সন্ধ্যা ৬:৩৭, মঙ্গলবার, ২৫শে জুলাই, ২০১৭ ইং
/ কলাম/ফিচার / সাফল্যে ঘেরা টাইগারদের ২০১৫
সাফল্যে ঘেরা টাইগারদের ২০১৫
ডিসেম্বর ২৪, ২০১৫

মুশফিক পিয়াল : বিদায়ের পথে আরও একটি বছর। ২০১৫ সালকে বিদায় দিয়ে ২০১৬ সালকে স্বাগত জানানোর অপেক্ষায় প্রত্যেকটি মানুষ। আগের বছরের সালতামামিজুড়ে ছিল শুধুই হাহাকার। তবে, ২০১৫ সালটি বাংলাদেশ ক্রিকেটের একটি সফল বছরের সমাপ্তি। সফল সমাপ্তি এই অর্থে বলা যে, এই বছরে প্রাপ্তির পাল্লা অনেকাংশে সমৃদ্ধ।
২০১৫ বছরটিকে বাংলাদেশ মনে রাখবে অনেক দিন। এ রকম সোনালি সময় আর কখনো পার করেনি বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। ১৯৮৬ সাল থেকে ওয়ানডে ক্রিকেট খেললেও ২০১৫ সালে এসে নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বোচ্চ সাফল্যই মিলেছে বাংলাদেশের। এ বছর ১৮ ম্যাচের ১৩টিতেই জিতেছে টাইগাররা। হারিয়েছে পূর্ণশক্তির ইংল্যান্ড, পাকিস্তান, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলকে।
নতুন বছরে পা রাখার আগে পেছন ফিরে দেখা যাক ২০১৫ সালে বাংলাদেশের ক্রিকেটে ঘটে যাওয়া কিছু আলোচিত-সমালোচিত ঘটনা। দেশের ক্রিকেট ২০১৫ সাল ইতিবাচক-নেতিবাচক দুভাবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে। মাঠের লড়াইয়ে তামিম-সাকিব-মাশরাফি-মুশফিকদের বছরটা ছিল জমজমাট। পুরোনো সৈনিকদের সঙ্গে লড়াইয়ে সামিল হয়েছিলেন নতুন যোদ্ধা সাব্বির-লিটন-সৌম্য-মুস্তাফিজরা।
Banglawash-600x400
বিশ্বকাপে ক্রিকেট বিশ্বকে কাঁপিয়ে আর ইংল্যান্ডকে হারিয়ে যে ইঙ্গিত দিয়েছিল বাংলাদেশ দল, তার পূর্ণতা আসে দেশের মাটিতে টানা চারটি ওয়ানডে সিরিজ জয় দিয়ে।
একটু পেছনে যাওয়া যাক। শঙ্কা আর অনিশ্চয়তা নিয়ে ২০১৪ সালের শুরুটা হয়েছিল। শ্রীলঙ্কা, এশিয়া কাপ, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, ভারত এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজে ধারাবাহিক ব্যর্থতা ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটের নিত্যসঙ্গী। পরাজয়ের বৃত্তেই বন্দি ছিল টাইগাররা। সে বছরের জুলাইয়ে বিশ্বসেরা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানকে সবধরনের ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ করে বিসিবি। তবে, নভেম্বরে জিম্বাবুয়ে সিরিজ দিয়েই আত্মবিশ্বাসের টনিক ফিরে পায় বাংলাদেশ, সঙ্গে সাকিবকেও ফিরে পায় টাইগার দলটি। বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য বছরের শেষভাগে এসে মরূদ্যানে এক পশলা বৃষ্টির মতোই ছিল জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজের ফল (৮-০)। জিম্বাবুয়েকে টেস্ট এবং ওয়ানডেতে ধবলধোলাই করে বছরের শেষটা রাঙিয়ে দেন মুশফিক-মাশরাফিরা।
কিন্তু, বছরের একদম শেষ ভাগে এসে ক্রিকেটপাড়ায় নতুন বিতর্কের জন্ম দেন পেসার রুবেল হোসেন। অভিনেত্রী হ্যাপি তার বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা করলে ক্রিকেটের গায়ে লাগে কলঙ্ক। তবে, ২০১৫ সালে অনুষ্ঠেয় ওয়ানডে বিশ্বকাপে টাইগারদের এ পেসার যে পারফর্ম করেছেন এক নিমিষেই সব বিতর্ক উড়ে চলে যায় ক্রিকেটের বাইরে। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের মাটিতে আয়োজিত বিশ্বকাপে ঝড় তোলার প্রত্যয় নিয়ে দলের সঙ্গে যান পেসার আল আমিন হোসেন। টিম কারফিউ ভঙ্গ করে তিনি রাতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়ে টিম হোটেল থেকে বাইরে বের হন। ফলশ্রুতিতে আল আমিনকে বিশ্বকাপ দল থেকে বহিষ্কার করে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এ বছর ক্রিকেটাররা নেতিবাচক কারণে সংবাদ শিরোনাম হয়েছেন আরও একবার। গৃহপরিচারিকা নির্যাতনের অভিযোগে সস্ত্রীক শাহাদাত হোসেনের কারাগারে যাওয়া ছাড়া এ বছর কোনো কলঙ্ক নেই বাংলাদেশের ক্রিকেটে।
ফেরা যাক ২০১৫ সালের শেষ দিকে। চলতি বছর জিম্বাবুয়ের সঙ্গে সিরিজের মধ্যদিয়ে শেষ হয় টাইগারদের রূপকথার গল্পের উপসংহার। তবে, সফরকারীদের বিপক্ষে শেষ টি-টোয়েন্টি ম্যাচটিতে হেরে আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে বিদায় নেয় টাইগাররা।
এবার যাওয়া যাক বছরের শুরুতে। এর আগে বাংলাদেশ ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে সুপার এইটে খেলার কৃতিত্ব দেখালেও ২০১৫ সালেই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে সাফল্য রেখার দাগ টানা শুরু করে বাংলাদেশ। গ্রুপ পর্বের এক ম্যাচ বাকি থাকতেই এই অনন্য সাফল্য। ২০১৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি, বিশ্বমঞ্চে পুল ‘এ’র সপ্তম ম্যাচ, বাংলাদেশ বনাম আফগানিস্তান। ক্যানবেরার মানুকা ওভালে আফগানদের দাপটের সঙ্গে ১০৫ রানে হারিয়ে মিশন শুরু হয় টাইগারদের। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পরের ম্যাচটি বৃষ্টির কারণে পণ্ড হয়। লঙ্কানদের বিপক্ষে ২৬ ফেব্রুয়ারি ৯২ রানে হেরে বসে বাংলাদেশ। ০৫ মার্চ স্কটল্যান্ডকে ৬ উইকেটে হারায় লাল-সবুজের জার্সিধারিরা।
এর পরের ম্যাচ ০৯ মার্চ, অ্যাডিলেড, বিশ্বমঞ্চের ৩৩তম ম্যাচে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড। বিশ্বক্রিকেটকে আরেকবার চমকে দিয়ে সে ম্যাচে মাশরাফি বাহিনীর জয়টি ছিল ১৫ রানের। ক্রিকেটের সুতিকাগার ইংল্যান্ড দল পর পর দুই বিশ্বকাপে বাংলাদেশের কাছে হার মানতে বাধ্য হয়। ইংলিশদের হারিয়েই কোয়ার্টারে উঠে টাইগার বাহিনী। সে ম্যাচে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি করেন মাহমুদুল্লাহ। প্রতিকূল অবস্থায় ব্যাটিংয়ে নেমে তিনি ১০৩ রান করে বিশ্বকাপে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে সেঞ্চুরির খাতায় নাম লেখান। আস্থার প্রতিদান দিয়ে মুশফিক ৭৭ বলে ৮৯ রানের অনবদ্য একটি ইনিংস খেলেন। ৫০ ওভারে টাইগাররা ৭ উইকেটে ২৭৫ রান করে ইংল্যান্ডের জন্য চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়। বাঁচা-মরার খেলায় ইংলিশরা জেতার জন্য সাধ্যের সবটুকু ব্যয় করেও জয় পায়নি রুবেল, তাসকিন ও মাশরাফির দৃষ্টিনন্দন বোলিং সাফল্যের কারণে। ২৬০ রানে ইংলিশদের থামিয়ে দিতে রুবেল ৪টি, মাশরাফি আর তাসকিন ২টি করে উইকেট তুলে নেন।
অন্যতম ফেভারিট নিউনিল্যান্ডের বিপক্ষে গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে হেরে যায় বাংলাদেশ। তবে, লড়াই করেই ৩ উইকেটের হার মানে টাইগাররা। টানা দ্বিতীয় ম্যাচেও শতক হাঁকান মাহমুদুল্লাহ। ১২৮ রান করে অপরাজিত থাকেন তিনি। ৫৮ বলে সৌম্য করেন ৫১ রান। আর শেষ দিকে ব্যাটে ঝড় তুলে ২৩ বলে ৪০ রান করেন সাব্বির রহমান। মাশরাফির অনুপস্থিতিতে সে ম্যাচে imagesসাকিবের নেতৃত্বে খেলে টাইগাররা ৭ উইকেট হারিয়ে তোলে ২৮৮ রান। জবাবে ৭ বল হাতে রেখে ৭ উইকেট হারিয়ে জয় তুলে নেয় কিউইরা। কোয়ার্টার ফাইনালে ভারতের কাছে ১০৯ রানে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় বাংলাদেশ। কিন্তু সে ম্যাচটি কতটা বিতর্কিত ছিল, তা সবারই জানা।
এরপর ঘরের মাটিতে পাকিস্তান, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা আর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টানা তিনটি সিরিজ জেতে টাইগাররা। ওয়ানডে র্যাঙ্কিংয়ে সাতে উঠে আসে বাংলাদেশ। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির টিকিটি কেটে নেয় মাশরাফি বাহিনী। টেস্ট র্যাঙ্কিংয়েও নিজেদের সর্বোচ্চ চূড়ায় ওঠে মুশফিক বাহিনী।
এ বছরে বাংলাদেশ মোট ১৮টি ওয়ানডে খেলেছে (বিশ্বকাপের অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ বাদ দিয়ে)। এর মধ্যে ১৩টি ম্যাচেই বিজয়ীর হাসি নিয়ে মাঠ ছেড়েছে লাল-সবুজরা। এর আগে ২০০৯ সালেই সবচেয়ে সফল সময় পার করেছিল বাংলাদেশ। সেবার ১৯টি ওয়ানডের মধ্যে ১৪টি ম্যাচে জিতেছিল বাংলাদেশ।
টেস্টেও টাইগাররা ২০১৫ সালটি কাটিয়েছে দারুণভাবে। পাকিস্তান-ভারত-দ. আফ্রিকার বিপক্ষে ৫টি ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ। সাদা পোশাকে মাত্র একটি ম্যাচেই হারের মুখ দেখে মুশফিক বাহিনী, বাকি চারটি ম্যাচ ড্র হয়। ভারতের বিপক্ষে একমাত্র টেস্ট ড্র হওয়া ছাড়াও টেস্টের সে সময়কার এক নম্বর দল দ. আফ্রিকার বিপক্ষে দুই ম্যাচ টেস্ট সিরিজও ড্র হয়।
এর আগে অবশ্য পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে ৩২৮ রানের বড় ব্যবধানে হারে স্বাগতিক বাংলাদেশ। তবে তারও আগে প্রথম টেস্টে মিসবাহ উল হকের পাকিস্তানকে যেভাবে টাইগার ব্যাটসম্যানরা আঁচড়ে দিয়েছিল, সেটি সফরকারীরা যত দ্রুত ভুলে যেতে চাইবেন, টাইগারপ্রেমীরা ততটাই স্মরণ রাখতে চাইবেন। প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ ৩৩২ রানে অলআউট হলে পাকিস্তান প্রথম ইনিংসে ৬২৮ রানের বিশাল পাহাড় গড়ে। টাইগার স্পিনার তাইজুল সে ইনিংসে তুলে নেন ৬টি উইকেট। পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করে বাংলাদেশ ৬ উইকেট হারিয়ে তোলে ৫৫৫ রান। ড্র মেনে নেন সফরকারী অধিনায়ক। উদ্বোধনী জুটি থেকেই তামিম-ইমরুল তুলে নেন ৩১২ রান। তামিম ২০৬, ইমরুল ১৫০ আর সাকিব অপরাজিত ৭৬ রান করেন।
টি-টোয়েন্টি ফরমেটে টাইগাররা ২০১৫ সালে খেলেছে ৫টি ম্যাচ। এর মধ্যে দুটি ম্যাচেই জেতে স্বাগতিক হিসেবে খেলতে নামা বাংলাদেশ। পাকিস্তানের বিপক্ষে একমাত্র টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশ জেতে দাপটের সঙ্গে। সফরকারীদের ১৪১ রানকে লাল-সবুজরা টপকে যায় ২২ বল হাতে রেখে। সাকিব আর সাব্বির রহমানের দুটি অপরাজিত অর্ধশতকে ৩ উইকেট হারিয়ে সহজ জয় তুলে নেয় মাশরাফির দল। অপর জয়টি জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ম্যাচে ৪ উইকেটের। একই দলের বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচে বাংলাদেশ হার মানে ৩ উইকেটে। তার আগে দ. আফ্রিকার বিপক্ষে দুটি ম্যাচেই পরাজয়ের মুখ দেখে স্বাগতিক বাংলাদেশ।
আইসিসির নবতর সংস্করণ টি-টোয়েন্টিকে বলা হয় ক্রিকেট বিশ্বের অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার। তবে, এর কারণেই ক্রিকেটে কিছুটা হলেও অনিয়ম-দুর্নীতি বাসা বাঁধে। বিপিএল এর প্রথম আসর (২০১২) নিয়ে নানা রকম সমস্যা তৈরি হলেও, দ্বিতীয় আসরটিকে (২০১৩) দেশের ক্রিকেটের সবথেকে বড় কলঙ্ক হিসেবে ধরা হয়। এক বছর বাদে ফের ২০১৫ সালে বিপিএলের জমজমাট তৃতীয় আসরটি বসে বাংলাদেশে। এতে টি-টোয়েন্টির সবথেকে বড় বিজ্ঞাপন ক্রিস গেইল, শহীদ আফ্রিদিদের সঙ্গে অংশ নেন কুমার সাঙ্গাকারা, লেন্ডল সিমন্স, মারলন স্যামুয়েলস, রবি বোপারা, সুনীল নারাইন, মোহাম্মদ হাফিজ, মোহাম্মদ আমির, শোয়েব মালিকদের মতো তারকা ক্রিকেটাররা। টুর্নামেন্টের সমাপ্তি ঘটে নতুন দল কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের জয়ের মধ্য দিয়ে। টানা তিনটি শিরোপাই হাতে নেন কুমিল্লার দলপতি মাশরাফি বিন মর্তুজা।
এ বছর বাংলাদেশ পেয়েছে নতুন নতুন ম্যাচ উইনার। টেস্টের বিস্ময় মুমিনুল হক, তাইজুল ইসলাম, জুবায়ের লিখন আর ওয়ানডের চমক সৌম্য, সাব্বির, লিটন, মুস্তাফিজ, তাসকিনদের মতো বিশ্বমানের ক্রিকেটার নিজেদের যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন। বিশ্ব র্স্পোটস মিডিয়ায় বাংলাদেশের ক্রিকেটের উন্নতির কথা বারবার ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে। বলা যায়, বাংলাদেশের ক্রিকেটের সামগ্রিক ফলাফল নিশ্চিত উর্ধগামী।
২০১৫কে পেরিয়ে ২০১৬তে টাইগারদের সাফল্য লুটোপুটি খাবে, সেটিও বলার অপেক্ষা রাখে না। যে দেশে আইসিসির বর্ষসেরা ওয়ানডে একাদশের সদস্য ‘কাটার মাস্টার’ খ্যাত মুস্তাফিজ রয়েছেন, যে দেশে ক্রিকেট বিশ্বের তিন ফরমেটের সেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান রয়েছেন, যে দেশে ক্রিকেট বিশ্বকে বারবার চমকে দেওয়া অধিনায়ক মাশরাফি রয়েছেন- সে দেশটি ক্রিকেটের পরাশক্তিতে রূপান্তরিত হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে এটিও আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
-বাংলানিউজ



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :