ভোর ৫:২৮, শুক্রবার, ১৯শে জানুয়ারি, ২০১৭ ইং
/ ক্রিকেট / সোহাগ গাজীর আক্ষেপ-ক্ষোভ-জেদ
সোহাগ গাজীর আক্ষেপ-ক্ষোভ-জেদ
এপ্রিল ১৭, ২০১৬

মাশরাফি বিন মুর্তজা মাঝে মাঝেই আক্ষেপ করে বলেন, ‘সোহাগ গাজীর মতো ক্রিকেটার সারা বিশ্ব খুঁজে বেড়ায়। আর আমরা তাকে পেয়েও হারাই, এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে।’ মাশরাফির এমন আফসোসের কারণও আছে। সোহাগ গাজীতো আর সাদামাটা কোনও কীর্তি গড়েননি। ইতিহাসের একমাত্র ক্রিকেটার হিসেবে একই টেস্টে সেঞ্চুরি ও হ্যাটট্রিক করেছেন।

জাতীয় দল থেকে বাদ পড়ার পর থেকেই তার একা একা অনুশীলন চালিয়ে আসছেন । মাঝে কিছুদিন তাকে মিরপুরের একাডেমিতে অনুশীলনের সুযোগও দেয়নি বিসিবি। গত বছর বিসিবির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এইচপি (হাই পারফরম্যান্স) এবং পোনিতেও (প্লেয়ার্স অব ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট) সুযোগ পাননি তিনি।

নিজে নিজে অনুশীলন করে গত বছর জুলাইতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজে জাতীয় দলে ফের সুযোগ পান তিনি। সেখানে মাত্র দুই ওভার বোলিং করার সুযোগ হয় গাজীর। এরপর জিম্বাবুয়ে ও বিশ্বকাপে দলে জায়গা হয়নি তার।

সোহাগ গাজীকে নিয়ে বিতর্কের শুরু মূলত ২০১৪ সালে। অভিযোগ ওঠে ফিটনেসে মনোযোগ নেই, ফিজিওর কথা শোনেন না। এর মধ্যেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে তার বোলিং অ্যাকশন প্রশ্নবিদ্ধ হয়। ওই অ্যাকশন শোধরানোর সময় জাতীয় দলের সহকারী কোচ রুয়ান কালপাগের সঙ্গে মনোমালিন্য হয়। বাদ পড়েন বিসিবির কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকে।

সব মিলিয়ে মাত্র ২৫ বছর বয়সে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে সম্ভাবনাময় এই ক্রিকেটারকে।

অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে এখন অনেক পরিণত সোহাগ। আসন্ন প্রিমিয়ার লিগকে শেখ জামালের হয়ে খেলবেন তিনি। যেভাবেই হোক প্রিমিয়ার লিগে ভালো পারফরম্যান্স করতে জানান দিতে চান হারিয়ে যাননি তিনি। আজ রবিবার মিরপুর একাডেমিতে অনুশীলন শেষে সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। এ সময় বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন সোহাগ গাজী। তার চুম্বকাংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো:

প্রশ্ন: ২২ তারিখ থেকে শুরু হচ্ছে প্রিমিয়ার লিগ। প্র্যাকটিসও শুরু করেছেন। কেমন লাগছে?

গাজী: অবশ্যই ভালো লাগছে। যেহেতু জাতীয় দলের বাইরে আছি। এই একটাই অপশন। প্রিমিয়ার লিগে ভালো কিছু করে যদি আবার জাতীয় দলে ফিরতে পারি।

প্রশ্ন: প্রিমিয়ার লিগের পারফরম্যান্সে সবার নজর থাকে। আপনার পারফরম্যান্স নিয়ে কী ভাবছেন?

গাজী: বিসিএলে ওইরকম ম্যাচ খেলতে পারিনি। প্রিমিয়ার লিগটা আমার নিজের জন্যই খুব গুরুত্বপূর্ণ। যদি আমি ভালো কিছু করতে পারি তাহলে হয়তো আমার জন্য রাস্তাটা একটু হলেও খোলা থাকবে। বাকিটা তাদের (নির্বাচকদের) হাতে। আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে পারফরম্যান্স করা।

প্রশ্ন: দীর্ঘদিন জাতীয় দলের বাইরে থাকাটা কতটুকু কষ্টদায়ক?

গাজী: কষ্টদায়ক তো অবশ্যই। জাতীয় দলের হয়ে খেলাটা একরকম। আবার খেলে পারফর্ম করলে অন্যরকম অনুভূতি। জাতীয় দলের বাইরে থাকার কারণে ওই অনুভূতিটা এখন আর নেই। যখন খেলা দেখি কিংবা যাদের সঙ্গে খেলছি তারা যখন খেলছে তখন হয়তো কষ্ট লাগে। ভাবি আমিও খেলতে পারতাম। প্রিমিয়ার লিগ বা বিসিএলে চেষ্টা করি নিজেকে উজাড় করে দিতে। কারণ এখন জাতীয় দলে প্রতিযোগিতা অনেক বেশি। ওইভাবেই আমার প্রস্তুতি নিতে হয়।

প্রশ্ন : সিনিয়র কোনও খেলোয়াড় যোগাযোগ করে কিনা?

গাজী: না। আসলে এরকম কোনও ব্যাপার নেই। আমার সঙ্গে এরকম কোনও ব্যাপার ঘটেনি।

প্রশ্ন : আপনার ফিটনেস নিয়ে কথা উঠেছিল। এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নিয়েছেন আপনি?

গাজী: আমি যখন পারফর্ম করেছি তখন কিন্তু ফিটনেস নিয়ে কোনও কথা ওঠেনি। আজ কেন এই কথাগুলো উঠছে। উত্তরটা সিম্পল আমি এখন দলের বাইরে। আপনি যখন দলে থাকবেন, পারফর্ম করবেন তখন কিন্তু আপনার ভুলত্রুটি সামনে আসবে না। ম্যাচ জিতলে ভুলগুলো ভুলে যাবেন। হারলে ছোট ছোট জিনিসগুলো চোখে পড়বে। হয়তো আমি দলে না থাকায় আমার অনেক ছোট ছোট জিনিসগুলো এখন সামনে এসেছে।

প্রশ্ন : বোলিং অ্যাকশন ঠিক করার পর দলে সুযোগ পাওয়াটা কঠিন হয়ে যাচ্ছে?

গাজী: এগারো-বারো মাস পরে আমি দলে আসছি। আমি টেস্ট বোলার, ওয়ানডে বোলার। টি-টোয়েন্টিতে আমি নিজেই বলছি আমি অতো বড় খেলোয়াড় না। আমার বেশি ভেরিয়েশন নেই। এখন কেন আমাকে ওয়ানডে ও টেস্টে সুযোগ না দিয়ে টি-টোয়েন্টিতে দেওয়া হলো এবং দুই ওভার দেওয়া হলো। এগারো বারো মাস আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলিনি। তবে আমার মাথায় আছে আন্তর্জাতিক ম্যাচে আমাকে এভাবে বল করতে হবে। তবে আশা করছিলাম আমাকে ওয়ানডে এবং টেস্টে সুযোগ দেওয়া হবে। জানিও না হঠাৎ করে একটি টি-টোয়েন্টিতে নেওয়া হলো। তাও দুই ওভার বল। এরপর আমি কিন্তু বিসিবি একাদশেও পারফর্ম করেছি। বিশ্বকাপের আগে অনুশীলন ম্যাচে খুলনায় প্রথম ম্যাচে খেলতে না পারলেও দ্বিতীয় ম্যাচে আমি পারফর্ম করেছি। তিন ওভারে ১০ দিয়েছি পাওয়ার প্লেতে। এরপর আমাকে দিয়ে আর একটি ওভার করানো হয়নি। কিন্তু আমি যে সুযোগ পেয়েছি আমি তাতে পারফর্ম করেছি।

প্রশ্ন: এমন হচ্ছে কেন? আপনার কি মনে হয়?

গাজী : নতুন খেলোয়াড় আসলে ছোট সাফল্যগুলোও বড় করে দেখা হয়। যেটা আমার ক্ষেত্রেও হয়েছিলো। আমি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৪২টি উইকেট পেয়েছিলাম। তখন আপনারা আমাকে হাইলাইটস করেছিলেন। রাজ্জাক ভাইয়ের ক্ষেত্রে দেখেন, বিসিএলে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি। কিন্তু ওইভাবে আসছেন না। কেন আসছেন না, কারণ তিনি জাতীয় দলে আগে খেলেছেন। এখানে যদি রাজ ভাইয়ের জায়গায় নতুন একটা ছেলে আসতো। তখন কিন্তু তাকে নিয়ে কথা হতো। আজকে আমি যদি নতুন হতাম তিন ওভারে ১০ রান দিয়ে আলোচনায় চলে আসতাম।

প্রশ্ন : এখন কী ভাবছেন ?

গাজী: এখন আমার কাজ পরিশ্রম করা। তারপর নির্বাচকদের আমার পারফরম্যান্স প্রদর্শন করা। আমি হাল ছাড়ছি না। পেশাদার খেলোয়াড় হিসাবে আমি আমার কাজ করে যাচ্ছি।

প্রশ্ন : এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিচ্ছেন তাহলে?

গাজী: খেলোয়াড় হিসাবে বলবো, জেদ না থাকলে পারফর্ম করা কঠিন। আপনি যদি আপনার ভিতরে ভালো করার জেদ আনেন তাহলে অনেক কঠিন জিনিসও সহজ হয়ে যাবে। যে টেস্টে আমি হ্যাটট্রিক করলাম, ১০০ করলাম, রেকর্ড হলো। ওই টেস্ট আমার খেলার কথা ছিল না। কারণ রাজ ভাই (আব্দুর রাজ্জাক) ছিল। সেদিন দুই একজন আমাকে সাহায্য করেছে। সেই সাহায্যের জন্য এবং আমি সেদিন জেদ হিসাবে নিয়েছিলাম বলেই করতে পেরেছি।
সোহাগ গাজী

প্রশ্ন: যতটুকু জানি একাডেমিতে অনুশীলনের অনুমতি নেই?

গাজী: অনুমতি নেই। এমনকি মাঠে রানিং করারও অনুমতি নেই। তবে গামিনীকে (মিরপুরের কিউরেটর) বললে করতে দেয়। ইনডোরে বোলিং মেশিন ব্যবহার করতে দেয় না। তবে জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা এবং মহিলা ক্রিকেটাররা থাকলে করা যায় না। আমরা ওইভাবে সুযোগ পাইনা।

প্রশ্ন : সবকিছু ছাপিয়ে জাতীয় দলে বর্তমান পেসারদের ভিড়ে ফেরাটা কতটা চ্যালেঞ্জ?

গাজী : এখন জাতীয় দলে ঢুকতে হলে ভালো কিছু করেই ঢুকতে হবে। এখন জাতীয় দলে অনেক পারফর্মার। এমনকি বাইরে যারা আছে পাইপ লাইনে তারাও অনেকেই ভালো পারফর্মার। আমাকে এক্সট্রা অর্ডিনারি কিছু করেই আসতে হবে।

প্রশ্ন : প্রিমিয়ার লিগে আপনার ফোকাসটা কী থাকবে?

গাজী: এখানে ভালো করলে হয়তো জাতীয় দলে ফিরতে পারি। আগামী বছর ভালো দল পাওয়ারও ব্যপার আছে।



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :