর দেন ম্যাচ সেরা ও সিরিজ সেরা মেহেদী হাসান মিরাজ। সব মিলিয়ে ঢাকা টেস্টে মিরাজের উইকেট সংখ্যা ১২টি। দুই টেস্টে তার উইকেট সংখ্যা ১৯টি। খুব স্বাভাবিকভাবেই তিনি বাংলাদেশের জয়ের নায়ক।

মুশফিকের জন্য ঢাকা টেস্টটি মাইলফলকের ম্যাচ। এই টেস্ট দিয়ে মুশফিক তার ক্যারিয়ারের ৫০তম টেস্ট খেললেন। নিজের ক্যারিয়ারের এই মাইলফলকের ম্যাচে বাংলাদেশের এই সাফল্য হয়তো অধিনায়ক মুশফিককে নতুন কিছু করতে অনুপ্রাণিত করবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




bangladesherkhela.com 2019
Developed by RKR BD