রাত ৮:০৩, শুক্রবার, ২০শে অক্টোবর, ২০১৭ ইং
/ অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপ / ‘জাতীয় দলে ঢোকার তাড়া নেই’
‘জাতীয় দলে ঢোকার তাড়া নেই’
ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০১৬

ক্রিকেটের কোনো বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের সেরা সাফল্য এসেছে তার হাত ধরেই। প্রথম বাংলাদেশি খেলোয়াড় হিসেবে টুর্নামেন্ট-সেরাও হয়েছেন তিনিই। এতক্ষণে নিশ্চয় বুঝে গেছেন কার কথা বলা হচ্ছে। হ্যাঁ, মেহেদী হাসান মিরাজ। মিরাজের নেতৃত্বেই ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত যুব বিশ্বকাপে তৃতীয় হয়ে টুর্নামেন্ট শেষ করেছে বাংলাদেশ। অধিনায়ক নিজে হয়েছেন টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়। যুব বিশ্বকাপ তো বটেই, বৈশ্বিক কোনো টুর্নামেন্টে বাংলাদেশি খেলোয়াড়ের এমন অর্জন এটাই প্রথম। পুরস্কার পেয়ে কেমন লেগেছে মিরাজের?
অধিনায়ক বললেন, ‘পুরস্কার পাওয়ার পর অবশ্যই অনেক ভালো লেগেছে। এই টুর্নামেন্টে ১৬টা দল অংশগ্রহণ করেছে। এর মধ্যে আমি টুর্নামেন্ট-সেরা হয়েছি। তাই এটার আনন্দটা অনেক বেশি। আর টুর্নামেন্ট শুরুর আগে আমার লক্ষ্য ছিল সেরা অলরাউন্ডার হওয়া। তবে হতেই হবে- এমনটা কখনো চিন্তা করিনি।’
এবারের বিশ্বকাপ দিয়ে যুব ক্যারিয়ারও শেষ হয়ে গেল মিরাজের। তার জন্য সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো, যুব ক্যারিয়ার শেষ করলেন উইকেটের চূড়ায় থেকে। ৫৬ ম্যাচে ৮০ উইকেট নিয়ে যুব ওয়ানডেতে সবচেয়ে বেশি উইকেট মিরাজের। আরেকটি বড় বিষয়, যুব ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকও একজন বাংলাদেশি। আর তিনি আবার মিরাজের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের সতীর্থের পাশাপাশি প্রিয় বন্ধুও, নাজমুল হোসেন শান্ত। এবারের যুব বিশ্বকাপেই নতুন রেকর্ডধারী হয়েছেন দুজন।
আগে দুটি রেকর্ডই ছিল পাকিস্তানের খেলোয়াড়ের। সেটা এখন বাংলাদেশের। এমন প্রাপ্তিকে বাংলাদেশের জন্য বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন মিরাজ, ‘আমার কাছে মনে হয় এটা বড় একটা অর্জন। আগে সর্বোচ্চ রান ও উইকেট দুটি রেকর্ডই ছিল পাকিস্তানি খেলোয়াড়ের। রেকর্ড ভাঙার পর দুজনই এখন বাংলাদেশি। আমরা দুজনই আবার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আর এই রেকর্ডটা আমাদের দেশের জন্য বড় পাওয়া।’
এবারের বিশ্বকাপে মিরাজ দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন সামনে থেকে। ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং- তিন বিভাগেই লড়েছেন সমানতালে। ৬ ম্যাচে চার ফিফটিতে ৬০.৫০ গড়ে রান করেছেন ২৪২। দলের বিপর্যয়ে লড়েছেন বুক চিতিয়ে। কোয়ার্টার ফাইনালে নেপালের বিপক্ষে মিরাজ যখন উইকেটে আসেন দল তখন ৯৮ রানেই ৪ উইকেট হারিয়ে বিপদে। সেখান থেকে জাকির হাসানকে নিয়ে ১১৭ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি গড়ে দলকে জিতিয়ে তবেই মাঠ ছাড়েন। সেমিফাইনালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষেও ৮৮ রানে ৪ উইকেট হারানোর পর ক্রিজে নেমে খেলেছেন ৬০ রানের কার্যকরী ইনিংস। যদিও ক্যারিবীয়দের কাছে হেরে বৃথা গেছে তার লড়াকু ইনিংসটি। তবে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে মিরাজের ৫৩ রানের ইনিংসটি আর বৃথা যায়নি।
বোলিংয়েও সমান উজ্জ্বল ছিলেন মিরাজ। দলের পক্ষে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১২টি উইকেট নিয়েছেন। ফিল্ডিংয়েও কম যাননি। গ্রুপপর্বে দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটসম্যান লিয়াম স্মিথকে ফেরানো তার ক্যাচটি তো এবারের বিশ্বকাপেরই সেরা ক্যাচগুলোর অন্যতম একটি। মিরাজের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে, তীব্র চাপের মধ্যেও মাথা ঠান্ডা রেখে খেলা। খুব বেশি পেছনে যাওয়ার দরকার নেই। কোয়ার্টার ফাইনাল আর সেমিফাইনালই যার বড় উদাহরণ। ওই পরিস্থিতে এটা কীভাবে সম্ভব হয়? মিরাজের জবাব, ‘আমি যখন চাপের মুখে ব্যাটিং করি তখন অল্প করে রান করার চেষ্টা করি। আমাকে ৬০-৭০ রান করতে হবে, এটা আমি চিন্তা করিনা। ৭০-৮০ রানে ৪ উইকেট পড়ে গেলে আমি চিন্তা করি দলকে ভালো একটা অবস্থানে নিয়ে যাব। প্রথমে চিন্তা করি আমি ২০ রান করব। সেটা হয়ে গেলে চিন্তা করি ৫০ করব। আমি নিজের রান চিন্তা করি না কখনো। চাপের মধ্যে আমি দলকে ভালো একটা সংগ্রহ এনে দেওয়ার চেষ্টা করি।’
যুব ক্যারিয়ার শেষ। এবার পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে নতুন পথচলার পালা। আসল চ্যালেঞ্জও শুরু এখান থেকেই। চ্যালেঞ্জটা যে অনেক বড় থাকবে সেটা মিরাজও ভালো করেই জানেন, ‘অবশ্যই চ্যালেঞ্জটা এখন অনেক বড় থাকবে। আগে যদি ষাট বা সত্তর ভাগ দিয়ে থাকি তাহলে এখন আমাকে একশতে একভাগই দিতে হবে। কারণ এখন চ্যালেঞ্জটা অনেক বড়।
অনূর্ধ্ব-১৯ দল একটা স্টেজ। এখানে নিজেকে অনেক পরিচিত করে, নিজেকে ওপরে নিয়ে যেতে সহায়তা করে। আর পরের স্টেজটা অনেক কঠিন হবে। তবে তখনই কঠিন হবে যখন আমি এটাকে হালকাভাবে নেব। আর যখন আমি কষ্ট করব, কঠোর পরিশ্রম করব তখন আমার জন্য অনেক সহজ হয়ে যাবে। এভাবেই মানসিক প্রস্তুতি নিতে হবে।’
বয়সভিত্তিক ক্রিকেট পেরিয়ে সবারই স্বপ্ন থাকে জাতীয় দলে খেলার। স্বপ্ন দেখেন মিরাজও। তবে জাতীয় দলে ঢোকার জন্য কোনো তাড়াহুড়ো নেই এই অফ স্পিন অলরাউন্ডারের, ‘জাতীয় দলে ঢোকার কোনো তাড়া নেই আমার। আমার যে ভুলগুলো আছে সেগুলো শুধরে পরিপূর্ণ ক্রিকেটার হিসেবে জাতীয় দলে ঢুকতে চাই। যেন টানা ১০ বছর খেলতে পারি। আমি বিশ্বের এক নম্বর অলরাউন্ডার হতে চাই।’
জাতীয় ক্রিকেট লিগের (এনসিএল) সর্বশেষ মৌসুমে কাঁধে সামান্য চোট পেয়েছিলেন মিরাজ। চোট তেমন গুরুতর না হলেও সেটা নিয়েই যুব বিশ্বকাপে খেলেছেন। এখন অবশ্য ব্যথা নেই। তবে বিশ্রাম প্রয়োজন। তাই প্রথম দুই রাউন্ডের পর বিরতি দিয়ে আগামী সপ্তাহে আবার শুরু হতে যাওয়া বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগে (বিসিএল) খেলছেন না মিরাজ।
আগামী ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ দিয়ে আবার মাঠে ফিরতে চান, ‘বিসিএলে আমি খেলতে পারব না। কারণ শেষ এনসিএলে আমি কাঁধে ব্যথা পেয়েছিলাম। এখন ওটা মারাত্মক কোনো ইনজুরি না। তবে এখন একটু বিশ্রাম নিতে হবে। অন্যথায় ব্যথাটা আস্তে আস্তে বেড়ে যাবে। ইনশা আল্লাহ নিজেকে প্রস্তুত করে প্রিমিয়ার লিগের মাঠে নামতে চাই।’
প্রায় দেড় মাস দলের সঙ্গে বিশ্বকাপ ক্যাম্পে থাকায় আপাতত ক্রিকেটের চিন্তা বাদ দিয়ে পরিবারকে সময় দিতে চান মিরাজ। মঙ্গলবারই গ্রামের বাড়ি খুলনাতে যাওয়ার কথা তার।



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :