দুপুর ১:৩০, সোমবার, ২৯শে মে, ২০১৭ ইং
/ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ / কাঁদলেন মাশরাফি!
কাঁদলেন মাশরাফি!
মার্চ ২০, ২০১৬

সংবাদ সম্মেলনে যখন ঢুকলেন মাশরাফি বিন মুর্তজা, চেহারায় বিষাদের ছায়া। এমনিতে দারুণ প্রাণবন্ত, চঞ্চল, আমোদপ্রিয় মাশরাফি পুরো ভিন্ন চেহারায়। চোখে ছলছল করছিল জল; একেকটি প্রশ্নের উত্তরে ধরে আসছিল গলা। কান্নার দমকে কথা আটকে যাচ্ছিল বারবার। সংবাদ সম্মেলন শেষে কক্ষ থেকে বের হয়ে আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না বাংলাদেশ অধিনায়ক।
রোববার বেঙ্গালুরুর এম চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে ফিরে এলো যেন ২০১১ সালের ২০ জানুয়ারির মিরপুর একাডেমি মাঠ। সেদিন ঘরের মাটিতে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ দল ঘোষণা করা হয়েছিল। ইনজুরির কারণ দেখিয়ে বাদ দেওয়া হয়েছিল মাশরাফিকে। একাডেমি মাঠে সংবাদকর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে এক পর্যায়ে কেঁদে ফেলেছিলেন মাশরাফি।
ক্যারিয়ারে সম্ভবত ওই একবারই চোখের পানি ফেলেছিলেন মাশরাফি। এবার কাঁদলেন আবার। সেবারও তার চোখের জলে মিশে ছিল ক্ষোভ, অসহায়ত্ব, হতাশা ও প্রতিবাদ। এবারও তা-ই। সেবার ছিল তাকে উপেক্ষার কারণে। এখন তিনি অধিনায়ক। এবারের কান্না দলের তরুণ সম্ভাবনাময় এক প্রতিভার বিরুদ্ধে ‘অবিচার’ হওয়ার ক্ষোভ, হতাশা আর অসহায়ত্বে। তাসকিন আহমেদের নিষিদ্ধ হওয়া মানতে পারছেন না অধিনায়ক, পারছে না দল।
‘অবিচার’ শব্দটি সংবাদ সম্মেলনে বারবার বলেছেন মাশরাফি। তার এবং দলের দৃঢ় বিশ্বাস, তাসকিনের প্রতি অবিচার করা হয়েছে। অধিনায়ক বারবার বলেছেন, দলের সবার বিশ্বাস, তাসকিনের অ্যাকশনে কোনো সমস্যা নেই। অবিচারের প্রতিবাদে দল হিসেবে এবং পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে খুব বেশি কিছু করতে পারছেন না তারা; সেই অসহায়ত্ব অধিনায়কের কণ্ঠে ফুটে উঠেছে বারবার।
ক্রিকেটাররা প্রতিবাদ জানাতে না পারলেও করতে পারে বিসিবি। ক্রিকেটাররা এখন তাকিয়ে বিসিবির দিকে। মাশরাফি জানালেন, দলের পক্ষ থেকে শক্ত বার্তা দেওয়া হয়েছে বিসিবিকে; যেন যেভাবে সম্ভব প্রতিবাদ করা হয়, প্রয়োজনে যেন আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
আগের দিন দুপুরে আরাফাত সানি ও তাসকিনের বোলিং অ্যাকশন অবৈধ হওয়ার খবর জানার পর থেকেই ক্ষুব্ধ, হতাশ বাংলাদেশ দল। বিশেষ করে তাসকিনের নিষিদ্ধ হওয়া মানতেই পারছে না দল। শনিবার বিকেল থেকে টানা চার ঘণ্টার বৈঠক করেছে দল। আলোচনা হয়েছে অনেক কিছুই। দলের পক্ষ থেকে শক্ত কোনো পদক্ষেপ, কঠিন কোনো বার্তা দেওয়ার তাগিদ বারবার জানিয়েছেন মাশরাফি। শেষ পর্যন্ত টিম ম্যানেজমেন্টের হস্তক্ষেপে আইসিসির প্রক্রিয়া মানারই সিদ্ধান্ত হয়েছে।
রোববার দলের অনুশীলনে অনেক পরে এসেছিলেন অধিনায়ক। অনুশীলন করেছেন সবাই। কিন্তু দলের সবার শরীরী ভাষা আর কথায় ছিল হতাশার ছোঁয়া, মনমরা ভাব। আইসিসির প্রক্রিয়া অনুসরণের সিদ্ধান্ত হয়েছে ঠিকই। কিন্তু মনকে বোঝাতে পারছেন না অধিনায়ক। সেটারই বিস্ফোরণ সংবাদ সম্মেলনে।
পরদিন অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। কিন্তু প্রায় ২৬ মিনিটের সুদীর্ঘ সংবাদ সম্মেলনে মাঠের ক্রিকেট থাকল সামান্যই। শুরু থেকেই নিজের মনে কথা, দলের ভাবনা ও মানসিকতার কথা বলে গেছেন মাশরাফি কান্নাজড়িত কণ্ঠে। জানালেন, গুরুত্বপূর্ণ দুজন সদস্যকে হারানো দলের জন্য কত বড় আঘাত।
নিষিদ্ধ হওয়ার খবর জানার পর কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন তাসকিন। মাশরাফি তাকে শান্ত করেছেন বারবার; কিন্তু সান্ত্বনা আর কত দেওয়া যায়। হতাশায় মুষড়ে পড়েছেন সানিও। সংবাদ সম্মেলনে মাশরাফি জানালেন, ছেলে দুটিকে শান্ত রাখতে কতটা হিমশিম খাচ্ছে দল; ওদের জন্য পুড়ছে দলের সবার হৃদয়।
একটা পর্যায়ে খানিকটা হাসলেনও অধিনায়ক। জানালেন, যে ম্যাচে তাসকিনের অ্যাকশন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, সেই ম্যাচে তার একটি ডেলিভরিও অবৈধ প্রমাণিত হয়নি! নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ওই ম্যাচে একটি বাউন্সারও মারেননি তাসকিন। অথচ বোলিং পরীক্ষায় তাকে ৩ মিনিটের মধ্যে ৯টি বাউন্সার করতে বলা হয়েছে, যেখানে ৩টি ডেলিভারিতে শুধু ১৫ ডিগ্রির সীমা ছাড়িয়েছে। এসব বলতে বলতে হাসি ফুটে উঠল মাশরাফি মুখে। তাতে মিশে থাকল প্রচ্ছন্ন আক্ষেপ, আইসিসির প্রতি ক্ষোভ। মাশরাফি হাসছেন, কিন্তু চোখে ছলছল করছে জল!
মাঠে যেমন আবেগের সবটুকু নিংড়ে উজার করে দেন নিজেকে, এ দিন সংবাদ সম্মেলনেও প্রতিটি প্রশ্নের উত্তরেও মিশে সেই আবেগ। তবে আবেগের স্রোতে নিজেকে হারিয়ে ফেলেননি। কম্পিত কণ্ঠের একেকটি উত্তরেও ছিল দারুণ দৃঢ়তা, বার্তা দেওয়ার তাড়না। ছিল প্রতিবাদ।
তবে শেষ পর্যন্ত আবেগটাই ছুঁয়ে গেছে সবাইকে। সংবাদ সম্মেলন কক্ষে পিন পতন নিরবতা। বাংলাদেশের সংবাদকর্মীরা তো বটেই, ভারতীয়, অস্ট্রেলিয়ান ও অন্যান্য বিদেশি সাংবাদিকরাও হতবাক, বিস্মিত ও একই সঙ্গে আপ্লুত। সংবাদ সম্মেলন শেষে নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না এক ভারতীয় সাংবাদিক। মাশরাফির একেকটি আবেগময় কথায় ভেঙে গেল তার আবেগের বাধ, কেঁদে ফেললেন কলকাতার ওই সাংবাদিকও। এমনিতে ‘কোড অব কণ্ডাক্টের’ নানা শর্তের শৃঙ্খলে বন্দি এই সময়ের ক্রিকেটাররা। কিন্তু সেই শেকল ভাঙার দু:সাহস দেখিয়ে আবারও মন জয় করলেন মাশরাফি।
সংবাদ সম্মেলনে তবু কোনো রকমে নিজেকে ধরে রেখেছিলেন অধিনায়ক। চোখে জল থাকলেও নামেনি গাল বেয়ে। কক্ষ থেকে বের হয়ে পেরে উঠলেন না নিজের সঙ্গে। হাত দিয়ে বারবার মুছতে হলো অশ্রু।
খানিক পর হোটেলে ফেরার গাড়িতে ওঠার আগেও অশ্রুসিক্ত হলেন অধিনায়ক। কান্না জড়িত কণ্ঠে তিনি বললেন, “আমার ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবি না। হয়ত অনেক শক্ত কথা বলেছি। কিন্তু আমার দেশকে আগামী ১০-১৫ বছর সার্ভিস দেবে যে ছেলেটি, এখন তার পাশে না দাড়াতে পারলে আর কিসের অধিনায়ক হলাম! এই অবিচার মানতে পারছি না।”
অধিনায়ক মানতে পারছেন না, মানতে পারছে না দল, পারছে না বাংলাদেশ। প্রতিবাদের ভাষায় অধিনায়ক কাঁদলেন, কাঁদালেন। বাকি দায়িত্ব বাংলাদেশ ক্রিকেটের অভিভাবক সংস্থা বিসিবির।



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :