দুপুর ১:২৩, বুধবার, ২২শে নভেম্বর, ২০১৭ ইং
/ ক্রিকেট / ‘হয়তো পাগলামিটা ছেড়ে দিতে হবে…’
‘হয়তো পাগলামিটা ছেড়ে দিতে হবে…’
এপ্রিল ৫, ২০১৬

টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচের শেষ দৃশ্যটা এখনও হয়তো সবার চোখে লেগে আছে। পুরো ম্যাচের ২৩৭ বল পর্যন্ত জিতে যাওয়ার পর শেষ তিনবলে এসে সব শেষ।

বেঙ্গালুরুর চিন্বাস্বামী স্টেডিয়ামে সেদিন কী অপ্রত্যাশিতভাবে না হেরেছিল বাংলাদেশ। সেই সময়টাতে রাজ্যের সব কষ্ট যেনো নেমে এসেছিল বাংলাদেশের সমর্থকদের মধ্যে।

এর মধ্যে একটা ছেলের কান্না বেশি করে দেখেছে বিশ্ব। পুরো শরীরটাই যেন বাঘের ডোরাকাটা গা। মুখেও বাঘের রূপ। গলায় প্যাঁচানো বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। মাথায় দুটো হাত।

শোকে ‘পাথর’ হয়ে যাওয়া শরীরটার চোখজুড়ে অঝোরে ঝরছে পানি। সেই কান্নার রং একটু পর পর দেখিয়েছে টিভি চ্যানেলগুলো। ছাপিয়েছে প্রায় সব পত্রিকা-অনলাইন।

নাম তার খাইরুল ইসলাম মারুফ। বাংলাদেশের ম্যাচ মানেই তার বাঘ রূপে মাঠে হাজির। আর হে হাতে থাকবে লাল সবুজের পতাকা। ওই চট্টগ্রামের একমাত্র মানুষ্য ‘বাঘ’। ছোটকাল থেকেই ক্রিকেটের পাড় সমথর্ক। বাংলাদেশের ম্যাচ মানেই টিভির সামনে বুঁদ হয়ে থাকা। তবে গত দু’বছর ধরে আর ঘরে নয়। সরাসরি মাঠে। এভাবে, বাঘ হয়েই।

সময়ের ব্যবধানে পরিচয়টা বড্ড পাল্টে গেছে এ তরুণের। মূল নাম খাইরুল ইসলামটা এখন একপ্রকার হাওয়া। সবার কাছে তার পরিচয় মারুফ টাইগার নামেই। এ নামেই বেশ স্বাচ্ছন্দবোধ করেন মারুফ নিজেও।
maruf-2
এতদিন দেশের মাটিতে বাংলাদেশের ম্যাচে দেখা গেছে মারুফকে। তবে এবার অনুষ্ঠিত টি-২০ বিশ্বকাপে ভারতের মাটিতে গিয়ে বাংলাদেশকে সমর্থন জানানোর সৌভাগ্য হয়েছে তার। দেশকে সমর্থন জানাতে প্রথম বিদেশ সফরে যাওয়ার পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না মারুফের জন্য।

মারুফ টাইগার বলেন, ‘কোনো স্পন্সর ছিল না। চট্টগ্রামের এ প্রতিষ্ঠান, ওই ব্যক্তির ঘরে ঘরে ঘুরেছি অনেকদিন। কেউ পাত্তা দেয়নি। কি আর করা। আমার অদম্য ইচ্ছে দেখে কাতার প্রবাসী ভাই পাঠিয়ে দিল ১৬ হাজার টাকা। পাশাপাশি এম এ আজিজ স্টেডিয়ামের ভেন্যু ম্যানেজার আবদুল হান্নান আকবর স্যারের আর্থিক ও বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেন। এরপর ১৩ মার্চ ভারতের উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম ত্যাগ করি। ঢাকা থেকে বাসে করে বেনাপোল হয়ে কলকাতা। সেখানে গিয়ে অনেক তোড়জোড় করে ১৬ মার্চ পাকিস্তানের সঙ্গে ম্যাচের টিকিট পেলাম, খেলা দেখলাম। পরবর্তীতে ট্রেনে করে কলকাতা থেকে চেন্নাই, সেখান থেকে বেঙ্গালুরু ছুটে চলা। উদ্দেশ্য অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের সঙ্গে ম্যাচ দেখা।’

সম্প্রতি টাইগার মারুফ এসেছিলেন চট্টগ্রাম ব্যুরো কার্যালয়ে। এরপর এক ঘণ্টায় শুনিয়েছেন তার সেই হাসি-কান্নার গল্প।

মারুফ বলতে থাকেন, ‘এদিকে পকেটের অবস্থা বেশ খারাপ। বেঙ্গালুরু গিয়ে দিনে এক বেলা করে ভাত খেয়েছি। একটা হোটেলে উঠেছিলাম। হোটেল ভাড়া নেওয়ার দিন আমি বাঘের রূপ ধারণ করে ছিলাম না। ২১ মার্চ সকালে বাংলাদেশের ম্যাচের দিন আমাকে বাঘের রূপ দেখেই হোটেল ম্যানেজার ক্ষেপে গেলেন। হোটেল বয়কে বললেন একে এখনি বের করে দাও, টাকা লাগবে না। আমি বিষয়টিতে বেশ কষ্ট পেলাম। তাদের কাছে অনেক অনুরোধ করলাম ভারত ম্যাচ পর্যন্ত হোটেলে থাকতে দেয়ার জন্য। কিন্তু রাখলো না। পরে জাহেদ ভাই নামের এক বাংলাদেশি সমর্থক আমাকে তার বাসায় রাখলেন। তার সঙ্গে থেকে বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচ দেখলাম। পরে তিনিই আমাকে বিমানে করে কলকাতায় নিয়ে আসেন। কলকাতায় একটি নিম্নমানের হোটেলে ছিলাম। ছারপোকার উপদ্রব। সারারাত ঘুমাতে পারিনি যে কদিন ছিলাম। এরপর নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে খেলা দেখি। এর মধ্যে বড় ভাই আবারও ১০ হাজার টাকা পাঠালেন। সেই টাকা দিয়ে কোনোভাবে খেয়ে না খেয়ে ২৯ মার্চ দেশে ফেরত আসি। ’

ভারত ম্যাচের দিনের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে মারুফ বলেন, ‘সেদিন মনে হয়েছিল আমার সব শেষ হয়ে গেছে। এত কষ্ট জীবনে আর কখনও পাইনি।’

এই যে দেশের জন্য এভাবে নিজেকে উজাড় করে দেওয়া ছেলেটা পায় না কারও সহযোগিতা। তাই ইচ্ছে থাকলেও বাংলাদেশের সব খেলা দেখতে যেতে পারেন না টাকার অভাবে। বাবার দেওয়া হাত খরচের টাকা দিয়ে আর কতই বা যাওয়া যায়। সেখানে বাংলাদেশকে সমর্থন জানাতে বিদেশ সফরে যাওয়া তো এক লাফে অ্যাভারেস্টে ওঠার মতোই দুঃসাধ্য।

মারুফ বলেন, ‘আমি এভাবে বাঘ সেজে বাংলাদেশকে সমর্থন জানিয়ে যেতে চাই। ’ এরপর কিন্তু বলে এসে থমকে যান মারুফ। একটু থেমে বলতে থাকেন, ‘আর্থিক কারণে আমাকে হয়তো থেমে যেতে হবে। ’ গল্পের শেষে এসে শুকিয়ে যাওয়া মুখটা তাই বলে, ‘হয়তো এ পাগলামিটা ছাড়তে হবে।’
-বাংলানিউজ



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :