রাত ৪:৪৫, সোমবার, ২৩শে জুলাই, ২০১৭ ইং
/ কলাম/ফিচার / মাশরাফির ‘নেতা’ হয়ে ওঠার নেপথ্যে
মাশরাফির ‘নেতা’ হয়ে ওঠার নেপথ্যে
মার্চ ৪, ২০১৬

নেতাই তো। মাশরাফি বিন মুর্তজা একজন নেতা। জাদুকরী নেতৃত্ব দিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটকে বদলে দেওয়া এক নেতা। যিনি দলের জন্য নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দেন, দেশের স্বার্থে নিজের শরীর-পরিবার সবই তুচ্ছ তার কাছে। তিনি আশ্চর্য নেতৃত্বগুণে পুরো দলকে, পুরো দেশকে উজ্জীবিত করে তোলেন। এমন জাদুকরী যার দক্ষতা, দেশের প্রতি যার এমন টান। তিনি শুধু একজন ক্রিকেটারই নন, তিনি নেতাও।

মাশরাফির নেতৃত্বেই গত দেড় বছর ধরে নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসে সেরা সময় পার করছে বাংলাদেশ। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলা, পাকিস্তান, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জয়, সর্বশেষ দ্বিতীয়বারের মতো এশিয়া কাপের ফাইনালে ওঠা- প্রতিটিতে দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন মাশরাফি।

তবে নেতা হয়ে ওঠা মোটেই সহজ ছিল না মাশরাফির জন্য। পোড়াতে হয়েছে অনেক কাঠখড়। দুই হাঁটুতে যার সাত-সাতবার অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছে, তার ক্রিকেট খেলাটাই তো অবিশ্বাস্য ব্যাপার! সেখানে অসাধারণ নেতৃত্ব দিয়ে দলকে একের পর এক ম্যাচ জেতাচ্ছেন। হয়ে উঠেছেন সত্যিকারের নেতা। কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকাকে দেওয়া দীর্ঘ এক সাক্ষাৎকারে বিভিন্ন কথার ফাঁকে এই ‘নেতা’ হয়ে ওঠার পেছনের গল্পটাও বলেছেন মাশরাফি।

গৌতম ভট্টাচার্যের নেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে অধিনায়কত্ব নিয়ে মাশরাফি বলেন, ‘আমি যখন ক্যাপ্টেন হই তখন ক্যাপ্টেন্সি নিয়েই আমার কোনও ধারণা ছিল না। বাবার সঙ্গে কথা বলি যে এত চোটাআঘাত আর শরীরে সাতটা অপারেশন নিয়ে আমার ক্যাপ্টেন হওয়া আদৌ উচিত কি না? বাবা বললেন, হয়েই যাও। তুমি পারবে। কিন্তু আমার মনে সেই ভয়। আবার না ইনজিওর্ড হয়ে যাই। ভাবলাম কেমন ক্যাপ্টেন হব আমি? মনে হলো আমি যেমন আবেগপ্রবণ সৌরভ গাঙ্গুলির স্টাইলের ক্যাপ্টেন্সিটাই আমায় স্যুট করবে। ওই যে লর্ডসে জার্সি খোলা ওটা নিয়ে কত কথা হয়েছে। কিন্তু আবেগ চাই ওটা করার জন্য।’

মনে হলো আপনার সেই আবেগ আছে- এমন প্রশ্নে বাংলাদেশ অধিনায়ক বলেন, ‘হ্যাঁ। তারপর ঠিক করলাম ড্রেসিংরুমটাকে ঠিক রাখতে হবে। ম্যাচ বাই ম্যাচ ভাবব। একসঙ্গে অনেকটা নয়। আর জুনিয়র-সিনিয়রে কোনো গ্যাপ হতে দেব না। ইউটিউবে অনেক ক্যাপ্টেনের ইন্টারভিউ এই সময় দেখে আমি ক্যাপ্টেন্সি ব্যাপারটা বুঝতে চেষ্টা করেছি। একটা শো রয়েছে ওখানে, যেখানে ভিভিএস লক্ষ্মণ আর দাদা (সৌরভ গাঙ্গুলি) ৪৫ মিনিট কথা বলেছে। ওইটা শুনে আমি ঠিক করি ক্যাপ্টেন হিসেবে আমি কী ভাবে এগোব। ম্যাচ হারতে পারি কিন্তু আবেগটা যেন রিয়েল হয়। যেন সব সময় টিম সেরাটা দেয়।’

অনেক সময় বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের অনেকেই ‘হিরো’ মনে করেন। তবে মাশরাফির কাছে সবচেয়ে বড় হিরো বাংলাদেশের বীর মুক্তিযোদ্ধারা। মাশরাফি বলেন, ‘সবচেয়ে বড় হিরো আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা। তাদের জন্যই তো আজ স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা রয়েছি। আমি ওদের অসম্ভব সম্মান করি। আমি সম্মান করি বৈজ্ঞানিকদের। ওদের এক-একটা আবিষ্কার জাতিকে কত বছর আগে নিয়ে যায়। আমি সম্মান করি ডাক্তারদের। যারা মানুষের জীবন বাঁচান। এর চেয়ে মহৎ কাজ আর কী হতে পারে। আমাদের নিয়ে যত নাচানাচিই হোক, আমরা কি কারও জীবন বাঁচাতে পারছি?’

ক্রিকেটের পাশাপাশি বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের অন্যান্য বিভাগেও সমর্থন করার আহ্বান জানিয়ে মাশরাফি বলেন, ‘আমি ভেতর থেকে বিশ্বাস করি আমাদের সমর্থন করছেন খুব ভালো। আমার টিম কৃতজ্ঞ। কিন্তু সেই মেয়েটিকেও করুন যে স্যাগ গেমসে (সাউথ এশিয়ান গেমস) চারটে সোনা জিতে সবার অলক্ষ্যে ঢাকা ফিরেছে। আমরা যদি স্পোর্টসের লোক হই তো ওই মেয়েটিও স্পোর্টসেরই লোক। সাপোর্ট জীবনের সব বিভাগে করুন। তা হলেই তো বাংলাদেশ এগোতে পারবে। শুধু ক্রিকেটে পড়ে থেকে কী লাভ!’

মাশরাফি মনে করেন, ভালো ক্রিকেটার হওয়ার সঙ্গে ভালো মানুষ হওয়াটাও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এক প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ অধিনায়ক বলেন, ‘দেখুন আমি শচীনের (টেন্ডুলকার) একটা ইন্টারভিউ পড়েছিলাম। যেখানে ও বলেছিল, ভালো ক্রিকেটার তো অনেকেই হতে পারে। ভালো। সঙ্গে ভালো মানুষ হওয়াটা অনেক ইম্পরট্যান্ট। আমি ওই কথাটা মনে রেখেছি। ক্রিকেট তো ক’দিনের। ভালো মানুষ হিসেবে যেন সবার মনে বেঁচে থাকতে পারি। তাই বলে চোট রয়েছে, সাতবার অপারেশন হয়েছে- এই সহানুভূতি নিয়ে ক্রিকেট খেলতে চাই না। আমার যেন ছোট ছোট কন্ট্রিবিউশন থাকে। কাল (বুধবার) হাফিজের উইকেটটা। আমার দুটো বাউন্ডারি। এগুলোও থাকতে হবে।’

দেশের মাটিতে বাংলাদেশের খেলা মানেই গ্যালারীভর্তি বাংলাদেশি সমর্থক। সমর্থকদের সামনে খেলতে কেমন লাগে- এমন প্রশ্নে মাশরাফি বলেন, ‘আমরা তো ক্রিকেট খেলে আমাদের দেশের জনগণকে কিছু দিতে পারিনি। দিনের পর দিন ওরা হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। তখনও টিমে ভালো প্লেয়ার ছিল। সুমন (হাবিবুল বাশার) ছিল। আশরাফুল ছিল। কিন্তু এক-দুজন ভালো খেলত। টিমটা জিতত না। ২০০৭ ওয়ার্ল্ড কাপের ইন্ডিয়া ম্যাচটা আমরা প্রথম বড় খেলা জিতলাম। ওই ম্যাচটা যত দিন বেঁচে আছি মনে রাখব। কী কী প্লেয়ার ছিল ইন্ডিয়ার। শচীন, রাহুল, কুম্বলে, দাদা (সৌরভ)। ওই ম্যাচ থেকে আমাদের কনফিডেন্স পাওয়া শুরু। ইদানীং আমরা দেশের মাঠে কিছু জিতছি। বলতে পারেন সমর্থকদের কাছে যে ধার-কর্জ হয়েছিল তার কিছু কিছু করে ফেরত দিচ্ছি। এবার বিদেশেও ভালো খেলতে হবে।’

আগামী রোববার এশিয়া কাপের ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে মাঠে নামতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ফাইনালে ভারতকে ভেবারিট মনে করলেও নিজেদের লড়াই করার আত্মবিশ্বাসের কথাও জানালেন মাশরাফি, ‘খুব পরিষ্কারভাবেই ভারত ভেবারিট। এটা তো র‌্যাঙ্কিংয়ে এক নম্বরের সঙ্গে দশ নম্বরের খেলা। আমাদের অবশ্য কনফিডেন্স আছে ভালো লড়ব। মুস্তাফিজকে মিস করছি। কাল (বুধবার) ও থাকলে পাকিস্তান ১০০ করতে পারত না। ও থাকলে ফাইনালে অনেক সুবিধে হত। তবে লড়ব। যা হবে, হবে।’

গত বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে এই ভারতের বিপক্ষেই আম্পায়ারের বিতর্কিত সিদ্ধান্তে হেরে গিয়েছিল বাংলাদেশ। তাই বলে এশিয়া কাপের ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটাকে প্রতিহিংসার ম্যাচ ভাবতে নারাজ মাশরাফি, ‘না কোনো টিমকে চার্জ করার জন্য এই প্রতিহিংসা-টিংসা বলতে হবে আমি বিশ্বাস করি না। অবশ্যই জিততে চাই। কিন্তু তার জন্য কাউকে আঘাত করে কিছু বলতে হবে কেন? টিমকে শুধু এমন অ্যাঙ্গেল থেকেই মোটিভেট করতে হবে কেন? মেলবোর্নের ওই ম্যাচের রেশ আজ আমাদের মধ্যে নেইও।’

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের ভাবনা নিয়ে মাশরাফি বলেন, ‘আস্তে আস্তে হয়তো ছাড়তে হবে। কীভাবে এখনো ঠিক করিনি। টেস্ট ম্যাচটা হিসেবের মধ্যে নেই। যদিও ব্যক্তিগতভাবে আমি স্বপ্ন দেখি একদিন খুব ভালো টেস্ট টিম হয়েছে বাংলাদেশ। ওয়ানডেতে ভালো খেলতে খেলতে বাংলাদেশ প্রথম পাঁচে এসেছে। আমি বেঁচে থাকতে থাকতে বাংলাদেশ বিশ্বকাপ জিতবে কি না জানি না, কিন্তু এগুলো যেন দেখে যেতে পারি।’



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :